গল্পঃ দুই গল্প - সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

দুই গল্প

সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী


সমব্যথী

দোকানের নাম ‘দি রয়াল কেনেল’। দরজার পাশে একটি সাইন বোর্ড – তাতে লেখা, ‘বিক্রয়যোগ্য কুকুরছানা পাওয়া যাইবে’।
দোকানের বেশিরভাগ খদ্দের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা। একদিন সকালে দোকান খোলার কিছুক্ষণ পরে একটি বছর দশেকের ছেলে দোকানে প্রবেশ করল। পরনে ফুল প্যান্ট, ফুল শার্ট – রোগাটে গড়ন, মুখে শান্তশিষ্ট একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাব। খানিকটা এদিক ওদিক দেখে দোকানিকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, এই কুকুরের ছানাগুলোর কীরকম দাম?”
দোকানি বলল, “একেকটা কুকুরছানার একেকরকম দাম। তবে সবই ৩০ ডলার থেকে ৫০ ডলারের মধ্যে।”
ছেলেটি তার পকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা বার করে গুনে দেখল, তার কাছে সবসমেত ২ ডলার ৩৭ সেন্ট আছে। সে তখন দোকানিকে বলল, “আমার কাছে সব মিলিয়ে ২ ডলার ৩৭ সেন্ট আছে। তা আমি কি কুকুরছানাগুলোকে একবার দেখতে পারি?”
ছেলেটির চেহারা, কথাবার্তা, হাবভাব দোকানির নজর কেড়েছিল। সে একটু হেসে একটা ঘন্টা বাজাল। ভেতর থেকে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। ছেলেটি দেখল, ঐ ভদ্রমহিলার পেছন পেছন গোটা ছয়েক ছোট্ট ছোট্ট কুকুরছানা সাদা তুলোর বলের মতন ভু ভু করতে করতে দৌড়ে দৌড়ে আসছে। কেবল তাদের মধ্যে একটি কুকুরছানা সবার পেছনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসছে।
ছেলেটি সাথে সাথে কুকুরছানাটির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞাসা করল, “ওই সবার পেছনের কুকুরছানাটার কী হয়েছে? ও ওরকম খোঁড়াচ্ছে কেন?”
দোকানি বলল, “ওর কোমর আর পেছনের একটা পায়ের জোড়ের একটা হাড় ঠিক নেই। তাই ও ওরকম খুঁড়িয়ে হাঁটছে।”
ছেলেটি বলল, “তা ওকে ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা করালে তো ভালো হয়ে যেতে পারে।”
দোকানি উত্তর দিল, “আমরা ওকে একজন নামকরা পশু-চিকিৎসককে দেখিয়েছি। ডাক্তারের মতে এটা ওর জন্মগত, ও কখনও সোজা হয়ে হাটতে পারবে না। বেচারিকে সারাজীবন খুঁড়িয়েই হাঁটতে হবে।”
ছেলেটি তখন উত্তেজিত হয়ে দোকানিকে বলল, “আমি ঐ কুকুরছানাটিকেই কিনতে চাই। আমাকে কত দাম দিতে হবে?”
দোকানি হেসে বলল, “দেখো, তুমি যদি সত্যিই চাও, আমি ওকে তোমাকে এমনিই দিয়ে দেব। তোমাকে ওর জন্য কোনও দাম দিতে হবে না। তবে তুমি কেন ওকে নিতে চাইছ?”
ছেলেটি দোকানির এই কথা শুনে খুব রেগে গিয়ে বলল, “না, আমি ওকে এমনি কেন নেব? ও খোঁড়া বলে ওর বুঝি কোনও দাম নেই? আমি ওর উপযুক্ত দাম দিয়েই ওকে কিনব। আমার কাছে এখন ২ ডলার ৩৭ সেন্ট আছে। এই টাকাটা রাখুন। আমি প্রতি মাসে ৫০ সেন্ট করে দিয়ে ওর দাম শোধ করে দেব।”
ছেলেটির কথা শুনে দোকানি তাজ্জব বনে গেল। আস্তে আস্তে বলল, “দেখো, আমি তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তুমি ওকে নিয়ে কী করবে? ভেবে দেখো, তুমি ওর সাথে খেলতে পারবে না। ও তোমার সাথে ছুটতেও পারবে না।”
ছেলেটি তখন নিচু হয়ে ওর ডান পায়ের দিকের প্যান্টটা গুটিয়ে হাঁটু অবধি তুলল। দোকানি তার কাউন্টার থেকে ঝুঁকে অবাক হয়ে দেখল, ছেলেটির ওই পা-টিতে একটি ধাতু ও চামড়ার ‘লেগ-ব্রেস’ লাগানো আছে।
ছেলেটি বলল, “আমিও তো একদম ছুটতে পারি না। ও আর আমি ভালোই খেলতে পারব।”



ঈশ্বরী

ডিসেম্বর মাস। নিউ ইয়র্ক শহরে সেবার খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। একদিন সকালে ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ দিয়ে একটি ছোট্ট ছেলে, বছর ছয়েক হয়তো হবে, হেঁটে হেঁটে চলেছে। হাফ প্যান্ট পরা, গায়ে একটা ছেঁড়া সোয়েটার, খালি ধুলোকাদা মাখা পা। শীতে কাঁপছে। যেতে যেতে একটা বড়ো জুতোর দোকানের সামনে ছেলেটি দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রায় মাটি থেকে সিলিং পর্য্যন্ত কাচ। তার পেছনে সার দিয়ে কতরকমের জুতো সাজানো রয়েছে – বড়োদের, বাচ্চাদের। অথচ তার নিজের একটাও কোনওরকম জুতো-মোজা নেই। সে মনে মনে ভাবল, ‘আচ্ছা ভগবানের কাছে চাইলে একজোড়া জুতো কি পাওয়া যাবে না?’
ছেলেটি তখন দোকানের গ্লাস-কেসের সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে একমনে বলতে লাগল, “ভগবান, দেখছ তো কীরকম ঠাণ্ডা পড়েছে। আর আমার খালি পা, কেননা আমার একটাও জুতো-মোজা কিচ্ছু নেই। কেনার মতন পয়সাও আমার নেই। আমার হাঁটতে কত কষ্ট হচ্ছে। তোমার তো অনেক পয়সা। তুমি কি আমাকে কোনও জুতো কিনে দিতে পার না?”
এই সময়ে জুতোর দোকান থেকে মধ্যবয়সী এক সুদর্শনা অভিজাত ভদ্রমহিলা হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন। কমলা রঙের একটি লম্বা সিল্কের স্কার্ট আর সাদা সিল্কের ব্লাউস পরিহিতা। সুবিন্যস্ত সোনালি চুল। মুখের মধ্যে শান্ত, সৌম্য মাতৃভাব। বেরিয়েই দোকানের সামনে হাতজোড় করে থাকা ছোটো ছেলেটিকে চোখে পড়ায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে ছেলেটির কাছে এসে তার মাথায় আলতো করে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে, বাছা? এখানে কী করছ?”
ছেলেটি অবাক হয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার তো খালি পা, আর এই শীতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই আমি ভগবনাকে বলছিলাম আমায় জুতো কিনে দিতে।”
ভদ্রমহিলা চুপ করে ছেলেটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর, “এসো আমার সাথে” বলে হাত ধরে ছেলেটিকে নিয়ে সেই জুতোর দোকানে ঢুকলেন।
দোকানের কাউন্টারে যারা ছিল সবাই অবাক হয়ে দেখল যে ভদ্রমহিলা খালি পা, অত্যন্ত সাধারণ জামাকাপড় পরা একটি ছোটো ছেলেকে নিয়ে দোকানে ঢুকছেন। ভদ্রমহিলা দোকানের ম্যানেজারকে ডেকে বললেন, “আমাকে এক বালতি গরম জল, সাবান আর একটা তোয়ালে দিন তো।”
পুরনো, সম্ভ্রান্ত, চেনা খদ্দের। ম্যানেজার তাড়াতাড়ি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে দোকানের পেছনদিকের বাথরুমে নিয়ে গেল। সেখানে গরম জল, সাবান, বালতি, মগ, তোয়ালে সবকিছুরই ব্যবস্থা আছে। ভদ্রমহিলা ছেলেটির ধুলোমাখা পা-দুটি যত্ন করে পরিষ্কার করে ধুইয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দোকানের কাউন্টারে নিয়ে এলেন। এবারে ম্যানেজারকে বললেন, “আমাকে এই ছেলেটির মাপে একজোড়া গরম ফুল মোজা আর ভালো দেখে নরম জুতো দিন তো।”
ম্যানেজার মোজা আর জুতো নিয়ে এল। ভদ্রমহিলা ছেলেটিকে দোকানে রাখা খদ্দেরদের জন্য যে নিচু সোফা থাকে তার একটিতে বসিয়ে নিজের হাতে সযত্নে মোজা আর জুতো পরিয়ে দিলেন। এবারে ম্যানেজারে কাছে বিল চাইলেন। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে কার্ড বার করে বিল মিটিয়ে দিয়ে কাউন্টারে রাখা তাঁর প্যাকেটটি নিয়ে দোকানের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
ভদ্রমহিলা হঠাৎ তাঁর স্কার্টে একটা টান অনুভব করলেন। মনে হল কেউ যেন পেছন থেকে স্কার্ট ধরে টানছে। ঘুরে দেখলেন, ছোট্ট ছেলেটি ওঁর স্কার্টের একপ্রান্ত ধরে আছে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকাতে ছেলেটি তার সরল নিষ্পাপ বড়ো বড়ো বিস্ময়ভরা চোখে ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি ভগবানের বৌ?”
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ মৌসুমী রায়

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অনেক গল্প পড়েছিলাম। হয়তো অনেকে পড়ে থাকবেন। গল্প নিজের ভালো লাগলে অন্যকেও বলতে ইচ্ছে হয়। তাই এই প্রচেষ্টা। ওয়েবসাইটে গল্পগুলোর লেখক বা উৎস অজ্ঞাত বলা আছে। এগুলো প্রচলিত গল্প। আগামী দিনে আরও অনেক গল্প বলার ইচ্ছে রইল।

- সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

No comments:

Post a Comment