বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ কেন করি খাই খাই (প্রথম পর্ব) - কিশোর ঘোষাল




প্রথম পর্ব

এক

মানুষের এই বড়সড় দলটাতে ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী মিলে প্রায় দুশো চল্লিশ জন। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ওদের একটাই চিন্তা – সেটা হল খাদ্য যোগাড়ের চিন্তা। দলের এতগুলো মানুষের জন্যে প্রচুর খাদ্য চাই। ওরা প্রধানত শিকার করে, যেকোনও ধরনের পশু। তবে মাংসাশী পশুর থেকে তৃণভোজী পশু-শিকারেই ওদের বেশি আগ্রহ। মাংসাশী পশু ছোটো ছোটো দলে ঘোরাফেরা করে, তাদের শিকার করাতে খুব ঝুঁকি। তারা মানুষকে ভয় পায় কম, আর প্রায়শ ঘুরে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করে শিকারি মানুষকেই। ঘায়েল করে দেয়, কখনও কখনও শিকারিদেরই বেশ কয়েকজন শিকার হয়ে যায়। সেদিক থেকে তৃণভোজী পশুরা বড়ো বড়ো দলে থাকে। তারা মানুষের দলকে ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে। তাদের মধ্যে থেকে বৃদ্ধ, দুর্বল কিংবা শিশু পশুদের শিকার করা অনেক কম বিপজ্জনক। তাছাড়া তৃণভোজী পশু খাদ্য হিসেবে স্বাদে গন্ধেও অনেক সুস্বাদু। পশু ছাড়া মানুষগুলোর অন্য খাদ্য হল, গাছের ফল, মাটি থেকে খুঁড়ে তোলা নানান কন্দ। কিন্তু সে আর কত? জনসংখ্যার দিক থেকে তার পরিমাণ অপ্রতুল।
গাছের কাণ্ড, ডালপালা আর বড়ো বড়ো পাতার ছাউনি দেওয়া ঘরে মানুষগুলো থাকে। অনেকগুলো ঘর পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি করে বানানো একটা গ্রামে। সেই গ্রামের চারদিকে সারি সারি শক্ত মোটা গাছের কাণ্ড মাটিতে পুঁতে বেড়া দেওয়া, জানোয়ারের দল কিংবা দলছুট জানোয়ার যাতে হুট করে আক্রমণ করতে না পারে।
এই মানুষগুলো শুনেছে, তাদের আগের মানুষেরা এমন ঘর বানাতে পারত না। তাদের অধিকাংশ থাকত ঘন জঙ্গলের মধ্যে বড়ো বড়ো গাছের ওপর, আবার কেউ কেউ থাকত গুহার মধ্যে। আরও আশ্চর্য তারাও এদের মতোই শিকার করত, আর পশুর কাঁচা মাংস খেত। ইস, তারা কী অসভ্য জংলি মানুষ ছিল রে বাবা! আগুনে না পুড়িয়ে রক্তমাখা কাঁচা মাংস কী করে খেত কে জানে। ভাবলেই ঘেন্না করে। ওই মানুষগুলোর তুলনায় এরা নিজেদের খুবই সভ্য ও আধুনিক মনে করে, কারণ তারা শিকার করা পশু আগুনে পুড়িয়ে এবং মাটি থেকে তুলে আনা কন্দ সেদ্ধ করে খায়।
ওরা যখন শিকারে যায়, শিশুরা আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ঘরে থাকে। তাদের দেখভালের জন্যে থাকে দু-তিনজন যুবক-যুবতী। বাকি সবাই নারী ও পুরুষ একসঙ্গে শিকারে যায়। শিকার পাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু খুবই অনিয়মিত। কোনও কোনওদিন প্রচুর পশু হাতের কাছেই শিকার হওয়ার জন্যেই যেন ঘুরে বেড়ায়। আবার কোনও কোনওদিন এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পশুর দেখাই মেলে না। যাও বা এক-আধটা পাওয়া যায়, তারা মানুষের সাড়া পেলেই দৌড়ে পালিয়ে যায় গভীর জঙ্গলে। এমনই একদিন ব্যর্থ শিকারের দিনে হঠাৎ বদলে গেল মানব সভ্যতার দিশা।
সেদিনও সকাল থেকে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পুরো দলটা ক্লান্ত, অবসন্ন, তৃষ্ণার্ত – কিন্তু একটাও শিকার জুটল না। দুপুর গড়িয়ে দিন চলেছে বিকেলের দিকে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তারা চলে এল জঙ্গলের একধারে। ঘন গাছ আর ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে তারা দেখতে পেল, বিস্তীর্ণ জলা জমিময় হলদেটে সবুজে ছাওয়া ঘাসের ক্ষেত্র। তার ওপাশে বয়ে চলেছে একটা তিরতিরে নদী। তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ ওই ঘাসের ক্ষেত্রের দিকে।
তারা ওই নদী আর তার বেলাভূমির ওই বিস্তীর্ণ তৃণভূমির দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হল তা কিন্তু নয়। তারা মুগ্ধ হল এই দেখে যে, ওই তৃণভূমির চারপাশে অজস্র তৃণভোজী পশু মহানন্দে মহাভোজে ব্যস্ত। অন্য কোনওদিকে তাদের যেন দৃষ্টি দেওয়ার সময় নেই। চোখ বন্ধ করে তারা মহা আরামে খেয়ে চলেছে ওই হলদেটে সবুজ ঘাস। এই পশুরা ছাড়াও নানানরকমের নানান রঙের পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে বসছে ওই তৃণভূমির ওপর, আর খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলেছে কিছু।
পাথরের আর কাঠের অস্ত্রগুলো শক্ত হাতে চেপে ধরে শিকারি মানুষগুলো নিচু হয়ে সন্তর্পণে এগোতে লাগল তৃণভূমির দিকে। পশুগুলো খাওয়ায় এতই মগ্ন ছিল, প্রথমে লক্ষই করল না কেউ এবং যখন করল তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা পশু ঘায়েল হল মানুষের অস্ত্রে, বাকিরা পালিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। আতঙ্কিত পাখিরা অনেকটা উঁচুতে চক্রাকারে ঘুরতে লাগল। মানুষগুলো তৃণক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে এলেই তারা আবার নেমে আসবে এই ঘাসের জমিতে।
সারাদিনের ব্যর্থতার পর সহজ শিকারের সাফল্যে মানুষগুলো প্রায় সবাই যখন খুব ব্যস্ত আহত পশুদের বধ করে বয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার যোগাড়ে, সেই সময় এক যুবক আর যুবতী জলাভূমির সেই ঘাসের গুচ্ছগুলো দেখতে লাগল খুঁটিয়ে। কোমরভর উঁচু এই ঘাস, তার সরু সরু পাতাগুলোর রঙ হলদেটে সবুজ, আর প্রত্যেক ঘাসের শীর্ষে দুলছে পুষ্ট একগুচ্ছ হলুদ রঙের বীজের ছড়া। এই ঘাস খেতেই পশুদের এত আগ্রহ, আর পাখিদের আগ্রহ এই বীজের দানা খুঁটে খাওয়াতে? যুবতী কঠিন নখে খুঁটে ছাড়িয়ে ফেলল কয়েকটি বীজের খোসা। বেরিয়ে এল ভেতরের সাদা রঙের দানা। একমুঠি ছাড়িয়ে কিছুটা নিজের মুখে নিল, বাকিটা দিল সঙ্গীর হাতে। দু’জনেই সেই শক্ত দানা চিবোতে লাগল দাঁতে। দানা পিষ্ট হয়ে লালায় মিশে জিভে এনে দিল নতুন এক স্বাদ, নতুন এক গন্ধ। দু’জনেই মহানন্দে গিলে ফেলল এই নতুন খাদ্য। পশুর কাছে এই ঘাস এবং পাখির কাছে এই দানা যখন প্রিয় খাদ্য তখন বিষাক্ত কিছু হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। যুবক ও যুবতী ঘাড় তুলে দেখল দলের বাকি সবাইকে। সকলেই তখনও ব্যস্ত পশুগুলোকে বহন করার যোগাড়ে। তারা দু’জনে আর বিলম্ব করল না। তাদের ধারালো পাথরের অস্ত্র দিয়ে অতিদ্রুত সপাসপ কাটতে লাগল ঘাসের শীষগুলো। জমা করতে লাগল এবং ছোটো ছোটো আঁটি বাঁধতে লাগল একটা একটা ঘাস ছিঁড়ে তার বাঁধনে।
সেদিন শেষ বিকেলে সেই মানুষের দলটি যখন গ্রামে ফিরল, তারা বহন করে আনল, মোট চোদ্দটি পশু, আর অন্তত ছয় বোঝা ঘাসের শীষ।
গ্রামে ফিরে একদল মানুষ যখন আগুন জ্বেলে পশুগুলোকে ঝলসানোর যোগাড় করতে লাগল, দলের নেত্রী ইরা দেখলেন, বয়ে আনা শীষগুলো থেকে দানা ঝাড়ছে সেই যুবতী। তিনি সেই যুবতীর পাশে বসে বললেন, “তুই কী করছিস রে, রিরি? বাজে সময় নষ্ট না করে পশু ঝলসানোয় যা না! কী করবি কী ওই দানাগুলো নিয়ে, খাবি নাকি?”
যুবতী রিরি মুখ তুলে হাসল। বলল, “আমি খাব, তোমরাও খাবে।”
ইরা ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “ছিঃ, শেষ অবধি ঘাসপাতা খাবি, ঘাসের বীজ খাবি? তুই গরু না মোষ, রে?”
“খেয়ে দেখো না, আমরা কাঁচা দানা চিবিয়ে খেয়েছি। বেশ খেতে। একটু সেদ্ধ করে দেখব কেমন লাগে।”
“খেতে হয় তুই খা। আমি খাব না। তোর আর মিকার যত উদ্ভট কাণ্ড। তোরা শিকারে গেলেই দেখেছি ভয়ে সবার আড়ালে থাকিস। ভিতু, দুর্বল, অকর্মা। আরও দেখেছি, তোরা কেমন হাঁ-করা আলসে। ফ্যালফ্যাল করে চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে কী যে দেখিস আর কীসব ভাবিস কে জানে। শিকারে গিয়েও তোদের এই গা-ছাড়া ভাব আমার একদম সহ্য হয় না।”
মিকা বলল, “রোজ রোজ এই একই মাংস খেতে ভালো লাগে না, মাসি। এটা একটু খেয়ে দেখোই না, খারাপ লাগবে না।”
ইরা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন। রিরি আর মিকা দু’জনে বসে বসে দানার খোসা ছাড়াতে লাগল।
বড্ড দেরি হচ্ছিল খোসা ছাড়াতে। কী মনে হতে মিকা একটা পাথরের পাটার ওপর কিছু বীজ রেখে আরেকটা পাথরে পাটা দিয়ে চেপে চেপে ঘষল কয়েকবার। সরিয়ে দেখল, খোসা খুলে গেছে। তবে কিছু দানা ভেঙে গেছে, কিছু গুঁড়ো হয়েছে, কিছু গোটাও আছে। বেশ মজা পেয়ে গেল দু’জনে। রিরি বীজ ছাড়াতে লাগল, আর মিকা দানা বের করতে লাগল খোসা ছাড়িয়ে।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বেশ অনেক দানাই তৈরি হল। তখন বড়ো মাটির পাত্রে জল দিয়ে তার মধ্যে দানা দিয়ে বসিয়ে দিল জ্বলন্ত পাথরের উনুনে। কিছুক্ষণ পরেই জল ফুটতে শুরু হল। রিরি আর মিকা গভীর আগ্রহে ঝুঁকে দেখতে লাগল। দেখল, দানাগুলো আকারে বাড়ছে, বাড়ছে জলের ঘনত্ব। আর যত ফুটছে, তত অদ্ভুত গন্ধ ছড়াচ্ছে। সে গন্ধ দগ্ধ মাংসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আশেপাশের সবাই এতক্ষণ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু অদ্ভুত এই ব্যাপারে তাদেরও কৌতূহল বাড়তে লাগল। মাত্র কয়েক মুঠো দানা পাত্রের নিচে পড়ে ছিল। মনে হচ্ছিল সামান্য, কিন্তু এখন বাড়তে বাড়তে সেই দানাগুলিই পাত্রটিকে প্রায় ভরে তুলেছে! আর স্বচ্ছ জল এখন দানার রসে মিশে ঘন তরল। রিরি গাছের একটা ডাল দিয়ে কয়েকটা দানা তুলে টিপে দেখল, বেশ নরম, আঙুলের চাপে থেঁতলে গেল। বিকেলে কাঁচা দানাগুলো যেমন শক্ত ছিল, দাঁতে চিবুতে হচ্ছিল কটকট করে, এখন আর তেমন নয়।
রিরি অনেকগুলো পাতা দিয়ে ধরে উনুন থেকে মাটির বড়ো পাত্রটি নামিয়ে রাখল। তাকে সাহায্য করল একমাত্র মিকা। নামানোর পর মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, তাদের ঘিরে দলের সকলে দাঁড়িয়ে আছে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ইরা।
বড়ো একটি পাতায় সেই উষ্ণ খাবারের কিছুটা তুলে মিকা ইরার দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল, “খেয়ে দেখোই না, মাসি। আমরা বিকেলে কাঁচা দানাই চিবিয়েছিলাম। বেশ লেগেছিল খেতে!”
ইরা সন্দিগ্ধ হাতে তুলে নিলেন পাতাটি। প্রথমে গন্ধ শুঁকলেন, তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য একটু মুখে তুললেন। মুখের মধ্যে নাড়াচাড়া করে খেয়েও ফেললেন। বললেন, “একটু পানসেমতো, কিন্তু খাওয়া চলবে। তা হ্যাঁ রে, খেয়ে কোনও অনর্থ হবে না তো? শরীর-টরির খারাপ হলে?”
“কিচ্ছু হবে না, মাসি। আমি আর রিরি তো খেলাম। অনেকক্ষণ আগেই। কিছু হয়েছে কি? আর পাখিরা খাচ্ছে, পশুরাও খাচ্ছে, তারা বেশ মজা করেই খাচ্ছিল গো, মাসি।”
ইরা পাতা শেষ করে বললেন, “খেতে মন্দ নয় রে। আমাকে আরেকটু দে তো দেখি। তারপর সবাইকে ভাগ করে দিয়ে তোরাও খাস। এর সঙ্গে ঝলসানো মাংসও দিস দু’টুকরো করে। আজকের খাওয়াটা একটু অন্যরকমই হোক। দেখা যাক এ কেমন খাদ্য।”

দুই

শস্যসহ ধানগাছ
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আজ থেকে অন্তত দশ থেকে চোদ্দ হাজার বছর আগে ওরাইজা রিউফিপোগন (Oryza rufipogon) নামে বুনো এক ঘাস মানুষরা আবিষ্কার করেছিল। পরবর্তীকালে সেই ঘাসেরই তারা চাষ করতে শেখে। দীর্ঘ চাষের প্রক্রিয়ায় একটু আলাদা প্রজাতির যে ঘাস থেকে তাদের প্রধান খাদ্য উৎপন্ন করতে শুরু করে, পণ্ডিতেরা সেই প্রজাতির ঘাসের নাম দিয়েছেন ওরাইজা সাটিভা (Oryza sativa)। এই ঘাসই আসলে ধানের চারা এবং এই ধান থেকে যে চাল উৎপন্ন হয়, সেই চালই নানান রন্ধন প্রক্রিয়ায় আজ সারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য (staple food)।
প্রধানত উত্তর-পূর্ব ভারতে উৎপন্ন এই চালের প্রধান উপপ্রজাতির নাম ইণ্ডিকা (indica)। আর ইয়াংসে এবং হুয়াই নদীর উপত্যকায় যে চালের চাষ শুরু হয়েছিল, সেই উপপ্রজাতির নাম জাপোনিকা (japonika)। ইণ্ডিকা চাল ভারতবর্ষ এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক উৎপন্ন হত। বর্তমানে শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই প্রায় দশহাজার উপপ্রজাতির ধান ও চাল উৎপন্ন হয়ে থাকে।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ রিরি আর মিকা নামের ওই মেয়ে ও ছেলেটি যে দানা আবিষ্কার করেছিল, সেটিই চাল, আর শস্যটি ধান। আর প্রথমদিন রান্না করে যে খাবারটা সবাই মিলে খেয়েছিল, সেটি আমরা বাঙালি, ওড়িয়া কিংবা অহোমি ঘরে আজও খাই, যার নাম ফ্যানাভাত! অর্থাৎ, এখন একটু ঘি বা মাখন মিশিয়ে, লবণ, আলুসেদ্ধ এবং কাঁচালঙ্কার অনুষঙ্গে যে খাবারটি আমরা অত্যন্ত তৃপ্তি করে খাই, সেটি প্রায় দশহাজার বছরের প্রাচীন রেসিপি, অনুষঙ্গগুলি সামান্য আলাদা।

শস্যসহ গমগাছ
ধান বা চালের মতো প্রথম গমও অন্য এক প্রজাতির বন্য ঘাস থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ব্যাপক চাষের ফলে প্রাচীন ভারতে নানান প্রজাতির গম উৎপন্ন হত। মহেঞ্জোদরো ও হরপ্পার নগর সভ্যতার অনেক আগে ওই অঞ্চলের বোলান নদীর মেহেরগড় অঞ্চলের উৎখননে যে গমের নমুনা পাওয়া গেছে সেগুলি যিশুর জন্মের অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগেকার! এই প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায়, মেহেরগড়ের উন্নত কৃষি পদ্ধতির অনেক আগে থেকেই গমের বহুল চাষ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা ধান চাষের সময়ের থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই।  এর সঙ্গে আর একটু কল্পনা যদি করে নিই যে, বিশেষ প্রজাতির ঘাস থেকে ধান ও গমের মতো সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবারের সন্ধান পেয়ে সেকালের মানুষ থেমে থাকল না। তারা বুনো ঘাস ও ঝোপঝাড় থেকে আরও খুঁটিনাটি সন্ধান করে অচিরেই একের পর খাদ্য শস্য আবিষ্কার করে ফেলতে লাগল। যেমন, জোয়ার, বাজরা, তিল, সরষে, ভুট্টা, ছোলা, মটর, মুগ, মুশুর ইত্যাদি এবং নানান মশলা, যেমন লঙ্কা, ধনে, জিরে ইত্যাদি।
কী মনে হয়, আমার কল্পনাটা খুব অযৌক্তিক মনে হচ্ছে? একেবারেই না। কারণ, ধান কিংবা গমের চাষ শুরু হবার কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই আমাদের মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে এমন সব খাবারের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে রান্নার প্রক্রিয়া তেল-মশলা সহ রীতিমতো ‘রন্ধন শিল্প’ হয়ে উঠেছিল।
চাল থেকে রান্না করা খাদ্য কিংবা গম ভাঙানো আটার রুটি থেকে যে পরিমাণ সহজপাচ্য পুষ্টি ও ভিটামিনস পাওয়া যায়, অন্য কোনও খাদ্যে তেমন পাওয়া যায় না। নিচের চার্ট থেকে তোমরা বুঝতে পারবে সমপরিমাণ খাদ্যের কী গুণাগুণঃ


সাদা চাল
(১০০ গ্রাম)
গমের রুটি (২টি)
(১০০ গ্রাম)
পাঁঠা/ভেড়ার মাংস*
(১০০ গ্রাম)
কার্যকারিতা
ক্যালোরি
২২৩
২৬০
১৯৯
খাদ্য থেকে পাওয়া শরীরের শক্তির পরিমাণ
টোটাল ফ্যাট
০.৩ গ্রাম
৮ গ্রাম
৯.৩ গ্রাম
পরিমিত পরিমাণে শরীরে শক্তি দেয়, অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরের ক্ষতি করে।
কোলেস্টেরল
০.০০
০.০০
৯৩ মিগ্রা
স্বল্পমাত্রা কোলেস্টেরল শরীরের জন্যে উপকারী
*আদিম যুগের মানুষ পশু-শিকারে কোনও বাছবিচার করতে পারত না। পাঁঠা বা ভেড়ার তুলনায় সে মাংস ছিল অনেক শক্ত এবং দুষ্পাচ্য। সেইসব মাংসের পুষ্টিগুণ যোগাড় করা এখন বেশ কষ্টকর।
ওপরের চার্ট থেকে বুঝতেই পারছ, সমপরিমাণ ভাত ও রুটিতে খাদ্যগুণে খুব একটা তফাত নেই এবং খাদ্য থেকে শরীরে পাওয়া শক্তিও (ক্যালোরি) প্রায় সমান। এই খাদ্য থেকে পাওয়া শক্তিকে যদি খাদ্যশক্তি (food energy) বলি, তাহলে এই শক্তি দিয়ে আমরা সারাদিনের সব কাজ করার ক্ষমতা পাই। এই খাদ্যশক্তি কম হতে থাকলে আমরা দুর্বল হতে থাকি, অসুস্থ হতে থাকি, কখনও কখনও স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারাই। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশক্তিও আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। আমরা মেদবহুল হয়ে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকি। সারাদিনে একজন পূর্ণবয়স্ক অফিস/স্কুল/কলেজে চাকরি করা আধুনিক মানুষের মোটামুটি ২০০০ ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন। যাঁরা খেলাধুলো করেন, কিংবা শ্রমজীবি মানুষ, তাঁদের এই ক্যালোরি অনেক বেশি দরকার।
এবার এই হিসেবে আদিম মানুষদের কথা যদি চিন্তা করা যায়, তাঁদের সকলকেই জঙ্গলে, পাহাড়ে পশু-শিকারের জন্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হত, অতএব তাঁদের দিনে চার-পাঁচ হাজার ক্যালোরির কম শক্তি হলে চলত বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে অন্তত চার কিলো মাংস নিয়ে তাঁদের বসতেই হত যাতে হাড়গোড় ফেলে দিয়ে পেটে কেজি দুই-আড়াই হাড়হীন সলিড মাংস যায়। প্রত্যেকদিন দলের সকলের ভরপেট মাংসের যোগাড়ের জন্যে কত পশু শিকার করতে হত এবং কাজটা কতটা বিপজ্জনক ও পরিশ্রমের আশা করি বুঝতে পারছ।
অতএব, প্রধানত পশুমাংসের উপর নির্ভরশীল মানুষ যেদিন থেকে ধান এবং গমজাত খাদ্যকে প্রধান খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করতে লাগল, তাদের আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা এবং জীবনধারায় অতিদ্রুত পরিবর্তন ঘটতে লাগল। ওই রিরি আর মিকার আশ্চর্য আবিষ্কারের ফলেই আমরা যে আদিম মানুষ থেকে আজকের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি, এ-কথাটা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে আমার একটুও দ্বিধা নেই।
এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পার, বিজ্ঞানের পাঠশালায় আধুনিক বিজ্ঞানের নানান জটিল বিষয় থাকতে হঠাৎ ধান-গম নিয়ে লিখতে বসলাম কেন। এ-কথার উত্তর আজ নয়, পরের সংখ্যায় দেব।
_____

ছবিঃ আন্তর্জাল

2 comments:

  1. খুব মনোগ্রাহী লেখা ,ভালো লাগলো
    শর্মিষ্ঠা ব্যানার্জি

    ReplyDelete
  2. অনেক ধন্যবাদ শর্মিষ্ঠাদেবী।

    ReplyDelete