ধারাবাহিকঃ কুরুপাণ্ডব কথা (তৃতীয় পর্ব) - মৈত্রেয় মিত্র



তৃতীয় পর্ব


বালক দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

পিতার অকালমৃত্যুর পর পাণ্ডব ভাইয়েরা হস্তিনাপুরের রাজভবনেই বড়ো হতে লাগলেন। পাণ্ডবদের জ্যাঠামশাই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের একশো জন ছেলে ও এক মেয়ে। সব ভাই মিলে একসঙ্গেই তাঁরা রাজভবনের অঙ্গনে, বাগানে খেলাধুলো করতেন। একশো পাঁচ ভাই ও একমাত্র বোন মিলে সেই জমজমাট আনন্দের হৈচৈ কল্পনা করতে পার? এই ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে দুরন্ত আর দুর্দান্ত ছিলেন ভীম।
পাণ্ডবদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ভীম ছিলেন মেজ। ধৃতরাষ্ট্রের বড়ো পুত্র দুর্যোধনও খুব বলবান ছিলেন, কিন্তু তাও ভীমের সঙ্গে অনেক সময়েই পেরে উঠতেন না। আর ভীম যেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের পেছনে লাগাতেই সবথেকে বেশি আনন্দ পেতেন। ভীমের ভয়ে ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা হয়তো আলাদা কোথাও খেলা করছেন, ভীম সেখানে গিয়ে তাঁদের মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি করে দিতেন। কখনও তাঁদের মাটিতে ফেলে, তাঁদের চুলের মুঠি ধরে খুব পিটতেন। সরোবরে সাঁতার কাটার সময় তিনি একাই হয়তো তাদের দশজনকে ধরে জলের মধ্যে নাকানিচোবানি খাইয়ে দিতেন। ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের কেউ কেউ হয়তো গাছে ফল পাড়তে উঠেছেন, ভীম সেই গাছের গুঁড়িতে এমন লাথি মারতেন, যে সেই ঝাঁকুনিতে গাছের ডাল থেকে ফলের সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরাও ধুপধাপ মাটিতে পড়ে চোট পেতেন খুব। এইভাবে ভীমের হাতে সর্বদাই অপদস্থ হওয়ার ফলে দুর্যোধন ও তাঁর ভাইয়েরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে লাগলেন।
একশো ভাইয়ের মধ্যে দুর্যোধন ছিলেন সবথেকে রাগী, অত্যন্ত হিংসুটে আর তাঁর মাথায় ছিল ঝুড়ি ভর্তি বদবুদ্ধি। তিনি চিন্তা করলেন, পাণ্ডবদের মধ্যে এই ভীম যেমন শক্তিধর, তেমনি সাহসী। আমাদের এতগুলো ভাইকে ও একাই সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। ওকে যদি শেষ করে দিতে পারি তাহলে ওর বড়ো ভাই যুধিষ্ঠির আর ছোটো ভাই অর্জুন খুব ভয় পেয়ে যাবে, তখন আর ওদের বশ করতে অসুবিধে হবে না। পাণ্ডবেরাও তখন আমারই অধীনে থাকবে - এই চিন্তা করে দুর্যোধন নানারকম ফন্দি ভাবতে লাগলেন আর ফিকির খুঁজতে লাগলেন কীভাবে ভীমকে মেরে ফেলা যায়।
এইভাবে অনেক কুচিন্তা আর কুটিল ভাবনা ভেবে তিনি লোকজন ডেকে গঙ্গার ধারে কাপড় আর মোটা কম্বল দিয়ে অনেকগুলি তাঁবু বানিয়ে তুললেন। নানা রঙের ধ্বজা, রঙিন কাপড়ের শিকলি, ছোটো ছোটো পতাকা দিয়ে খুব সুন্দর সাজিয়ে তুললেন তাঁবুগুলিকে আর গঙ্গার পাড়ের অনেকটা জায়গা। তারপর খুব ভালো ভালো রাঁধুনিদের ডেকে দারুণ দারুণ সব খাবার বানানোর আয়োজন করলেন। পরিকল্পনামতো সব আয়োজন শেষ করে তিনি পাণ্ডবভাইদের কাছে গিয়ে দাদা যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “দাদা, রোজ রোজ এই বাগানে আর সরোবরে একই খেলা আর ভালো লাগছে না। আজ চলুন সবাই মিলে গঙ্গায় সাঁতার কাটতে যাই। সারাদিন গঙ্গার বুকে খেলব, তারপর খাব-দাব, সে বেশ মজা হবে দেখবেন! আপনি কিন্তু না করতে পারবেন না, দাদা! আপনাদের যেতেই হবে।”
যুধিষ্ঠির বালক হলেও খুবই বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। কিন্তু তাঁর মাথায় তো আর কুচিন্তা নেই, তিনি দুর্যোধনের কথায় বিশ্বাস করে মেতে উঠলেন, “তুই বলছিস, আর আমি যাব না, ভাই? নিশ্চয়ই যাব।”
নির্দিষ্ট সময়ে সকলে মিলে সেজেগুজে রওনা হলেন গঙ্গাতীরের সেই বাগানের দিকে। কেউ চাপলেন হাতির পিঠে, কেউ চাপলেন ঘোড়ায়, আবার কেউ কেউ রথে। পাণ্ডবরা পাঁচভাই, আর দুর্যোধনের একশো ভাই – একসঙ্গে সঙ্গে যখন যাত্রা করলেন, সে এক দেখার মতো দৃশ্য বৈকি! শহরের লোকেরা পথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগল একশো পাঁচ ভাইয়ের অদ্ভুত সেই শোভাযাত্রা।
গঙ্গার তীরে সেই সাজানো বাগানে পৌঁছে সেখানকার আয়োজন দেখে সকলেই খুবই আনন্দ করতে লাগলেন। তাঁবুগুলি খুব সুন্দর করে বানানো, তার গায়ে নানা রংয়ের আলপনা। বসার আসনগুলি দুধের মতো সাদা। সুন্দর ফুলে ভরা গাছের বাগান, বাগানের মধ্যে অনেকগুলি পুকুর আর দীঘি। সেই দীঘির জলে ফুটে আছে অজস্র পদ্ম। সকলেই এমন রমণীয় বাগান দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লেন। দুর্যোধন প্রস্তাব দিলেন, “দাদা, এতটা পথ এসে আমরা যেমন ক্লান্ত হয়েছি, তেমনি খিদেও পেয়েছে। গঙ্গায় সাঁতারে নামার আগে চলুন কিছু খেয়ে নিই।”
এই প্রস্তাবে সকলেই মহানন্দে নানান সুস্বাদু খাবার খেতে আরম্ভ করলেন। প্রচুর মিষ্টির আয়োজনও করা হয়েছিল। সকলেই খুব তৃপ্তি করে সেই সব মিষ্টি খেতে লাগলেন। সকলেই যখন আহারে মগ্ন, দুর্যোধন বিষ মেশানো বেশ কিছু মিষ্টি নিয়ে ভীমের কাছে গেলেন। খুব আদর করে ভীমকে বললেন, “ভাই, আজ তুমি বেশ কম কম আহার করছ দেখছি। রান্না ভালো হয়নি নাকি? এক কাজ করো, ওসব খাবার যদি ভালো না লাগে, খেও না। এই মিষ্টিগুলো খেয়ে দেখো, হাঁ করো, হাঁ করো, অ্যাই… কী ভালো না? নাও, নাও, আরও নাও।”
দুর্যোধন নিজের হাতে ভীমের মুখে বিষ মেশানো মিষ্টি তুলে দিলেন। ভীম বুঝতে পারলেন না, দুর্যোধনের দেওয়া মিষ্টি খুব তৃপ্তি করেই অনেকটা খেয়ে ফেললেন। নিজের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দেখে দুর্যোধন মনে মনে হাসলেন।
খাওয়াদাওয়ার পর পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের সব ছেলেরা একসঙ্গে গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেন। একশো পাঁচ ভাই মিলে গঙ্গার জল তোলপাড় করে তুললেন। এত আনন্দ কোনওদিন হয় না। রোজ রোজ একইধরনের খেলার যে মজা, তার সঙ্গে আজকের এই আনন্দ-খেলার কোনও তুলনাই হয় না। এই আনন্দ আর হুল্লোড় যে কতক্ষণ চলত কে জানে, কিন্তু শেষ করতেই হল একসময় যখন গঙ্গার পশ্চিম মাঠের দিগন্তে সূর্যদেব অস্ত গেলেন।
যতক্ষণ আনন্দের হুল্লোড় চলে, ততক্ষণ বোঝা যায় না, কিন্তু থেমে গেলেই শরীরে নেমে আসে ক্লান্তি। খেলা ছেড়ে গঙ্গার জল থেকে সব ভাইয়েরা ক্লান্ত পায়ে উঠে আসতে লাগলেন। তাঁদের সারা শরীরে এখন অবসাদ। তাঁদের এখন একটাই চিন্তা, কতক্ষণে তাঁবুতে ফিরে শুকনো কাপড় পরে বিছানায় শরীর ছেড়ে দেওয়া যাবে, তারপরেই ঘুম। সারাদিনের দীর্ঘ আনন্দের পর সকলেই এখন গভীর ঘুমের স্বপ্নে মগ্ন।
কিন্তু সবাই কি ফিরে এলেন তাঁবুতে? না, দু’জন এখনও ফেরেননি। বিষের তীব্র বিক্রিয়া আর ক্লান্তিতে মেজভাই ভীম অজ্ঞান হয়ে শ্যাওলা আর ঝাঁজির জঙ্গলে অসহায় পড়ে আছেন গঙ্গার পাড়ের জলাতে। দুর্যোধন একটু দূর থেকে নিরীক্ষণ করে ভীমের কাছে গেলেন। নিচু হয়ে দেখলেন, ভীম মরেননি, অজ্ঞান হয়ে রয়েছেন। দুর্যোধনের ঠোঁটে খলের হাসি। অস্ফুটে বললেন, “যে পরিমাণ কালকূট পেটে গিয়েছে ভীমভাই, এ-যাত্রায় তোমায় আর ফিরতে হবে না গো।”
আশেপাশের জল থেকে লতা তুলে দুর্যোধন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধলেন ভীমকে। তারপর অসাড় দেহটা পাঁজাকোলা করে তুলে গভীর গঙ্গার বুকে ছুড়ে দিলেন। ঝপ্‌পাস - একটা শব্দ হল, গঙ্গার বুকে বিচলিত হয়ে উঠল ঢেউ। গোধূলির ম্লান আলোও মুখ ঢাকল আতঙ্কে, গভীর সন্ধ্যা ঢেকে দিল চারদিক।
দুর্যোধন পিছন ফিরে তাকালেন। দূরে তাঁবুর ভেতরে, বাইরের অঙ্গনে দীপের আলো জ্বলছে। কেউ কোথাও আর নেই। দুর্যোধন মুচকি হেসে নিজের মনেই বললেন, ‘আপদটাকে শেষমেশ বিদেয় করতে পেরেছি, নির্বিঘ্নে সরিয়ে দিয়েছি পথের কাঁটা!’ তারপর তিনি দ্রুত পায়ে তিনি উঠে এলেন গঙ্গার পাড় থেকে। এগিয়ে চললেন নিজের তাঁবুর দিকে।
জলের গভীরে ডুবতে ডুবতেও বহতা গঙ্গার স্রোতে সংজ্ঞাহীন ভীম বহুদূরে নাগভবনে গিয়ে ঠেকলেন। তাঁর শরীরের চাপে কিছু নাগশিশু মারা গেল, আহত হল অনেক। বাচ্চাদের এ হেন পরিণতি দেখে মাথার ঠিক রাখতে পারলেন না নাগমাতারা। তাঁরা রাগে অন্ধ হয়ে ভীমের শরীরে বারবার দংশন করতে লাগলেন। তাঁদের সকলের তাজা তীব্র বিষের প্রভাবে ভীমের রক্তে মিশে থাকা কালকূট বিষের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে লাগল। একসময় সম্পূর্ণ নির্বিষ হয়ে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন, সংজ্ঞা ফিরে পেলেন।
নাগমাতাদের দংশনে ক্ষতবিক্ষত শরীরের যন্ত্রণায় ভীমও এবার খুব রেগে উঠলেন। তাঁদের দংশন থেকে রক্ষা পাবার জন্যে তিনি সকলকে মেরে ফেলতে উদ্যত হলেন। তাঁর হাতে কেউ কেউ মারা গেলেন, কেউ কেউ আহত অবস্থায় প্রাণ নিয়ে পালালেন।
নাগরাজ বাসুকি দেবরাজ ইন্দ্রের মতোই পরাক্রমশালী এবং প্রজাবৎসল। ভীমের হাতে আহত নাগেরা নাগরাজ বাসুকির কাছে গিয়ে করজোড়ে নিবেদন করলেন, “হে নাগেন্দ্র, ভীষণ শক্তিমান এক মানব বালক আমাদের পাতালপুরে এসে ভীষণ উপদ্রব শুরু করেছে। আমাদের যাচ্ছেতাই মারধোর করেছে, অনেককে মেরেও ফেলেছে। ওই বালক যখন এল, তখন তার হাত-পা বাঁধা এবং অজ্ঞান অবস্থায় ছিল। মনে হয় বিষ খেয়েছিল। আমাদের এখানে এসে পড়ল একেবারে নাগশিশুদের ঘাড়ে! শিশুরাও কেউ কেউ মারা গেছে, আহত হয়েছে অনেক। তাতে রেগে গিয়ে আমাদের কেউ কেউ ওকে দংশন করেছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমাদের বিষে ওর বিষক্ষয় হল; ওর জ্ঞান ফিরল। তারপর হাত-পায়ের বাঁধন ছিঁড়ে আমাদের মারতে শুরু করল। কয়েকজনকে শেষ করে দিয়েছে, আমরা এই ক’জন কোনওমতে পালিয়ে আসতে পেরেছি। এখন আপনি গিয়ে দয়া করে বালকটি কে, তার খোঁজখবর নিন। কিছু একটা বিহিত করুন, না হলে আমাদের খুবই বিপদ।”
নাগরাজ বাসুকি তাঁদের কথায় নাগদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভীমকে দেখতে পেলেন। ভীমকে দেখেই তিনি চিনতে পারলেন। তাঁর আপন কন্যার পুত্র রাজা কুন্তিভোজ, আর কুন্তীভোজের কন্যা কুন্তীর পুত্র এই ভীম! তিনি ভীমকে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। উপস্থিত নাগেদের মধ্যে কেউ একজন বললেন, “হে মহারাজ, ভীম আপনার দৌহিত্রের দৌহিত্র, পরম আদরের ধন। এঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে অমৃত পান করার অনুমতি দিন। যে কুণ্ড রক্ষার জন্যে সহস্র নাগসৈন্য সর্বদা প্রহরায় থাকে, সেই কুণ্ড থেকে পেট ভরে অমৃত পান করলে ভীম সমস্ত বিষের প্রভাব থেকে মুক্ত হবেন; ওঁর শরীরের সমস্ত ক্ষতও নিরাময় হবে।”
নাগরাজ খুশি হয়েই অনুমতি দিলেন। তখন ভীমকে নিয়ে নাগেরা কুণ্ডের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে সকল নাগের আশীর্বাদ নিয়ে, পূর্বমুখে আসন গ্রহণ করে ভীম অমৃত পান শুরু করলেন। এক এক নিঃশ্বাসে এক এক কুণ্ড অমৃত নিঃশেষ করতে করতে ভীম আটটা কুণ্ড শেষ করে ক্ষান্ত হলেন। অমৃত পানের পর নাগগণ তাঁকে দিব্য শয্যার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই শয্যায় ভীম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন।
এদিকে যুধিষ্ঠির বাড়ি ফেরার সময়ও ভীমকে দেখতে না পেয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। বাগান, নদীর তীর, মাঠঘাট - কোথাও ভীমকে দেখতে পেলেন না। দুর্যোধনদের জিজ্ঞাসা করেও ভীমের কোনও সংবাদ পেলেন না। শেষে ভাবলেন, ভীম হয়তো আমাদের আগেই বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেছে। তখন আগের মতোই কেউ হাতির পিঠে, কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ বা রথে চড়ে হস্তিনানগরে ফিরে এলেন।
ভীম ফিরে না আসায় দুর্যোধন প্রসন্ন মনে তাঁর প্রাসাদে ঢুকলেন। আর যুধিষ্ঠির ভীমের চিন্তায় বিষণ্ণ মনে ঘরে ঢুকেই মাতা কুন্তীকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলেন, “ভীম কোথায় গেল, মা? আমরা সব জায়গায় খুঁজেও ভীমকে পেলাম না বলে ভাবলাম, ও হয়তো আমাদের আগেই চলে এসেছে। সে কি তবে আসেনি? আমার খুব অস্থির লাগছে, মা। নাকি সে এসেছিল, তুমি তাকে কোথাও পাঠিয়েছ?”
মাতা কুন্তী যুধিষ্ঠিরের কথায় ব্যাকুল হয়ে বললেন, “হায় হায়, ভীমের কী হল, রে! ভীম তো বাড়ি আসেনি, বাবা। তুই আরেকবার তোর ভাইদের সঙ্গে নিয়ে ভীমকে শিগগির খুঁজে আয়।”
তারপর দেওর বিদুরের কাছে গিয়ে বললেন, “হে বিদুর, ওরা পাঁচভাই মিলে গঙ্গার তীরে বাগানে বেড়াতে গিয়েছিল। চারজন ফিরে এল, ফিরল না শুধু ভীম। সে কোথায় গিয়েছে, সে খোঁজ ওরা পায়নি। দুর্যোধন ভীমকে দু’চোখে দেখতে পারে না। দুর্যোধন ভীষণ নীচ, দুর্বুদ্ধির রাজা, নির্লজ্জ আর রাজ্য-ধনসম্পদ লোভী। সে আমার ভীমের কোনও ক্ষতি করল না তো? ভীমের জন্যে আমার মন আকুল হয়ে উঠেছে, বিদুর!”
কুন্তীর এই কথায় বিদুর চমকে উঠে বললেন, “চুপ চুপ, আপনার এবং আপনার ছেলেদের মঙ্গল চান তো ওসব কথা আর মুখেও আনবেন না। এসব কথা দুর্যোধনের কানে গেলে আপনাদের ও ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? ভীমের জন্যে আপনি চিন্তা করবেন না। ভীমের কিচ্ছু হবে না, ও খুব শিগগির ফিরে আসবে। মহামুনি বেদব্যাস বলেছেন, আপনার পুত্রেরা সকলেই দীর্ঘায়ু হবে। তাঁর কথা কখনও মিথ্যে হবে না, আপনি দেখে নেবেন। আপনি মোটেও চিন্তা করবেন না, দেবী।”
বিদুর সান্ত্বনা দিলেন ঠিকই, কিন্তু মায়ের মন কি চিন্তা না করে পারে? কুন্তী চার পুত্রকে নিয়ে বিষণ্ণ মনে ঘরে ফিরে এলেন।
ওদিকে মধ্যম পাণ্ডব ভীমের ঘুম ভাঙল আটদিন পর। ঘুম ভেঙে শয্যায় উঠে বসতেই নাগগণ তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে মহাবীর, আপনি যে বলদায়ী অমৃত পান করেছেন তাতে আপনি সহস্র হাতির মতো শক্তিশালী হবেন এবং যুদ্ধে আপনাকে কেউ পরাস্ত করতে পারবে না। এখন এই দিব্য জলে স্নান করে আপনি ঘরে ফিরে যান। আপনার মা ও ভাইয়েরা আপনার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে রয়েছেন।”
ভীম তাড়াতাড়ি স্নান সেরে সাদা কাপড় পরলেন, গলায় পরলেন শুভ্র ফুলের মালা। তারপর বিষনাশক কিছু বিশেষ ওষুধ খেয়ে নাগদের দেওয়া পরমান্ন ভোজন করলেন। বয়স্ক নাগেরা তাঁকে আশীর্বাদ করলেন, ছোটোরা পুজো করল। তারপর নাগদের সকলকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভীম বাড়ি ফেরার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নাগেরা তাঁকে জল থেকে তুলে গঙ্গাতীরের সেই উপবনের কাছে পৌঁছে দিয়ে নাগলোকে ফিরে গেলেন।
সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব গতিতে ভীম বাড়িতে পৌঁছলেন। বাড়িতে ঢুকেই মা ও দাদা যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম করলেন। ছোটোভাইদের বুকে জড়িয়ে আদর করলেন। মাতা কুন্তীর চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। তিনি পুত্র ভীমকে আলিঙ্গন করে পরম স্বস্তিতে বললেন, “দৈব আমাদের প্রতি সদয়, তাই তোকে আবার ফিরে পেলাম, বাবা।”
এরপর ভীম তাঁদের সকলের কাছে দুর্যোধনের কীর্তি এবং পাতালে নাগরাজের কৃপার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। ভাইয়ের মুখে সব কথা শুনে বিচক্ষণ যুধিষ্ঠির বললেন, “ভাই, আমাদের কাছে যে কথা বললে, বাইরের লোকের কাছে কখনও বলো না। এরপর থেকে আমরা সকলেই সতর্ক থাকব এবং একে অপরকে রক্ষা করব।”
ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের এই কথায় পাঁচ ভাই এরপর থেকে একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। দুর্যোধন, কর্ণ বা শকুনিদের কেউ নানা উপায়ে তাঁদের হিংসা করার চেষ্টা করলেও তাঁরা নির্বিকার থাকতেন।

রাজকুমারদের শিক্ষা-দীক্ষা

অনেকদিন আগে মহারাজ শান্তনু অনেক সৈন্য সামন্ত নিয়ে একবার মৃগয়া করতে বনে গিয়েছিলেন। তাঁর এক সৈনিক দৈবাৎ এক শরবনের মধ্যে সদ্যোজাত তুই যমজ ভাইবোনকে দেখতে পায়। সেই সৈনিক মহারাজা শান্তনুর কাছে এই সংবাদ দেওয়া মাত্র মহারাজ শান্তনু নিজে গিয়ে সেই যমজশিশুকে উদ্ধার করে তাদের নিজের সন্তানের মতোই প্রতিপালনের মনস্থ করলেন। মহারাজ শান্তনুর কৃপায় তাদের জীবন রক্ষা হল বলে ছেলেটির নাম রাখা হল কৃপ এবং মেয়েটির নাম কৃপী।
এদিকে ওই যমজ শিশুর আসল পিতা ছিলেন মহাত্মা শরদ্বান। তিনি কঠোর তপস্যা করে ধনুর্বেদ পাঠ ও অভ্যাস করে অসামান্য ধনুর্ধর হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একদিন তপোবলে তাঁর দুই সন্তানের বেড়ে ওঠার কথা জানতে পারলেন। জানতে পেরে তিনি রাজভবনে এসে পুত্র কৃপ ও কন্যা কৃপীকে নিজের পরিচয় দিলেন এবং পুত্রকে চার ধনুর্বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র সম্পূর্ণ পাঠ করিয়ে নিজের আশ্রমে ফিরে গেলেন। এইভাবে পিতার আশীর্বাদে কৃপ খুব অল্পদিনের মধ্যে ধনুর্বেদে অসাধারণ পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। এই পণ্ডিত কৃপের কাছেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা, পাণ্ডব, যাদব, বৃষ্ণি, এমনকি নানা দেশবিদেশের নৃপতিরাও ধনুর্বেদের পাঠ নিতে আসতেন।
রাজকুমারদের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে পিতামহ ভীষ্ম তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। আচার্য কৃপ ছাড়াও তিনি আরেকজন বুদ্ধিমান, সর্বশাস্ত্রজ্ঞ, দেবতার মতো সত্ত্বগুণের অধিকারী এক অধ্যাপকের খোঁজ করছিলেন যাঁর হাতে তিনি নাতিদের শিক্ষার ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারবেন। একজনের নাম তাঁর মনে আসছে, তিনি দ্রোণ। কিন্তু এখন তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন, সে সংবাদ তাঁর কাছে নেই। তাঁর থেকে ভালো আচার্য এই ভূ-ভারতে আর কেউ হতে পারে না। তাঁর নাতিরা সেই আচার্যের কাছে শিক্ষা পেলে আর কোনও চিন্তা থাকে না। পিতামহ ভীষ্ম উত্তম এক আচার্যের সন্ধান করছেন ঠিকই, কিন্তু মনে মনে তিনি দ্রোণকেই খুঁজছেন।

রাজকুমারেরা একদিন নগরের বাইরে গিয়ে লোহার একটি গোলক নিয়ে খেলা করছিলেন। হঠাৎ সেই গোলকটি গড়িয়ে গিয়ে পড়ল জলহীন গভীর একটা কুয়োর ভেতরে। রাজকুমারেরা অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু কুয়ো থেকে সেই গোলক কিছুতেই তুলতে পারলেন না। হতাশ হয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলেন বড়োদের মধ্যে কাকে বললে বেশি বকাবকি করবেন না, কিন্তু গোলকটি তুলে দেবেন। এমন সময় সেই পথেই দ্রোণ যাচ্ছিলেন। তাঁর শীর্ণ শরীর, গায়ের রং শ্যাম, মাথার চুল সাদা। তিনি অগ্নিহোত্র ব্রাহ্মণ, তাঁর সঙ্গে ছিল যজ্ঞের অনল। আচার্য কৃপের ভবনে রাজকুমারেরা তাঁকে দেখেছেন, কিন্তু তাঁর পরিচয় তাঁরা জানতেন না। কিন্তু এখন অন্য কোনও উপায় না দেখে রাজকুমারেরা তাঁকেই ঘিরে ধরলেন। লোহার গোলকের কথা বলে অনুরোধ করলেন কুয়ো থেকে গোলকটি তুলে দেওয়ার জন্যে। ব্রাহ্মণ একটু হেসে বললেন, “তোমরা দেখছি রাজার কুমার, সকলেই ক্ষত্রিয়। ছিঃ ছিঃ, এই তোমাদের ক্ষাত্রধর্ম! এই তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা? বিখ্যাত ভরতবংশের পুত্র হয়েও এই সামান্য কাজটাও করতে পারলে না? ছ্যা ছ্যা, ভরতবংশের নাম ডোবাবে তোমরা! আর আমি দেখো অগ্নিহোত্র ব্রাহ্মণ হয়েও ওই কুয়ো থেকে তোমাদের গোলক এবং আমার এই আংটি সামান্য ঈষীকার (নল-তৃণ) সাহায্যে তুলে দেব। কিন্তু কথা দাও, তার পরিবর্তে তোমরা আমার অন্নসংস্থানের আয়োজন করবে।”
এই বলে সেই ব্রাহ্মণ নিজের আঙুলের আংটি খুলে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিলেন। এই আশ্চর্য ব্যবহার ও কথা শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, “হে বিপ্রবর, যদি আপনি ওই গোলক কুয়ো থেকে তুলে দিতে পারেন তাহলে আমরা আচার্য্য কৃপের অনুমতি নিয়ে চিরদিনের জন্যে আপনার অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেব।”
দ্রোণ তাঁর কথা শুনে হাসতে হাসতে পাশের জমি থেকে এক মুঠি ঈষীকা তুলে কুয়োর সামনে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বললেন, “এই দেখো, একটা ঈষীকা দিয়ে প্রথমে গোলকটিকে বিদ্ধ করব। তারপর দ্বিতীয় ঈষিকা দিয়ে বিদ্ধ করব প্রথমটিকে। এইভাবে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, পর পর বিদ্ধ করতে করতে যে ঈষীকা হাতের কাছে চলে আসবে সেটিকে ধরে তুলে আনব লোহার গোলক।”
কথা বলতে বলতেই দ্রোণ অনায়াসে গোলকটি তুলে আনলেন। রাজকুমারেরা ব্রাহ্মণের এই অদ্ভুত দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হলেন। তাঁরা বললেন, “এবার আপনি আপনার আংটিটি তুলে আনুন, বিপ্রবর।”
এইবার দ্রোণ হাতে তির-ধনুক তুলে নিয়ে কুয়োর মধ্যে তির ছুড়ে আংটিটিকে বিদ্ধ করলেন। তারপর উপরে তুলে এনে আংটি পরে নিলেন নিজের আঙুলে। রাজকুমারেরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে ব্রাহ্মণকে প্রণাম করে বললেন, “আপনি কে আমরা জানি না। কিন্তু আপনি যে দক্ষতা দেখালেন, তাতে আপনি যে অসাধারণ সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। অতএব, হে দ্বিজবর, আপনার পরিচয় এবং আপনি কী করেন সে কথা বলে আমাদের ধন্য করুন।”
দ্রোণ বালকদের কথা শুনে প্রসন্ন হলেন। বললেন, “হে বালকগণ, তোমাদের পিতামহ মহামতি ভীষ্মের কাছে আমার রূপ ও গুণের কথা ভালো করে বর্ণনা করো। আর এও বলো, যে সেই মহাতেজা ব্রাহ্মণ এখন এই হস্তিনাপুরেই আছেন, আচার্য কৃপের ভবনে।”
চলবে

[কৃতজ্ঞতাঃ মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, প্রকাশকঃ বসুমতী সাহিত্য মন্দির]

No comments:

Post a Comment