গল্পঃ গড়বড়িপুরের ইতিবৃত্ত - সুস্মিতা কুণ্ডু



।।এক।।

“আহা! সবটা শোনার আগেই অমনধারা বেয়াক্কেলেমার্কা হ্যা হ্যা করে হাসলে কী করে চলবে ভায়া? অ্যাঁ! কী বললে, হাসি পাওয়ারই কথা? তা হেসে নাও। বেঁচে গেলে, বুঝলে? নেহাতই দোর্দণ্ডপ্রতাপ রণেন্দ্র গড়গড়ি আজ চন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছেন কিনা! ধুত্তোর! আজ কেন হবেন? কত্তাঠাকুর গত হয়েছেন সে কত যুগ আগের কথা। তুমি ভায়া কথার মাত্রা কারে কয় সেটাই বোঝো না দেখছি।”
“অ বেম্মদাদু! কার সাতে কতা কইচ এই ভরদুপুরে পুকুরঘাটে বসে বসে?”
“অ্যাঁ! ক্ক-কে, কোতায়?”
“আমি গো দাদু, আমি। পাটকিলে।”
“অ তুই! আমি ভাবলুম বোসেদের ওই বেয়াদপ ছোঁড়াটা।”
“কে? যতীন? ও বেয়াদপ হতে যাবে কেন খামোকা! ও তো ভারি ভালো ছেলে। কেলাসে ফাস্ট হয় গো, জলপানি পায়।”
“ভালো না ব্যাঙের মাথা! জলপানি না হাতি! পয়লা নম্বরের বজ্জাত ছেলে। আমায় দেখলেই ঢিস ঢিস করে খোলামকুচি তুলে মারবে, হতভাগা।”
“বেম্মদাদু, তোমার মাথাটা একেবারেই গ্যাচে। যতীন কি তোমায় দেখতে পায় যে তোমায় ঢিলি ছুড়ে মারবে? ও হয়তো পুকুরের জলে খোলামকুচি দিয়ে ব্যাঙ নাচানোর মকশো করে। ওই যে গো মাটির হাঁড়ি, সরা ভেঙে যে পাতলা পাতলা চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা টুকরো হয়। ওগুলোকে জলের ওপর দিয়ে ছুড়লে কেমন লাফাতে লাফাতে যায়। কার ঢিলিটা কদ্দুর গেল, ক’টা লাফ মেরে তবে জলে ডুবল, সে এক ভারি মজার খেলা দাদু।”
“তুই থাম! ব্যাঙ নাচানো খেলা আমায় শেখাতে আসিসনি! সেদিনের ছোঁড়া, খালি মুখে পটর পটর কথা।”
“আচ্ছা ঠিক আছে আমি নয় চুপ করলুম। তা তুমি কার সাথে অত হাত-পা নেড়ে বকবক করছিলে, শুনি?”
“ও তুই চিনবিনে, দেখতেও পাবিনে। নতুন এক মক্কেল এয়েচে সদর থেকে। আমাদের গেরামের নাম শুনে খ্যাঁক খ্যাঁক করে মশকরা করচে। বলে, গড়বড়িপুর আবার কোনও নাম নাকি? বোঝ পাটকিলে, কথাখানা!”
“তা ওর আর দোষ কী বেম্মদাদু, এমনধারা নাম কোন গাঁয়েরই বা হয় বলো দেখি? অবিশ্যি আমাদের গাঁয়ের সাথে নামটা ভারি লাগসই। তুমিই বলো, এই যে তুমি ভূত তাও কিনা আমি তোমায় দেখতে পাই, কথা কই, তুমি আমার ঘাড়ও মটকাওনি...”
“ফের যদি আমায় ভূত বলবি তো সত্যি সত্যি তোর ঘাড় মটকাব, পাটকিলে! আমি হলুম গিয়ে বেম্মদত্যি, আমাকে কোথায় ভক্তিচ্ছেদা করবি, তা নয়!”
“আহা খেপচো ক্যানো? বলি তোমার সাথে কি আমার ঘাড় মটকানোর সম্পক্ক, বেম্মদাদু? তাই যদি হত তবে সারা গাঁয়ের লোক তোমায় দেখতে শুনতে পায় না, আমি কেন পাই?”
“ছোঁড়া এমন সিড়িঙ্গেমার্কা হলে কী হবে, ওই ঝাঁকড়াচুলো মুণ্ডুতে ঘিলু আছে, পোয়াটাক। তা ভরদুপুরে চললি কোতা? ইশকুল নেই তোর?”
“তোমাদের ভূতেদের... থুক্কুড়ি, বেম্মদত্যিদের বেলগাছে ক্যালেন্ডার ঝোলানো থাকে না বুঝি? আজ রোববার তাও জানো না? তুমি বরং তোমার নতুন মক্কেলকে গড়বড়িপুরে ইতিহাস পড়াও। আমি চললুম বুনোখুড়োর সবুজঘরে। ঘড়িফুলের বীজ আনতে বলেছিল বুনোখুড়ো। সকাল থেকে অনেক ঢুঁড়ে শেষমেশ ঝিনুকপোঁতার জঙ্গল থেকে এনেচি। জানিনে সঠিক বীজ মিলল কি না!”
“অ। ওই এক পাগল, কাঁচের ঘর না কী ঢপ গড়েচে, এর চে’ পানের বরজ করলে কাজ দিত। বুনোটা চিরকাল বুনোই থেকে গেল। তোর ওই পাগলের ঘরে গিয়ে কাজ নেই, হেথা বোস। নিজের গেরামের জন্মকথা শোন দেখি।”
“কতবার শুনব দাদু! তুমি বলো, নরুনখুড়ো বলে, সাজুপিসি বলে, এই গাঁয়ের সবাই-ই দিনে একবার করে বলে। আমায় রেহাই দাও।”
“চোওওওপ! বোস ওই ঘাটের ধাপটায়।”
অগত্যা কাঁধের চটের ঝোলাটা নামিয়ে বেলপুকুরের ঘাটে এসে বসে পাটকিলে। মা-বাপ ছুটির দিনে নাকে সর্ষের তেল দিয়ে যেই না শুয়েছে, অমনি পাটকিলে বেরিয়েছে দেশভ্রমণে, মানে ওই গ্রামভ্রমণে আর কী! পাটকিলের একটা ভালো নাম আছে অবিশ্যি ইস্কুলের খাতায়। কিন্তু সে নাম ওর নিজেরও মনে থাকত না যদি না দিনে একবার করে রোল কলের সময় পণ্ডিতমশাই হাঁক দিত।
যাই হোক, পাটকিলের নামের বেত্তান্ত অন্যদিন হবেখ’ন। এদিকে বেম্মদাদু তাঁর গপ্পের ঝুলি খুলে বসেছেন পাটকিলে আর অদেখা কে জানে কোন নব্য ভূত অতিথির সামনে।

।।দুই।।

পাটকিলের বড্ড মায়া হয় বেম্মদাদুর জন্য। লোকটা মুক্তি না পেয়ে আজ কত্ত বছর ধরে এই গাঁয়ের বেলপুকুরের পাশের বেঁটে বেলগাছটায় ঘাঁটি গেড়ে রয়েছেন। ওদের আলাপও হয়েছিল বড্ড অদ্ভুতভাবে। পাটকিলেদের ইস্কুল যাওয়ার রাস্তাটা গ্রামের মাঝখানে চণ্ডীমণ্ডপের এক প্যাঁচ চক্কর কেটে যায়। বেলপুকুরটা হল গিয়ে গ্রামের উত্তরপ্রান্তে, আর পাটকিলেদের বাড়ি দক্ষিণপ্রান্ত। পুবে শেষপ্রান্তে জমিদার গড়গড়িদের মহল, আর মহল পেরিয়ে ঝিনুকপোঁতা জঙ্গল। পশ্চিমে সটান গেলে পরে গাঁয়ের শ্মশান। পাশ দিয়ে সরু নদী বয়ে গেছে, নাম তার ঝিলিমিলি। ইস্কুল, চণ্ডীমণ্ডপ, নাদুকাকার হরেক মালের দোকান, সব্জির বাজার, সবকিছুই গ্রামের মাঝামাঝি। আপাতদৃষ্টিতে তাই পাটকিলের উত্তরপ্রান্তে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। তবে ওই যে বলে কাকের হাততালি, ইয়ে মানে কাকতালীয় ব্যাপার-স্যাপার।
সেদিন ইস্কুলের অঙ্ক ক্লাসে চার নম্বর অনুশীলনীর সবক’টা অঙ্ক কষে নিয়ে যেতে বলেছিলেন দিবাকর মাস্টারমশাই। উনি তো বলেই খালাস। এদিকে প্রায় ঊনচল্লিশখানা অঙ্ক এক রবিবারের ভেতর করা কি চাট্টিখানি কথা? অবিশ্যি যতীনের কাছে এটা বাঁয়ে হাত কা খেল। কিন্তু সবাই তো আর যতীন হয় না যে দিনরাত্তির চিলেকোঠার ঘরে খিল দিয়ে আঁক কষবে। কিছু লোকজন তো পাটকিলের মতোও হয়। যাদের সারাদিন মাছ ধরার চারের কেঁচো, ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার কাঁচগুঁড়ো, টিয়াদিদির গলার মালা বানাবার জন্য লাল লাল কুঁচফল, ঝুপাই ছাগলের জন্য কচি বাঁশপাতা জোগাড় করতেই সময় চলে যায়। এত কাজ সেরে সন্ধেবেলায় হাত-পা ধুয়ে যখন পড়তে বসে পাটকিলে তখন দু’চোখে কেজি কেজি ঘুম নেমে আসে। তোমরাই বলো, সেই অবস্থায় সিঁড়িভাঙা অঙ্ক মাথায় ঢোকাতে গেলে হাতুড়ি দিয়ে খুলিটাই ভাঙতে হবে না কী?
সে যাই হোক গে, সোমবার দিন ঊনচল্লিশটা অঙ্কের বদলে মোটে ন’খানা অঙ্ক খাতায় নিয়ে ইস্কুলে ঢুকতে সাহস হলুনি পাটকিলের। তাই বাড়ি আর পাঠশালা থেকে যতটা দূরে থাকা যায় সেটাই মঙ্গল - এই ভেবে সোওওজা গাঁয়ের ও-মাথায়, মানে সেই উত্তর পানে বেলপুকুরের পাড়ে পাড়ি দিয়েছিল পাটকিলে। দিবাকরমাস্টার, “মৃগাঙ্ক সান্নেল, মিরিগাংকো সান্নেএএএল, আরে ওই ব্যাটা পাটকিলে!” বলে রোল কলের সময় যে দাঁত খিঁচিয়ে টেবিল মাথায় তুলবেন, তাইতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ওর।
বেলপুকুরের পাড়ে একটা বেঁটে ঝাঁকড়ামতো বেলগাছের ছায়ায় শুয়ে শুয়ে একটা একটা করে ঘাস ছিঁড়ে গোড়াটা মুখে দিয়ে চিবোচ্ছিল পাটকিলে। বেশ কষাটে মিঠে খেতে, মন্দ লাগছিল না চেবাতে। বাবা যে তবে মাঝে মাঝে বলে, ‘তুই একটা আস্ত পাঁঠা’ ভুল কিছু বলে না - মনে মনে ভাবছিল পাটকিলে। ইস্কুল ছুটির সময় বাকিদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে, এমনটাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল। কাল আবার দিবাকর মাস্টারকে কী বলে আটকাবে, চিৎপটাং হয়ে শুয়ে সেই মতলব ভাঁজতে ভাঁজতে কখন যেন চোখদুটো লেগে গিয়েছিল ওর। হঠাৎ করে একটা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগতে তন্দ্রাটা ছুটে গিয়ে চোখ মেলল পাটকিলে। চোখ খুলতেই দেখল, নাকের ঠিক চার কড়া ওপরে একটা গোল ইয়াব্বড় বেল ঝুলছে, মানে শূন্যে একদম ভাসছে। ই কী রে বাবা! সেদিন যে ক্লাসে রমেন মাস্টার মাধ্যাকর্ষণমর্ষন কী সব পড়ালে! সব জিনিসই পৃথিবীর বুকে নাকি দুম করে আছড়ে পড়ে, তবে বেলটা এমন ধারা ভাসছে কী করে?
ওওওওওও! বিজ্ঞানী নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছিল বলে যেমন মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেছিলেন, তেমন পাটকিলেরও নাকে বেল ফেলে ভগবান ওকে দিয়ে কিছু আবিষ্কার করাতে চাইছে নিশ্চয়ই। নিজেকে বেশ কেষ্টবিষ্টু মনে হতে লাগে পাটকিলের। হুঁহ্, এবার থেকে ওকে নিউটনের সূত্র পড়তে হবে না। ওই ব্যাটা যতীন-শিমূল-বলাই-ভেনো ওরা সব পাটকিলের সূত্র ইয়ে মানে, মৃগাঙ্ক সান্নেলের সূত্র পড়বে বইতে। চোখমুখ কুঁচকে ভাসমান বেলটার দিকে তাকায় পাটকিলে - আসছে, আসছে, কিছু কি জটিল সূত্র মাথায় আসছে? ভুরুদুটো আরও কোঁচকায়, নিদেনপক্ষে চার নম্বর অনুশীলনীর সিঁড়িভাঙা সরলটার সমাধানটাও যদি আসে! কিন্তু নাহ্, কিছুই আসছে নাকো।
আরে, দাঁড়াও দাঁড়াও! কী যেন একটা ঘটছে, নাকের ডগায় ভাসমান বেলটার চারধারে। একটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া জমাট বাঁধছে। এ কেমনধারা সূত্র রে বাবা! জমাট বাঁধতে বাঁধতে হাত হল, পা হল, মাথা হল, টিকি হল... তবে কি ভৌতবিজ্ঞানের বদলে জীবনবিজ্ঞানের সূত্র আসছে নাকি?
এমন সময় ধোঁয়া জমাট লম্বাপানা হাতটা জব্বর গাঁট্টা লাগাল চাঁদিতে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে গেল পাটকিলে, নাকটা ঝুলন্ত ভাসন্ত বেলে ঠুকে গেল।
“বলি এই ভরদুকুরবেলায় আমার গাছতলায় পড়ে পড়ে নাক ডাকাচ্চিস, তুই কে রে ছোঁড়া?” সামনের মূর্তিটা বলে উঠল। ধোঁয়া জমে জমে বেশ ভালোরকমের একটা ফর্সামতো ভুঁড়িওয়ালা মানুষের রূপ নিয়েছে। ন্যাড়ামাথায় লম্বা টিকি, আদুর গায়ে পৈতে, পরনে ধবধবে ধুতি।
“তুমি কি চণ্ডীমণ্ডপের নতুন পুরুত?”
“অ্যাঁ, বলে কী ছোঁড়া! আমি নাকি ওই বারোয়ারি মন্দিরের পুরুত! আমি খোদ জমিদার রণেন্দ্র গড়গড়ির নাটমন্দিরের মা মহামায়ার খাস পূজারি! অ্যাই অ্যাই, থাম থাম! তুই আমাকে দেখতে পাচ্চিস নাকি? এমনটা তো কথা নয়। শুধুই শুনতে পাওয়ার কথা, তাও আমি চাইলে তবেই।”
“ও দাদু, তুমি কি পাগল? এই তো দিব্যি টিকি নেড়ে কতা কইচ, দেখতে পাব না কেন শুনি?”
“এ তো মহা গোল হল! তুই জানিস আমি বেম্মদত্যি? এভাবে দুমদাম আলটপকা একটা ছোঁড়া আমায় দেখে ফেললে আমার মানসম্মানটা কোথায় যায়, অ্যাঁ? পশ্চিমের শ্মশানঘাটের চ্যাংড়া ভূতগুলোর থেকে দূরে যে জন্য এখেনে এসে শান্তিতে ঠাঁই গাড়লুম। কিন্তু তুই ব্যাটা তো দেখছি সব ভণ্ডুল করবি। না না, তোর ঘাড়টা দেখছি আমায় মটকাতেই হবে।” গর্জন করে সামনের ধোঁয়া জমাট লোকটা।
“ওওও, তুমি তবে সেই কোনকালের বামুন, মরে ভূত হয়েছ! তা ধোঁয়াদাদু, খামোখা একটা কচি ছেলের ঘাড় মটকে মেরে ফেলতে তোমার মানে লাগবে না বুঝি? বিশেষ করে যখন একটা সূত্র প্রায় আবিষ্কার করেই ফেলেছি, এমন সময়। দেশের, বিজ্ঞানের কী ক্ষতি হবে ভাবো দিকিনি।”
“দূর মুখপোড়া। প্রথম কথা হল ভূত নয়, বেম্মদত্যি বলবি। আর দু’নম্বরি কথা হল যদি তোকে মারার হত তবে ওই বেলটাকে তোর নাকের ডগায় ধপাস হওয়ার থেকে আটকালুম কেন, অ্যাঁ? নেহাতই আমার গাছের তলায় বেলের গুঁতোয় প্রাণ খোয়াবি বলে মায়া হল, তাই জন্যেই তো...”
“আচ্ছা ঠিক আছে, বেম্মদাদু বলেই ডাকবখ’ন তোমায়। দ্যাখো, তুমি আমার নাকটা, ইয়ে মানে প্রাণটা বাঁচালে তাই সেই কৃতজ্ঞতায় আমিও কথা দিলুম তোমার কথা আমি কাউউউউকে বলব না। এই যে আমি তোমায় দেখতে শুনতে পাই, সেটাও কাকপক্ষীতে টের পাবে না ঘুণাক্ষরেও। কী, এবার খুশি তো?”
“তা মন্দ বলিসনি। ছোঁড়ার মগজে শুধু ভুষিই নেই দেখছি। তবে যেদিনই তুই শর্ত ভাঙবি আমিও তোর ঘাড় মটকাব।”
এরপর বেলপুকুরের পাড়ের ঝাঁকড়া বেলগাছে অনেক বেল পেকেছে, পাটকিলে আরও আরও অনেকবার স্কুল পালিয়েছে, বেম্মদাদুর সাথে পাটকিলের ঝুড়ি ঝুড়ি ঝগড়া হয়েছে তবুও বেম্মদাদু পাটকিলের ঘাড় মটকায়নি। উলটে পাটকিলেই বেম্মদাদুর ঘাড়ে চেপে কলকাতা শহর ঘুরে এসেছে। সে অবশ্য আরেক বেত্তান্ত, পরে হবেখ’ন।
আজ আপাতত ফিরে যাওয়া যাক সেই অচেনা অদেখা অজানা নব্য ভূতটার কাছে, যাকে বেম্মদাদু পাকড়াও করেছে গড়বড়িপুরের নামের ইতিহাস শোনাবে বলে।

।।তিন।।

“বুঝলি পাটকিলে? বুঝলেন মশাই? ও মশাই, শুনছেন তো? অবিশ্যি না শুনে যাবেনটাই বা কোতায়?” বেশ খোশমেজাজে শুরু করেন বেম্মদাদু।
“সবাই শুনচে দাদু, তুমি শিগ্গির শুরু করো তো বাপু।” অধৈর্য হয়ে বলে পাটকিলে।
“অত তাড়া কীসের শুনি? ভারি তো যাবি বুনোর আস্তানায়। চুপটি করে বোস, নইলে ঘাড় মটকে দেব।”  দাঁত খিঁচোয় বেম্মদাদু।
ফিসফিসিয়ে পাটকিলে বলে, “বিষ নেই কুলোপানা চক্কর।”
“কী বললি হতভাগা?”
“আরে বললুম, ঝটপট শুরু করো!”
“হুম, শোন তবে। জমিদার রণেন্দ্র গড়গড়ি একটা সময় সবকিছুর হর্তাকর্তা দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা ছিলেন এ গাঁয়ের। মানুষটার জন্মই হয়েছিল যেন জমিদার হওয়ার জন্য। কী তাঁর তেজ! কী তাঁর প্রতাপ! শুধু এই গাঁ কেন, আশপাশের আর পাঁচটা গাঁয়ের মানুষও পারলে নিজেদের জমিদারদের ভুলে রণেন্দ্র গড়গড়িকে খাজনা দিয়ে যায়, এমন অবস্থা। রণেন্দ্র গড়গড়ির পিতা বীরেন্দ্র গড়গড়ি, তস্য পিতা ভবেন্দ্র গড়গড়ি, শোনা যায় একটা সময় নরবলি দিয়ে হারে রেরে রেরে করে ডাকাতিও করেছেন। তবে জমিদার রণেন্দ্র সে পথে পা বাড়াননি। তিনি রাগী হলেও হিংস্র ছিলেন না, বরং কিঞ্চিৎ শৌখিনই ছিলেন। বাপঠাকুরদার জমানো পয়সা, মোহর, গয়নাগাঁটি আর প্রজাদের খাজনাতে জমিদারির আয়পয় হুড়হুড়িয়ে হত।
“কেবল একটি জিনিস ছাড়া অন্য কিছুতে তাঁর লোভও বিশেষ ছিল না। সেটা হল খ্যাতি, মানে গাঁয়ের বাইরেও দেশের আর পাঁচটা লোকজন বেশ তাঁকে চিনবে-টিনবে। শহরের শিক্ষিত বিজ্ঞসমাজে, নানা আলোচনাচক্র সভায়-টভায় তাঁর নাম করবে লোকে। এমনটাই তাঁর সাধ ছিল মনে বড়ো। ছোটো ছেলে জ্ঞানেন্দ্রকে কলকাতা শহরের কলেজে ভর্তি করেছিলেন যে জন্য। স্বপ্ন ছিল কালে কালে ছেলে বিলেত যাবে, ব্যারিস্টার হবে। রোজ সন্ধেয় মা মহামায়ার আরতি করতুম যখন আমি, উনি এসে করজোড়ে বসতেন নাটমন্দিরের শ্বেতপাথরের চাতালে। বিড়বিড় করে সব বলতেন আর শেষে ‘মাআআ, মাগো, মা মহামায়া!’ বলে হুঙ্কার দিতেন। আমি পুজোর ফাঁকে ফাঁকে কানখাড়া করে ওঁর প্রার্থনা শুনে নিতুম।”
“ভারি ফাঁকিবাজ পুরুত ছিলে তো তুমি বেম্মদাদু!” পাটকিলে ফুট কাটে।
কিন্তু বেম্মদাদু এমনই ঘোরে বকে চলেছে যে কানে ঢুকল না খোঁচাটা।
“বুঝলেন মশাই, শেষমেশ কত্তাঠাকুরের একটা সুযোগ এল বিখ্যাত হওয়ার। নায়েব রমানাথ মাইতি খবর আনল যে, লাটসাহেবের ভারি ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনসাহেব নাকি সপরিবারে বিলেত থেকে সোওওজা এসেছেন কলকাতা শহরে ইণ্ডিয়া দেখতে। আর কপালগুণে তিনি নাকি এই ঝিনুকপোঁতা গ্রামের আশেপাশের এলাকাতেও ক’দিন পল্টন নিয়ে আসবেন। জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
“অ্যাঁ, কী বললেন, ঝিনুকপোঁতা গ্রাম কোথায়? আরে মশাই, এই গ্রামটার নামটাই তো ঝিনুকপোঁতা ছিল আগে, ঐ জঙ্গলের নামে নাম ছিল গাঁয়ের। আগে পুরোটা শুনবেন তো ছাই, তারপর প্রশ্ন করবেনখ’ন। বারবার এমনধারা করলে আমি মুখে এই কুলুপ আঁটলুম, হ্যাঁ।”
পাটকিলে অমনি তড়িঘড়ি ঝোলা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “গপ্প শেষ? আমি তবে চলি?”
“এই বেয়াদপ ছোঁড়া! বোস চুপ মেরে। শুনলিনে উনি অনুরোধ করচেন পুরোটা বলতে?” খেঁকিয়ে ওঠে বেম্মদাদু।
পাটকিলে সেই অদৃশ্য ভৌতিক অতিথিকে মনে মনে চাট্টি গালি দিয়ে ফের ধপাস করে বসে পড়ে বেলপুকুরের ঘাটে। কী কুক্ষণেই যে আজ বাড়ির বাইরে পা রেখেছিল! এমনিতে বেম্মদাদু লোকটা মন্দ নয়, তবে আড্ডা মারতে পেলে আর কিচ্ছুটি চায়নেকো। এদিকে আবার যেমন তেমন শ্মশানের ভূতের সাথে আড্ডা মারবেননে তিনি। অতএব যত ভোগান্তি এই পাটকিলের, একইসব গল্প পঞ্চাশবার করে শুনতে হয়।
বেম্মদাদু ফের বেত্তান্ত শুরু করেন, “জনসাহেবের আসার কথা শুনে তো ভারি উৎফুল্ল হলেন জমিদার রণেন্দ্র। জনসাহেবকে যদি যত্নআত্তি-খাতির করে তুষ্ট করা যায় তাহলে নিশ্চয়ই তিনি লাটসাহেবের কাছে জমিদারবাবুর নামে সুপারিশ করবেন। আর বহুদিনের স্বপ্ন রায়বাহাদুর খেতাবটা যদি কপালে জুটে যায় ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে।
“যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। নায়েব রমানাথ ছিলেন করিৎকর্মা লোক। জনসাহেবের আর্দালিকে পটিয়ে-পাটিয়ে সাহেবের পছন্দ-অপছন্দ জেনে ফেললেন। সেইমতো সব খানাপিনার আয়োজন হল। লক্ষ্নৌ থেকে বাবুর্চি এনে খোশবাইওয়ালা মোগলাই খানা হল। নাচা-গানা-শিকারখেলা কত্ত কিছুর আয়োজন হল! জমিদারমশাই নিজে গলবস্ত্র হয়ে জুড়িগাড়িতে করে সাহেবকে নিয়ে এলেন। বেশ ক’দিন হইহই রইরই চলল। জনসাহেব তো, রোনেনড্রোবাবু আপুনি গ্রেইট জমিনডার আচেন! হামি বোড়ো কুশি হইলাম ইখানে আসিয়া… বলে বলে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
“শেষ চমকটা তখনও বাকি ছিল। মা মহামায়ার মন্দিরে জনসাহেবের নামে সংকল্প করে তিনি পুজোর আয়োজন করতে বললেন আমাকে। আমি অনেক করে মানা করলুম তাঁকে এমন ঘোরতর অনিষ্টের কাজ করতে, কিন্তু তাঁর চোখে তখন রায়বাহাদুর উপাধি পাওয়ার লোভ জেগেছে, তিনি শুনবেন কেন! নায়েব রমানাথও খুব মোসাহেবি করতে লাগল। অতএব হল ঢাকঢোল বাজিয়ে জনসাহেবের নামে পুজো, মা মহামায়ার মন্দিরে।”
“ঠাকুর পাপ দিলেনে, বেম্মদাদু?” ঠাকুরদের মতিগতি নিয়ে কৌতূহলী হয় পাটকিলে। আসলে মাঝেমধ্যেই ঠাকুরের নামে দিব্যি গেলেও মিছে কথা বলে তো, তাই একটু শাস্তির বিধানটা জেনে নিতে মন চাইছিল আর কী!
একটু কেমন উদাস হয়ে বেম্মদাদু বললেন, “তখন যখন বেঁচে ছিলুম, পুজোআচ্চা করতুম, এই ধর্ম ওই ধর্ম ম্লেচ্ছ ধর্ম, আমার ঠাকুর ওদের ঠাকুর, এসব মানতুম, বুঝলি। মরে গিয়ে বুঝলুম, ওসব দল-ভাগাভাগির সময় ঠাকুরদেবতাদের নেই। তাঁরা দিব্যি মিলেমিশেই থাকেন। আমরা খামোখাই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি মারামারি দলাদলি করে মরি।”
পাটকিলে বোদ্ধার মতো ঘাড় নাড়ল বটে, কিন্তু চিন্তায় পড়ল। তার মানে এক ঠাকুরের নামে মিথ্যে দিব্যি কাটলে সব ঠাকুর মিলেই শাস্তি দেবে বুঝি!
ওদিকে বেম্মদাদু বলে চলেন তাঁর গপ্পো। “জনসাহেব তো মহাখুশি হয়ে বিদায় নিলেন তিনদিন এই গাঁয়ে জমিদারের খাতিরদারি ভোগ করে। যাওয়ার সময় কথা দিয়ে গেলেন, বাবু রোনেনড্রো, হামি হামার ফ্রেন্ডকে টুমার কোথা বলবে, আর বলবে টুমাকে রায়বাহাডুর উপাঢি ডিটে। ইউ ডিজার্ভ ইট! সাচ আ জেন্টলম্যান ইউ আর! আর বলবে এই ভিলেজের নেমও টুমার নেমের সাঠে ম্যাচ কোরে ডিটে।
“এইসব শুনে তো রণেন্দ্র গড়গড়ি আত্মহারা। যদিও মাঝের ইংরাজি কথাগুলো বিন্দুবিসর্গও বোঝেননি। জ্ঞানেন্দ্র থাকলে পরে সব বুঝিয়ে দিত। তবে রমানাথ বললে, সায়েবের মুখ দেকে মনে হচ্চে ইংরাজিতে ভালো-ভালোই কইলেন, কত্তামশাই। বুঝলি পাটকিলে, তখন গাঁয়ের একটা লোকও ইংরাজি পড়তে জানতুনি একমাত্র জমিদারবাবুর ছোটো ছেলে জ্ঞানেন্দ্র ছাড়া।”
“ইংরেজি খুব অসুবিধের ভাষা, বেম্মদাদু। এই যো দ্যাখো না, ইস্কুলে কেমন গাদাগাদা রচনা লিখতে দেয় ইংরেজিতে। আবার বানানভুল হলে পরে কান মুলে দেয় মাস্টারমশাই। ও-ভাষা তুলে দিলেই ভালো।”
“উঁউউউহ্‌! কোন বিষয়টায় তুই কাঁচকলা পাসনি আর কানমলা খাসনি বলবি হতভাগা? তুই জানিস, এই ইংরেজি না জানার জন্যই গাঁয়ের কত বড়ো সব্বোনাশ হল?”
পাটকিলে কানমলার ভয়ে বিড়বিড় করে বলে, “ইংরেজি পড়েই বা কোন সব্বোনাশের হাত থেকে বেঁচেছি আমি?”
কথাটা বেম্মদাদুর কান অবধি গড়াল না তাই গপ্পোটাই গড়গড়িয়ে চলতে লাগল।

।।চার।।

বলে চলেন বেম্মদাদু, “জনসাহেব ফিরে যাওয়ার পর থেকে জমিদার রণেন্দ্রর প্রতিটা দিন উৎকণ্ঠায় কাটে। এই বুঝি খবর এল, এই বুঝি খবর এল। অপেক্ষা করতে করতে যখন প্রায় আশার হ্যারিকেনের পলতে শেষ, তখন নায়েব রমানাথ মাইতি নাচতে নাচতে সেরেস্তায় এলেন। মানে ওই বুড়ো বয়সে বাঁকা মাজায় যতটা নাচা যায় আর কী! বন্ধু জনসাহেবের সুপারিশে লাটসাহেব জমিদার রণেন্দ্র গড়গড়িকে রায়বাহাদুর উপাধি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই ঝিনুকপোঁতা গ্রামের নাম বদলে গড়গড়িপুর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গাঁ জুড়ে তো উৎসবের মরশুম লেগে গেল। জমিদারবাড়ির দুগ্গাপুজোতেও এত হুল্লোড় হয় নাকো।
“স্বপ্নপূরণের ঘোরে রণেন্দ্র গড়গড়ি আরেকটি সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক করলেন, কাগজে লেখা যে মানপত্রটি আসবে সেটিকে হুবহু একরকমভাবে স্বর্ণফলকে খোদাই করাবেন। শুধু তাই নয়, শুভদিন দেখে আর সবক’টা আশেপাশের জমিদারদের নেমন্তন্ন করে ওই স্বর্ণফলক জমিদারবাড়ির সম্মুখে স্থাপন করবেন। মাটির তলার ঘরে ঘড়াভর্তি খাঁটি আকবরি মোহর আছে, ডাকাতির ধন। ওই মোহর গলিয়েই এই পুণ্যের কাজে ব্যয় করবেন মনস্থির করলেন তিনি।”
“জমিদারবাড়িতে সত্যি সত্যি এত মোহর ছিল, বেম্মদাদু?”
অনেকবার গল্পটা শুনলেও ঠিক এই জায়গাটা এলে পাটকিলের গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয় ইস্কুলের উঁচু ক্লাসের ল্যাবরেটরি থেকে আতসকাঁচ নিয়ে, বাবার রাবারের পাম্প শ্যুটা পায়ে গলিয়ে, যতীনের সেজপিসে যতীনকে দিল্লি থেকে যে কালো কোট আর টুপি কিনে দিয়েছিল সেই দুটো পরে গুপ্তধন খুঁজতে বেরোয়।
বেম্মদাদুও সুযোগ বুঝে খোঁচা দেয়, “কেন? এই তো বলছিলি সব গল্প জানা-শোনা, তাহলে এখন শুধোচ্চিস কেন শুনি? বুজলেন মশাই, আজকালকার ছেলেপুলের এই এক দোষ। পুরো জিনিসটা মন দিয়ে শুনবার ধয্যি নেইকো মোটে।”
শেষের কথাগুলো অবশ্য সেই আরেকজন অজানা অদৃশ্য ভৌতিক শ্রোতার উদ্দেশ্যে।
পাটকিলে অদৃশ্য নতুন ভূতের সামনে এরকম অপমানিত হয়ে বেশ খচে গেল বেম্মদাদুর ওপর। মুখ গোমড়া করে বসে রইল।
বেম্মদাদু মিচকে হেসে ফের শুরু করলেন। পাটকিলের সাথে খুনসুটিগুলো বড্ড ভালো লাগে ওঁর। যখন উনি বেঁচে ছিলেন, ছোটো নাতিটা ঠিক ওইরকমই ছিল।
“তারপর কী হল বলি শোনো। লাটসাহেবের দপ্তর থেকে সে মানপত্র এল। দস্তুরমতো ইংরাজিতে লেখা বড়োকত্তাদের সই-টই করা। সে একেবারে সাংঘাতিক ব্যাপার। রাতারাতি সেই মানপত্র আর একঘড়া মোহর নিয়ে বিশু স্যাঁকরা খিল দিল নিজের কারিগরির ঘরে। দরজার বাইরে মোতায়েন রইল যদু আর মধু দুই লেঠেল। বিশু স্যাঁকরা আকবরি মোহর গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে বানাল মোটা একটা স্বর্ণফলক। তার ওপর সূক্ষ্ম ছেনি ক্ষুদ্র হাতুড়ি দিয়ে চলল ঠুকঠুক। মানপত্রের ইংরাজি বিশুও পড়তে পারে না, তাই লেখাগুলো তার কাছে গয়নার নকশা তোলার মতোই কাজ।
“পাক্কা সাতদিন না ঘুমিয়ে, না খেয়ে বিশু শেষ করল সেই মহাকার্য। যদু আর মধু খোদাই করা স্বর্ণফলক লাল শালুতে মুড়ে নিয়ে এল জমিদারবাড়িতে। জমিদারবাড়ির সামনে বানানো লোহার গারদে ঘেরা বেদীতে স্থাপন করল ফলক, তারপর লাল কাপড় চাপা দিয়ে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে পইল দু’জন দু’দিকে।
“পরেরদিন সকালে সারা গাঁয়ের লোক, আশেপাশের গাঁয়ের জমিদাররা, তাদের প্রজারা, সকলের সামনে উদ্বোধন হবে স্বর্ণফলকের। জমিদার রণেন্দ্র গড়গড়ি নিজের হাতে করবেন, উঁহু, রায়বাহাদুর জমিদার রণেন্দ্র গড়গড়ি করবেন। গ্রাম পাবে তার নতুন নাম। সে এক্কেরে এলাহি ব্যাপার। জ্ঞানেন্দ্রও এসেছে শহর থেকে।
“সক্কাল সক্কাল জমিদারবাড়ি উপচে পড়তে লাগল মানুষে। ধীর পায়ে স্মিতহাস্য ধারণ করে এগিয়ে এলেন জমিদার রণেন্দ্র। উন্মোচন করলেন স্বর্ণফলকের আবরণ। সূর্যের আলোয় চকচক করতে লাগল ফলকটা। সবাই অভিভূত। কিন্তু একটু পরে কেমন ভিড়ের মধ্যে একটা ফিসফাস গুজগুজ শুরু হল এবং সেটা আস্তে আস্তে ছড়াতে লাগল। এ ওর গা ঠেলাঠেলি করে হাসাহাসি করতে লাগল। জমিদার রণেন্দ্র অবাক হয়ে নায়েব রমাপদ আর জ্ঞানেন্দ্রকে শুধোলেন। জ্ঞানেন্দ্র এগিয়ে গিয়ে ফলকের গায়ের লেখাটা জোরে জোরে পড়তে লাগল। ‘আই হিয়ারবাই প্রেজেন্ট জমিনদার রণেন্দ্র গড়বড়ি অফ ঝিনুকপোঁতা ভিলেজ দ্য প্রেস্টিজিয়াস টাইটেল রায়বাহাদুর। ফ্রম দিস ডে অনওয়ার্ডস ঝিনুকপোঁতা ভিলেজ উইল বি নোন অ্যাজ গড়বড়িপুর, অ্যাজ আ ট্রিবিউট টু জমিনদার রায়বাহাদুর রণেন্দ্র গড়বড়ি…”
“যদিও ইংরাজি বোঝেন না তবুও গড়গড়ির জায়গায় গড়বড়ি শুনে তো জমিদারমশাই বুকটা হাতে চেপে মাটিতে বসে পড়লেন। এ কী সাংঘাতিক কাণ্ড! জ্ঞানেন্দ্র ছুটে গিয়ে নায়েবের হাত থেকে কাগজের আসল মানপত্রটা নিয়ে দেখে ভুল করে সাহেবরা গড়গড়িকে গড়বড়ি করে দিয়েছেন আর জমিদারমশাই, রমাপতি থেকে শুরু করে বিশু স্যাঁকরা অবধি কারোর ক্ষমতায় কুলোয়নি সে ভুল ধরার ইংরাজি না জানার ফলে। অতএব…
“অন্য গাঁয়ের জমিদারদের দলবলের মধ্যে এক দু’জন করে লোক ইংরাজি জানত পড়তে। তারাই স্বর্ণফলকে বড়ো বড়ো চকচকে করে খোদাই করা লেখাটা দেখে ভিড়ের মধ্যে বলতেই সেকথা আগুনের মতো ছড়িয়ে গেছে। সব্বাই এই কাণ্ড দেখে মুখ টিপে টিপে হাসছে। পাশের গাঁয়ের জমিদার ভবানীপ্রসাদ রায় জমিদার রণেন্দ্রর উদ্দেশ্যে বললেন, কী আর করবেন গড়গড়িমশাই, রায়বাহাদুর খেতাব পেতে হলে আর নিজের নামে গ্রামের নাম করতে গেলে পদবিটাই বদলে ফেলুন, বুইলেন গড়বড়িমশাই! বলে শেয়ালের মতো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগলেন। যারা এতক্ষণ মুখ টিপে হাসছিল তারাও খ্যাঁক খ্যাঁক খৌয়া খৌয়া করে যোগ দিল। চারদিকের ভিড়ের ভেতর হাসির রোল উঠল।
“কত্তাঠাকুর রাগে গরগর করতে করতে বেদীর সামনে গিয়ে স্বর্ণফলকটা হেঁইয়ো করে তুলে ছুড়ে ফেললেন পাশের মাটিতে। ওমা, সেখানেও ঘটল গড়বড়! ফলকটা দুমড়ে বেঁকে গেল। ফলকের গায়ের বেশ খানিকটা জায়গা ঘষে গিয়ে, উজ্জ্বল সোনালি রং চটে কেমন তামাটে রং বেরিয়ে পড়ল। ফের হাসির রোল উঠল একপ্রস্থ। তার মানে বিশু স্যাঁকরা বেশিরভাগ সোনার মোহর হাতিয়ে নিয়ে তামা ভেতরে দিয়ে বাইরে সোনার পাতলা আস্তরণ করে দিয়েছে। এখানেও গড়বড়! জমিদার মশাই ফের ভূমিশয্যা নিলেন।
“যদু-মধু রে রে করে ছুটল বিশু স্যাঁকরার বাড়ি। কিন্তু সে ব্যাটা তো আগেরদিন রাত্রেই চম্পট দিয়েছে গাঁ ছেড়ে। তার টিকি পাবে কোথায়!”
“যাহ্, সব সোনা বিশুর ট্যাঁকেই গেল!” মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাটকিলে।
“ওদিকে রমানাথ আর জ্ঞানেন্দ্র মিলে জমিদারমশাইকে কোনওমতে নিয়ে গেল অন্দরমহলে। বাইরের ভিড়ও ততক্ষণে পাতলা হতে শুরু করেছে। গড়গড়িমশাইয়ের খেতাব জুটুক না জুটুক, বাকি সবার আগামী কয়েক বছর ধরে গাঁয়ে-গাঁয়ের হাটেগঞ্জে গল্প করার মতো খোরাক জুটে গেছে। এদিকে জ্ঞানেন্দ্র বাবাকে বোঝাতে থাকে, যা হওয়ার হয়েছে, আপনি চিন্তা করবেন না বাবা। আমি নিজে লাটসাহেবের কাছে গিয়ে দরবার করব তিনি যেন নতুন করে বানান শুধরে মানপত্র দেওয়ার বন্দোবস্ত করেন। আর বিশে স্যাঁকরাকে যদু আর মধু ঠিক খুঁজে আনবে, মোহরও উদ্ধার হবে।
“এই শুনে তো রাগে গরগর করতে করতে পালঙ্কে উঠে বসলেন জমিদারমশাই। গর্জন করে উঠলেন, খবরদার! আজকের পর ওই মানপত্রের মুখও আমি দেখতে চাইনে। আর ওই অভিশপ্ত মোহরও চাইনে আমার। জ্ঞানেন্দ্রর ইংরেজি পড়া বন্ধ। আর কলকাতায় পড়তে গিয়ে কাজ নেই। বিলেতের নামও যেন কেউ এই জমিদারবাড়িতে না করে। এই বলে চেঁচিয়ে কত্তামশাই বুকটা খামচে ধরে শুয়ে পড়লেন। তারপর থেকে সেই যে মাথার ব্যামো ধরল, সত্যি সত্যিই গড়গড়ি থেকে গড়বড়ি হয়ে গেলেন গো মানুষটা। ঝিনুকপোঁতা গ্রাম সেই থেকে গড়গড়িপুর হওয়ার বদলে লোকের মুখেমুখে গড়বড়িপুর হয়ে গেল।”
ধুতির খুঁটে চোখটা মুছে বেশ খানিকক্ষণ চুপ হয়ে রইলেন বেম্মদাদু। পাটকিলেও সেই সুযোগে পা টিপে টিপে সটকে পড়তে যাচ্ছিল। অমনি বেম্নদাদু বলে উঠলেন, “সূয্যি ঢলতে বসেচে পাটকিলে, সিধে বাড়ি যা। আর বুনোর আখড়ায় ঢুঁ মারতে যাসনে। তাহলে তোর মা তোর পিঠের ছাল তুলে ডুগডুগি বাজিয়ে দেবে।”
পাটকিলে চটেমটে বলল, “তুমি ভারি বদ বুড়ো। শুধুমুধু আমার সব পণ্ড করলে। কেন, তোমার ঐ অদৃশ্য নতুন বন্ধুকে গল্পটা শোনালে হতুনি? খামোকা আমাকেও বসিয়ে রাখলে!”
বেম্মদাদু ফিচিক ফিচিক করে হেসে বললেন, “কই অদৃশ্য বন্ধু? আমি তো তোকেই গপ্পো শোনাতে চেয়েছিলুম। গত ক’হপ্তা ধরে দেকচি, সব ছুটির দিনেই হেথা হোথা টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্চিস, আমাকে পাত্তাই দিচ্চিসনে। তাই আজ ভাবলুম তোর টিকি ধরে টান মারি...”
“ওওও! তার মানে তুমি মিছিমিছি...” বলে চেঁচাতে গিয়েই পাটকিলে দেখে বেম্মদাদু ভ্যানিশ!
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

4 comments: