জীবনের গল্পঃ পিটুর কথা - সৌম্যকান্তি জানা



কয়েকদিন ধরে বাবা-মা আমার ভাই-বোন আর সর্বাণীর আচরণে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছে। ওরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে কী যেন আলোচনা করে। থেকে থেকে ওরা চিলেকোঠায় যায়। বাচ্চাগুলোর এই আচরণগত পরিবর্তনের কারণ বাবা বা মায়ের ঠিক বোধগম্য হচ্ছিল না। কতই বা বয়স ওদের? ভাইয়ের বয়স বারো, আর বোনের দশ। সর্বাণী আমাদের বাড়িতে থাকে। ভাইয়ের সমবয়সী হবে। ওর মা-বাবা নেই। আত্মীয়রা খুব গরিব। তাই ওর এক প্রতিবেশী আমাদের বাড়িতে রেখে গেছে। মায়ের কাজে টুকটাক সাহায্য করে। ভাই-বোনের সাথে খেলে। আর সন্ধ্যাবেলা মায়ের কাছে পড়ে। সে যাই হোক, বাবা গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে ওদের ওই সন্দেহজনক আচরণের কারণ উদ্ধার করে ফেলল কয়েকদিনের মধ্যেই।
আমাদের পুরনো মাটির বাড়ির পেছনে ছিল একটা মস্ত শিরীষগাছ। পুরনো বাড়িটা ছিল না, কিন্তু তার ভগ্নাবশেষ ঢিপি হয়ে ছিল। ওই ঢিপিতে বসে ভাই, বোন ও সর্বাণী প্রায়ই খেলত। আগের রাতে বেশ ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল। দুপুরবেলা রোদ উঠতে ওরা ঢিপির উপর খেলতে গিয়েছিল। হঠাৎই শিরীষগাছের নিচে ওদের নজরে পড়ে পাখির একটা বাসা। ঝড়ে পড়ে গেছে। শিরীষগাছে কাকেরা প্রায়ই বাসা বাঁধত। ওদেরই কোনও বাসা হবে। বাসার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওরা দেখে একটা পাখির ছানা। তখনও গায়ে পালক গজায়নি। সারারাতের বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু। বাবা-মায়ের সুবাদে আমরা ভাইবোনেরা আশৈশব পাখিপ্রেমী। ভাই-বোন ভেবেছিল ওটা বুঝি কাকের ছানা। কিন্তু তা হোক। ওদের মা কোথায় কে জানে? ওকে ওখানে ওভাবে ফেলে রাখলে এমনিতেই মারা যাবে, নয়তো বিড়াল, চিল, কাক বা সাপের পেটে যাবে। আবার কাকের ছানা বাড়িতে পোষা কি উচিত হবে? বাবা-মা বকবে না? নানা সন্দেহের দোলায় দুলে তিন অপরিপক্ব মাথা আলোচনায় স্থির করে যে বাড়িতেই পাখির ছানাটিকে নিয়ে যাবে। তবে বাবা-মায়ের চোখের আড়ালে রেখে তিনজনে মিলে তার লালনপালন করবে।
তিন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে দলনেতা আমার ভাই। তার পরিকল্পনামতো চিলেকোঠায় জুতোর একটা বাক্সে ঘাস দিয়ে একটা কৃত্রিম বাসা বানানো হয়েছে। আর তাতেই ঠাঁই হয়েছে বাচ্চাটার। ওরা ডেঁয়ো পিঁপড়ে মেরে এনে তার মাথা কেটে বাদ দিয়ে বাচ্চাটাকে খাওয়ায়। ঘাসের মধ্যে থেকে ফড়িংও ধরে এনে খাওয়ায়। মুড়ি জলে ভিজিয়ে নরম করে খাওয়ায়। ওরা মাঝে মাঝে জল আর চিনি গোলা জল ড্রপারে করে নিয়ে গিয়েও খাওয়াত। যাই হোক, বাচ্চাটাকে খাওয়াতে ওদের কোনও সমস্যা ছিল না, কারণ কাছে গেলেই সে খাবারের জন্য হাঁ করত, আর তখনই তার মুখের ভেতর খাবার দিয়ে দিত। বাচ্চাটার এভাবেই চার-পাঁচদিন কাটার পর বাবার গোয়েন্দাগিরিতে রহস্য উন্মোচিত হল। এসব ঘটনা আমার শোনা বাবার মুখ থেকে, কারণ আমি তখন বাড়িতে থাকি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে থাকি।
এবার বাচ্চাটার দেখভালের মূল দায়িত্ব তুলে নিল আমার বাবা-মা। এবার আর লুকিয়ে-চুরিয়ে বাচ্চাটার যত্ন করতে হচ্ছে না বলে ভাই-বোন আর সর্বাণীও দারুণ খুশি। বাবা বাচ্চাটাকে পোকামাকড় ছাড়াও একটু একটু করে ভাত ও আলুসেদ্ধ খাওয়ানো শুরু করল। পনেরো-কুড়ি দিনের মধ্যেই বাবা বুঝতে পারল এ কাকের ছানা নয়, কোকিলের ছানা। এর চোখের রঙ লাল। কাকের চোখ লাল হয় না। তাছাড়া এ হল স্ত্রী কোকিল, কারণ ছানাটার পালকের রঙ বাদামি, আর তার উপর সাদা ছিট। সুতরাং ছানাটাকে নিয়ে আমাদের বাড়ির সবার আগ্রহ উঠল তুঙ্গে। এবার ওকে নিরাপত্তা দিতে হবে। বাড়িতে বেড়াল না থাকলেও প্রতিবেশীদের বেড়াল আছে। তাছাড়া আশেপাশে দাঁড়াশ সাপ তো রয়েছেই।
গোয়ালের মাচায় তোলা ছিল আমাদের এককালে পোষা টিয়াপাখি পিটু ও বুলুর খাঁচা। সেটা নামিয়ে ঝুল ঝেড়ে পরিষ্কার করা হল। খাঁচার মেঝেতে কাঁথার বিছানা তৈরি করা হল। রাতে খাঁচা ঢেকে দেওয়া হত আরেকটা কাঁথায়। আমাদের বাড়িতে প্রথম পোষ্য পাখি ‘পিটু’র অকালমৃত্যুর কথা মাথায় রেখেই বাবা ওই কোকিলাছানারও নাম দিল পিটু।
পিটু অদ্ভুতভাবে শব্দ করে তার চাহিদার কথা জানাতে শিখে গেছে। খিদে পেলেই কিক-কিক-কিক শব্দ করে। বাড়ির কোনও সদস্যকে সামনে দেখতে পেলে তো কথাই নেই। ওর খিদেও বড্ড বেশি। মাঝে একবার ওর গায়ে পিঁপড়েরা জড়িয়ে ধরল। কেন কে জানে। আমরা ভয় পেলাম। কোনও অসুখ হয়নি তো? বাবা ওকে কাঁচা হলুদবাটা মেশানো জল দিয়ে গা ধুইয়ে দিল কয়েকবার। ওতেই কাজ হল। কিন্তু কোকিল কি পোষ মানে? আমাদের ধারণা ছিল, কোকিল কখনও পোষ মানে না। আর তাই বাবা বলেছিল, ও উড়তে শিখলেই ওকে ভাসিয়ে দেবে আকাশের বুকে। ও ফিরে যাবে প্রকৃতির কোলে। মা-ভাই-বোনেদের মন সায় দিচ্ছিল না ছাড়তে, কিন্তু বাবার নির্দেশ অমান্য করার সাধ্যি কারও নেই। সাথে আমার সম্মতিও ছিল বাবার মতের সাথে।
দু’মাসেই বেশ বেড়ে উঠেছে পিটু। বাবা বলল, এবার ওকে ছেড়ে দেওয়া দরকার। নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করা শিখুক। সেইমতো এক রোববারের সকালে খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হল। কিন্তু পিটুর বেরিয়ে যাবার কোনও লক্ষণই নেই! বাধ্য হয়ে বাবা ওকে হাতে করে ধরে নিয়ে বারান্দার সামনে শিউলিগাছের একটা ডালে বসিয়ে দিল। কিন্তু পিটুকে দেখে মনে হল, সে এই ঘটনায় বেশ বিব্রত। রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কী করবে ভেবে উঠতে পারছে না। ওর উড়ে যাবার কোনও লক্ষণও নেই। আসলে উড়বে কী করে? ও তো এতদিন কোনও পাখিকে উড়তেই দেখেনি। বাবা হাত তুলে ভয় দেখানোর ভান করে বলে উঠল, যাহ্‌! কিন্তু সে ছোট্টো একটা লাফ দিয়ে গিয়ে বসল পাশের ডালে। আমার ভাই-বোনেরা মন সায় না দিলেও ওর ভবিষ্যতের কথা ভেবে হাত তুলে তাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে লাগল। ফল মিলল কিছুক্ষণের মধ্যেই। শিউলিগাছ থেকে উড়ে গিয়ে বসল পাশের আমগাছে। এই প্রথম ডানা মেলার স্বাদ পেল পিটু। হোক না তা কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আত্মবিশ্বাস পেল। একটু পরেই উড়ে গিয়ে বসল প্রায় কুড়ি ফুট দূরে পুকুরঘাটের পাশে আমগাছে। বাবা নিশ্চিন্ত হল।
দু’মাসে কোকিলের ছানাটি বুঝে গিয়েছিল যে ওর নাম পিটু। বাবা নাম ধরে ডাকলেই কিক-কিক-কিক করে একটা কর্কশ স্বরে সাড়া দিত। পিটু ছাড়া পেলেও তার প্রাকৃতিক খাবারের সাথে পরিচিত ছিল না। সংগ্রহ করে খেতেও সে শেখেনি। আমগাছে বসে সে কিক-কিক-কিক করে নিজের খিদের কথা জানান দিল। বাবা সেদ্ধ আলু মাখানো ভাত প্লেটে করে নিয়ে যেতেই লাফিয়ে নেমে এল নিচের ডালে। তারপর হাঁ করতেই বাবা গোল্লা পাকিয়ে টুপ করে ফেলে দিল মুখের ভেতর।
তিন-চারদিন এভাবেই কাটল। পিটু দূরে কোথাও উড়ে গেল না। আশপাশের গাছেই সে ঘুরে বেড়াতে লাগল। আর বাবাও তাকে প্রতিদিন সকালে খাইয়ে দিতে লাগল। ও আর কারও কাছে আসত না। মাকে তো রীতিমতো ভয় পেত। তার কারণও ছিল। আসলে মা পিটুকে মনে মনে ছেড়ে দিতে নারাজ ছিল। আর তাই একদিন কাঁচি দিয়ে পিটুর ডানার কয়েকটা পালক কেটে দিয়েছিল। যদিও বন্দি দশা থেকে মুক্তি দেওয়ার সময় তার ডানার পালক বড়ো হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হয়তো তখনও ওড়ার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ছিল। ও মাকে ওর দিকে এগোতে দেখলেই লাফিয়ে উপরের ডালে পালাত।
প্রায় একমাস পিটু রয়েই গেল বাড়ির লাগোয়া গাছে। ওকে দেখতে না পেলে বাবা ‘পিটু’ বলে হাঁক পাড়লেই উড়ে এসে বাবার হাতে বসত। আর তারপর বাবা ওকে খাইয়ে দিত। বাবা বাড়িতে না থাকলে অন্যেরা ঘাটের পাশের আমগাছটার নিচের দিকের একটা ডালে আলুসেদ্ধ মাখা ভাতের ছোটো ছোটো গোল্লা করে পর পর সাজিয়ে রেখে আসত। পিটু এসে খেয়ে যেত। কখনও কখনও শালিক পাখিরা এসেও খেয়ে যেত।
এভাবেই কেটে গেল পুজো পর্যন্ত। পুরুষ কোকিলের কুহু-রব শোনা যেতে লাগল আশেপাশের গাছ থেকে। একদিন হঠাৎই নজরে এল, পিটু নেই। বাবা অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করল। ভাই-বোন ও সর্বাণী আশেপাশে অনেক খোঁজ করল। কিন্তু পিটুকে আর দেখা গেল না। বাবা মনে মনে দুঃখ পেলেও নিশ্চিন্ত হল, পিটু মনে হয় তার সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে। ধীরে ধীরে কোকিলা পিটুর স্মৃতি আমাদের মন থেকে ফিকে হয়ে যেতে লাগল।

পরের বছরের ঘটনা। বর্ষাকাল এসে গেছে। সকাল থেকে টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বাবার হঠাৎ নজরে এল একটা স্ত্রী কোকিল পুকুরঘাটের থেকে একটু দূরে একটা কল্কে ফুলের গাছে বসে ভিজছে। বাবার কেন জানি না মনে হল, ও পিটু হতে পারে। বাবা ডাক দিল, পিটু... সাথে সাথে কোকিলাটি ডেকে উঠল কিক-কিক-কিক। তবে ওই শব্দ একটু অন্যরকম, কর্কশতা বেশ কম, কেমন যেন আদুরে আদুরে ডাক। বাবা আবার ডাকল, পিটু... অমনি সে উড়ে এসে বসল সামনের আমগাছে। মায়ের ভাত রান্না হয়ে গিয়েছিল। বাবা আলুসেদ্ধ মাখা ভাত হাতে নিয়ে ডাক দিল, আয়, পিটু আয়। সে ইতস্তত করতে লাগল। বেশ কয়েক মাসের অনভ্যাস তাকে মনে হয় মানুষের প্রতি ভীতু করে দিয়েছে। কিংবা বলা যায়, তাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। বাবা আমগাছের ডালে খাবার কয়েকটা গোল্লা করে সাজিয়ে দিয়ে একটু সরে আসতেই সে এগিয়ে এসে টপাটপ খেয়ে নিল।
পিটু ফিরে আসায় আমরা খুব আনন্দ পেলাম। দু’দিনের মধ্যেই পিটু আবার পুরনো অবস্থায় ফিরে এল। বাবা ওকে ডাকলেই বাবার হাতে এসে বসে, আর বাবা খাবার গোল্লা পাকিয়ে খাইয়ে দেয়। পিটু আমাদের বাড়ির আশেপাশেই কোনও গাছে থাকত। বাবা ‘পিটু’ বলে হাঁক পাড়লেই দু’ডানা ঝটপটিয়ে সাঁই সাঁই করে তিরবেগে উড়ে এসে সোজা বাবার হাতে এসে বসে যেত। সে দৃশ্য আমাদের চোখের পক্ষে যেমন ছিল আরামের, বাড়িতে আগত কোনও অতিথির কাছে ছিল চরম বিস্ময়ের। কোকিলও পোষ মানে!
শীত পড়ার শুরুতেই একদিন পিটু আবার ভ্যানিশ হয়ে গেল। আমরা বুঝে নিলাম, ওর মনে প্রেম জেগেছে। কিন্তু প্রেমের টান এবং প্রকৃতির টানের তুলনায় মানুষের ভালোবাসার টান একটা বন্য পাখির কাছে যে অগ্রাধিকার পেতে পারে তা আমাদের কল্পনাতীত ছিল। পক্ষীবিশারদদের কাছেও কি কল্পনাতীত নয়?
পিটু আবারও ফিরে এল একইভাবে। টানা ছ’বছর এভাবেই কেটেছে। পিটু জৈবিক টানে চলে গেছে, আবার ভালোবাসার টানে ফিরে এসেছে। ষষ্ঠবার যখন ও ফিরে এল তখন ওর চেহারাটা আর আগের মতো নেই। পালকের ঔজ্জ্বল্য কমেছে। কেমন যেন ন্যাড়ামুড়ো চেহারা। আমরা ভাবলাম, ও কি কারও সাথে মারামারি করেছে, নাকি অপুষ্টিতে ভুগছে? বাবার হাতে ক’দিন খাওয়াদাওয়া করে পিটু তার হারানো ঔজ্জ্বল্য কিছুটা ফিরে পেল। তারপর আবার শীতের শুরুতে চলে গেল।
ওটাই ছিল পিটুর শেষ যাওয়া। পিটু আর কোনওদিন ফিরে আসেনি।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

1 comment: