লোককাহিনিঃ সাপের ম্যাজিক - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


সাপের ম্যাজিক

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

তখন এই পৃথিবীটা ছিল নতুন এক্কেবারে। সেই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এক মালভূমি অঞ্চল হল বর্তমানের তিব্বত। সবে সেখানে দুয়েকজন করে মানুষ, পশুপাখির বসতি গড়ে উঠতে শুরু করেছে। সবাই বেশ মিলেমিশে থাকতে শুরু করেছে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার আশায়। একের ওপর অন্যের নির্ভরশীলতা আর বিশ্বাসভাজনতা তাদের শান্তিপূর্ণ এই বসতিতে অন্যতম মাত্রা যোগ করছে।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে পাকদণ্ডী পথ উঠে গেছে ওপরে। বিপজ্জনক সে রাস্তা। পাশেই গভীর খাদ। সেই পথ দিয়ে এক নিশুতি রাতে একজন মানুষ, একটি কাক, এক ইঁদুর আর একটি সাপ ধীরে ধীরে চলেছে তো চলেইছে। পিছলে পড়েছে এরা বেশ কয়েকবার। তবুও থামেনি। হাঁটছে তো হাঁটছেই। কেউ এরা আঘাত পায়নি তাই রক্ষে।
তারা একটু বসে পাহাড়ের ঢালে, একটু জিরোয়। খিদে, তেষ্টায় বিধ্বস্ত হয়ে তাদের পথচলা দায় হয়। এদিকে পাহাড়ের মাথায় না উঠলেই নয়। কী করবে সকলে মিলে, এই ভাবতে ভাবতে তারা দেখল এক পথিক ওপর থেকে আসছেন হাঁটতে হাঁটতে। তাঁদের দিকে তাকিয়ে তিনি বেশ বিস্মিত হলেন। বললেন, “তোমরা তো দেখি আটকে পড়েছ। একটি দড়ির সাহায্যে তোমাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করা যাক।”
সেই চারজন যেন হালে পানি পেল। এমন হয়! কেউ এলেন বুঝি তাদের ত্রাণ করতে। দড়ি ফেলে দিয়ে এক এক করে তাদের দড়ির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে ওপরে উঠে আসতে বললেন সেই পথিক। তিনি ওপর থেকে দড়ি ধরে হেঁইও বলে টানতে থাকলেন। আর সেই লোকটি, ইঁদুর, সাপ আর কাক একে একে ধীরে ধীরে উঠতে থাকল পাহাড়ের ওপরে। একসময় তারা তাদের গন্তব্যে হাজির হল।
সেই মানুষটির জন্য তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ রইল না। তারা সমস্বরে বলে উঠল, “ভবিষ্যতে যদি কোনওদিন আপনার কোনও উপকারে আসতে পারি জানাবেন দয়া করে।”
এরপর অনেকদিন কেটে গেল। সেই রাজ্যের রাজার রানি ছাদের ওপর বসে মনোযোগ সহকারে তাঁর কেশ পরিচর্যা করছিলেন। তিনি তাঁর নবরত্ন খচিত গলার হারটি সযত্নে নিজের পাশেই একটি বেঞ্চিতে রাখলেন। এবার কেশ পরিচর্যার সময় নিচে নেমে এলেন আর হারটি ভুলে সেখানেই রেখে এলেন। পাশের একটা গাছে কাকটি বসে দেখছিল সব। তাৎক্ষণিক বুদ্ধি এল তার মাথায়। সে ভাবল যে পথিকটি তাদের সেদিন অত বড়ো সাহায্য করেছেন তাঁকে গিয়ে সেই মহামূল্য হারটি সে উপহার দেবে। সে টুক করে উড়ে গিয়ে বেঞ্চির ওপর থেকে তার ঠোঁটে করে সেই নবরত্নের হারটি তুলে আনল। উড়ে যেতে গিয়ে কাকের আচমকা দেখা হয়ে গেল সেই পথিকের সঙ্গে। সে মহার্ঘ সেই হারটি পথিককে দিয়ে বলল, “কত উপকার করলেন সেদিন। তাই আমার কাছ থেকে এই সামান্য উপহারটি গ্রহণ করলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”
পথিক সেই হারটি সানন্দে গ্রহণ করে রাস্তায় হেঁটে চলেছেন। এমন সময় তাঁর দেখা হল সেই লোকটির সঙ্গে যাকে তিনি একদিন উদ্ধার করেছিলেন পাহাড়ের ওপর থেকে। পথিক লোকটিকে বললেন, “দেখো, কাক আমাকে এই দামি হারটি দিল। আমি জীবনে ভাবতে পারিনি যে কাক মানুষের এত বন্ধু হয়।”
লোকটি সেই শুনে সোজা রাজদরবারে হাজির হল। রানির মহামূল্যবান হারখানা হারিয়ে যাবার কথা রাজাকে জানাল সব। আর বলল, “আমি জানি কার কাছে সে হারটি আছে। আমি তাকে বিলক্ষণ চিনি। তার নামধাম সব জানি।”
রাজামশাই তাঁর পেয়াদা পাঠিয়ে সেই পথিককে ধরে আনতে বললেন। বললেন, “এখুনি তাকে বন্দী করো।”
পুরনো একটা অন্ধকার বন্দীশালার স্যাঁতস্যাঁতে খুপরিতে পথিক বন্দী হল। শাস্তিস্বরূপ কোনও খাবারদাবার দেওয়া হল না তাকে। তার ঘরে বিছানা পর্যন্ত নেই। পথিকের অবস্থা দিনে দিনে সঙ্গিন হল। সে তখন মৃত্যুশয্যায়। বাকি যারা সেখানে বন্দী ছিল পথিকের কাছ থেকে জানতে চাইল ঘটনাটা। অকৃতজ্ঞ সেই লোকটির কথা পথিক বললেন তাদের। একদিন তিনি যার উপকার করেছিলেন সেই লোকটি তাঁকে কেমন ফাঁসিয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি।
ইঁদুর সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। সে এইসব শুনে রাজার ভাঁড়ারে ঢুকে পথিকের জন্য মুখে করে একটু খাবার নিয়ে এল। সে-যাত্রায় পথিকের প্রাণ বাঁচল।
খাবার নিয়ে যেতে যেতে পথে ইঁদুরের দেখা হল সেই সাপটির সঙ্গে। সাপ সব শুনে একদিন পথিককে দেখতে এল। যতই হোক বড়ো উপকার করেছিল এই মানুষটি তার। সে বলল, “কিচ্ছু ভয় নেই। আমি মুক্ত করব তোমাকে এই বন্দীদশা থেকে।”
সাপটি ছিল একটি জাদু সর্প। সে নিজেকে বদলে ফেলল একটি ভূতে। আর রাজার সভায় প্রবেশ করে রাজার গলায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রইল। কিছুতেই রাজা তার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেন না। তাঁর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। মনে হল এই বুঝি তিনি মারা যাবেন। কিন্তু যতই তিনি সাপটিকে স্পর্শ করে নিজেকে ছাড়াতে যান, ততই অবাক হন। সাপটিকে ছোঁয়া যাচ্ছে না! অথচ তার উপস্থিতি টের পান তিনি।
রাজদরবারে জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা লামাকে নিয়ে এল। লামা বললেন, “যাকে বন্দী করে রেখেছ তাকে আগে মুক্ত করো, তবে নিজে মুক্ত হবে। না জেনেশুনে এভাবে কারও দোষ দেখো না, রাজা। এতে ক্ষতি বৈ লাভ হয় না।”
অতঃপর সেই লামার আদেশে রাজা বন্দী পথিককে জেলখানা থেকে ছেড়ে দিয়ে নিজে সেই ম্যাজিক সাপের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হলেন।
(তিব্বতদেশের লোককাহিনি)
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

2 comments: