জীবনের গল্পঃ তেথুলিয়া বিল - দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী


তেথুলিয়া বিল
দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী


সময়টা ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস হবে। আমি তখন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানার ছোটো দারোগা। জেলার পুলিশ সুপার এইচ.ই. সাবাইন থানা পরিদর্শনে আসবেন। পুলিশ সাহেবের থানা পরিদর্শন তখনকার দিনে এক বিশেষ ব্যাপার বলে গণ্য করা হত। সমস্ত বৎসর কোন অফিসার কতটা দক্ষতার সহিত কাজ করেছেন, বিশেষ করে থানার ইন-চার্জ অফিসার অপরাধ নিবারণে, রহস্য উদঘাটনে এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কতদূর সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন, তা থানা এলাকার বিশিষ্ট জনসাধারণের সংযোগে এবং থানার রেকর্ড পরীক্ষা করে তিনি ঠিক করতেন। শুধু তাই নয়, এই পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সম্বন্ধে তিনি যে ধারণা করে নিতেন, তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন উক্ত কর্মচারীর ‘সি সি রোল’ বলে কথিত রেকর্ডে। এই মন্তব্যের ভালোমন্দ হবে পুলিশ কর্মচারীর উন্নতি বা অবনতির সহায়ক।
সে যা হোক, কয়েকদিন পরেই পুলিশ সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে আমাদের মোহনগঞ্জ থানায় এসে গেলেন। দলবলের মধ্যে পুলিশ সাহেব নিজে, রিভলবারধারী দু’জন দেহরক্ষী, আর একজন স্টেনোগ্রাফার। তখনকার দিনে ইংরেজ পুলিশ সাহেবরা শুধু ক্রাইম অর্থাৎ অপরাধের বিষয়টাই ভালো করে দেখতেন আর অন্যান্য বিষয় খুবই মামুলি ধরনের। তাই প্রথমদিন ভালোই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিনের ইন্সপেকশন খুব ভালো হচ্ছিল না। কারণ, জটিল কেসগুলো দারোগা মোয়াজ্জম হোসেন কোনওদিনই খুব ভালোভাবে তদন্ত করেনি। আসলে থানার কাজে ওর কোনও উৎসাহই ছিল না। গানবাজনা, খেলাধূলা নিয়ে মেতে থাকতে খুব ভালোবাসত। তাই পুলিশ সাহেবের জিজ্ঞাসাবাদে সুবিধা করে উঠতে পারছিল না।
বিকেলের দিকে শ্যামবাবু প্রভৃতি কয়েকজন ভদ্রলোক এলেন সাহেবের সাথে দেখা করতে। তারাই প্রস্তাব করলেন পরদিন বিকালের দিকে পাখি শিকারের কথা। পুলিশ সাহেব শুনে তো খুব খুশি। ইন্সপেকশনের ফাইনাল কমেন্টস ভালো হয়ে গেল। তারপর চলল শিকারের তোড়জোড়। ভালো দুটো ডিবিবিএল গান (ডাবল ব্যারেল শট গান) ও বিশ রাউন্ড গুলি যোগাড় হয়ে গেল। ঠিক হল, আমি সাহেবের সঙ্গে যাব সাইকেলে। দুটো ভালো সাইকেল নিয়ে আমরা বেলা দুটোর পর রওনা হলাম। প্রায় সাড়ে তিনটায় তেথুলিয়া কাছারিতে পৌঁছে গেলাম।
তেথুলিয়ার এই বিখ্যাত বিল কাছারি থেকে বেশি দূর নয়। দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন মাইল এবং প্রস্থে হবে এক মাইলের উপর। অনেক বিলের জায়গা আমি আমার চাকুরি-জীবনে দেখেছি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের জেলায় জেলায় ঘুরতে হয়েছে সরকারি কাজের উপলক্ষে, কিন্তু এত পাখির সমাবেশ আর কোথাও দেখলাম না। সমস্ত বিলের উপর কে যেন ধূসর রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নড়ে উঠছে সমস্ত চাদর, নানারকম রঙের বাহার। সূর্যের পড়ন্ত রোদ বিলের জলের উপর পড়ায় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে যেন আরও সহস্র গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাখির কলকল শব্দে সমস্ত বিলের আশপাশ মুখরিত। কী জীবন্ত আনন্দ! শামুক, গুগলি খেয়ে চলেছে মনের সুখে। ওদের এই অপূর্ব আনন্দের সমারোহ দেখে আমিও একজন তার অংশীদার হয়ে গেলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বিষাদে মন ভরে গেল এই ভেবে যে এখনই এক ভীষণ আঘাতে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়খার হয়ে যাবে। কতরকমের হাঁস – বালিহাঁস, লেঞ্জা হাঁস, পাতিহাঁস, রাজহাঁস। আরও কত নাম না জানা পাখি।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তেথুলিয়ার কাছারির নায়েব বিধুবাবু বিলের একটি জায়গা ঠিক করে নিয়ে জলার কিছু জায়গায় কলাগাছের ভেলার উপর কয়েকটি মেকি ঝোপ বানিয়ে রেখেছেন। উদ্দেশ্য, বিলে পাখি শিকারের প্রথা অনুযায়ী একজনকে জলে নেমে কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে ঐসব ভাসমান ঝোপের আড়ালে বন্দুক নিয়ে, যাতে পাখিরা বুঝতে না পারে। এইভাবে বেশ কিছু এগিয়ে গিয়ে গুলির রেঞ্জের মধ্যে পৌঁছে গেলে পাখিদের উপর পর পর দুটো গুলি করা হবে। অপরদিকে একজন আরেকটা বন্দুক নিয়ে বিলের ধারে একটি নির্বাচিত জায়গায় তৈরি থাকবে। উভয় শিকারি দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে যে প্রথমে গুলি করবে সে জলে থাকবে। গুলি খেয়ে পাখিরা যেমন চক্রাকারে উপরে উঠবে তখনই সুবিধা হবে তীর থেকে গুলি করা। তাকে বলে ফ্লাইং শট।
যা হোক, সাহেবকে তীরে দাঁড় করিয়ে দিলাম বন্দুক দিয়ে। আমি গুটিগুটি এগিয়ে গেলাম ঝোপের আড়ালে। পজিশন নিয়ে তাকিয়ে দেখি, সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি পরপর দুটি গুলি চালিয়ে দিলাম। সাহেবের গুলির শব্দ আমি শুনতে পাইনি। কারণ, আমার গুলি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রলয় কাণ্ড ঘটে গেল। সহস্রাধিক পাখি একসঙ্গে চক্রাকারে জল থেকে আকাশের দিকে উঠে গেল। এই ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক প্রবল বাতাসের গতিবেগের সৃষ্টি হল যে ভেলার বাঁশের খুঁটি না ধরে ফেললে হয়তো আমাকে কয়েক হাত জলের উপর উঠিয়ে ফেলত। নিমেষের মধ্যে আমাদের মাথার উপরে সমস্ত আকাশ যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে এই অসংখ্য পাখির সম্মিলিত ডাকে আকাশ বাতাস কিছুক্ষণের জন্য মুখরিত হয়ে উঠল। সে দৃশ্য আজ এতদিন পর লিখে প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবেশ কল্পনা করে কেউ বাংলাদেশের কোনও বিলে পাখি শিকার করে থাকলে বুঝে নিতে পারবেন।
কিন্তু এই কালবৈশাখীর মেঘাচ্ছন্নতা কয়েক মিনিটের জন্য। বহু উপরে বার দুই-তিন চক্রাকারে ঘুরে এই বিশাল পক্ষীকুল কোথায় মিলিয়ে গেল। গুলি লেগে অনেক পাখি বিলের জলের উপর পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই শিকারি কুকুর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাখায় কামড়ে ধরে এক এক করে টেনে নিয়ে এল। গুনে দেখা গেল উনিশ-কুড়িটা হবে। নায়েববাবুর লোক পাখিগুলোর পেট কেটে নুন ভরে সেলাই করে দিল। তিন-চারটে পাখির গায়ে কোথাও কোনও জখম নেই। ওগুলো গুলির শব্দে বোধহয় আতঙ্কে পড়ে গিয়েছে। কী সুন্দর সতেজ ভাব, ধূসর রঙ, গলায় নানা রঙের মালা, লাল ঠোঁট, চোখ বুজে পড়ে আছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
নিজের এবং বহু লোকের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নাজিরনগর থানার চাতল পাড়ে গুলি চালিয়ে কিছু সংখ্যক দাঙ্গাকারীকে হতাহত করতে হয়েছিল। কিন্তু তখন আমার এতটুকুও মন খারাপ হয়নি কারণ, সেটা ছিল আমার কর্তব্য-কর্মের অন্তর্ভূক্ত। তারপর আমার চাকুরি-জীবনে আরও দু’বার ডাকাত ধরতে গিয়ে গুলি করতে হয়েছে। কিন্তু পাখি শিকারের অদম্য স্পৃহা তেথুলিয়া বিলের জলে শেষ করে দিয়ে এসেছি। আমার অংশের পাখিগুলো মোয়াজ্জম হোসেন ও অন্যান্য বন্ধুগণকে বিলি করে দিলাম। অর্দ্ধসামরিক বাহিনীতে কাজ করেও নিরীহ পাখি শিকারের হিংসা প্রবৃত্তি আর যাতে না জাগে তার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা করেছি এবং ঠাকুর সে কথা শুনেছেন। কারণ, পাখি শিকার আর কোনওদিনই আমি করিনি।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ মৌসুমী রায়

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী (১৯১৬ – ২০০৬) স্বাধীনোত্তর ভারতে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। ১৯৬৩ সালে রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত Indian Police Medal ও ১৯৭২ সালে 25th Independence Anniversary Medal লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে অবসরগ্রহণের পর নিজের পুলিশ-জীবনের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন। বর্তমান আখ্যানটির পটভূমি পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানা, কাল সন ১৯৪০।

No comments:

Post a Comment