গল্পঃ মেঘের বন্ধু - শাঁওলি দে



ছোটমামাই যেদিন প্রথম টুকটুককে নিয়ে এসেছিল এ-বাড়িতে, মেঘের আনন্দ আর ধরে না। কী খাওয়াবে, কোথায় রাখবে এই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। মা তো মামাইয়ের ওপর রেগে আগুন বললেন, “এমনিতেই পড়ায় মন নেই, তার ওপর তুই আবার এটাকে নিয়ে এলি!”
মামাই হেসে বললেন, “থাম তো তুই। মেঘ আমাদের ভালো ছেলে, ও টুকটুককে দেখবেও আবার নিজের কাজও করবে। কী রে মেঘ, তাই করবি তো?”
সম্মতির ঘাড় নেড়েছিল মেঘ।
কিন্তু বাস্তবে হল সম্পূর্ণ উলটো। স্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে মেঘ সারাদিন টুকটুককে নিয়েই থাকতে লাগল। দুধ সাদা রঙের ছোট্ট লোমশ শরীর নিয়ে টুকটুক যখন মেঘের কাছে ছুটে আসে, দারুণ আনন্দ হয় ওর। স্কুলেও সারাক্ষণ টুকটুকের গল্প। মাঝেমাঝে তো স্কুল যেতেই ইচ্ছে করে না মেঘের। কিন্তু মাকে তো বোঝানোই মুশকিল। মেঘের ঘরেই কার্ডবোর্ডের একটা ঘর বানান হয়েছে টুকটুকের জন্য। কিন্তু ও কি আর থাকে! মেঘের নরম বিছানা থেকে নামতেই চায় না আদুরে টুকটুক। এই নিয়েও মায়ের কত রাগ। মা যে কেন টুকটুককে আদর করে না বুঝে পায় না ক্লাস থ্রির ছোট্ট মেঘ। অথচ মেঘের অন্য বন্ধুদের মা কত ভালোবাসে!
বাবা অবশ্য এমন করে না। অফিস থেকে ফিরলে টুকটুক যখন পায়ে পায়ে ঘোরে, বাবা ওকে কোলে তুলে নেয়, আদর করে। ছুটির দিনে মেঘ যখন বাবার সঙ্গে ক্রিকেট খেলে, টুকটুকই তো বল কুড়িয়ে এনে দেয়। কী যে মজা হয় তখন! কুই কুই করে টুকটুক মেঘকে ডাকে। মেঘের আওয়াজ পেলেই এই শব্দটা করে ও। এভাবেই টুকটুক যে কখন ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে যায়, মেঘ নিজেই টেরই পায় না।
সেদিন খেতে বসে মাই প্রথম কথাটা বলে বাবাকে, “শোনো, তোমার ছেলে কিন্তু একেবারেই পড়াশোনা করছে না। সারাদিন ওই কুকুরটাকে নিয়ে…”
আর কথা শেষ করে না মেঘের মা। খুব মন খারাপ লাগে ওর। কুকুর আবার কী? ওর নাম নেই নাকি? চোখে জল চলে আসে মেঘের। ঘাড় নিচু করে খেতে খেতে মেঘ শোনে, ওর মা বলছে, “এভাবে চলতে থাকলে কিন্তু খুব মুশকিল। একটা কিছু ব্যবস্থা করো।”
বাবা মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, “কী রে বাবু, পড়াশোনা করিস না? সামনেই পরীক্ষা যে!”
মেঘ ঘাড়টা আরও খানিকটা নিচু করে ফেলে। ও মা-বাবাকে কীভাবে বোঝাবে যে টুকটুকের চিন্তায় ওর পড়ায় মনই বসে না। টুকটুকই ওর জীবনের সব, এটা কাউকে বলতেও পারে না ও। মন খারাপ হয় মেঘের, খুব মন খারাপ।
সেদিন সন্ধ্যাবেলায় মন দিয়ে পড়তে বসেছিল মেঘ। টুকটুক নিচে বসে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। বারবার মন চলে যাচ্ছিল ওর দিকে। হঠাৎ শুনতে পায়, পাশের ঘরে খুব আস্তে মা ফোনে কথা বলছে কারও সঙ্গে। উঠে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়ায় মেঘ। ঠিকই বুঝেছে ও। ছোটমামাই আসছে কাল। টুকটুককে নিয়ে যাবে মামাবাড়িতে। ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরে  কাঁদতে কাঁদতে চুমু খেতে থাকে ওর আদরের টুকটুককে। টুকটুক কী বোঝে কে জানে, ওর চোখের কোণটাও যেন চিকচিক করে ওঠে।
পরদিন স্কুলে যেতে মন চাইছিল না ওর। তবুও যেতেই হল। যাবার আগে চুপিচুপি মায়ের ঠাকুর ঘরে গিয়ে সব ঠাকুরের সামনে হাতজোড় করে বারবার প্রার্থনা করে মেঘ, “ঠাকুর, মা বলে তুমি কত ভালো। তুমি সব ঠিক করে দাও না। আমি এবার থেকে খুব পড়াশোনা করব। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে আমার থেকে নিয়ে নিও না। প্লিজ ঠাকুর, প্লিজ!”
টুকটুকটাও আজ যেন কেমন ঝিম মেরে গেছে। অন্যদিনের মতো দৌড়াদৌড়িও করছে না। মেঘের মন খারাপ দেখে ওরও বুঝি খুব মন খারাপ হয়েছে। মেঘ যে ওরও বেস্ট ফ্রেন্ড।
স্কুল থেকে ফিরে মেঘ দেখে টুকটুক নেই। এমনটাই তো ভেবেছিল ও। মাকে আজ খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছে। মেঘ ঢুকতেই বলে ওঠে, “তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নাও, আজ তোমার প্রিয় ফ্রায়েড রাইস করেছি সোনা। আর খাওয়ার পর একটা সারপ্রাইজও আছে।”
চুপ করে সব কথা শোনে মেঘ। টুকটুকের কথাও জানতে চায় না। কার্ডবোর্ডের ঘরটাও দেখতে না পেয়ে মনটা হু হু করে উঠলেও কিছুই বলে না ছোট্ট মেঘ। মা-বাবার ওপর খুব অভিমান হল ওর। প্রিয় খাবারও খেতে ভালো লাগে না ওর।
কোনওরকম খেয়ে উঠতেই মা একটা বিরাট বাক্স দিয়ে বলে, “আজ তোর ছোটমামাই এসেছিল। দেখ তোর জন্য কী দিয়ে গেছে!”
মেঘ দেখে বাক্সটা। হয়তো খেলনা গাড়ি হবে। হাত বাড়িয়ে নিয়ে মাটিতে রেখে দেয় ও। তারপর আস্তে আস্তে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মা হয়তো একটু অবাক হয়, কিন্তু মুখে কিছু না বলে মেঘের চুলগুলো ঘেটে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে যায়। মেঘের কিছুতেই ঘুম আসে না। কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজে ওঠে। বারবার টুকটুকের মায়ায় ভরা মুখটা ভেসে ওঠে ওর সামনে। কী করছে এখন ও কে জানে। ওরও কি মেঘের মতোই মন খারাপ হচ্ছে?
সেদিন রাতে প্রচণ্ড জ্বর আসে মেঘের। মা-বাবা সারারাত বসে থাকে ওর মাথার কাছে। জলপট্টি দেওয়া, সময়ে সময়ে ওষুধ দেওয়া সব চলে - কিন্তু মেঘের জ্বর আর নামে না। সবচাইতে চিন্তার বিষয়, কিচ্ছু দাঁতে কাটছে না ও। যে লুচির জন্য মাঝেমাঝেই জেদ করে তা মুখেই তুলছে না মেঘ। ডাক্তারকাকুও তো মাকে বলে গেলেন, মেঘ শুয়ে শুয়ে শুনছিল, “বউদি, কিছু না খাওয়াতে পারলে তো ওষুধই কাজ করবে না।”
মা খুব কান্নাকাটি করছিল। খারাপ লাগছিল মেঘের। কিন্তু ও কী করবে? টুকটুককে না দেখতে পেলে তো ও বাঁঁচবেই না, তা কি মা এতটুকু বোঝে?
দু’দিন পরপর স্কুলও কামাই হয়ে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে তাও মনটা ভালো লাগত। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসছিল ওর। হঠাৎই ‘কুই কুই’ আওয়াজটা কানে এল। এই আরেক বিপদ হয়েছে। সারাক্ষণই টুকটুকের ডাক কানে বাজে ওর। ছোটো হাতদুটো দিয়ে কানটা চেপে ধরে মেঘ। নাহ্‌, শব্দটাকে তো আটকানো যাচ্ছে না। বরং আরও জোরে শব্দ হচ্ছে।
দুর্বল শরীর নিয়েই খাট থেকে নেমে পড়ে মেঘ। ওই তো ছোটমামাই এসেছে। আর ছোটমামাইয়ের পায়ের কাছে ওটা টুকটুক না? হ্যাঁ, টুকটুকই তো!
ভালো করে চোখ কচলে নেয় মেঘ। মামাইয়ের পেছনে মা-বাবা দাঁড়িয়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। দৌড়ে গিয়ে কোলে তুলে নেয় মেঘ টুকটুককে। মা হেসে বলে, “দেখো ছেলের কাণ্ড! দু’দিন বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারল না, আর আজ টুকটুককে দেখে এক লাফে কেমন নেমে গেল।”
মামাইও হাসতে হাসতে বলল, “এ ক’দিন টুকটুকও কি ভালো ছিল? সারাদিন মেঝের ওপর শুয়ে থাকত চুপ করে। খাবার দিলেও খেত না। আমরা তো ভেবেছিলাম আর বাঁঁচবেই না।”
মামাইয়ের কথা শুনে মা অমনি টুকটুকের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলে উঠল, “না না, কিচ্ছু হবে না আমাদের টুকটুক সোনার। ও যে এখন ওর প্রিয় বন্ধুকে পেয়ে গেছে।”
মাও টুকটুককে আদর করছে দেখে খুব আনন্দ হয় মেঘের। শরীরটাও এখন ভালো লাগছে। টুকটুকটাও মেঘের কোলে দিব্যি বসে আছে। দুই বন্ধুকে দেখে সবারই মুখে হাসি।
মামাই তখন বলে ওঠে, “সবই তো হল, কিন্তু আমাদের মেঘবাবুকে তো এবার একটা প্রমিস করতে হবে। নইলে…”
মামাইয়ের কথা শেষ না হতেই মেঘ বলে ওঠে, “আমি এবার থেকে খুব পড়াশোনা করব, মামাই। আমার কাছ থেকে টুকটুককে নিয়ে যেও না আর।”
মামাই মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বলে, “দ্যাট’স লাইক আ গুড বয়,” তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “কী রে দিদি, আমাদের সবার খাওয়ার ব্যবস্থা কর। টুকটুক আর মেঘেরও তো খুব খিদে পেয়েছে, তাই না!”
মেঘ একটু লজ্জা পেয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “মা, লুচি করো না আজকে।”
আর অমনি টুকটুকও বলে, “কুই কুই।”
সকলেই হো হো করে হেসে ওঠে তখন।

_____

4 comments:

  1. খুব মিষ্টি গল্পটা দিদি

    ReplyDelete
  2. কি ভালো যে লাগলো কি বলব !আহা !

    ReplyDelete
  3. বেশ ভালো লাগলো

    ReplyDelete