গল্পঃ দিগন্তস্যারের পড়া - চিরকুমার


দিগন্ত স্যারের পড়া

চিরকুমার

অঙ্ক বিষয়টা টুকুনের মাথাতে কিছুতেই যেন ঢোকে না। অন্য বিষয়ে পরীক্ষা মোটামুটি হলেও প্রতিবার অঙ্কতে এসেই হোঁচট খায় সে। অথচ ওরই বন্ধু বুবাই, পটলার অঙ্ক নিয়ে কোনও দুশ্চিন্তা নেই। আর যত ঝামেলা টুকুনের বেলায়!
ওরা সবাই পড়ে ক্লাস সেভেনে, কোচবিহার জেঙ্কিন্স স্কুলে। সেই ক্লাস থ্রি থেকে ওরা একসাথে পড়ে। ছোটো থেকেই স্কুলে তিনজনের দারুণ বন্ধুত্ব। ওদের মধ্যে বুবাই পড়াশোনায় সবচেয়ে ভালো, প্রতিবার ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকে। তা বলে পটলা বা টুকুনও পড়াশোনায় খারাপ নয়; তারাও থাকে ক্লাসে প্রথম দশ থেকে পনেরো জনের মধ্যে।
অঙ্ক নিয়েই টুকুনের ভীষণ ভয়। বন্ধুরা বলে অঙ্ক-ফোবিয়া। আবার অঙ্ক নিয়ে টুকুনের বিড়ম্বনারও শেষ নেই। আর এই নিয়ে সবচেয়ে বেশি হ্যাঁটা করে তার ছোটো বোন তিতলি। বিশেষ করে অঙ্ক পরীক্ষার আগেরদিন তার দুরবস্থা দেখে তিতলির হাসি যেন আর থামেই না। মনে মনে খুব রেগে গেলেও প্রিয় ছোটো বোনকে সে কিছুই বলতে পারে না।

সময়টা মার্চ মাস। শীত চলে গেছে কিছুদিন হল। আস্তে আস্তে কোচবিহারে গরম পড়তে শুরু করেছে। এরকম একটা সময়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আর প্রতিবারের মতো এবারও জেঙ্কিন্স স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষার সিট পড়েছে। আর মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে টুকুনদের স্কুলেও ছুটি শুরু হয়ে গেছে। তবে স্কুল ছুটি হলেও টুকুনদের শান্তি নেই। দুই সপ্তাহ ছুটির পর স্কুল খুললেই শুরু হবে অ্যানুয়াল পরীক্ষা। তাই স্কুলে ছুটি পড়তে না পড়তেই টুকুনরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পড়াশোনায়। সবাই যার যার মতো করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই সময়টা টুকুনের দিগন্তবাবুকে ছাড়া একদম চলবে না।
দিগন্তবাবুর বয়েস ষাট পার হয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর হল। তিনি অঙ্কের অভিজ্ঞ শিক্ষক।  সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি স্কুলে পড়াতেন। অবসর নিয়েছেন অনেকদিন। এখন অবসরে কিছু ছেলেমেয়েকে টিউশন পড়ান। অঙ্কের প্রতি টুকুনের দুর্বলতা দিগন্তবাবু খুব ভালো করেই জানেন। তাই ওঁর বাকি ছাত্রছাত্রীদের থেকে এই সময়টা তিনি টুকুনের প্রতি একটু বিশেষ নজর দেন।

দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে টুকুনদের ছুটিও প্রায় শেষ। এবার অ্যানুয়াল পরীক্ষা আরম্ভ হবে।
ছুটির আগেই স্কুলের পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিয়েছিল। স্কুল খুললে টুকুনদের প্রায় রোজই পরীক্ষা রয়েছে। এক সোমবার বাংলা দিয়ে শুরু হয়ে আরেক সোমবার অঙ্ক দিয়ে শেষ। মাঝে রয়েছে ইংলিশ, জীবনবিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞান, ইতিহাস আর ভূগোল।
বাংলা দিয়ে টুকুনের পরীক্ষার শুরুটা খারাপ হল না। তারপর একে একে বাকি পরীক্ষাগুলিও টুকুনের মোটামুটি ভালোই হল। সারাবছর সে পড়াশোনা করেছে। তাই পরীক্ষা দিয়ে তার মনটা বেশ খুশি খুশি। টুকুনের বাকি বন্ধুদেরও পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হয়েছে।
শনিবার পরীক্ষার পর মাঝে একদিন ছুটি। তারপর সোমবার আবার অঙ্ক পরীক্ষা। আর অঙ্কের কথা ভাবলেই টুকুনের গায়ে প্রায় জ্বর চলে আসে।
শনিবার পরীক্ষা দিয়ে এসে রাতে টুকুনের খুব একটা পড়া হল না। কিছুটা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরার পর টিভি দেখে ও তিতলির সাথে খুনসুটি করেই সে সময়টা কাটিয়ে দিল।
রবিবার সকাল সকাল উঠে টুকুন অঙ্ক পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করল। কিন্তু যে ধরনের অঙ্কই সে প্র্যাকটিস করছে, ততই যেন সব গুলিয়ে যাছে। পাটিগণিত, বীজগণিত সব কেমন যেন কেমন ঘেঁটে ঘ হয়ে যাছে।
দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। কিন্তু টুকুন সকাল থেকে যেন একচুলও  এগোতে পারেনি। সারাদিন সে যা যা অঙ্ক করেছে, সব যেন ভোজবাজির মতো মাথা থেকে উবে গেছে।
বিকেল থেকে তাই টুকুন বেশ টেনশনে। অবশ্য তার মনটাও বিশেষ ভালো নেই। বাড়ির সবাই গেছে আলিপুরদুয়ারে এক আত্মীয়ের বিয়েতে। টুকুনেরও যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পরীক্ষার জন্যে সে যেতে পারেনি। তাই সে হা পিত্যেশ করে বসে আছে দিগন্তবাবুর জন্যে। প্রতিবছর অঙ্ক পরীক্ষার আগেরদিন স্যার একবার টুকুনদের বাড়িতে আসবেনই। না হলে টুকুনের অঙ্ক পরীক্ষা দেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। স্যার তাকে অনেকদিন থেকে দেখছেন, তাই এই বিশেষ দিনটিতে একবার তিনি টুকুনদের বাড়িতে ঢু মেরে যাবেনই।
দেখতে দেখতে সন্ধে হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন প্রায় সাতটা বাজে। এদিকে দিগন্তবাবুর দেখা নেই। টুকুনের মন আস্তে আস্তে অস্থির হয়ে উঠছে। টেনশনে সে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে শুরু করেছে।
এরই মধ্যে বাইরে কখন যে মেঘ করেছে টুকুন টের পায়নি। হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হল। সাথে জোরে জোরে বাজ পড়ার আওয়াজ শোনা গেল। দুয়েকটা আওয়াজ শুনে মনে হল, টুকুনদের বাড়ির আশেপাশে যেন কোথাও বাজ পড়ল। বাজটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারেন্ট চলে গেল। আর সাথে সাথে পুরো বাড়ি যেন অন্ধকারের কালো চাদরে ঢেকে গেল। অবশ্য টুকুন অন্ধকার দেখে ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। অন্ধকারে দেওয়াল ধরে ধরে সে ঠিক পৌঁছে গেল পড়ার টেবিলের কাছে। টেবিলের উপর রয়েছে চার্জার লাইট। সেটা জ্বালিয়ে দিতেই পড়ার ঘরটা হালকা সাদা আলোয় ভরে গেল।
এদিকে বাইরে ঝড়ের দাপাদাপি যেন বেড়েই চলেছে। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত আটটা। টুকুনের মনে আস্তে আস্তে দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে। আজকেই কি এই ঝড় হওয়ার ছিল? এই ঝড়জলে যদি দিগন্তবাবু না আসেন! তাহলে তার অঙ্ক পরীক্ষার কী হবে? ভেবেই চলেছে সে।
মুহূর্তে দরজার শব্দ শোনা গেল।
“কে? কে এসেছে? কে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে?” কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইল টুকুন।
“ওরে আমি রে, তোর স্যার। দরজা খোল।” বাইরে থেকে জবাব এল।
স্যারের গলার আওয়াজ পেয়ে টুকুনের যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। “ওহ! স্যার, আপনি! আসুন, আসুন। আপনার জন্যেই আমি বসে আছি।” বলেই ছুটে গেল বাইরের ঘরের দিকে।
দরজা খোলার সাথে সাথে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন টুকুনের প্রিয় দিগন্তবাবু। এই ঝড়জলের মধ্যে স্যারের হাতে রয়েছে সেই বিখ্যাত ছাতা। অবশ্য বাইরে যা ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে তা কোনও ছাতাতে মানবে না। সে দেখল, স্যার প্রায় কাকভেজা হয়ে গেছেন।
“এ কী হাল হয়েছে আপনার, স্যার? আপনি তো পুরো ভিজে গেছেন। শুকনো জামাকাপড় দিই, বদলে নিন।” বলে উঠল টুকুন।
“ওরে আমার কিছু লাগবে না। তোর বাড়িতে আসতে গিয়েই এই দশা। এই তোকে একটু দেখিয়েই চলে যাব। আবার তো সেই বৃষ্টিতেই ফিরতে হবে।”
টুকুনের সঙ্গে স্যার পড়ার ঘরে প্রবেশ করলেন। এইবার চার্জার লাইটের হালকা আলোয় দিগন্তবাবুকে ভালো করে দেখতে পেল টুকুন। স্যারের পরনে সেই ট্রেডমার্ক চেক শার্ট আর প্যান্ট, বহু ব্যবহারে যা দীর্ণ। চোখদুটো কেমন যেন টকটকে লাল হয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে। মুখটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। মাথার চুল পুরো এলোমেলো। স্যারকে এরকম আবস্থায় দেখে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে টুকুনের।
“স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ? কেমন যেন লাগছে আজ আপনাকে!”
“আরে, না না। তোদের বাড়িতে আসার সময় একটু কেমন যেন করছিল। এখন সব ঠিক আছে। আর আমি না এলে টুকুনবাবু পরীক্ষা দেবে কী করে?”
পরীক্ষার চিন্তায় আর কথা না বাড়িয়ে টুকুন চেয়ার টেনে পড়ার টেবিল বসে পড়ল।
দিগন্তবাবু পড়ার টেবিল বসে প্রথমেই অঙ্ক বইটা বন্ধ করে দিলেন। বললেন, “আজ আর এটার দরকার নেই রে।”
তারপর স্যার একটার পর একটা অঙ্ক করানো শুরু করে দিলেন। স্যারের পড়ানোর এমন গুণ যে টুকুন পুরো সময়টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাটিগণিত, বীজগণিতের সব অঙ্ক যেন টুকুনের মগজে গেঁথে গেল।
প্রায় ঘণ্টা খানেক কেটে গেল। পড়া শেষে স্যার বললেন, “তোকে মোটামুটি দেখিয়ে গেলাম, আশা করি কাল পরীক্ষায় এই ধরনের অঙ্কই করতে হবে।”
টুকুন মাথা নেড়ে স্যারকে সম্মতি জানাল।
“বাইরে বৃষ্টিটা একটু ধরে এসেছে। এবার আমি চলি। ভালো করে পরীক্ষা দিস।” বলেই স্যার উঠে পড়লেন। পরমুহূর্তেই টুকুন তাকিয়ে দেখে চেয়ারে স্যার নেই, চলে গেছেন। বাইরের ঘরের দরজাটা বন্ধ করার একটা আওয়াজ পাওয়া গেল। টুকুন বুঝল, দিগন্তবাবু বের হয়ে গেলেন।

পরদিন সকাল সকাল টুকুন পরীক্ষা হলে পৌঁছে গেছে। তখনও ওর বাকি বন্ধুরা এসে পৌঁছয়নি। পরীক্ষা শুরুর সময় প্রশ্নপত্র পেয়ে টুকুনের বেশ আনন্দ হল। প্রশ্ন বেশ ভালো এসেছে। আর অবাক করার মতো বিষয় হল, কাল দিগন্ত স্যার ঠিক যে ধরনের অঙ্ক করিয়েছেন, ঠিক সেই ধরনের অঙ্কই প্রায় এসেছে।
আস্তে আস্তে সে একেকটা অঙ্ক করা শুরু করল। এত ভালো অঙ্ক পরীক্ষা সে কখনও দেয়নি। পাটিগণিত বা বীজগণিত যাই হোক না কেন সব অঙ্কই আজ তার বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আর দিগন্তবাবুর সৌজন্যে পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে কেমন যেন জলবৎ তরলং মনে হচ্ছে।
পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে টুকুনের অঙ্ক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। ক্লাসের বাকি ছেলেরা তখনও অঙ্ক নিয়ে লড়ে চলেছে। বুবাই আর পটলাও খুব ব্যস্ত দেখা গেল।
বেশ কিছুক্ষণ রিভিউ করার পর টুকুন দেখল আর কিছু করার নেই। তাই সে টিচারের কাছে খাতা জমা দিয়ে ক্লাস ছেড়ে বের হয়ে এল। তখনও পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বাজাতে মিনিট পনেরো বাকি।
পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে টুকুন স্কুলের সাইকেল স্ট্যান্ডের সামনে চলে এল। অপেক্ষা করতে লাগল বুবাই আর পটলার জন্যে। পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বাজার কিছুক্ষণ পরে ওরাও হেলতে দুলতে এসে হাজির হল।
“কী রে টুকুন, তোর এত তাড়াতাড়ি অঙ্ক পরীক্ষা শেষ হোল কী করে?” বুবাই জানতে চাইল।
“সব দিগন্ত স্যারের কামাল রে! স্যার এত ভালো পড়ান...”
“এর মধ্যে আবার দিগন্ত স্যারকে কোথায় পেলি তুই?” পটলা জানতে চাইল।
“কেন? স্যার তো কাল রাতে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।”
“তোর বাড়িতে! তুই জানিস না কিছু?” অবাক হয়ে বলে উঠল পটলা।
“কেন? কী হয়েছে?”
“কাল দিগন্তবাবু মারা গেছেন।” বলে উঠল বুবাই।
“কী বলছিস? কখন? কোথায়? কীভাবে?” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল টুকুন।
“কাল রাত আটটার আশেপাশে। ঝড়ের সময় গোলবাগান মোড়ের কাছে গাছ-চাপা পড়ে স্যার মারা গেছেন।” জানাল বুবাই।
“বলিস কী রে! তাহলে যে স্যার রাতে আমাকে...” বলতে বলতে দুই চোখ ঝাপসা হয়ে এল টুকুনের। আর টলতে টলতে পড়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে বুবাই আর পটলা কোনওমতে ধরে ফেলল তাকে।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

1 comment:

  1. গল্পের প্রচ্ছদটা বেশ ভালো হয়েছে

    ReplyDelete