গল্পঃ ফাতা পীরের বাড়ি - ফাল্গুনী ঘোষ



“আজকেই চল বুঝলি! স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে ভালোই হল।”
“দ্যাখ, খুব সাবধান! কাকপক্ষীর চোখ এড়িয়ে যেতে হবে কিন্তু! বাড়ি থেকে কেউ খোঁজ করলে যেন স্যারেরা কিছু বলতে না পারে।”
সুমন আর মুনীরের এই ফিসফিসে বৈঠক যখন হল, তখন গ্রামের স্কুলের ঘড়িতে পাঁচটা ঘন্টা গোনা হয়ে গেছে সকলের। বসন্ত দুপুরের তরুণ রোদ খানিকটা ফিকে হয়ে এসেছে। ঠিক এরকম বারবেলায় দুই ডানপিটে বন্ধু বেরোল ফাতাবাবার বাড়ি অভিযানে। বাতাসপুরের শেখ আর পালেদের বাড়ির দুই ছেলে মুনীর শেখ, সুমন পাল। দুষ্টু এই ছেলেদুটি গোটা স্কুলকে তটস্থ করে রাখে প্রায়শই। শুধু তাই নয়, নিরীহ ভালো ছেলেদের পড়াশোনাতে বিরক্ত করা এদের প্রধান কাজ।
বাবা-মায়ের কথা না শুনে লোকের আমবাগান-জামবাগানে হইচই করা, ঢিল মেরে লোকের আম-কুল পাড়া এদের নিত্যদিনের অভ্যেস। বনে, বাদাড়ে, মাঠে-ঘাটে, ঝোপে-ঝাড়ে, ভাঙা বাড়ির আঁচিলে-পাঁচিলে দস্যিপনা করে বেড়ায়। অথচ বাড়ির কোনও কাজে তাদের পাওয়া যায় না। বাপ-মায়ের ধমক, চমক, বকাঝকা, ভালোবাসা - কোনও কিছুতেই এরা সোজা পথে আসেনি। সহজ সাদাসিধে বাবা-মায়েদের যেকোনও কৌশল বদমাশ ছেলেদুটোর ছলনার কাছে কম পড়ে। গ্রামঘরের মানুষগুলো যে বড্ড সরল। এরা ভূত-জ্বীনে ভয় করে, দেবদ্বিজে ভক্তি করে অন্য পাঁচটা কাজের মতোই। গ্রামের প্রান্তিক শ্মশান, কবর এড়িয়ে চলে। ভরদুপুরে বা সন্ধ্যা উঁকি দেওয়ার মুখে কোনও পোড়ো বাড়ি দেখলে পেন্নাম ঠুকে, বিড়বিড় করে ইষ্টমন্ত্র জপ করতে করতে দ্রুত পায়ে সরে পড়ে। হাড়ভাঙা খাটনি খাটা সাধারণ মানুষগুলো জানে, এটা মানতে হয়। এসবের মাঝে মূর্তিমান ব্যতিক্রম মুনীর-সুমনের জুটি।

        
গ্রামের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে জলার ধারে ছ্যাতলা পড়া পোড়ো বাড়ি। ফাতাবাবার ভূতুড়ে বাড়ি নামে বহুশ্রুত। এই বাড়ির ইতিহাসটি গ্রামের লোকেদের কাছে তেমন জোরালো নয়। তবে কানাঘুষো আছে, ফাতাবাবা নাকি বিরাট ক্ষমতাধারী পীর ছিলেন। পীর-ফকিররা যেমন হয়—বড়ো দয়ালু আর ভালো মানুষ। গ্রামের একপ্রান্তের পাঁচিল-ঘেরা একতলা ছোট্টো বাড়িটিতেই তাঁর আস্তানা ছিল। সে-বাড়ির পাথরের ভারী দরজাওয়ালা ঘরে ঈশ্বর-সাধনায় মগ্ন থাকতেন তিনি। এলাকার হিন্দু, মুসলমান, ছোটো, বড়ো, নারী, পুরুষ সাহায্যপ্রার্থী কাউকেই ফেরাতেন না। একদিন সন্ধে থেকে দরজা বন্ধ করে বসলেন ঈশ্বরের ধ্যানে। রাত পেরলো। সকালের আলো ফুটল। বাগান কাকপক্ষীর কলরবে মুখর হয়ে উঠল। কিন্তু ফাতাবাবার দরজা খুলল না। সেই থেকে ফাতাবাবাকে আর চোখে কেউ দেখেনি।
তারপর লোকে ভয়ে সেদিক পানে মাড়ায় না। সন্ধের পরে অন্ধকার গলি-রাস্তা নিঝুম, নিশ্চুপ হয়ে একলা কাঁপে। নাকি ভূতপ্রেতের উপদ্রব আছে। সে-বাড়ির দিকে দিনেদুপুরে তাকালেও অবশ্য বুক ছমছম করে ওঠে এখন। এক-আধলা ইট খসা, চোয়াল ভেঙে যেন বাইরে ঝুলছে হাঁ করে। অজানা বুনো লতা পাঁচিলের উপর এত জড়িয়েছে যে আসল পাঁচিলের নাগাল পাওয়া ভার। বড়ো বড়ো তেঁতুল, আগাছার মতো গজিয়ে ওঠা পাকুড়, বুনো চালতা, শ্যাওড়াগাছের জঙ্গলে বাড়ি প্রায় ঢেকে গেছে। ঘন সবুজ অন্ধকারের দিকে তাকালে বুকের ভেতর দম ধরে আসে সহসা।
এরকম জায়গায় ভাঙা দেওয়াল টপকে ঢুকে পড়ার জল্পনা সুমন আর মুনীরের অনেকদিনের। আজ পঞ্চম পিরিয়ডে স্কুলের ছুটি হয়ে যাওয়ায় কিছুতেই এ-সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। ‘পোড়ো, ভূতুড়ে বাড়িতে কী আছে আমরা দেখেই ছাড়ব’—মনে মনে ভাবে। পড়ন্ত বেলায় জঙ্গুলে বাড়িতে ঢুকেই দু’জনে গলা ছেড়ে গান ধরল। আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! আজ বড়োই সুখের দিন। উৎসাহের চোটে নেচেও নিল একপাক। আর তাদের পায় কে!
বাড়ির লম্বা বারান্দার পাশে ভাঙা দুটো ঘর। দরজা-জানালাগুলো কোথাও পুরো হাঁ মুখ নিয়ে। কোথাও বা আধভাঙা হয়ে ঝুলছে। লাল বড়ো পিঁপড়ে আর উইয়ের মহাভোজ লেগেছে সেখানে। লতাপাতা দু’হাত দিয়ে ভেঙে পথ বের করে এরা। ঘরের ভিতর আগাছার জঙ্গল। পা বাড়ানোর উপায় নেই। চামচিকে ফরফর শব্দে উড়ে গেল মুনীরের কান ঘেঁষে। বুক ঢিপঢিপ করছে এখন। কেমন যেন একটা অস্বস্তি।
“চল সুমন, এবার বেরিয়ে পড়ি, সন্ধে লাগছে।” ভয় ধরা গলা মুনীরের।
কিন্তু সুমনের তখন আবিষ্কারের নেশা লেগেছে। ঐ কোণের বন্ধ পাথরের দরজা তাকে চুম্বকের মতো টানছে। বন্ধ ঘরে কী আছে না দেখে সুমন ফিরছে না কিছুতেই। মরচে ধরা তালাটা ভাঙতে পারলেই হল।
“তুই তাহলে চলে যা, মুনীর। তালা ভেঙে আমি দেখব। সারারাত লাগে লাগুক।”
বুকের ভিতর শিরশিরানি ধরলেও প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে একলা ছেড়ে যেতে পারে না মুনীর। আধভাঙা ইট আশেপাশে অনেক ছড়িয়ে আছে। বাগানের এদিক ওদিক থেকে জঙ্গুলে কাঁটার খোঁচা খেয়ে মাকড়সার জাল ভেদ করে ভাঙা ইট জড়ো করতে হাঁফিয়ে ওঠে দু’জনে।
আকাশ তখন ছাই রঙের পর্দা টেনে নিয়েছে। অন্ধকার জাঁকিয়ে বসছে। মুনীরের মাথা ঝিমঝিমিয়ে ওঠে। ওদিকে সুমন মহা উদ্যমে মরচে ধরা তালা ঠুকে চলেছে। বসন্তকালের বিকেলেও কপালে তার বিনবিনে ঘাম। কিন্তু ইটের টুকরোগুলো কুচি কুচি হয়ে ছিটকে পড়লেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। জং ধরা তালা একচুলও নড়েনি।

   
সরসর করে কে যেন হেঁটে আসছে! গাছের শুকনো একটা ডাল মড়মড়িয়ে পড়ল মুনীরের পায়ের কাছে। মুহূর্তে ঝিমঝিমে ভাবটা কেটে গেল তার। চোখ তুলে চাইতেই দেখে, গোল গোল দুটো আগুনের ভাঁটা। জলন্ত দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে মিশকালো পেঁচাটা। খসখসে শুকনো ঠোঁটদুটো জিভ দিয়ে একবার চেটে খুব জোরে সুমনকে ডাক দেয় মুনীর। কিন্তু গলা দিয়ে কিছুটা চিঁ চিঁ আওয়াজ ছাড়া কিছুই বেরোয় না। ওদিকে ঘোর লাগা অন্ধকারে কিছু স্পষ্ট ঠাওর হয় না। আওয়াজের আন্দাজে বন্ধুর পাশে তড়িঘড়ি ছুটে আসে সুমন। একটু জল খেতে পেলে ভালো হত। সুমনের গলা শুকিয়ে আসে। ফিসফিস করে বাতাসে কারা যেন কথাও কইছে।
“চল, পরে আরেকদিন আবার আসব।” সুমন মুনীরের হাত শক্ত করে ধরে হিড়হিড়িয়ে টানে।
কিন্তু ঐ টানাটানিই সার। পাদুটো ততক্ষণে মাটিতে গেঁথে গেছে। সামনে সাদা আলখাল্লা পরা, ফর্সাপানা একটা ছায়া মানুষ। ভূতপ্রেতের মতো ভয়ংকর কঙ্কালসার চেহারা নয়। তবে উইইইই তালগাছের মতো লম্বা। কেমন যেন সাদা সাদা, ছায়া ছায়া। চুল-দাড়ি সব পাকা। কটমটিয়ে চেয়ে আছে তাদের দিকে। ছায়াবুড়ো হিম গলায় বলল, “এই যে ডানপিটে ছেলেরা! বাড়ি থেকে এই বাগানে আসতে বারণ করেনি?”
এত লম্বা আর ছায়া ছায়া কি মানুষ হয়! নিশ্চয়ই তাহলে ছদ্মবেশী ভূত। কাঁপতে কাঁপতে দুই বন্ধু বলে উঠল, “আমরা এ-বাগানে আর কখনও আসব না। এই নাক মলছি, কান মলছি।”
হাড় কাঁপানো হাসি হেসে বুড়োটা বলে, “নাই বা এলে এখানে! অন্য কারও বাড়ির বাগানে তো অন্যায়ভাবে ঢুকবে! বাড়ির বড়োদের কথাও শুনবে না, সে আমি জানি। আর স্কুলেও পড়াশোনা করবে না।”
“না না, আমরা এবার থেকে খুব ভালো ছেলে হয়ে যাব!” সমস্বরে চ্যাঁচায় ছেলেদুটো।
“এত সহজে ছাড় নেই তোমাদের।”
চিন্তায় পড়ে দু’জন ভাবে কী করে ছাড় পাবে এর হাত থেকে। কিন্তু ছায়াবুড়ো কি মনের কথা পড়তে পারে!
“যা বলছি মন দিয়ে শোনো। ঐ তালা দেওয়া ঘরের ভেতর ছোট্টো বাক্সে আমার সম্পত্তি আছে। ঘর খুলে সেই সম্পত্তি আমার হাতে এনে দিতে পারলেই তোমাদের এখান থেকে মুক্তি।”
“কিন্তু ও-তালা যে ভাঙাই যায় না!”
মিটমিটে হেসে বুড়ো দুই বন্ধুর হাতে তুলে দেয় রঙিন পালক।
“এই পালকেই আছে তালা খোলার মন্ত্র।” খনখনে গলায় বলে বুড়ো, “কিন্তু খুব সাবধান! পালক হাত থেকে পড়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে আর কোনওদিনও তালা খোলা যাবে না। এ-বাগানের অন্ধকার রাতও শেষ হবে না। তোমরাও বাড়ি ফিরতে পারবে না।”
মুনীর ফিঁচফিঁচ করে কেঁদে ফেলে। মনে মনে মাকে ডাকে সে। সুমন ভাবে, বাপ-মায়ের অবাধ্য আর হব না। চোখদুটো জ্বালা ধরে আসে। বুড়ো খলখলিয়ে হেসে উত্তর দেয়, “এর মধ্যেই বেশ সুবুদ্ধি হয়েছে দেখছি তোমাদের। খুব খুশি হলাম। এবার আজকে রাত পোহাবার আগে যে কাজ দিলাম, ভালো ছেলের মতো করে ফেলো দেখি। নাহলে কিন্তু ভয়ানক বিপদ তোমাদের। আর দু’জনে হাত ধরাধরি করে থাকবে।”


বাঁহাতে মুনীরের ডানহাত আর ডানহাতে রঙিন ছোট্ট পালকটি শক্ত করে ধরে সুমন। দরজার তালার দিকে যেই পা বাড়িয়েছে, কালো কালো অনেক ছায়া পায়ে পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বেঁটে, লম্বা, রোগা, মোটা সব ভূতপেত্নীর দল। কোথা থেকে এল এরা! কোঠরে ঢোকা চোখ, সাদা একমুখ দাঁত নিয়ে সে কী হাসি! তাদের চুলের মুঠি ধরে কেউ টানে, কেউ বা দেয় পেটে রাম চিমটি। নাহলে জোটে চাঁদি-জ্বলা গাঁট্টা। টপটপ করে চোখের জল ফেলতে ফেলতে দু’জনে হাতজোড় করে বলে, “ভূতবাবাজীরা, তোমরা পথ ছেড়ে দাও! ঐ বুড়োর সম্পত্তি ওর হাতে তুলে না দিলে আমরা বাড়ি ফিরতে পারব না। বাচ্চা মানুষগুলোকে দয়া করো।”
কাকুতি মিনতির উত্তরে হি-হি-খি-খি খ্যাক-খ্যাক-ঝ্যাক-ঝ্যাক বিকট আওয়াজে লাফাতে আর হাসতে থাকে ভূতগুষ্টি। শাঁকচুন্নি এগিয়ে এসে গান ধরে—
“বঁদঁমাঁশঁ পাঁজিঁ
ওঁরেঁ দুঁইঁ দুঁষ্টুঁ
মুঁন্ডুঁ চিঁবিঁয়েঁ তোঁদেঁরঁ
হঁবঁ আঁমিঁ তুঁষ্টুঁ।
ধঁরঁ ধঁরঁ মাঁরঁ মাঁরঁ
কঁড়াঁইঁতেঁ তেঁলঁ ছাঁড়ঁ
ছিঁড়েঁ নিঁয়েঁ কঁলিঁজাঁ
মুঁচঁমুঁচেঁ কঁরিঁ ভাঁজাঁ।”
ব্রহ্মদৈত্যি উৎসাহ পেয়ে হেঁড়ে গলায় তাল ঠুকছে—
“তা ধিন ধিনা ধিনতা
নেই কো তো আর চিন্তা
আজকে হবে মহাভোজ
পেয়েছি মানুষের খোঁজ।
জমিয়ে খাব আঙুল চেটে
নাড়িভুঁড়ি যা আছে পেটে
কচি কচি হাত পা
ঝলসে পুড়িয়ে খা।”
এসব শুনে ভালো মানুষেরও হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। আর এরা তো বাচ্চা মানুষ। ভয়ে চোখ বন্ধ করে লাগাল চোঁ-চাঁ দৌড়। একছুটে তালার কাছে। কিন্তু পালক দিয়ে কীভাবে তালা খুলবে? লোহার হাতুড়ি হলেও নাহয় কথা ছিল। হে ভগবান, আমাদের বাঁচাও! ও আল্লাহ, রক্ষা করো! ভয়ে তখন তাদের চুল খাড়া। চোখের জল গেছে শুকিয়ে। জং ধরা নোংরা তালার উপর আশ্চর্য পালক রাখতেই ঘটে গেল ম্যাজিক। ধড়াম! সশব্দে দরজা গেল খুলে।
কম্বলের মতো পুরু চাপ অন্ধকার। ঐ ঘুরঘুট্টিতেই হাত বাড়িয়ে কাঠের বাক্স খোঁজে দুটি ছোট্ট হাত, যেখানে ঠাসা আছে ছায়াবুড়োর গোপন সম্পত্তি। অন্ধকার হাতড়ে এরা পেল আবার একটা দেওয়াল। ততক্ষণে গাঢ় অন্ধকার চোখ সওয়া হয়ে এসেছে। চোখের সামনে আবার একটা দরজা। আরও বড়ো মরচে ধরা তালা ঝুলছে তাতে। এদিকে ঘাড়ের উপর আবার এসে পড়ছে গরম নিঃশ্বাস। চারদিকে আগুনের গোলার মতো চোখ ফুটে উঠছে দ্রুত। আগুনের ফুলকি ছুটছে হঠাৎ হঠাৎ।


হায়, হায়! কপাল চাপড়ায় দুই বন্ধু। কী কুক্ষণেই যে ভূতুড়ে বাগানে ঢোকার জেদ চেপেছিল এদের মনে। কিন্তু ঐ ভাঁটার মতো চোখগুলো তো এগিয়ে আসছে! অন্ধকার ফুঁড়ে কাদের যেন উপস্থিতি জোরালো হচ্ছে। দু’জনের পা তখন বরফের মতো ভারী, নড়ে না।
“এরা কি ভূত?”
সুমনের প্রশ্নে মুনীরের মনে হয়, হয়তো জ্বীন হবে। সে তো আব্বার মুখে শুনেছে, ‘জ্বীন আগুনের তৈরি।’ তাই বোধহয় আগুনের হলকা দিচ্ছে মাঝে মাঝে।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মুনীরের শরীর হালকা হয়ে উপরে উঠতে থাকে। সুমনের হাতে টান পড়ে। সেরেছে! বন্ধুর হাত ছেড়ে গেলে তো মহাবিপদ! প্রাণপণে মুনীরকে জাপটে ধরে সে। এরপর শূন্যে তাদেরকে নিয়ে সে কী লোফালুফি! সাথে সমবেত ঝিঁ ঝিঁ—
“এই পথে আর এলে দুমদাম
পেটে পিঠে খাবি কিল গুমগাম
লোফালুফি খেলব তালগোল পাকিয়ে
কেমন লাগে মজা বল দেখি কঁকিয়ে।”
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শূন্য থেকে বন্ধ দরজার সামনে তাদেরকে ছুড়ে দিল অশরীরীরা। কেঁদে কঁকিয়ে তো দূর দুই বন্ধুর তখন টু শব্দ করারও ইচ্ছে নেই। ভারী তালার উপর পালক বুলিয়ে দেয় জলদি। আবার দরজা খোলে। এবার যেন আবছা একটা আলো ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
চোখের সামনে এতক্ষণে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘরের ঠিক মধ্যিখানের চৌকো মাটির বেদী। বেদীর উপর মখমলি চাদর চাপা দেওয়া কারুকার্যখচিত কাঠের বাক্স। দ্রুত পায়ে বেদীর কাছে গিয়ে চাদরের দিকে হাত বাড়াতেই সুমনের জামায় পড়ে টান। কিন্তু মুনীর তো পাশে! তবে? পিছন ফিরে দেখে সেই লম্বা ফর্সা পানা ভালোমানুষ ভূতটা। মুখে প্রসন্নতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি বাক্সটা তারা দিয়ে দিল ভালো ভূতকে।
বাক্স থেকে বেরোল জপের মালা। সে মালা গলায় পরতেই ভালো ভূতের সারা গা কমলা আলোয় ভরে গেল, আর সামনের দিকে আলো এগোতে লাগল। সুমন আর মুনীর কমলা আলোর পিছনে দ্রুত হাঁটতে থাকে। ধীরে ধীরে অন্ধকার ফুঁড়ে গাছপালা, মাঠ, পুকুর জেগে ওঠে চারপাশে।
এ কী! বিস্ময়ে চেয়ে দেখে দুই বন্ধু, ঐ পোড়ো বাগানের ঠিক উলটোদিকে গলি-রাস্তার ধারে দু’জনে দাঁড়িয়ে। কখন যেন তারা নিজেদের অজান্তেই বাগান থেকে বাইরে চলে এসেছে। হাতের পালকটিও নেই। সাদা আলো হয়ে আকাশের ঠিকানায় পৌঁছে যাচ্ছে ভালো ভূত। তার হাতে ঐ আশ্চর্য রঙিন জাদু পালক। আনন্দে চোখ জলে ভরে ওঠে দু’জনের।
আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে তারা ছুটে আসে। বাবা-মায়ের পায়ে ধরে ক্ষমা চায়, তাঁদের কথার অবাধ্য হবে না বলে। এই কথা সুমন আর মুনীর সারাজীবন মনে রেখেছিল।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

No comments:

Post a Comment