গল্পঃ টান - সুমন মিশ্র



নিম্নচাপের ফলে গত দু’দিন ধরে ক্রমাগত বৃষ্টি হয়ে চলেছে। রাস্তাঘাটে প্যাচপ্যাচে কাদা, লোকজনও কম। আজ সকাল থেকে বৃষ্টি না থাকলেও আকাশের মুখ ভার। দিনটা মর্নিং ওয়াকের জন্য একেবারেই আদর্শ নয়। তবুও খানিক জোর করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন পরিতোষবাবু। পরপর দু’দিন বৃষ্টির কারণে বাড়ি থেকে বেরোনো হয়নি। মনটা ছটফট করছিল। অগত্যা একটা ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়লেন। যেটুকু হাঁটা যায় আর কী।
পরিতোষবাবু রিটায়ার্ড প্রোফেসর। বাড়িতে তিনি বাদে আছে শুধু এক সর্বক্ষণের ভৃত্য। স্ত্রী-বিয়োগ ঘটেছে বছর চারেক হল। ছেলে হায়দ্রাবাদে একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সেখানেই তার সুখের সংসার। তারা অনেকবার বলেছে কলকাতা ছেড়ে তাদের ওখানে পাকাপাকি চলে যেতে। কিন্তু বললেই তো আর সব ছেড়ে যাওয়া যায় না। এখানে এত বছর ছিলেন, কেমন একটা মায়া জন্মে গেছে। এসব ছেড়ে এই বুড়ো বয়েসে একদম নতুন জায়গায় কি মানিয়ে নেওয়া যায়!
হাঁটতে হাঁটতেই এলোমেলো চিন্তা মনে ভিড় করছে। মেঘলা দিনের একটা নিজস্ব মন খারাপ করা সুর আছে। সবসময় যেন এক বিষণ্ণতা মনকে ছুঁয়ে যেতে চায়। সেই বিষণ্ণতা আর তাঁর নিজের মনের অবস্থার এক আশ্চর্য সমাপতন ঘটেছে আজ। গত তিন-চারদিন তাঁর বাড়ি গমগম করছিল ছেলে, ছেলের বউ আর নাতনির উপস্থিতিতে। কালই তারা চলে গেছে। ব্যস্ত জীবন থেকে দুটো দিন দিয়েছিল বুড়োটাকে। কর্তব্য, নাকি টান? কে জানে! নাতনিটাকে ছেড়ে থাকতেই বেশি খারাপ লাগবে। কী মিষ্টি মেয়েটা, সারাক্ষণ ঠোঁটের ডগায় আধো আধো বুলি, মনের মধ্যে শিশুসুলভ প্রশ্নের ঝাঁপি। ইশ, বৃষ্টির জন্য বেচারিকে কোলকাতা ঘুরিয়ে দেখানোই হল না। পরেরবার যদি একটু বেশি সময় নিয়ে ওরা আসে তাহলে... ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক ঠেলে। তিনি নিজেও জানেন না পরেরবারটা ঠিক কত পরে আসবে। দুই বছর ধরে ক্রমাগত আসতে বলার পর ওরা দু’দিনের জন্য এসেছিল। কাজের চাপে নাকি বড়ো একটা ছুটি পায় না। পরিতোষবাবুর ঠোঁটের কোনায় বিষাদের ছোঁয়া। মানুষ ততটাই ব্যস্ত হয় যতটা সে হতে চায়।
মর্নিং ওয়াকের পরিচিত মুখগুলোর আজ দেখা নেই। পার্কে সর্বসাকুল্যে চার-পাঁচজন। অন্যান্য দিন এইসময় পার্কটা গমগম করে। প্রায় সাত-আটটা গ্রুপ এখানে জড়ো হয়। মর্নিং ওয়াক চলে, আড্ডা চলে। তাঁর নিজের গ্রুপেরও কেউই আসেনি।  কিছুক্ষণ একা হাঁটাহাটি করার পর আবার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন পরিতোষবাবু।

“পাঁচু, ওই পাঁচু। একবার এদিকে আয় তো।” পরিতোষবাবু হাঁক দিলেন তাঁর ভৃত্যকে। পাঁচুর আসল নাম তিনি ভুলে গেছেন। তার গ্রাম কোথায় ছিল কে জানে। গত দশ বছর ধরে পাঁচু এখানেই আছে। পরিতোষবাবু ছাড়া তার নাকি আর কেউ নেই। অবশ্য খাতায় কলমে হিসাব যাই হোক, পরিতোষবাবুও জানেন পাঁচু ছাড়া তাঁর আপন আর কেউ নেই। যারা আছে তারা না থাকারই সমান।
“হ্যাঁ, বাবু।” পাঁচু হন্তদন্ত হয়ে এসেছে।
“একটা ডিশে একটু দুধ নিয়ে আয় তো।”
“ও-বেড়ালটাকে দেবেন? কিন্তু দুধ তো শেষ হয়ে গেছে।” পাঁচু বোকা বোকা হেসে বলল।
পরিতোষবাবু ভুরুতে ভাঁজ এঁকে বললেন, “শেষ! ফ্রিজে ভালো করে দেখ, এই তো দিদিভাইয়ের জন্য আনা হয়েছিল।”
“সে আর ক’দিন চলবে? যেটুকু ছিল আজ সকালে তো চা বানাতেই লেগে গেল।” পাঁচু মাথা  চুলকে বলল।
“হুম। যা, দোকান থেকে একটু নিয়ে আয়। একেবারেই ছোটো বাচ্চা, দুধ না খাওয়ালে বাঁচবে না।” পরিতোষবাবু অন্যমনস্ক স্বরে বললেন।
তিনি চেয়ারে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে খাটের নিচে অন্ধকারে। সেই অন্ধকার থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে একটা বেড়ালের বাচ্চা। বাঁ কানটা মাঝে মাঝে একটু নাড়াচ্ছে। ভীতু চোখে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে আবার গুটিসুটি মেরে অন্ধকারে ঢুকে পড়ছে। বেড়ালটার কাণ্ড দেখে পরিতোষবাবুর ঠোঁটের কোনায় হাসি খেলে গেল।
পাঁচু ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। পরিতোষবাবু পিছু ডাকলেন, “হ্যাঁ রে, তুলতুলি নামটা কেমন রে?”
“খুব ভালো। বেড়ালটার নাম দিলেন বুঝি? তুলি দিদিভাইয়ের নামের সাথে মিলিয়ে রাখলেন।” পাঁচু হাসছে।
পরিতোষবাবু পাঁচুর দিকে শূন্যদৃষ্টিতে একবার চেয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি দোকানে যা। নামটা কেমন শুধু জানতে চেয়েছিলাম। এত বাজে বকিস কেন?”
বেড়ালের ছানাটা আজই এই বাড়ির অতিথি হয়ে এসেছে। একটু অদ্ভুতভাবেই। মর্নিং ওয়াক সেরে ফেরার পথে আবার একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। মতির চায়ের দোকানে আটকে গেছিলেন পরিতোষবাবু। বৃষ্টির জন্যেই দোকানে তেমন কাস্টমার ছিল না। সকালে চা খেয়ে বেরোলেও এমন দিনে যতবার খুশি চা চলতে পারে। তাই এক কাপ চা নিয়ে দোকানের বেঞ্চে বসেছিলেন। বাইরে ঝরঝর ঝরছে বারিধারা। এমন সময় বেড়ালের ছানাটা কোত্থেকে জানি ছুট্টে এসে পরিতোষবাবুর পায়ের পিছনে লুকিয়ে পড়ল। ভীত চোখে তার দিকে তাকিয়ে খালি ডাকল, “মিঁউ।” একদম কাকভেজা হয়ে গেছে বেচারা।
সবে পরিতোষবাবু পা সরিয়ে ভালো করে দেখতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি কিছু বোঝার আগেই কোত্থেকে একটা কুকুর এসে হাজির হল। ও, তাহলে তাড়া খেয়ে এখানে লুকোনো হয়েছে! কুকুরটা ইতিমধ্যে ঘেউ ঘেউ করে পাড়া মাথায় তুলল। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার, বেড়ালছানাটা যেন তাঁর আড়ালে থেকে সাহস ফিরে পেয়েছে। সেও গোঁ গোঁ করছে। এই কুকুরটাকে দূর করার জন্য হাতের লাঠিটা দিয়ে তাড়া দিলেন পরিতোষবাবু। একবারে কাজ হল না, দুই তিনবার তাড়া দিতেই আপদটা লেজ উঠিয়ে পালাল।
ভয়ে জড়সড় বেড়ালছানাটাকে দেখে ভারি মায়া হল পরিতোষবাবুর। এখানে ফেলে গেলে হয়তো আবার কোনও কুকুরের পাল্লায় পরবে। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে এলেন বাড়িতে। অদ্ভুত ব্যাপার, একটুও ছটফট করল না সে। যদিও বাড়িতে এসে কোল থেকে নামাতেই একছুটে সেই যে খাটের নিচে ঢুকেছে, আর বেরোচ্ছেই না বাইরে।
উফ, পাঁচুর এত দেরি হচ্ছে কেন? বাচ্চাটা না খেয়ে কতক্ষণ থাকবে! হাতের কাছে কিছু না পেয়ে রান্নাঘর থেকে একটু শুকনো মুড়ি এনে ছড়িয়ে দিলেন মেঝেতে। যদি খায় একটু। তুলতুলি মাথাটা একবার বের করল। ছোট্ট নাকখানা মুড়ির কাছে নিয়ে একটু শুঁকল, তারপর আবার অন্ধকারে ঢুকে পড়ল।

মাস তিনেক কেটে গেছে। তুলতুলি একটু বড়ো হয়েছে। ভালো খাওয়াদাওয়া করে নাদুসনুদুসও হয়েছে। সময়মতো দুধটা, মাছটা পেয়ে সে দারুণ সুখী। একটু এদিক ওদিক হলেই মিঁউ মিঁউ করে তার অসুবিধার কথা জানান দেয়।
তুলতুলি ঘরে থাকতেই পছন্দ করে। বাড়ির বাইরে বেরোয় না বেশি। আদপে সে একটা ভীতুর ডিম। দরজা-জানালা খোলা থাকলে বাইরে বেরোত শুরুর দিকে, কিন্তু একদিন একটা হুলো বেড়ালের এমন তাড়া খেল যে টো টো করে ঘুরে বেড়ানোর শখ তার মিটে গেল। ওই জানালার ফাঁক গলে একটু বেরোত, তারপর খানিক মিঁউ মিঁউ করে ঘরে ঢুকে যেত। যদিও এখন মোটা হয়ে গিয়ে জানালার ফাঁক গলে আর বেরোতে পারে না।
এমনিতে সে খুব দুরন্ত। সারাক্ষণ খেলে বেড়াচ্ছে। পরিতোষবাবুর পায়ে পায়ে সারাক্ষণ ঘুরছে। লেজ নাড়ছে, লাফাচ্ছে, পায়ে গা ঘষছে, আর সুযোগ পেলেই কোলে উঠে বসবে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে মিঁউ মিঁউ করবে।
পরিতোষবাবুকে অনেকক্ষণ না দেখতে পেলে তুলতুলি রেগেও যায়। হয়তো কোনও কাজে একটু বেরোতে হল, ঘণ্টা খানেক পর ফিরে এসে যেই তুলতুলি বলে ডাকবেন, অমনি সে হাজির হলেও মিঁউ মিঁউ না করে গোঁ গোঁ করে অভিমান জানায়, কোলে তুললে ছটফট করে নেমে যায়। মোটের উপর পরিতোষবাবু যেমন তুলতুলিকে ভালোবাসেন, তুলতুলিও হয়তো তেমনই তাঁকে ভালোবাসে।
পরিতোষবাবুর জীবনে চাহিদা কম। ছেলে, ছেলের বৌ তাকে মাথায় তুলে রাখবে তা তিনি কখনই আশা করেন না। তারা ব্যস্ত মানুষ, রোজ একবার ফোনে কথা হয় তাই অনেক। শুধু মন খারাপ লাগে তুলির জন্য, বারবার তাকে দেখতে ইচ্ছা করে।
টাকাপয়সার অভাব তাঁর নেই। পেনশনের টাকায় তাঁর দিব্যি চলে যায়। কারও কাছে হাত পাতার প্রয়োজন তাঁর এই জন্মে পড়বে বলে মনে হয় না। তাঁর একটাই ইচ্ছে, এই বাড়িতেই বাকি ক’টা দিন কাটিয়ে দেবেন। এটা তো শুধু বাড়ি নয়, একটা আস্ত স্মৃতির ভাণ্ড। তিনি আর তাঁর স্ত্রী এই বাড়িটা নিয়ে কতো স্বপ্ন দেখেছেন। অভাবের মধ্যেও তিল তিল করে টাকা জমিয়ে বাড়িটা করেছিলেন। ছেলের ছোটোবেলা, তার একটু একটু করে বেড়ে ওঠা। স্ত্রীর সাথে চল্লিশটা বছরের সংসার। স্ত্রীর চলে যাওয়া। উফ, স্মৃতি স্মৃতি আর স্মৃতি।
মানুষের জীবনে একটা সময় আসে যখন খালি স্মৃতিটুকু পড়ে থাকে, বাকি সবকিছুই বড়ো অতিরিক্ত মনে হয়। পরিতোষবাবু যেন সেই সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছিলেন। মাঝে তুলতুলির এসে যাওয়াটা সব হিসাব পালটে দিয়েছিল।
তিনি জানেন তুলতুলি কেবল তাঁর পোষ্য নয়, তাঁর আশ্রয়। এই বয়েসে এসে তাঁর একটা অবলম্বনের দরকার ছিল যার উপরে নিজের মায়া মমতা উজাড় করে দিতে পারেন। যে মমতা তুলির জন্য জমেছিল, অথচ একমাত্র নাতনিটাকে কাছে না পাওয়ায় বিলিয়ে উঠতে পারেননি, সেটাই যেন এই অবলা জীবটাকে পেয়ে উজাড় করে দিচ্ছেন। সাধে কী নামটা তুলতুলি রেখেছিলেন! যে ছোট্ট মেয়েটার তাঁর দাদানের পায়ে পায়ে ঘোরার কথা, কোলে বসে গল্প করার কথা ছিল, সে তো আর পরিতোষবাবুর কাছে এল না। না হয় তুলতুলিকেই খাইয়ে-দাইয়ে, আদর করে মনটা একটু হালকা করলেন।

রবিবারের সকাল। কাল রাত থেকে কিছু খাননি পরিতোষবাবু। পাঁচু অনেকবার জোর করা সত্ত্বেও খাননি। অবশ্য পাঁচুও কিছু খায়নি। পরিতোষবাবু একবার আলতো গলায় বলেছিলেন, “তুই কিছু খাচ্ছিস না কেন রে হতভাগা? তোর আবার কী হল?”
পাঁচু তাতে রেগে গেল। হয়তো দশ বছরে এই প্রথমবার। “সেই! আমার আবার কী হবে! আমি তো কাজের লোক। আমার কি কিছু হতে আছে? আপনি মনিব, বাড়ি আপনার, যখন যাকে পারবেন কাজ থেকে বের করে দেবেন, যখন যাকে খুশি পুষবেন, যখন যাকে খুশি ছুড়ে ফেলে দেবেন। তুলতুলিটা গেছে, আমিও যাব। আপনার আর কী।” বলতে বলতে চোখে জল এসে গেল তার।
পাঁচু আর কয়েকদিন হয়তো আছে এই বাড়িতে। তারপর সে কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না। পরিতোষবাবু আর কলকাতায় থাকতে পারবেন না। আসলে আগেরবার পরিতোষবাবুর ছেলে যখন এসেছিল তখনই সে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিল। ডিনারের সময় বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছিল যে এবার যেন পরিতোষবাবু তাদের ওখানে  চলে আসেন। কতদিন আর এই পুরনো বাড়ি আগলে থাকবেন। তারাও নতুন ফ্ল্যাট কিনবে কিনবে করছে, সেখানেই না হয় পরিতোষবাবু সবার সাথে থাকবেন।
পরিতোষবাবু অবশ্য তখন অতশত ভাবেননি। স্পষ্ট না করেছিলেন। তারাও আর বিশেষ জোর দেয়নি। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পরে নানানভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই প্রসঙ্গ। শেষে বিরক্ত হয়ে একদিন তিনি বলেই ফেললেন যে তাঁর পক্ষে কলকাতা ছাড়া সম্ভব নয়। হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন, কিন্তু পাকাপাকিভাবে ওখানে থাকা সম্ভব নয়। তখনই আসল কথাটা জানা গেল। পরিতোষবাবুর ছেলে চায় কলকাতার বাড়িটা বেচে দিয়ে যে টাকাটা পাওয়া যাবে সেটা দিয়ে নতুন ফ্ল্যাটটা কিনবে। দুয়েকজনের সাথে কথাও হয়েছে এ ব্যাপারে। যা টাকা পাওয়া যাবে তাতে নতুন ফ্ল্যাট কিনেও ব্যাঙ্কে মোটা অঙ্কের টাকা জমা পড়বে।
পরিতোষবাবুকে অন্ধকারে রেখে তলে তলে তারা এতটা এগিয়েছে জেনেই তিনি মনঃস্থির করেছিলেন, আর এ ব্যাপারে কোনও কথা বলবেন না। বাড়ি তিনি বেচতে দেবেন না কোনওভাবে। ফলত বাবা-ছেলের সম্পর্কে একটা টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল সেইদিন থেকেই। তারপর বেশ কয়েকবার ফোনে মতবিরোধ হয়। তিনদিন আগে ফোনে প্রচণ্ড তর্কাতর্কির পর দু’দিন কোনও ফোন আসেনি।
বয়সের সাথে মানুষের হয়তো পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা কমে যায়। পরিতোষবাবুরও হয়তো তাই হয়েছিল। দু’দিন অনেক চিন্তা করলেন তিনি। হাজার চিন্তাভাবনা। মানুষের মন, রক্তের টানকেই তো প্রাধান্য দেবে। এই ঝামেলা কীসের জন্য? এই বাড়ির জন্য, নিজের ইচ্ছেয় বাঁচার জন্য? আর কার বিরুদ্ধে? নিজের ছেলের, যার সুখটাই তিনি চিরকাল প্রাধান্য দিয়েছেন?
শেষে ঠিক করলেন, ছেলেকে জানিয়ে দেবেন তিনি হায়দ্রাবাদে চলে যেতে রাজি। শেষ হোক এই দড়ি টানাটানির। পাকাপাকি খবরটা দেওয়ার আগে কিছু কাজ তিনি সেরে নিলেন। পাঁচুকে ডেকে ব্যাপারটা জানালেন।
তুলতুলিরও একটা হিল্লে করতে হবে। সে যে পরিতোষবাবুকে ছাড়া থাকতেই পারে না। কীভাবে বাঁচবে বাইরের জগতে? একটা উপায় আছে। পাঁচুকে ডেকে বললেন, তুলতুলিকে একটা ব্যাগে পুরে মিত্তিরদের বাড়িতে ছেড়ে দিতে। মিত্তিরদের বাড়িতে ভর্তি বেড়াল, ওখানে তুলতুলিও ঠিক জায়গা করে নেবে। ঠিকমতো খাবার পাবে, যত্ন পাবে, নিজের দলে আরও খেলার সাথী পাবে।

কাল রাতেই পাঁচু ছেড়ে এসেছিল তুলতুলিকে। কিন্তু তারপর থেকেই কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে পরিতোষবাবুর। একটা মনখারাপ। ঠিক এই খারাপ লাগাটাই কি সেদিন হয়েছিল যেদিন তুলি তার বাবা-মায়ের সাথে ফিরে গেছিল হায়দ্রাবাদে? যখন বুঝেছিলেন তুলি দিদিভাই বলে ডাকলেই সেই ফুটফুটে মেয়েটা দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরবে না? এই অবস্থাটাও কি খুব একটা আলাদা? তুলতুলি তুলতুলি বলে চিৎকার করলেও কি সে ফিরে আসবে? ডাকবে সেই আদুরে গলায়?
খেতে পারেননি কাল, আজও ইচ্ছা নেই। এ কী দোটানা! কতরকমের টান যে সারাজীবন আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে চলে!

পরিতোষবাবু তখন বসার ঘরে চেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসছেন। “পাঁচু, ওই হতভাগা পাঁচু, গেলি কোথায়?”
পাঁচু হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। “ডাকছিলেন?”
“একটা ডিশে একটু দুধ নিয়ে আয় তো।”
“তুলতুলির জন্য?”
“নয়তো কার জন্যে? তোরা দুটো কি আমায় নিশ্চিন্তে থাকতে দিস?”
পাঁচু হাসছে, পরিতোষবাবুও হাসছেন।
তুলতুলি অনেকক্ষণ ধরে নিজের লেজটা ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। লেজ ধরতে গিয়ে নিজের চারপাশেই গোল গোল পাক খেয়ে যাচ্ছিল। তারপর একটা সময় ক্লান্ত হয়ে লাফিয়ে পরিতোষবাবুর কোলে উঠে বসল। পরিতোষবাবুও তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেই সে আরামে চোখ বুজেছে।
তুলতুলিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পরিতোষবাবু নিজেই গিয়েছিলেন মিত্তিরদের বাড়িতে, তুলতুলিকে খুঁজে আনতে। তার আগে একটা ফোন করেছিলেন তাঁর ছেলেকে। স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ-বাড়ি তিনি বিক্রি করবেন না। ওদিক থেকে আজ আর তেমন প্রত্যুত্তর পাননি। সব শুনে শুধু ফোনটা কেটে দিয়েছে। এরপর কী হবে তাও জানা নেই।
মিত্তির বাড়িতে গোটা পঞ্চাশেক বেড়াল। তার ভেতর তুলতুলিকে খোঁজা বেশ মুশকিল কাজ ছিল। তবে পরিতোষবাবুর কোনও অসুবিধা হয়নি। তিনি গিয়ে দাঁড়াতেই তুলতুলি তাঁকে খুঁজে নিল। ভিড়ের মধ্যে থেকে তুর তুর করে করে এসে মিঁউ মিঁউ করে তাঁর চারপাশে ঘুরতে লাগল। পরিতোষবাবুও তাকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, “ভয় নেই রে তুলতুলি। তোকে আর পাঁচুকে আমি আর দূরে সরিয়ে দেব না।”
তুলতুলিও সাড়া দিয়ে বলেছিল, মিঁউ মিঁউ মিঁউ।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

No comments:

Post a Comment