গল্পঃ সনাতনবাবুর প্ল্যানচেট - অরিজিৎ গাঙ্গুলি



এই নিয়ে আজ সাতাশ বছরে পড়ল সনাতনবাবুর প্ল্যানচেটের ব্যাবসা। উত্তর কলকাতার বনেদি পাড়ায় এই দোকানের উদ্বোধন হয়েছিল বিশ্বনাথ সামন্তর হাত ধরেই। প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই বাবার থেকে এই বিদ্যে শিখে নিতে বেগ পেতে হয়নি সনাতনবাবুকে। ব্যস, তারপর থেকেই জাঁকিয়ে চলছে এই ফ্যামিলি বিজনেস।
দোকান বা চেম্বারটা দেখতে আদ্যিকালের হলেও এর সুনাম বা খ্যাতি সারাদিন লোকজনের আনাগোনা দেখলেই বোঝা যায়। একমাসের মধ্যেই যদি কেউ প্ল্যানচেটের ডেট পেয়ে যায় এখানে, তাহলে বুঝতে হবে সে সত্যিই ভাগ্যবান। বিশ্বাস অবিশ্বাসের চিরকালীন দ্বন্দ্ব মাঝে মাঝে এই ব্যাবসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেও মাসিক কাস্টমারের সংখ্যা মোটামুটি একই ধরে রাখতে পেরেছেন সনাতনবাবু। তাই আয় মন্দ হয় না। আর লোকমুখে সুনাম ছড়ালে তবেই না লক্ষ্মীলাভ! তাই কাজের কোয়ালিটির সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করেন না কোনওদিনই। এর জন্য ক্লায়েন্টকেও নিয়মের লিস্টি ধরিয়ে দেন সনাতন সামন্ত আগেভাগেই।
প্ল্যানচেট শব্দটা নিয়ে অনেকেরই একটা ভুল ধারণা আছে। ফরাসি ভাষায় ‘প্ল্যানচেট’ শব্দের মানে হল পানপাতার মতো দেখতে পাতলা কাঠের প্লেট, যার একপ্রান্তে দুটো ছোটো ছোটো চাকা লাগানো থাকে আর অন্যপ্রান্তে থাকে পেনসিল আটকানোর জন্য একটা ছোটো ফুটো বা ক্লিপ। বিভিন্ন সময়ে এই জিনিসের স্বয়ংক্রিয় নড়নচড়নের দ্বারা অনেক রহস্যময় সংকেতের খোঁজ মেলায় ধীরে ধীরে এই ধারণা বদ্ধমূল হতে শুরু করে যে এই কাঠের ফলক একটা মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে অতিপ্রাকৃত দুনিয়ার সাথে, আর সেই দুনিয়ার লোকজনই নিয়ন্ত্রণ করে একে। তাই সময়ের সাথে সাথে এই প্রক্রিয়ারই নাম হয়ে যায় প্ল্যানচেট।
এই ফিল্ডে পাকা খেলোয়াড় বলে সনাতনবাবুর প্ল্যানচেটের স্টাইল কিন্তু গতেবাঁধা নিয়মের থেকে বেশ আলাদা। ওঁর বাবা তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে মিডিয়াম বানাতেন। কিন্তু সনাতনবাবু তার ব্যতিক্রম। তুলা রাশি আর চন্দ্র প্রবল হওয়ায় উনি নিজেই মাধ্যম হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ, এই গুণসম্পন্ন লোকদের সাথে তেনাদের দুনিয়ার যোগসূত্র ঘটা খুব সহজ, আর তাই কাস্টমারকেও লক্ষণ বিচার করে আর মাধ্যম ধরে আনতে হয় না।
সপ্তাহের পাঁচদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি দোকানে বসেন সনাতনবাবু। তবে প্ল্যানচেটের কাজ করেন শুধু শনি আর রবিবার সন্ধের পর থেকে সারারাত ধরে। ভিড় এড়ানোর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় অনেক আগে থেকেই। তবে প্রথম কয়েকটা সিটিংয়ে উনি বোঝার চেষ্টা করেন প্ল্যানচেটের কারণ ও টার্গেট সম্বন্ধে বেশ কিছু জরুরি তথ্য। ছাপা ফর্ম দিয়ে দেন খদ্দেরকে ফিল আপ করার জন্য। তবে অনেকে কম্পিউটার কেনার কথা বললেও এই আটান্ন বছর বয়সে এসে আর নতুন কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না সনাতনবাবুর। বিয়ে করেননি, তাই এই ব্যাবসার উত্তরাধিকারীও আর কেউ নেই। দোকান উইল করা আছে একটা চ্যারিটির নামে। কলেজ জীবনে বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব থাকলেও দুয়েকজনের সাথেই সখ্যতা ছিল বেশি। তবে আজ কে কোথায় আছে তার আর খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠে না।
উইক-এন্ড সাধারণত খুব ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যায় বলে সনাতনবাবু তাঁর দ্বিতীয় শখ পূরণ করেন প্রতি সোমবার ডিনারের পর। সপ্তাহের যাবতীয় কার্যকলাপ ও হরেক কিসিমের অভিজ্ঞতা তুলে রাখেন নিজের সাধের ডায়রিতে। মাঝে মাঝে কয়েক বছরের পুরনো ডায়রি বের করে পড়েন ও নিজেই অবাক হয়ে যান কিছু কিছু ঘটনা পড়ে।
তবে আগের সপ্তাহে, বিশেষ করে গতকাল যেটা ঘটল, তা ডায়রিতে লিখতে গিয়েই যে হাত কাঁপছে সনাতনবাবুর! এমনও যে অভিজ্ঞতা হতে পারে তার জন্য একদমই তো প্রস্তুত ছিলেন না।

*****

বয়স একত্রিশ, রঙ ফর্সা, কোঁকড়ানো চুল আর উচ্চতা বেশ চোখে পড়ার মতোই লম্বা। ফর্মে নামের পাশে বেশ গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, মৈনাক বিশ্বাস। টার্গেটের নাম অসীম বিশ্বাস, সম্পর্কে মৈনাকের বাবা, মারা গেছেন একবছর হল, বাড়ি গড়িয়ার কাছে।
সপ্তাহের মাঝখানে চেম্বার এতটা খালি থাকে না কখনওই। ফর্ম ভরে জমা দেওয়ার পরের দিন ক্লায়েন্টরা এসে বাইরের ঘরের বেঞ্চে অপেক্ষা করে কখন ভেতরের ছোটো মতন কাঠের পার্টিশান দেওয়া ঘর থেকে ডাক আসবে। আজ শুধু দু’জনই বসে।
“মৈনাক বিশ্বাস কি আপনি?” সনাতনবাবু জিজ্ঞেস করলেন ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে।
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“ভেতরে আসুন।”
এই ছোটো ঘরে সনাতনবাবু ক্লায়েন্টদের সাথে আলোচনা করেন ও নিজের একটা খাতায় নোট নিতে থাকেন। তবে প্ল্যানচেটের ঘর পেছনে, সেখানে শুধু সপ্তাহান্তেই ঢোকেন।
“বলুন মৈনাকবাবু, হঠাৎ বাবাকে প্ল্যানচেট করতে ইচ্ছে হল কেন?”
“না মানে, আসলে কিছু কথা বলার আছে বাবাকে।”
“বিশ্বাস আছে এইসবে?”
“হ্যাঁ, আপনার নাম বা সুখ্যাতি তো অনেক শুনেছি, আর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মনের ভেতর খুব খচখচ করছিল এই কথাগুলো। তাই মনে হল একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না। বাবাকে বলতে পারলে শান্তি পাই।
“ভয় পাবেন না তো?”
“না না, সেটুকু সাহস নিয়েই এসেছি।”
“আপনার বাবার বয়স কত হয়েছিল?”
“ষাটের কাছাকাছি হবে।”
“কীভাবে মারা গেলেন উনি?”
“ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন। সেরকম কোনও অসুখও ছিল না, বরং বেশ ফিটই ছিলেন।”
“হুম। তো এই রবিবার ফ্রি আছেন? তাহলে কাজ সেরে ফেলা যায়।”
“বলেন কী! শুনেছি আপনার এখানে ডেট পেতে মাস খানেক লেগে যায়।”
“যা জিজ্ঞেস করছি বলুন। রোববার সন্ধে সাড়ে সাতটা। হবে?”
“আলবাত হবে! তবে আমার একটা প্রশ্ন ছিল, সনাতনবাবু।”
“বলে ফেলুন।”
“বলছিলুম যে, ইয়ে মানে, আপনি তো নিজেই মিডিয়াম হন, তা ক্লায়েন্ট যা কথাবার্তা বলে টার্গেটের সাথে তা আপনার মনে থাকে প্ল্যানচেটের পর?”
“ক্লায়েন্ট আমার সাথে কথা বলেন না, যিনি আমার মধ্যে আসেন তার সাথে বলেন। তাই আমার কিছুই মনে থাকার কথা নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
“ওকে, ওকে।”
টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা প্রিন্ট করা কাগজ বের করে মৈনাকের দিকে এগিয়ে দিলেন সনাতনবাবু। “নিন, এই নিয়মগুলো সব মন দিয়ে পড়ুন, আর তলায় সাইন করে আমাকে ফেরত দিন। কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে বলতে পারেন।”
এই নিয়মের দিক থেকে খুব কঠোর সনাতনবাবু। হাজার হোক এই কাজে ব্যক্তিগত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রাণহানিরও ভয় থাকে। তাই ক্লায়েন্টকে আগে থেকেই শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
মৈনাক খুঁটিয়ে পড়তে লাগল কাগজখানা। “আচ্ছা, এখানে লেখা আছে যে প্ল্যানচেটকে মাঝপথে বন্ধ করা যাবে না কোনওমতেই। ক্লায়েন্ট বন্ধ করতে বাধ্য করলে ফাইন করা হবে। কিন্তু যদি কোনও কারণে থেমে যায়, তাহলে কী হবে সনাতনবাবু?”
“ভুলেও ভাববেন না ঐসব। ওর থেকে বাজে পরিণতি আর কিছু নেই। আত্মা আর ফিরে যাবে না, রয়ে যাবে ঘরের মধ্যেই। আর তার ফল কিন্তু মারাত্মক হতে পারে।”
“আচ্ছা, আমার ঘড়িটাও কি....”
“সব খুলে আসবেন। কোনওরকম ধাতব জিনিস বা পূজার ফুল বা তাগা সঙ্গে রাখবেন না। মানিব্যাগও বাইরে জমা রাখতে হবে। আর হ্যাঁ, ভালো পরিষ্কার জামাকাপড় পরে আসবেন।”
“টার্গেটের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস বা ছবি আনতে বলা রয়েছে। বাবার খুব শখের একটা ফাউন্টেন পেন ছিল। সেটা আনব?”
“সাথে একটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবিও আনবেন বাবার। ফর্মের ছবিটা খুব ছোটো।”
কাগজের তলায় সই করে সনাতনবাবুর দিকে বাড়িয়ে দিল মৈনাক। “আজ্ঞে, অ্যাডভান্স কত দিতে হবে?”
“কিচ্ছু না, কাজ পছন্দ হলে পে করবেন। এখন আসতে পারেন। রোববার সন্ধে সাতটার মধ্যে বাইরের ঘরে অপেক্ষা করবেন, আমি সময়মতো ডেকে নেব। একাই আসবেন কিন্তু।”
“অবশ্যই। চলি আজ, অনেক ধন্যবাদ।”

রবিবার সকাল থেকে হালকা বাড়ির কাজ করেন সনাতনবাবু। সংসার নেই বলে সব কাজ একা হাতেই করতে হয়। তবে আজকে হঠাৎ খালি পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছে। কলেজে বেশ হ্যান্ডসাম চেহারা ছিল, বেশ কিছু মেয়ে তো উৎসাহীও ছিল। বন্ধুরাও খ্যাপাত। তবুও খুব একটা পাত্তা দেননি তাদের সনাতনবাবু। হয়তো ভালোই করেছিলেন, নয়তো আজ এমন ঝাড়া হাত-পা থাকা যেত না।
দুপুরে ঘন্টা দুয়েক ঘুম দিয়ে সন্ধের আগে চা-বিস্কুট খেয়ে তৈরি হয়ে গেলেন। চেম্বারের বাইরের ঘরে এসে দেখলেন মৈনাক বসে।
“এসে গেছেন? একটু অপেক্ষা করুন, আমি ঘর তৈরি করে ডাকছি।”
তালা খুলে প্ল্যানচেটের আসল ঘরে ঢুকলেন সনাতনবাবু। দশ ফুট বাই আট ফুট সাইজের ঘর। চার দেওয়ালে কোনও জানালা নেই, আছে সিলিংয়ে। বিশাল কাচের জানালা। জানালা লাগোয়া একটা লম্বা হাতল ধরে টেনে জানালাটা অল্প খুলে দিলেন। ঘরে হালকা ভ্যাপসা মতন গন্ধ। পশ্চিমদিকের দেওয়ালে একটা ল্যাম্পশেড, যার ভেতর টিমটিম করে জ্বলছে একটা বালব। ঠিক মাঝখানে একখানা গোল পাথরের টেবিল যার দু’পাশে দু’খানা গদিওয়ালা চেয়ার আর টেবিলের ওপরে রাখা আদ্যিকালের বেশ ভারী একটা মার্বেলের মোমদানি।
সনাতনবাবু ডেকে নিলেন মৈনাককে। মৈনাক ঘরে আসতেই দরজা ভেতর থেকে খিল দিয়ে বন্ধ করে দিলেন।
“বসে পড়ুন সামনের চেয়ারে। ছবি আর পেন ঐ মোমদানির সামনে রাখুন।”
“আচ্ছা। ছবি বেশ বড়োই পেয়েছি বাবার। দেখে নিন।”
সনাতনবাবু টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি বার করে দেশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে মোমদানির ওপর বসিয়ে দিলেন। ঘরের আলো নিভিয়ে এসে বসলেন নিজের চেয়ারে, আর খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন অসীম বিশ্বাসের ছবিখানা। ভদ্রলোকের বয়স বেশি হলেও মুখে সেরকম ছাপ পড়েনি, তাই জোয়ান বয়সে কেমন দেখতে ছিলেন সহজেই আন্দাজ করা যায়। ছবি যথাস্থানে রেখে মৈনাকের দিকে তাকালেন সনাতনবাবু।
“মন খুব শান্ত রাখবেন। অযথা ভয় পাবেন না, আমি আছি চিন্তা নেই। হাতদুটো আমার মতো করে টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখুন।”
“আচ্ছা। কীভাবে বুঝব যে বাবা এসেছেন?”
“আমার কথা শুনুন মন দিয়ে। একমনে বাবাকে মনে করুন, ওঁর সমস্ত স্মৃতি জড়ো করার চেষ্টা করুন, আর মনে মনে ওঁকে ডাকতে থাকুন। যদি মনঃসংযোগ না করেন তাহলে কিন্তু অন্য দুষ্ট আত্মা চলে আসতে পারে। কাজ পণ্ড হবে। তাই চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন। আমার কথাবার্তাতেই বুঝে যাবেন আপনার বাবা এসেছেন কি না।”
“আচ্ছা, আচ্ছা।”
“আর হ্যাঁ, কথাবার্তা শেষ হয়ে গেলে ওঁকে অনুরোধ করবেন ফিরে যেতে। আমি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে বুঝবেন উনি চলে গেছেন। তার আগে অবধি নিজে থেকে ঘরের আলো জ্বালাবেন না বা মোমবাতি নেভাবেন না।”
“ওকে।”
“নিন, শুরু করুন ওঁকে ডাকা।”
ওপরের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে বেশ আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি হয়েছে ঘরের ভেতর। সনাতনবাবুর চোখ বন্ধ, মৈনাক মগ্ন বাবার চিন্তায়। হঠাৎ ঘরের ভেতর একটা হাওয়ার ঝটকায় মোমবাতির শিখাটা বেশ কয়েকবার দুলে উঠতেই চোখ খুললেন সনাতনবাবু। মৈনাক চমকে উঠল ওঁর লাল চোখ দেখে। একদৃষ্টে উনি তাকিয়ে আছেন একচিলতে আগুনের শিখার দিকে। খুব ভয়ে ভয়ে মৈনাক জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি এসেছ?”
কিছুক্ষণ চুপচাপ। হঠাৎ সনাতনবাবু বলে উঠলেন, “কেমন আছিস মনা?”
“বাবা! বাবা তুমি এসে গেছ! তুমি কেমন আছ বাবা?”
“আছি রে। এই দুনিয়ায় ভালো আছি। তোরা সবাই ভালো আছিস তো?”
“হ্যাঁ বাবা, আমরা সবাই ভালো আছি। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই মা একদম চুপচাপ হয়ে গেছে।”
“মঞ্জুকে বলিস নিজের খেয়াল রাখতে। তাছাড়া ওর কী দোষ বল তো? কী করে বুঝবে আমি হঠাৎ করে এইভাবে চলে আসব? আমি নিজেই তো বুঝতে পারলুম না।”
“বাবা, তোমাকে কিছু বলার আছে বাবা। জানি না তুমি মেনে নিতে পারবে কি না, কিন্তু তোমাকে বলতে না পারলে আমি সারাজীবন আফশোস করব।”
“কী বলবি বল না, আমার হাতে সময় কম।”
“বাবা, তোমার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়।”
সনাতনবাবু ওরফে অসীম বিশ্বাসের চোখদুটো আরও লাল হয়ে উঠল। এক মিনিট থেমে থেকে তিনি বললেন, “সে তো স্বাভাবিক নয়ই। নয়তো এমন সুস্থ অবস্থায় কী করে ঘুমের মধ্যেই…”
“বাবা, তোমার রাতের খাবারে বিষ মেশানো ছিল।”
কোনও জবাব এল না উলটোদিক থেকে।
মৈনাক বলতে থাকল, “আমি এই কথাগুলো কাউকে বলতে পারিনি বাবা এতদিন, ভয়ে। কিন্তু মনে মনে কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। যেদিন তোমার কোম্পানির ওয়ারিশের জায়গায় তুমি আমার নাম না নিয়ে সুদেবদার নাম নিলে, সেদিন থেকেই রাগ চেপে বসল। কিন্তু তার বদলা যে এইভাবে নেব আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। আমি চাইনি এমন করতে।”
মৈনাক টেবিলের ওপর হাতজোড় করেই কাঁদতে লাগল।
হঠাৎ সনাতনবাবুর ডানহাত ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে টেবিল থেকে ওপরে উঠতে থাকল। ঠিক মোমবাতির সলতের ওপরে এসে হাতটা থেমে গেল। মৈনাক ঘাড় তুলে ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি আছ?”
কোনও উত্তর এল না। হাত এখনও ওইভাবেই স্থির। আচমকা হাতটা নেমে এল সলতের ওপর আর মোমবাতি নিভে যাওয়ার সাথেই ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের মধ্যে একটা জোরালো আঘাতের শব্দ হল, সাথে গোঙানির আওয়াজ।

পরেরদিন আটই জানুয়ারি খবরের কাগজের তিনের পাতায় বেরোল খবরটা।
আজ উত্তর কলকাতার একটি দোকান থেকে উদ্ধার হয়েছে বছর ত্রিশের এক যুবকের মৃতদেহ। নাম মৈনাক বিশ্বাস। কপালে ভারী কিছুর জোরালো আঘাতে মৃত্যু বলে ধারণা করা হচ্ছে। বডি পাঠানো হয়েছে পোস্টমর্টেমের জন্য। দোকানটিতে তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ চলত বলে প্রাথমিক অনুমান করা হয়েছে। দোকানের মালিকের এখনও কোনও হদিশ মেলেনি। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

*****

কাল সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি সনাতনবাবু। এখনও গত সন্ধেবেলার কথা মনে পড়লে আঁতকে উঠছেন। মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই দেখলেন এখনও চোখদুটো বেশ টকটকে লাল। ঝোলা ব্যাগ থেকে পেন বের করে ডায়েরির পাতা খুলে কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতে শুরু করলেন।
০৮/০১/২০১৮
আজ যেখানে বসে লিখছি, সেই জায়গার কথা ডায়েরিতে রাখলাম না। নিজের বাড়ি ছেড়ে এই প্রথম অন্য কোথাও এসে থাকতে বাধ্য হলাম। বাবার শেখানো বিদ্যা ও আমার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে অগণিত মানুষকে বিগত চব্বিশ বছর ধরে বোকা বানিয়ে আসছি। কিন্তু অসীমের পরিণতি দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না কাল। মুখে বয়সের ছাপ পড়লেও ফর্মে আটকানো পাসপোর্ট ফটো দেখে আমার কলেজের বন্ধু অসীমকে চিনে নিতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। ওই তো ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। যেটুকু প্রাণের কথা মনের কথা বলতাম কলেজে পড়ার সময়, সব তো ওরই সাথে। কত স্মৃতি আজও তাজা। কিন্তু সময়ের সাথে কোথায় যেন হারিয়ে গেল অসীম। এত বছর বাদে ওর দেখা যে এইভাবে পাব তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। প্রিয় বন্ধুর অকালমৃত্যুর বদলা আমি না নিলে হয়তো কোনওদিনই দোষী শাস্তি পেত না। তাই টেবিলে রাখা ভারী মোমদানিটাই হাতের কাছে পেয়ে…
হঠাৎ সনাতনবাবুর হাত আড়ষ্ট হয়ে উঠল। চেষ্টা করেও আর লিখতে পারছেন না। সরাতেও পারছেন না। কেউ যেন ওঁর পেন আর হাতকে শক্ত করে ধরে আছে খাতার ওপর। বুঝতে পারছেন না কেন এমন হচ্ছে। শীতের রাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। অন্য হাত দিয়ে ডানহাতকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। কোনও এক অমোঘ শক্তি যেন হঠাৎ পাথর বানিয়ে দিয়েছে তাঁর হাতকে!
সনাতনবাবু চমকে গিয়ে দেখলেন তাঁর হাত ধীরে ধীরে সরে আসছে ডায়েরির পাতার নিচের দিকে। কেউ যেন তাঁর হাত দিয়ে জোর করে কিছু লিখতে চাইছে। পেন চলতে শুরু করল। ডায়েরির পাতায় ফুটে উঠতে থাকল লেখাগুলো।

ভাই সনাতন,
এতদিন বাদে তোর সাথে এইভাবে দেখা হবে আশা করিনি। ছেলে যে এই কাজ করেছে আমি আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু হাজার হোক নিজের ছেলে তো, তাই বদলা নেওয়ার কথা কখনওই ভাবিনি। ওকে এতটা কঠিন শাস্তি না দিলেও পারতিস। যাই হোক, ভালো থাকিস।
ইতি,
তোর বন্ধু অসীম
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

3 comments:

  1. বাপরে, নতুন ধরনের ভয়ানক গল্প। বেশ ভয় লাগল, ইয়ে মানে ...ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. বাহ! জবরদস্ত গল্প। ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  3. গল্পটা দুর্দান্ত!

    ReplyDelete