ধারাবাহিকঃ তুষার যুগ (প্রথম পর্ব) - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়



প্রথম পর্ব


আমাদের এই পৃথিবীটার বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর। আর মানুষের জীবিতকাল গড়ে ৭০ বছর। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে। তাই এই পরিবর্তন মানুষ তার জীবিতকালে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আমাদের জানিয়ে দেয় কেমন ভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তার রূপ পরিবর্তন করে। সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন (Global Warming) খবরের কাগজের শিরোনাম জুড়ে শোভা পায় - একথা আমাদের সবারই জানা। পরিবেশ দূষণ উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে, কিন্তু সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ক্রমাগত ঘুরতে থাকার ফলস্বরূপ পরিবেশে বারে বারে ফিরে আসে শীতলতা আর উষ্ণায়ন। এমন একেকটি চক্র সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে লক্ষ লক্ষ বছর।
বেশ কয়েক বছর ধরে কাগজ খুললেই গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে বন্যার খবর পড়ছি আমরা। কখনও মুম্বাই শহর ডুবে যায় জলে, কখনও উড়িষ্যা ও আসামে বন্যা কবলিত মানুষ উদ্ধারে নাস্তানাবুদ হয় সরকার, আবার কেরলে ভয়াবহ বন্যায় মানুষের ভিটেমাটি উচ্ছেদ হয়ে যায়। প্রাণে ভয় জাগে, তাহলে কি আবার পৃথিবী জলমগ্ন হয়ে যাবে? যদি হিমবাহ গলে গিয়ে প্লাবন আসে, তাহলে কিন্তু সত্যি সত্যি সবাইকে নোয়ার নৌকোয় উঠে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।
বাইবেলে আছে, পৃথিবী একসময়ে প্রবল প্লাবনে ভেসে যাওয়ায় ঈশ্বরের আদেশে নোয়া নামক এক ভদ্রলোক এক বিরাট নৌকোয় দুটি করে সবরকমের প্রাণী নিয়ে উঠে পড়েছিলেন অবলা জীবেদের রক্ষা করতে। বিজ্ঞেরা মাথা-টাথা চুলকে আবিষ্কার করেছেন, বাইবেলে বর্ণিত এই মহাপ্লাবন আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে ঘটেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মহাপ্লাবনের স্বপক্ষে প্রমাণ পাননি, আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি বাইবেল বর্ণিত নোয়ার সেই বিশাল নৌকো বা তার ভগ্নাবশেষ।
আশ্চর্যজনকভাবে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মহাপ্লাবনের গল্প দেখা যায় বিভিন্ন উপকথা ও ধর্মগ্রন্থে। ভারতবর্ষের পুরাণ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বিষ্ণুর মৎস অবতার মনুকে প্লাবনের সাবধানবাণী শুনিয়ে আদেশ দিয়েছিলেন এক বিশাল নৌকো তৈরি করে সব প্রাণীদের উদ্ধার করবার জন্য। চিন দেশের পুরাণে আছে, সম্রাট ইয়ো গুনকে আদেশ দিয়েছিলেন প্রজাদের মহাপ্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করতে।
মহাপ্লাবনের বৈজ্ঞানিক সত্যতা মেলেনি, কিন্তু বিভিন্ন দেশে বারে বারে ভয়াবহ প্লাবনে জনজীবন বিপন্ন হয়েছে, জনশ্রুতি ছড়িয়েছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তাই প্রায় একই মহাপ্লাবনের গল্প দেখা যায় পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই – এমনটাই ধারণা আজকের ভূবিজ্ঞানীদের।
ভূগোল বই খুলে দেখতে পাই, পৃথিবীর তিন ভাগ জল, একভাগ স্থল। তাহলে বোঝা গেল, পৃথিবীর বেশিরভাগ স্থান অধিকার করে আছে জল। সে হল ক্ষেত্রফলের হিসাবে। হিমবাহের যত তুষার জমে আছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে, সব যদি গলে যায় তবে এক চিলতে জমিও জেগে থাকবে না মানুষের পা রাখবার জন্য। ঠিক কতটা বরফ জমে আছে পৃথিবীর বুকে সেটা দেখে নেওয়া যাক।
গ্রীনল্যান্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঢাকা আছে বরফে। উত্তর গোলার্ধে কানাডা ও আলস্কায় বরফ জমে আছে হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে হিমবাহে ও পাহাড়ের মাথায় বরফের টুপি হয়ে। ১৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বরফের চাদরে ঢাকা উত্তর গোলার্ধ। দক্ষিণ মেরুতে অ্যান্টার্কটিকায় বরফের চাদর ১৪০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এই চাদরের গড় গভীরতা দুই কিলোমিটারেরও বেশি। বিজ্ঞানীদের হিসেবমতো, শুধু গ্রীনল্যান্ডের সমস্ত বরফ গলে গেলে সমুদ্রের জলের উচ্চতা কুড়ি ফুটের বেশি বেড়ে যাবে। এছাড়াও বরফ আছে হিমশৈল ও হিমবাহে। উত্তর সমুদ্রে আছে ভাসমান বরফের স্তর।
এত বরফ এল কোথা থেকে? অবশ্যই জল জমে বরফে পরিণত হয়েছে। কেন কেবল উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুতেই বরফ এত বিপুল পরিমাণে আছে? আসলে এসবের জন্য দায়ী পৃথিবীর নিজের অক্ষে ও সূর্যের চারধারে পাক খাওয়া।
পৃথিবী নিরন্তর তার নিজের সাপেক্ষে যে পাক খেয়ে চলেছে, যার কারণে দিন ও রাত আসে, সেটি হল পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ। এই অক্ষ ভৌগলিক উত্তর ও দক্ষিণ মেরু ভেদ করে সোজা পার হয়ে গেছে। মেরু অঞ্চলে সূর্যালোক সরাসরি পড়ে না বলে এখানে তাপমাত্রা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে কম। বৃষ্টির সাথে তুষারপাত হলে সেই তুষার গলে যেতে না পেরে জমা হতে থাকে বছরের পর বছর। একটানা লক্ষ লক্ষ বছর তুষার জমা হতে হতে চাপ দিতে থাকে তার নিচে অবস্থিত পুরনো বরফের স্তরকে। নিরেট সাদা ও নীল রঙের বরফ ক্রমশ জমে পাথরের মতো কঠিন হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমা হওয়া বরফের আস্তরণ ক্রমশ পুরু হতে থাকে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে উষ্ণতার হেরফের হয়। মেরু অঞ্চলে গরমকালে কিছু বরফ গলে জল হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু আবার শীতকাল এলে জল জমে বরফ হয়ে গিয়ে চরাচর ঢেকে দেয়।
যদিও পৃথিবীর মোট জলের পরিমাণের মাত্র ১.৭ শতাংশ বরফ ও তুষার রূপে আবদ্ধ, মোট পরিশুদ্ধ জলের প্রায় ৬৮.৭ শতাংশ হিমশৈল ও হিমবাহে পাওয়া যায়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক সমীক্ষায় জানা গেছে, পৃথিবীতে বর্তমানে জমাট বাঁধা বরফের ৯০ শতাংশ অ্যান্টার্কটিকায়, বাকি ১০ শতাংশ উত্তর মেরুতে অবস্থিত।  মনে হয় প্রকৃতি যেন পানীয় জলের ভাণ্ডার বানিয়ে রেখেছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে চিরকাল কিন্তু মেরু অঞ্চলে জল শুধুই এমন জমাট বাঁধা বরফ হয়ে ছিল না। অনেকবার উষ্ণায়নের প্রভাবে এখানে বরফ গলে জল হয়েছে, অন্যত্র বন্যায় ভেসেছে জমি।
সূর্যের চারদিকে পাক খেতে খেতে নিজের অক্ষ অবলম্বন করে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী পৃষ্ঠে বদল হয় আবহাওয়া। তাই কখনও পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, কখনও আবার হিমশীতল। অবস্থার এই পরিবর্তন চক্রাকার। এক চক্র সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে লক্ষ লক্ষ বছর। পৃথিবীর হিমশীতল পরিস্থিতিকে বলা হয় তুষার যুগ। প্রায় ১৮,০০০ বছর আগে শেষ তুষার যুগের সূত্রপাত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় দশ হাজার বছর আগে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত আজকের কানাডা, উত্তর এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার সমগ্র অঞ্চল তুষারে ঢাকা পড়ে ছিল।
গত দুই শতাব্দী ধরে ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায় জানা গেছে, বর্তমানে আমরা তুষার যুগের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। বৈজ্ঞানিক গণনা বলছে, আরও হাজার পঞ্চাশেক বছর লেগে যাবে এই তুষার যুগ শেষ হতে। কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যেভাবে সভ্য সমাজ পরিবেশ দূষণ বাড়িয়ে চলেছে, বায়ুমণ্ডলে উষ্ণায়ন দ্রুত হবে, কয়েক শতাব্দী পরেই শেষ হয়ে যাবে তুষার যুগ। তারপর কী আবার আসবে বাইবেল বর্ণিত মহাপ্লাবন? পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে না মানুষ ও জীবজন্তু দাঁড়ানোর উপযুক্ত জমি? কে জানে আবার হয়তো ডাক পড়বে আর এক নোয়ার, প্রাণ বাঁচাতে সে তার জাহাজ ভাসাবে জলে।


তুষার যুগের ধারণা ও বিজ্ঞানী লুই আগাসিজ


সুইজারল্যান্ডের চাষিরা তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে জানত, আল্পস পর্বতের হিমবাহ আগে অনেক বিস্তৃত ছিল। তারা লক্ষ করেছিল, হিমবাহ তার নিজের বুকে আটকে বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই দূর থেকে বয়ে নিয়ে এসেছিল তাদের চাষের জমি পর্যন্ত। বংশপরম্পরায় প্রকৃতির এই খেলার সাথে পরিচিত হত ফসল ফলানো মানুষেরা। পাহাড়ের তলদেশে পাথরের মসৃণতাও সেই হিমবাহের দূরে সরে যাওয়ার পদচিহ্ন। প্রচণ্ড ভারী হিমবাহ সরে যাওয়ার সময় কোথাও কোথাও পাথরের বুকে যেন আঁচড়ে দিয়ে গিয়েছিল, যার নিদর্শন আজও বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়।
১৮৩৭ সালে সুইস সোসাইটি অফ ন্যাচরাল সায়েন্সের অধিবেশন শুরু হয় বেজায় হট্টগোল দিয়ে। অ্যাসোসিয়েশনের তরুণ অধ্যক্ষ, যার বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল জীবাশ্মর উপর তার নতুন গবেষণার ফলাফল নিয়ে, তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরা পর্বতের লক্ষ্যভ্রষ্ট পাথর (erratic stone) নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। জানালেন, জুরা পর্বতের পাদদেশে চাষের জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরগুলো আসলে বহু বছর আগে হিমবাহ বাহিত হয়ে এসেছিল। ব্যস, বেধে গেল তর্ক। জীববিজ্ঞানী যদি তার নিজের বিষয় ছেড়েছুড়ে ভূতত্ত্বের কথা শোনাতে যায়, তাহলে বিজ্ঞানীরা শুনবেন কেন? এদিকে আগাসিজও নাছোড়বান্দা। তিনি স্ব-আবিষ্কৃত তুষারযুগের তত্ত্ব নিয়ে বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন। লোকে একবারেরই তার কথা পাতে দেবার মতো বলে মনে করল না।
লুই আগাসিজ
তুষার যুগের কথা এর আগেও যে বিজ্ঞানীরা বলেননি, তা কিন্তু নয়। তবে তাদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। আগাসিজ তাদের কর্ণ ধরে সেই গল্প শোনাতে চাইলে কেউ শুনবে কেন? আগাসিজ বললেন, বড়ো বড়ো গ্রানাইট পাথরের চাই জুরা পর্বতে বয়ে আনল কে? এগুলো তো থাকার কথা মঁ ব্লাঁ পর্বতে। এরা হিমবাহের শক্ত বরফে আটকে ছিল। তারপর যেই না বরফ গলতে শুরু করল, পাথরের চাইগুলো খসে পড়ল যত্রতত্র।
লক্ষ্যভ্রষ্ট পাথর
বিজ্ঞানীরা যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই পাথরগুলোর নাম দিয়েছেন ‘ইর‍্যাটিক স্টোন’, বাংলায় বললে লক্ষ্যভ্রষ্ট পাথর। আগাসিজ যুক্তি দিলেন, লক্ষ্যভ্রষ্ট পাথর দেখে বোঝা যাচ্ছে, হিমবাহ একসময়ে জুরা পর্বতের অনেক নিচে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বসেছিল। হিমবাহ যদি পাহাড়ের পাদদেশে একসময় থেকে থাকবে, তবে নিশ্চয়ই বাইবেলে বর্ণিত বন্যার গল্প সত্যি হলেও হতে পারে। কিন্তু জল জমে বরফ হয়ে গেল কী করে? জলমগ্ন পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েই বরফ জমে গিয়েছিল?
এদিকে আগাসিজের হাত ধরে বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামাতে লাগলেন তুষার যুগের সত্যতা নিয়ে। ফল মিল হাতেনাতে। পরীক্ষা করে পাওয়া গেল ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন। মিলে গেল আগাসিজের কথা। পৃথিবীর অন্য জায়গাতেও সমুদ্রের ধারে, পাহাড়ের উপত্যকায় মিলল ছড়ানো ছেটানো এমন অনেক পাথর, যাদের থাকার কথা অনেক অনেক দূরে। বন্যার জলে এই ভারী ভারী পাথর ভেসে আসা অসম্ভব। একমাত্র জল জমে বরফ হয়ে হিমবাহে পরিবর্তন হলে তবেই সম্ভব পাথরের স্থানান্তরণ। ভূতাত্ত্বিকেরা এর নাম দিয়েছেন, ‘ড্রিফট থিওরি’।
(চলবে)

ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment