গল্পঃ অসমাপ্ত অঙ্ক - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়



ফুরফুরে দখিনা বাতাস বয়ে যাওয়া সকালে আজ অনেকদিন পর বিষ্টুবাবুর মনটাও বেশ তাজা গোলাপের মতো। যতদূর মনে পড়ে, কাল রাতে শরীরটা তার বিশেষ ভালো ছিল না। বাড়িতে শ্যালক আর তার পরিবার বেড়াতে এসেছিল। বিষ্টুবাবু অনেক বাজারও করেছিলেন। খাওয়াদাওয়ার পর অতিথিদের বিদায় দিতে বাড়ির গলি পেরিয়ে মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাওয়ার পর থেকে আর কিছুই মনে পড়ছে না। কেন এমন হল, সে নিয়ে মাথাও বেশি ঘামছে না। কেন কে জানে। বরঞ্চ আজ মনে বেশ খুশি খুশি ভাব। চারদিকে গোলাপের গন্ধ। অথচ গোলাপের টিকিটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
ঠিক এই সময়ে বিষ্টুবাবুকে সকালবেলা স্কুলের দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে হয়। অথচ আজ সেই স্কুলের দিকে ধেয়ে যাবার তাগিদটাও আসছে না। শহরতলির এই অবনীভূষণ শিক্ষায়তনের অঙ্কের শিক্ষক হয়ে কেটে গেছে তিরিশটা বছর। একদিনের জন্য মনে হয়নি ছুটি নেওয়ার কথা। শরীর খারাপের জন্য বিষ্টু মাস্টারের ক্লাস একদিন বন্ধ হয়েছে, একথা স্কুলের ছেলেরা কেন, সহকর্মীরাও বিশ্বাস করবে না।
হেডস্যার নরেন মিত্তির, বিষ্টুবাবুর চাইতে দু-চার বছরের ছোটোই হবেন, রসিকতা করতে ছাড়েন না। বলেন, “একটু হাওয়া বদল করে আসুন, বিষ্টুবাবু। পুরী কিম্বা চাইবাসা, গিন্নিকে নিয়ে। দু-চারদিন ক্লাস না হলে ছেলেপুলেগুলোও একটু স্বস্তি পায়।”
বিষ্টুবাবুর মুখ দিয়ে বেরিয়েই যায় অপ্রীতিকরভাবে, “কেন? ছেলেরা সেকথা বলেছে নাকি আপনাকে? বলুন দেখি! কে বলেছে? পিটিয়ে চামড়া তুলব ড্যাকরাগুলোর। একবার নাম বলে দেখুন।”
হেডস্যার টেবিল থেকে জলের গ্লাস তুলে আগে বাড়িয়ে ধরে বলেন, “আ-হা-হা, চটেন কেন? বলবে, সে সাহস আছে কারও? আপনার ভয়ে বাচ্চাগুলো থরহরিকম্প। আরে বাবা, আমিও তো স্কুলে পড়তাম এক সময়ে। অঙ্ক আমার ভালোই লাগত না, সে আপনি যাইই মনে করেন। সেজন্য আমার বাবা আমাকে ইতিহাসে ভর্তি করে দিলেন। বাকিটা সব ইতিহাস, বুঝলেন। আসলে মনের পরিবর্তন হওয়ার দরকার মাঝে মাঝে। ঘুরে-টুরে এলে মন একেবারে মনপবন নৌকা হয়ে যাবে; সাঁই সাঁই পাল তুলে চলতে থাকবে অঙ্কের সমুদ্দুরে।”
কথা না বাড়িয়ে রোল কলের খাতা হাতে সেদিন বিষ্টুবাবু হেডস্যারের ঘর থেকে একরকম প্রায় ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নাইন সি’র অ্যালজেব্রার ক্লাস নিতে।
আজ সেই বিষ্টুবাবুর স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে জীবনের সব চাওয়া পাওয়া শেষ। শরীরটা কেমন যেন হাওয়ায় ভাসার মতো করে স্কুলের সামনে চলে এল।
গেটের সামনে ছেলের পাল হৈ হৈ করে ঢুকছে। টেন বি’র মোটা ছেলেটার হাঁফাতে হাঁফাতে স্কুলের সামনে গাড়ি থেকে নামল। ওর বাবা কন্ট্রাক্টরি করে অনেক টাকা করেছে, বিষ্টুবাবু জানেন। গাড়ি থেকে ওর মা নেমে এসে প্রায় দৌড় লাগাল ছেলের পিছন পিছন, “টিফিন খেয়ে নিও বাবা। নইলে শরীর খারাপ হবে কিন্তু!”
অন্যদিন হলে ছেলেটির মায়ের এই আদিখ্যেতায় বেজায় রেগে যেতেন বিষ্টুবাবু। আজ তার রাগ নেই। কেন, কে জানে। বরং এই ছেলেটা গতবছর তার হাতে অঙ্কে ফেল করেছে ভেবে মনে একটু দুঃখও হচ্ছে।
ঢং ঢং করে স্কুলের ঘণ্টা বেজে গেল। বিষ্টুবাবু স্কুল লাগোয়া পার্কের বেঞ্চিতে বসে পড়লেন। আজ তার কেমন ছুটি ছুটি অনুভূতি হচ্ছে। বিষ্টুবাবু বেঞ্চের এক কোনায় বসে পড়ে ভাবতে লাগলেন কাল থেকে কী কী ঘটেছে। নাহ্‌, কিচ্ছু মনে পড়ছে না। শুধু মনে আছে শালার সাথে কী একটা মজার বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে জোরে জোরে হেসে উঠেছিলেন। আর তারপর কী হল? আচ্ছা, তিনি আজ স্কুলবাড়ির কাছে চলে আসবার আগে কী কী করেছেন সকাল থেকে উঠে তাও মনে পড়ছে না। জোর করে মনে করবার ইচ্ছা একবার মাথায় বুদবুদের মতো উদয় হয়ে পরমুহূর্তে মিলিয়ে যায়।
প্রাতঃকালীন মনোরম মিষ্টি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে চারদিকে। পার্কে লাগানো রবারগাছগুলোর সবুজ পাতা সোনালি রোদে খিলখিল করে হেসে উঠেছে। একটা কুকুর বিষ্টুবাবুর পায়ের কাছে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এসে থমকে দাঁড়িয়ে বাতাস শুঁকল। বিষ্টুবাবুর কুকুরে বেজায় ভয়। উনি পাদুটো বেঞ্চের উপর তুলে দিলেন। কুকুরটা দেখেও না দেখার মতো লেজ গুটিয়ে দৌড়ে চলে গেল। বিষ্টুবাবু বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়লেন। ঠাণ্ডা আমেজে দু’চোখের পাতা জুড়িয়ে এল।
আরামের ঘুম ভাঙল বেশ জোরে ধাক্কা খেয়ে। ধড়মড়িয়ে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বেজায় চটে গেলেন বিষ্টুবাবু। তাকিয়ে দেখেন, গুঁফো লম্বাচওড়া একটা কালোমতো লোক হাতের ইশারায় উঠে বসতে বলছে। পা নামিয়ে বেঞ্চে সোজা হয়ে বসে ভুরু কুঁচকে তাকালেও লোকটার গোমড়া মুখে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। বিষ্টুবাবুর পাশেই বেঞ্চে বসে লোকটা ঘাড় না ঘুরিয়েই প্রশ্নটা ছুড়ে দিল, “চিনতে পার, বিষ্টু?”
বিষ্টুবাবু এবার ভালো করে গুঁফো লোকটার মুখ দেখে নিয়ে বললেন, “নাহ্‌, আপানাকে তো ঠিক… আর এত জোরে ধাক্কা দেবার কী আছে? একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বৈ তো আর কিছুই নয়! জোরে ডাকলেও আমার ঘুম ভেঙে যেত। আর আপনি আমার নামটাই বা জানলেন কী করে?”
“পড়িয়েছিলাম যে তোমাকে! মনে পড়ে? আমি কিন্তু তোমাকে চিনি। অঙ্কের মাস্টার বিষ্টুকে এ-তল্লাটে চেনে না, এমন লোক আছে নাকি?”
বিষ্টুবাবু ভীষণরকম চমকে গেলেন। ইনি পড়িয়েছিলেন? কবে? কোথায়? কিচ্ছু মনে পড়ছে না। আজ কেমন যেন মাথাটাই ফাঁকা হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। গুঁফোর মুখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে যেন সারা শরীরে ইলেকট্রিক শক লাগল। আরে, এ তো হেমেন স্যার! স্কুলে বিষ্টুবাবুদের অঙ্ক করাতেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, যতদূর মনে পড়ে তিনি আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগে…
“ঠিকই ধরেছ। আমি অনেকদিন আগেই আর মনুষ্য শরীরে নেই। মানে ওই যাকে মৃত্যু বলে আর কী, তাই হয়েছে। অনেকদিন কেটে গেছে হে।” বলে উদাস হয়ে দূরের মাঠ দেখতে লাগলেন হেমেন স্যার।
বিষ্টুবাবুর হৃদয়-যন্ত্র তিনতলা থেকে আছড়ে পড়বার মতো হল। তাহলে তাঁর পাশে হেমেনবাবুর ভূত? বলে কী লোকটা? নাকি ছদ্মবেশে কোনও ইনকাম ট্যাক্সের লোক! বিচিত্র কিছু নয়। ইদানিং প্রাইভেট টিউশন করে দু’পয়সা হয়েছে বিষ্টুবাবুর। স্কুলের বাকি মাস্টারগুলোর তাতে কি কম হিংসা? ওদেরই কেউ দিয়েছে হয়তো রিপোর্ট করে।
“কী ভাবছ বিষ্টু? তুমিও এখন আমার দলে, তাই ভাবছ?” এবার হেমেন স্যার বিষ্টুবাবুর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলেন, “তুমি আর ইহলোকে নেই, বিষ্টু। তুমি এখন পরলোকে, মানে পরলোকে যাবার কথা ছিল, কিন্তু আটকে আছ। প্রাণপাখিটা তোমার এখন যমরাজের লকারে। তাই ঘুরে ফিরে সেই এখানেই...”
বিষ্টুবাবুর মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল। কাঁদো কাঁদো মুখে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, “আমিও মরে গেছি, স্যার? কী বলছেন, কই বুঝতে পারিনি তো! কখন? এখন আমার কী হবে, স্যার? গিন্নিকেও বলে আসতে পারিনি আসবার সময়। মেয়েটার বিয়ে দিয়ে উঠতে পারিনি জানেন? কী করে যে কী হয়ে গেল!”
হেমেন স্যার বিষ্টুবাবুর কাঁধে স্নেহের হাত রেখে বললেন, “দুঃখ কোরো না। এটাই অদৃষ্ট। ওরা সব সামলে নেবে, দেখো। এই যে আমি নেই, তাই বলে কি আমার ফেলে আসা সংসার চলছে না? থেমে গেছে নাকি? কালের চাকা ঘুরতেই থাকে। তাকে থামায় কার সাধ্য। কারও জন্য কি কিছু আটকে থাকে বাছা?”
একটু ধাতস্ত হয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে প্রথমেই বিষ্টুবাবু ঢিপ করে হেমেন স্যারকে পেন্নাম সেরে ফেললেন। হেমেন স্যার বলে উঠলেন, “আরে করো কী, করো কী! আমরা এখন সমান সমান। দুই ভূত, বুঝলে! পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হলে সব সমান। তখন কেই বা মাস্টার, আর কেই বা ছাত্তর!”
চকিতে পা সরিয়ে নেবার ফলে স্যারের শরীর একদিকে পালকের মতো ঝুঁকে গেল। অঙ্কের মাস্টারমশাই বিষ্টুবাবু বুঝে গেলেন, সত্যি সত্যি তার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছে। কিছুক্ষণ আগের দুঃখ মন থেকে মুছে গিয়ে কেমন যেন উদার উদার ভাব আসছে। এইবার বিষ্টুবাবু হৃদয়ঙ্গম করলেন, কেন কুকুরটা তাঁকে দেখে ঘেউ করে ওঠেনি। বিষ্টুবাবুর মনে অনেকদিনের বাসনা নেড়ি কুকুরের পেটে একটা কষে লাথি চালান। ইহজীবনে, থুড়ি উহজীবনে আর হয়ে ওঠেনি।
উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে চাইলেন কুকুরটাকে ত্রিসীমানায় দেখা যায় কি না। হ্যাঁ, যা ভেবেছেন তাই। পার্কের এক কোণে ডাস্টবিনের ভিতর মুখ ডুবিয়ে কী যেন খাচ্ছে কুকুরটা। বিষ্টুবাবু প্রায় বাতাসে ভেসে গিয়ে দিলেন কষিয়ে এক লাথি। সাথে সাথে ডিগবাজি খেয়ে বাতাসে গোল হয়ে ঘুরে গেল বিষ্টুবাবুর শরীর। কুকুরটা অম্লানবদনে একইরকমভাবে মুখ নিচু করে ফেলে দেওয়া থার্মোকলের পাতা চেটে খেয়ে যাচ্ছে। ওর শরীরের ভিতর দিয়ে বিষ্টুবাবুর পা ছায়ার মতো পার হয়ে গেল। ফলে বিষ্টুবাবুর শরীর বাতাসে ডিগবাজি খেল তিনবার।
পুরনো ছাত্রের কাণ্ড দেখে গম্ভীর, গুঁফো হেমেনবাবু হেসে কুটোপাটি বেঞ্চের উপর। বিষ্টুবাবুর কান্না পাচ্ছে। এই শরীর রেখে আর কী লাভ, সামান্য কুকুরের পেটেও লাথি কষাতে ব্যর্থ হয় যে শরীর! বাতাসে তিন পাক খেয়ে পিং পং বলের মতো বিষ্টুবাবুর শরীর মাটিতে পড়ে দু’বার লাফাল। হেমেনবাবু বললেন, “সময় লাগবে হে! সবে তো ভূত হয়ে জন্মেছ! অনেক প্র্যাকটিস করলে শরীর খেলানোর কায়দা আয়ত্ত্ব করতে পারবে।”
বিষ্টুবাবু মাটি থেকে উঠে পড়ে বলেন, “তবে যে জানতাম, ভূতেরা কতসব কীর্তি করে! তাদের নিয়ে কত লোক কত গল্প লেখে!”
“সব ভুল। সেসব দিন আর নেই। যেমন জমিদার আর খুঁজে পাওয়া যায় না, প্রবল পরাক্রমশালী ভূতও এখন আর পাওয়া যায় না। সব বিশ্বায়নের ফল, বুঝলে! এই যে আমরা মরে গেছি, প্রেতলোকে যাওয়ার টিকিট পাচ্ছি না কেন, সেই প্রশ্নটা মাথায় আসছে না তোমার? একবারও ভাবছ না, কেন এখনও আমি আর তুমি সেই স্কুলের চারধারে ঘুরপাক খাচ্ছি?”
বিষ্টুবাবু ক্লাসে পড়া না পারা ছেলের মতো মুখ ব্যাজার করে বললেন, “কেন স্যার? ওরা কি আমাদের নিতে চাইছে না?”
“অ্যাই, এইটে হচ্ছে অঙ্কের মাস্টারের ক্ষুরধার বুদ্ধি। একদম ঠিক ধরেছ। ওরা অঙ্কের মাস্টারদের ফুল স্ক্রুটিনি না করে স্বর্গ, নরক, প্রেতলোক কোথাও ঢুকতে দেবে না। এদিকে চিত্রগুপ্তর খাতাও এখন ডিজিটাল হয়ে গেছে। কাজেই নড়চড় হবার উপায় নেই। যমরাজ আমাদের প্রাণ তো কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু জায়গা দিতে পারেনি কোথাও। এই আমাকেই দেখ না, আজ প্রায় বছর দশেক এখানেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দিচ্ছি। এবার একটা ঠাঁই না হলে আর...” হেমেনবাবুর দৃষ্টিতে ব্যথা ফুটে উঠল।
হেমেন স্যারের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, বিষ্টুবাবুর চোখ পড়ল স্কুল গেটে। টিফিন টাইমের ঘণ্টা পড়ে যেতেই আইসক্রিমওয়ালা আইসক্রিমের গাড়ি গড়গড়িয়ে গেটের কাছে হাজির। বিষ্টুবাবুর বেজায় আইসক্রিম ক্ষিদে পেয়ে গেল। কতদিন মনে সাধ হয়েছে একটা আইসক্রিম কিনে মুখে পোরার। ভাবতেন, অঙ্কের মাস্টার স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম চুষছে, না না, কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কাজেই মনের বাসনা মনেই রয়ে গেছে। তাই সাহসে ভর করে হেমেন স্যারকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করে বসেন, “স্যার, আইসক্রিম খাবেন?”
হেমেন স্যার বাজখায়ি গলায় ধমক দিয়ে উঠলেন, “ইয়ার্কি পেয়েছ? কস্মিনকালেও কেউ দেখেনি বা শোনেনি যে ভূতে আইসক্রিম খায়। তোমার মধ্যে এখনও মনুষ্যচিত গুণাবলী ধাক্কা মারছে। খাবে কী? কোন মুখে খাবে? তোমার মুখ আছে? আরেকটা কথা বলো দেখিনি, নিজে যে ধমক দিতে বাচ্চাগুলো বেশি আইসক্রিম খেলে, সেই বেলা? অনেকবার ওই হেডমাস্টারের কাছে কত ছেলের নামে কমপ্লেন করেছ, তাও আমি জানি।”
বিষ্টুবাবু শেষবারের মতো চেষ্টা করে দেখবার জন্য বলেন, “আসলে স্যার, লোকলজ্জার ভয়ে, বুঝতেই তো পারছেন… অঙ্কের মাস্টার বলে কি আর মানুষ নই, মানে ছিলাম না?”
হেমেন স্যারের মুখ দিয়ে ‘হুম’ করে একটা গুরুগম্ভীর শব্দ বেরোল। তিনি উঠে পড়ে বললেন, “চলো, একটু পুকুরের দিক থেকে ঘুরে আসি। ওখানে মাছ ধরছে বেকার ছেলের দল। এখানে বেশীক্ষণ থাকলে তোমার আবার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করবে।”
পার্ক থেকে হেমেন স্যরের পিছু পিছু বিষ্টুবাবুর বায়বীয় শরীর বাতাস বেয়ে পুকুরের দিকে চলল। স্কুলবাড়ি থেকে ছেলেদের হল্লার আওয়াজ আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগল। হেমেন স্যারের পিছনে হাঁটতে হাঁটতে বিষ্টুবাবুর মনে পড়ে গেল, কী ভয়টাই না পেতেন তারা স্কুলে এই মাস্টারমশাইটিকে। কোনওদিন কি ভেবেছিলেন, ভূত হয়ে তার পিছন পিছন ছুটবেন মাছ ধরা দেখতে?

এই পাড়াটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। ছড়ানো ছিটানো বাড়ি নয়, বেশ প্ল্যান করে তৈরি করা এলাকা। সম্ভ্রান্ত মানুষজনের আনাগোনা। বিষ্টুবাবুর চেনা এক ভদ্রলোক হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে ধীরেসুস্থে চলেছেন বাজারের দিকে। বিষ্টুবাবু জানেন উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। অভ্যেসমতো ভদ্রলোককে দেখে বিষ্টুবাবুর হাত কপালে উঠল। ভদ্রলোক আপন মনে হাঁটতেই লাগলেন। তার গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে থেকে এবার বিষ্টুবাবুর মন খারাপ হয়ে গেল। আশ্চর্য, মনেই থাকছে না যে গতকাল তিনি মারা গেছেন! অধ্যাপক ভদ্রলোক বিষ্টুবাবুকে দেখতে পেলেন না দেখে বিষ্টুবাবুর বুকটা চিনচিন করে উঠল। বিধির কী বিধান! পরলোক গমন করবার জন্য পা বাড়িয়েছেন, কিন্তু কিছু টেকনিকাল গোলযোগ হওয়ায় জন্য এখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
এদিকে হেমেন স্যার যে কোথায় মিলিয়ে গেলেন! দ্রুত বাতাসে ভর করে ভেসে গেলেন বিষ্টুবাবু পুকুরের ধারে। সেখানে তখন ছেলেবুড়োর দল ছিপ ফেলে বসে মাছ ধরছে। একজন ছিপ ফেলে বসে থাকা লোকের পিছনে জনা চার-পাঁচ দর্শক। কাজকর্ম না থাকলে লোকে কী আর করবে! মাছ ধরে সময় কাটাচ্ছে। আচ্ছা, ভূতেদের নাকি মাছ খাবার দিকে বেজায় ঝোঁক! কই, নিজের ভিতর সেরকম মাছ খাবার ইচ্ছেটা টের পাচ্ছেন না তো! দিনকাল সব সত্যিই বদলে গেছে। কিন্তু হেমেন স্যার পুরনো লোক। তিনি আবার কাঁচা মাছ নিয়ে পালাননি তো!
পুকুরের ধার দিয়ে হেঁটে গিয়ে আর একটু এগোতেই দেখা গেল ঝোপের পাশে কালোমতো একটা ষণ্ডা টাইপের লোকের সাথে হেমেন স্যার নিচু গলায় কী যেন আলোচনা করছেন। মানুষের সাথে ভূতের বাক্যালাপ? ব্যাপারটা খুব একটা সুবিধার ঠেকছে না তো!
বিষ্টুবাবুকে দেখে দু’জনেই থেমে গেলেন। ষণ্ডা লোকটার হাতে একটা গদার মতো দেখতে জিনিস। এও আরেক ভূত নয়তো? লোকটার দৃষ্টি রক্তবর্ণ। ভাঁটার মতো চোখ দিয়ে বিষ্টুবাবুকে গিলতে গিলতে বলে উঠল, “আপনি বিষ্টুচরণ তরফদার তো? অবনীভূষণ শিক্ষায়তনের অঙ্কের মাস্টার?”
বিষ্টুবাবু ঘাড় নাড়াতেই সে ঝড়ের বেগে তার কথা শুরু করল, “দেখুন মশাই, সময় বেশি নেই। সংক্ষেপে বলি। গতকাল আমিই আপনাকে উঠিয়েছিলাম আপনাদের পাড়া থেকে। এখন মুশকিল হয়েছে অঙ্কের মাস্টারদের স্বর্গে জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। নরকেও তাদের স্থান হতে পারে না, কারণ তারা এমন কোনও অপরাধ করেননি যাতে তাদের জায়গা নরকে হয়। কিন্তু আপনার রেকর্ড খুব একটা ভালোও নয়, সেটা জানিয়ে রাখি।”
বিষ্টুবাবু বেজায় চটে গিয়ে বলে উঠলেন, “কেন কেন? আপনি যমরাজ তো! আপনার এ কী অবিচার! আমি সারাজীবনে একটাও ছুটি নিইনি, একদিনের জন্য অসুস্থ হইনি, নিয়মিত ছাত্র পড়িয়েছি, আর আপনি বলছেন...”
“দাঁড়াও দাঁড়াও, প্রথম কথা আমি যমরাজ নই। যমরাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমার উপরে আছে ডেপুটি যমরাজ, তার উপর জয়েন্ট যমরাজ। যমরাজের অত সময় নেই তোমার মতো ক্ষুদ্র মাস্টারকে তুলে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাপু, তোমায় আরও কিছুদিন এখানে ওখানে ঘুরেই কাটাতে হবে। সময় এলে জায়গা পাবে, তার আগে নয়।”
যমরাজের অ্যাসিস্ট্যান্টের কথা শুনে পায়ের তলায় বাতাস সরে গেল বিষ্টুবাবুর। একে তো লোকটা অত্যন্ত অসভ্য প্রকৃতির। তার মতো একজন গণ্যমান্য মাস্টারমশাইকে ‘তুমি তুমি’ করে সম্ভাষণ করছে। আবার ভাব দেখাচ্ছে যেন ওর হাতেই সসাগরা পৃথিবীর ভার। হেমেনবাবুও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন, যেন শুনেও শুনতে পাচ্ছেন না। গলাটা বেশ গভীর করেই বিষ্টুবাবু বলে উঠলেন, “তাহলে আমাকে তুলেছিলেন কেন? জীবনের আরও দুটো দিন বউ-মেয়ে নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতাম। কীই বা বয়স হয়েছিল আমার?”
বিষ্টুবাবুর কথা শুনে গলা ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠল লোকটা। “মৃত্যু কি আর বয়স বুঝে আসে বাছা? ওই চিত্রগুপ্তের ডিজিটাল ডায়েরির পাতায় সব লেখা থাকে। পরপর সব নাম এসে গেলেই ব্যস, ঘচাং। সে তাতে বিষ্টু মাস্টারই গেল, নাকি পঞ্চা মুদি, তাতে কার কী এসে যায়!”
হেমেনবাবু এবার সাহস করে বলে বসেন, “আমি কিন্তু স্যার দশ বছর ধরে এই পাড়ায় ঘোরাঘুরি করতে করতে...”
কালো পেশীবহুল ডানহাত বরাভয়ের মতো উঁচিয়ে যমদূত বলে, “সেজন্যই তো আমার আগমন, বৎস। চলো এগোই। আমার পিছনে পিছনে এসো।”
কিছুদূর এগোতে দেখা গেল একটা হলদে দোতলা বাড়ির সামনে জটলা। বাতাসে ভর করে তিনজনে একতলার ভিতরের ঘরে ঢুকে পড়ল। বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে একটা দশ-বারো বছরের বাচ্চা ছেলে। ডাক্তার স্টেথোর নল ঝুলিয়ে গম্ভীর মুখে বসে। যমদূত ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল, “ওই ছেলেটার সময় ফুরিয়ে গেছে। দু-দু’বার জন্ডিসে কি আর কেউ বাঁচে?”
হেমেনবাবু মুখে চুকচুক শব্দ করে বললেন, “আহা, বেচারা! অবনীভূষণ শিক্ষায়তনের এইট সি’তে পড়ে ছেলেটা। আমি চিনি। গতবছর অঙ্কে টেনেটুনে পাশ করেছে।”
হেমেনবাবুর কথা কেটে দিয়ে যমদূত বলে, “সেই জন্যই তো আপনাকে ওর শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে ওরটা নিয়ে যাব। এছাড়া আপনার পুনর্বহালের আর কোনও রাস্তা আমার জানা নেই। আপনি অবশ্য ওর শরীরে ঢোকামাত্র নিজের সত্ত্বা খুইয়ে ফেলবেন। সে যাক গে, এই ব্যবস্থাটা সবচাইতে ভালো। নইলে যা দিনকাল পড়েছে, কোথাও জায়গা পাওয়া ভারি মুশকিল।”
বিষ্টুবাবুর গলা শুকিয়ে যায়। আর্তনাদ করে ওঠেন, “আর আমার কী হবে, স্যার?”
যমদূত ধমক দিয়ে বলে, “আহ্‌, দাঁড়াও বাপু, তোমার কথা পরে ভাবা যাবে। ওঁকে দ্যাখো, দশ বছর ধরে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তুমি তো সদ্য প্রয়াত। অঙ্কের ক্লাসে ছাত্র পিটিয়ে যে পাপের বোঝা চাপিয়েছ নিজের ঘাড়ে, সে দায় থেকে মুক্ত হও আগে!”
নিজের বিড়ম্বিত ভাগ্য নিয়ে ভাবতে ভাবতে বিষ্টুবাবু এমন মগ্ন ছিলেন, তার কোনও জ্ঞান ছিল না। হুঁশ ফিরতে তাকিয়ে দেখেন বিছানায় শুয়ে থাকা ছেলেটা আস্তে আস্তে চোখ মেলে চাইছে। ডাক্তারের মুখে হাসি। যমদূত অদৃশ্য। সে ছেলেটির শরীরে হেমেনবাবুকে ঢুকিয়ে দিয়ে ওর পুরনো প্রাণটা নিয়ে কেটে পড়েছে কোথায় কে জানে।
শুয়ে থাকা ছেলেটার খোলা চোখের দিকে তাকিয়ে বিষ্টুবাবু বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “ভালো থাকুন, স্যার। ছেলেটার মঙ্গল হোক। ও অঙ্কে ফার্স্ট হবে আমি নিশ্চিত।”
ছেলেটা বিষ্টুবাবুর একটা কথাও শুনতে পেল না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বিষ্টুবাবু ছুটলেন নিজের বাড়ির দিকে। চোখের কোলে হাত দিয়ে বিষ্টুবাবু দেখলেন সেখানে জলের চিহ্ন মাত্র নেই। ভূতেদের চোখে জল পড়ে না।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

6 comments:

  1. দারুণ লিখেছেন দাদা

    ReplyDelete
  2. দারুণ লাগল দাদা - সুস্মিতা

    ReplyDelete
  3. বেশ অন্য ধরনের লেখা, ভালো লাগলো পড়ে।

    ReplyDelete