গল্পঃ রাঙা পিসিমা - কস্তুরী মুখার্জি



বাঁশপুকুর স্টেশন-চত্বর ছাড়িয়ে যে রাস্তাটা বাঁশবনের বুক চিরে প্রায় দু’মাইল গিয়ে চড়কতলায় মিশেছে, সেই রাস্তা বরাবর মাত্র একটা আলোর পোস্ট আছে। এক হলুদ মরা আলোর আভা রাস্তার কিছুটা অংশ ছেয়ে রেখেছে। বাকি অংশ নিকষ অন্ধকার। দুই ধারে গভীর বাঁশঝাড় আর কিছু অন্য গাছ আছে। অরণ্যর আজ ফিরতে রাত হয়েছে। এগারোটা বাজে। ধারে কাছে কোনও যাত্রী চোখে পড়ছে না। প্ল্যাটফর্মের দুই ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে কোনও রিকশা দেখতে পেল না। আজকাল টোটো চালু হয়েছে, কিন্তু এত রাতে পাওয়ার কোনও আশা নেই। অগত্যা মধুসূদনের নাম নিয়ে হাঁটা শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিছুটা এগোতেই অরণ্য একটা রিকশার ঘণ্টির আওয়াজ পেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখতে পেল না। ‘তাহলে বোধহয় দুই সতীনের পুকুরপাড় দিয়ে কোনও রিকশা আসছে। আর ভেবে কী হবে। কপালে নেই ঘি, ঠকঠকালে হবে কী!’
অফিস থেকে বেরোনোর সময় আজ যখন এক শালিক দেখল তখনই অরণ্য প্রমাদ গুনেছিল। কিছু অঘটন আজ ঘটবেই। হলও তাই। হাওড়া স্টেশনে এসে শোনে লাইনে কোথায় কী গণ্ডগোল হয়েছে তাই ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে। অবশেষে সাতটা পাঁচের ট্রেনটা ন’টায় ছাড়ল। সেই ট্রেন বাঁশপুকুর এল রাত এগারোটায়।
আবার রিকশার আওয়াজ ভেসে আসছে। অরণ্য মিনিট দুয়েক দাঁড়াল। যদি এদিকে আসে তবে ভাড়া যাই নিক উঠে পড়বে। কিন্তু শব্দটা মিলিয়ে গেল। ‘ব্যাপারটা কী হচ্ছে! মনে হল, রিকশাটা এদিকে আসছে। কিন্তু শব্দটা যেন দূরে সরে গেল! যাক গে, অত ভাবতে পারছি না। এই পথটুকু হেঁটেই মেরে দেব।’
প্রায় আধ কিলোমিটার পেরিয়েছে, সাথে সাথে পোস্টের আলোটা দপ করে নিভে গেল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুই পাশে বাঁশবন থেকে রাতচরা পাখির ডাক ভেসে আসছে। দুই হাত সামনের কিছু দেখা যাচ্ছে না। অরণ্যর গা ছমছম করছে। হঠাৎ মনে হল, একটা ঘসঘসে আওয়াজ বাঁদিক থেকে ডানদিকে চলে গেল। এক মুহূর্ত থমকে গেল অরণ্য। একটা ভয় ওর সারা শরীরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এইসময় রাঙাপিসিমার কথা মনে পড়ছে, ‘অরু, রাতের বেলায় এই গাঁ-গঞ্জে হাতে আলো ছাড়া বেরোবি না।’
কিন্তু এমন কাণ্ড হবে জানবে কী করে! অফিস বেরোনোর সময় তো টর্চ নিয়েও বের হয়নি। বুকের ভেতর একটা ধুকপুকানি নিয়ে অরণ্য এক-পা দু-পা করে এগোচ্ছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কড়কড় আওয়াজের সাথে বাঁশগাছগুলো দুলতে শুরু করল। অরণ্য বুঝতে পারছে না যে ঝড় উঠল কি না। অবশ্য বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পা চালাতে শুরু করল। এরপর বৃষ্টি আরম্ভ হল, আর একেবারে মুষলধারে বৃষ্টি। এদিকে বৃষ্টি আর তার সাথে উথালপাথাল ঝড়। অরণ্যর মনে হচ্ছে, ও সোজা হাঁটতে পারছে না। একটা আসুরিক শক্তি ওকে বাঁয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অরণ্যর শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের এক কনকনে ঠাণ্ডা স্রোত পায়ের দিকে নেমে যাচ্ছে। কিছুতেই দিক ঠিক রাখতে পারছে না। এইসময় অরণ্যর চোখে পড়ল, ওর সামনে একজন মানুষের ছায়া। কিন্তু চোখের মণি দিয়ে সবুজ আলো ঠিকরে পড়ছে। ভয়ংকর সেই দৃষ্টি।
“কে!” আতঙ্কে অরণ্যর গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ ছিটকে বেরোল।

*****

“না না, এখন পারব না। তোমার এই বাদলা, মনীষা - এদের তোয়াজ করতে পারব না।”
“এটা কী বললি, অরু? অবলা জীব! এরাও ঈশ্বরের সন্তান। কী ক্ষতি করেছে এরা তোর? দুইবেলা দুই মুঠো বিচুলি খায়। এটুকুও করতে পারবি না?” রাঙাপিসিমা কষ্ট বিরক্তি মিশ্রিত এক অদ্ভুত গলার স্বরে কথাগুলো বলল।
“বাদলা, মনীষা এইটুকু খায়!” অরণ্যর চোখ গোল গোল করে পিসিমার দিকে তাকিয়ে আছে।
“অরু!” চিৎকার করে উঠল পিসিমা। “খেতে দিবি না, দিস না। এমন কোনও কথা বলিস না যাতে ওই অবোধ প্রাণীদুটো কষ্ট পায়।” কঠিন স্বরে কথাগুলো বলল পিসিমা।
“কিন্তু… কিন্তু রাঙাপিসিমা, ওরা তো গাই। ওরা কষ্ট বুঝবে কী করে?”
“খবরদার অরু, ওদের সম্পর্কে আর একটা খারাপ কথা শুনতে রাজি নই।” বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল পিসিমা। “ওরা আমার দুটো মেয়ে রে, অরু। কোনওদিন ভুলিস না এটা।”

*****

গলা দিয়ে তীক্ষ্ণ শিসের মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে। বরফের মতো ঠাণ্ডা পাদুটো আঁকড়ে ধরে আছে।
‘রাঙা-পিসি-ম-মা…’
‘অরু, তুই একটা কসাই! এত টাকার দরকার হয়ে পড়েছিল যে বাদলা-মনীষাকে ওই পাষণ্ডটার কাছে বিক্রি করে দিলি?’
রাঙাপিসিমার কথাগুলো অরণ্যর কানে যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে।
‘বড়ো কষ্ট.... বড়ো....জল রাঙা-পিসি-মা…’

তখন রাত তিনটে বাজে। হরিদাস আর বিপ্লব আড়তে যাবার জন্য বেরিয়েছে। ওই পথ দিয়ে দুই সতীনের পুকুর ধরে বালিখাল আড়তে যাবে। হঠাৎ ডানদিকে বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে একটা গোঙানির মতো আওয়াজ ভেসে কানে এল।
“কীসের আওয়াজ রে, বিপ্লব?” হরিদাস কানটাকে খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করছে।
“হ্যাঁ গো কাকা, আমিও শুনতে পাচ্ছি। এই তো, এইদিক দিয়ে শব্দটা আসছে।” বলে ডানদিকে একটা ফলসাগাছ দেখাল বিপ্লব।
“হুঁ, চল তো যাই একবার।”
“তুমি কি পাগল হলে? এখন গেলে আড়তে দেরি হয়ে যাবে না! ভালো মাছ পাওয়া যাবে না।” ভ্যানটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বিপ্লব বলল।
“ভ্যান থামা, বিপ্লব। হ্যাঁ রে, তোর কি কলজে বলে কিছু নেই? একজন বিপদে পড়েছে আর তুই ব্যাবসার হিসেব দেখছিস?” রাগে গজ গজ করতে লাগল হরিদাস।
ভ্যান থামিয়ে হরিদাস আর বিপ্লব পায়ে পায়ে বাঁশঝাড়ের ভেতর ঢুকল। বেশ খানিকটা ঢুকে দেখতে পেল একটা মানুষ মাটিতে পড়ে আছে। পরনের শার্ট-প্যান্ট ছিঁড়েখুঁড়ে একসা। সবচেয়ে তাজ্জবের ব্যাপার, শার্টের বেশ কিছু অংশ একটা বাঁশগাছের গোড়ায় আটকানো। কাছে গিয়ে হরিদাস উঁকি মেরে বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো ছিটকে সরে এল। “বিপ্লব!” চিৎকার করে উঠল, “এ যে দস্তিদার বাড়ির ছেলে অরণ্য!এখানে কী করে এল?”
কাকার চিৎকারে বিপ্লব ছুটে কাছে এল। “শোনো কাকা, শিবুকাকাকে এখনই জানাতে হবে। অরু এখানে কীভাবে এল! তুমি ভ্যানটা নিয়ে তাড়াতাড়ি শিবুকাকার বাড়ি চলে যাও। অরুর জ্ঞান আছে এখন। হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এক্ষুনি।”
“তোকে একা রেখে আমি কীভাবে যাব? মোবাইল আনিসনি?”
“হ্যাঁ, এনেছি। কিন্তু…”
“কিন্তু কী? শিবুর নম্বর নেই?”
“হ্যাঁ, তা আছে। তবে…”
“তবেটা কী? বিপ্লব, নষ্ট করার মতো সময় নেই। ফোন কর তাড়াতাড়ি।”
“শেষরাতে ফোন করলে যদি বিরক্ত হয়!” দ্বিধান্বিত স্বরে বিপ্লব কথাগুলো বলল।
“আচ্ছা বোকা তো তুই! শিবু মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান। মানুষ বিপদে পড়লে তো ওর কাছে যাবেই। আর বিপদ কি সুবিধামতো সময়ে আসে? রাগ করবে কেন? কর কর।”
হরিদাস দৌড়ে রাস্তার কল থেকে বালতি করে জল নিয়ে অরণ্যর চোখেমুখে ছেটাতে লাগল।

“অরণ্য ওখানে কীভাবে গেল? কারোর সাথে কোনও হাতাহাতির চিহ্নও তো দেখছি না!” ডাক্তার মাইতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শিবসাধনবাবুর দিকে তাকালেন।
শিবসাধন বোসের তৎপরতায় অরণ্যকে বাঁশপুকুর থেকে ঘন্টা খানেকের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। বিপ্লব, হরিদাস আর ওখানকার আরও কয়েকজন ছেলে সাথে এসেছে। শিবসাধনবাবুও দায়িত্ব না এড়িয়ে এসেছেন।
“আমিও ভাবছি, ও কীভাবে অত ঘন জঙ্গলের মধ্যে গেল?” শিবসাধন খানিকটা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“শিবুকাকা,” বিপ্লবের ডাকে শিবসাধনবাবু ঘুরে তাকালেন। “আমরা যখন অরুর জ্ঞান ফেরানোর জন্য চোখেমুখে জল ছেটাচ্ছিলাম তখন ওর গোঙানির মধ্যে শুধু ‘রাঙাপিসিমা’ এই কথাটা শুনছিলাম। আরও কিছু বলছিল, কিন্তু কথাগুলো এত জড়ানো ছিল যে বোঝা যাচ্ছিল না।”
“রাঙাপিসিমা কে?” ডাক্তার মাইতি বিপ্লবের তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“অরণ্যর পিসি। উনি অরণ্যকে মানুষ করেছেন। ছোটোবেলায় এক গাড়ি দুর্ঘটনায় অরণ্য মা-বাবা আর ছোটো বোনকে হারিয়েছিল। তারপর এই রাঙাপিসিমাই কোলেপিঠে করে বড়ো করেছেন। উনি সারা পাড়ার রাঙাপিসিমা। কিন্তু আমি ভাবছি, রাঙাপিসিমা তো কবেই মারা গেছেন। তার কথা বলবে কেন?” হরিদাস উত্তর দিল।

দিন সাতেক পরে অরণ্য কিছুটা সুস্থ হলে বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু বাড়ি ফিরেও বেশিরভাগ সময় চুপচাপ শুয়ে থাকে। কথা বলে না। সেদিনের ঘটনাটা জানবার কৌতূহলে সবাই নানা প্রশ্ন করে, কিন্তু অরণ্য কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। একটা বোবা দৃষ্টি নিয়ে খানিক তাকিয়ে থেকে চোখ বুজে ফেলে।
“অরু, ও অরু, বাড়ি আছিস?” একটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বর অরণ্যর সদর দরজার দিক থেকে শোনা গেল।
“কে?” মলিনামাসি রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল। অরণ্যকে বাড়ি নিয়ে আসার পর ওর রাঁধুনি মলিনামাসি নিজের থেকেই অরণ্যর কাছে থাকতে রাজি হয়েছে। মাসিই অরণ্যর দেখভাল করে।
“আমি। সনাতন পাইক। দরজাটা খোলো।”
“কেন? অরু তো কারও সাথে দেখা করে না।” বেশ ঝাঁঝের সাথেই কথাটা বলল মলিনামাসি।
“একটু খোলো। আমি দু’মিনিট দেখা করে চলে যাব।” করুণ স্বরে সনাতন গয়লা মলিনামাসিকে মিনতি জানাল।
মিনিট তিনেক পরে দরজা খুলল মলিনামাসি।
“অরু, অরু, সর্বনাশ হয়ে গেছে!” হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল সনাতন।
অরণ্য তাকাল, কিন্ত ওর চাউনি সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন।
“এই সাতসকালে এই বাড়িতে কী খবর এনেছ? দেখছ ছেলেটা বোবা হয়ে পড়ে আছে! খেতে দিলে খায় নয়তো চুপ করে পড়ে থাকে।” মলিনামাসি রেগে উঠল।
“অরু, বাদলা মরে গেছে!” ভয়ার্ত চোখে অরণ্যর দিকে তাকিয়ে সনাতন বলল।
বিদ্যুৎ চমকানোর মতো চমকে উঠল অরণ্য। আচমকা কাঁপুনি শুরু হল।
“ব্যাপারটা কী হল, সনাতন? অরু তো কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে গেল! কী বললে তুমি ওকে?”
সনাতন হতভম্বের মতো মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল।
একটা সাদা শাড়ি পরা মানুষের ছায়া দুলে উঠল অরণ্যর চোখের সামনে। সে হাত বাড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করল ছায়াটাকে, কিন্তু দূরে বহুদূরে সরে গেল।
‘রাঙাপিসিমা এস, কাছে এস।’
একটা মাতাল ঝোড়ো হাওয়া যেন বিশ্বচরাচর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
‘বাদলাকে মেরে ফেললি, অরু? আমি জানতাম এটাই হবে। এবার মনীষাও যাবে।’
‘রাঙাপিসিমা, রাঙা-পিসি-মা,’ অরণ্যর গলা দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে।
“অরু, এই অরু, কী বলছিস?” মলিনামাসি অরণ্যকে ঝাঁকাচ্ছে। “কে কোথায় আছ শিগগির ডাক্তার ডাকো।”
অরণ্যর চোখের সামনে দিয়ে রাঙাপিসিমা বাদলাকে জড়িয়ে ধরে দূরে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন দুধসাদা মেঘের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
চারদিক থেকে বহু উদ্বিগ্ন কন্ঠ ঘিরে ধরেছে। কে যে কী বলছে অরণ্যর মাথায় ঢুকছে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
“মাসি, রাঙাপিসিমা এসেছিল!” হঠাৎ অরণ্য বলে উঠল।
“কী বলছিস, অরু!” মলিনামাসি অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে।
“হ্যাঁ,” অরণ্যর ক্ষীণ স্বর শোনা গেল। “রাঙাপিসিমা বাদলাকে নিয়ে চলে গেল। এবার কি মনীষার পালা! তারপর!”
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

1 comment:

  1. Khub sundor ekti golpo..jhorjhore..tantan...eto choto golper modheyo voy bodh ta nipun vabe porisphuto hoyeche. Lekhika anobodyo

    ReplyDelete