প্রচ্ছদঃ অনুষ্টুপ শেঠ





সূচিপত্র

কচিপাতা
আঁকিবুঁকি

কমিকস

জীবনের গল্প
রংরুট দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

অণুগল্প
পিছুটান শাশ্বতী চন্দ
মিষ্টিমুখ বিভাবসু দে
বশীকরণ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভূতনাথবাবুর ডায়েরি কৌশিক ভট্টাচার্য
মানুষের মতো মানুষ অরিন্দম দেবনাথ
ঢেঁকুর তন্ময় বিশ্বাস

গল্প
স-রোষ সতী সঞ্জীবকুমার দে
আশ্চর্য আধুলি দেবলীনা দাস
শব্দ সন্ধানী অরিন্দম দেবনাথ
বজঘট বনাম পলু মৃণালকান্তি সামন্ত
সারপ্রাইজ ধূপছায়া মজুমদার
উপহার সায়নদীপা পলমল
নির্জীব অপর্ণা গাঙ্গুলি

ছড়া
মাসির রান্না স্বপনকুমার বিজলী
কোন উৎসব ডাক দিয়েছে সুশান্ত কুমার ঘোষ
হাসি সুদীপ্ত বিশ্বাস
ভূত ছড়াকার শঙ্কর দেবনাথ
ছোট্ট মেয়ে বনশ্রী মিত্র
সেই যে ভূতের ছানা পিয়ালী বসু
একটি প্রীতির রাখি গদাধর সরকার
শীতের খবর অমরেশ বিশ্বাস

আলোর দিশারী

ধারাবাহিক
তুষার যুগ (দ্বিতীয় পর্ব) অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার স্কুল

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি, যা শুনি, তারই উত্তর খুঁজি কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
বংশবদ ও বেয়াড়া তরলের গল্প সুজিতকুমার নাহা

বইকথা

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ ঐশিক





শ্রীমান ঐশিক ওরফে ক্যাপ্টেন নিমো। সদ্য চারে পা দিলেন।
ভালোবাসেন খেলতে, আঁকতে, বকবক করতে, গান গাইতে, গল্প শুনতে শোনাতে পড়তে।
প্রিয় খাদ্য আলুসেদ্ধ ভাত এবং বিনিনি (বিরিয়ানি)।
সবথেকে না-পসন্দ কাজ হল ঘুমোনো।

কচিপাতাঃ কমিকসঃ রাজুদা ও পল্টুঃ শাশ্বত রায়





জীবনের গল্পঃ রংরুটঃ দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী



এক

আর্থিক বিপর্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা আমার জন্য যেদিন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল, সেদিনের সেই মানসিক অশান্তি আমার মতো যারা মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন তারাই একমাত্র উপলব্ধি করতে পারবেন। মা ও ছোটো ছোটো ভাইবোনদের প্রতিপালনের দায়িত্ব আমাকে যে কৈশোরেই বহন করতে হবে এ-কথা নিশ্চিত হয়ে গেল। আমি তখন ঢাকায় আমার মামার বাড়ি থেকে পড়ছিলাম। নানা অফিসে ঘুরে ঘুরে চাকরির যখন কোনও সুবিধাই করতে পারলাম না তখন বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহে আমার এক জ্যাঠতুতো ভাইয়ের আশ্রয়ে এলাম। আমার উক্ত ভাই তখন পুলিশ বিভাগের একজন পদস্থ কর্মচারী। অনন্যোপায় হয়ে আমাকে পুলিশ বিভাগের একটি নিম্ন পদ গ্রহণ করতে হল। চাকরি পেলে সাধারণত মানুষ খুবই আনন্দিত হয়, আমার কিন্তু সেরকম কিছুই বোধ হল না। বরং জীবনের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সমস্ত মনটা সেদিন হতাশায় পূর্ণ হয়ে গেল। জীবনের কত উচ্চ আশা, ছাত্রজীবনের যত রঙিন স্বপ্ন, সমস্ত যেন এক নিমেষে কোথায় মিলিয়ে গেল। আমি ঢাকার ছাত্র, ঢাকা তখন রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রগামী। সেই আবহাওয়া যে আমার মনেও লাগেনি, এ-কথা স্বগত অস্বীকার করবার উপায় ছিল না। তারপর তখন একটি চলতি কথা ছিল যে ‘মারের শেষ ঝাঁটার বাড়ি, চাকুরির শেষ দারোগাগিরি’। এতেই বুঝে নিয়েছিলাম যে আমার জীবনের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল। এ-কথা ঠিকই যে আমার এছাড়া আর কোনও উপায়ও ছিল না। কিন্তু আমার যে তখন মাত্র উনিশ-কুড়ি বছর বয়স! যে আবেষ্টনীতে ঢাকায় ছাত্রজীবন কাটিয়েছি তাতে তো কোনওমতেই আমার এই চাকরি-প্রাপ্তি মানসিক শান্তি আনতে পারেনি। যদিও আর্থিক সমস্যার কিছুটা লাঘব হয়েছিল।
মনে আছে, কিছুদিন পর্যন্ত আমি যখন এক মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম তখন একদিন আমার এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি মন দিয়ে আমার সব কথা শুনলেন ও খুব উৎসাহ দিয়ে বললেন, “দেখো, Service is not mean, unless the man himself is mean - কোনও চাকরিই তুচ্ছ নয়, মানুষ তার হীন আচরণে ছোটো করে ফেলে। তুমি যদি ভালো হও, তবে এই অবাঞ্ছিত ডিপার্টমেন্টের কিছু ভালো করতে পারবে। মনে রেখো, তোমার যখন পড়া আর এগোল না তখন এই ডিপার্টমেন্টকে তুমি মনে করো তোমার বিশ্ববিদ্যালয়। শুনেছি এখানেও বিদ্যালয়ের মতো প্রমোশনের ধাপ আছে।” সত্যিই বলতে বাধা নেই, এ কথাগুলো আমার সমস্ত মানসিক বেদনা তো দূর করেই ছিল, মনে এনেছিল প্রচুর শক্তি ও আনন্দ। এই শক্তি ও আনন্দ হয়েছিল আমার নতুন জীবনের চলার পথের পাথেয়। এই ধ্রুবতারা থেকে যে কোনওদিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হইনি তার প্রমাণ আমার সুদীর্ঘ একটানা ঊনচল্লিশ বৎসর অন্তে এই অবাঞ্ছিত পুলিশ বিভাগের একটি উচ্চপদ থেকে সুনামের সঙ্গে অবসর গ্রহণ। যদিও এটা একটা আত্মপ্রশংসা হয়ে গেল আমার, কিন্তু বলার উদ্দেশ্য তা নয়। আমার কথা হল যে, আমার সেই অধ্যাপকের সদুপদেশ যে সত্যই আমার ভেতর মন্ত্রশক্তির প্রেরণা এনেছিল তা প্রকাশ করা এবং আমার মতো কোনও যুবক যদি এরূপ কোনও নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে পড়েন, তিনি হয়তো তাঁর কর্মজীবনে এর থেকে কিছু সাহায্য পাবেন, এই আশা।

দুই

যা হোক কাজ তো একটা মিলল, কিন্তু এই কর্মজীবনের প্রারম্ভিক প্রস্তুতি তো ভয়াবহ। সাধারণ লাগামহীন যে জীবন এতদিন যাপন করেছি, তার সঙ্গে তো এর কোনও মিল নেই। এ-কথা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারলাম যেদিন ট্রেনিং স্কুলে যোগ দিলাম। ১৯৩৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস অবধি ছিল আমার ট্রেনিং পিরিয়ড। এই ভরসা ছিল যে আমি একা নই, আরও আমার মতো বলির সংখ্যা প্রায় শতেকের উপর। সমস্ত চলাফেরা কঠোর নিয়মশৃঙ্খলাধীন। সে নয় প্রথম প্রথম কষ্ট হবে। সবচেয়ে অসুবিধা হয়েছিল অশিক্ষিত হাবিলদারদের অশুদ্ধ ইংলিশ কমান্ড। দু-চারটি বললেই বোধহয় সমস্তটা আন্দাজ করতে কষ্ট হবে না। লাইন করে আমাদের ইনচার্জ একটি Water tank-এর কাছে নিয়ে এসে বললেন, “ইয়ে অভরকা ট্যাঙ্কি। ইয়ে অরিনালーরাত কা ওয়াস্তে।” অর্থাৎ urinal শুধু রাত্রেই যাওয়া চলবে, দিনে নয়। দিনে যেখানে যেতে পারা যাবে তা দেখে খুবই দুশ্চিন্তা হয়েছে, ততক্ষণে লক্ষ্যস্থল পর্যন্ত যাওয়া যাবে কি না খুবই সন্দেহ হয়েছিল।
সে যা হোক, সবকিছুতেই বিনা অপরাধে উত্তীর্ণ হওয়া গেল। একদিনের দুর্ভোগের কথা না বলে পারছি না। কারণ, সেদিন ইনচার্জের ইংরেজি কমান্ড না বুঝতে পেরে অত্যন্ত ভয় পেয়ে পেছনদিকে তাকিয়ে আমাদের সাংঘাতিক অপরাধ করার দরুন একঘণ্টা বেশি ড্রিল করতে হয়েছিল। ব্যাপারটা হল, আমাদের ইনচার্জ সাহেব প্যারেড গ্রাউন্ডে হঠাৎ কমান্ড দিলেন ‘বাগ পিছে’ অর্থাৎ ব্যাক মানে যদি ‘বাগ পিছে’ হয় তাহলে তো ভয়েরই কথা।

তিন

দেশ বিভাগের পূর্বে যারা পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন তাদের সবাইকে ট্রেনিংয়ে যেতে হত অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার অন্তর্গত সারদা নামক একটি স্থানে। পদ্মানদীর তীরে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে এই শিক্ষাশিবির। আশেপাশে কোনও গ্রাম নেই বললেই চলে। খাবার স্টল, দোকান-বাজার সবই নিজস্ব। কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার অধীন থেকে জীবন যখন হাঁপিয়ে উঠত, তখন সারদার প্রাকৃতিক দৃশ্য কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে মাতৃস্নেহের মতন মনপ্রাণ ভরে দিত। তাই বিদায়ের দিনে এ হেন যায়গা ছেড়ে আসতে মনে খুব ব্যথা বোধ হয়েছিল। যে জায়গায় প্রথম প্রথম একদিনও থাকতে ইচ্ছা হত না, তাই শেষের দিকে মনে হয়েছিল খুবই মনোরম। পুলিশ ট্রেনিংয়ের এই শিক্ষাপদ্ধতির প্রশংসা না করে থাকা যায় না। দলে দলে কতকগুলি নিয়মশৃঙ্খলাহীন যুবকদের নানারূপ শিক্ষার ভেতর দিয়ে গড়েপিটে মানুষ করে পুলিশ বিভাগের মাধ্যমে দেশবাসীর সেবার জন্য পাঠিয়ে দিত। সে উদ্দেশ্য যে কতখানি সফল হত তা সকলেই জানেন। জেলায় ফিরে এদের যখন নানা স্থানে পোস্টিং করা হত তখন জনগণের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার পরিবর্তে এরা নিজেরাই হয়ে উঠত অত্যন্ত বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল। দেশসেবকের পরিবর্তে এরা হয়ে উঠত জনগণের প্রভু। জনগণ এদের ভালোবাসা দূরের কথা, দেখলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠত। আমার কর্মজীবনে অবশ্য এর প্রত্যেক জিজ্ঞাসার উত্তর পেয়েছিলাম।
ট্রেনিংয়ে থাকতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা কীভাবে চলত তার একটা রেখাচিত্র আঁকা যেতে পারে। শুধু রবিবার, বৃহস্পতিবার আর ছুটির দিন ছাড়া আমাদের ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠতে হত। প্রথমদিনের কথা মনে পড়ে। শুনলাম সকাল ছ’টায় ‘ফল ইন’ অর্থাৎ প্যারেড আরম্ভ হবার আগে লাইন দিয়ে মাঠে দাঁড়াতে হবে। ইন-চার্জ হাবিলদার রাতের রোল কলের সময় বজ্র নির্ঘোষে জানিয়ে দিলেন যে ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হওয়া চাই। অতএব আমাদের বুঝে নিতে দেরি হল না যে পাঁচটাই হবে আমাদের সময়। সে তো হল। কিন্তু ভোর তিনটেয় না উঠতে পারলে তো কোনওমতেই সব কাজ সেরে তৈরি হওয়া সম্ভব হবে না। সকলেই এক দুশ্চিন্তা নিয়ে শুতে গেলাম। পরস্পর আলোচনা করে ঠিক করলাম, খুব করে জল খাওয়া হবে আর যে আগে উঠবে সে ব্যারাকের সবাইকে দেকে দেবে।
হঠাৎ একটা গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, অধিকাংশ শিক্ষানবীশের তৈরি হওয়া আরম্ভ হয়ে গেছে। বিউগলের মর্মভেদী করুণ শব্দ বেজে চলছে। তখন আমার মনে হয়েছিল, বিউগল যেন বলছে, ‘ওঠো, জাগো, আজকের কাজ এখন থেকে শুরু হবে।’ ট্রেনিং ক্যাম্পে যারা এরূপ শিক্ষায় ছিলেন তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এই বিউগলের মর্মভেদী শব্দ সারাদিনের কাজে কীরূপ উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাত। এরই গানে তৈরি হওয়া শুরু, প্যারাড আরম্ভ, সাময়িক বিশ্রাম, প্যারাড শেষ, আইনের ক্লাশে যাওয়া ইত্যাদি। প্রত্যেক সময়ের এই বিউগলের শব্দের একটি করে নাম আছে এবং এর সাথে পরিচিত হতে না পারলে প্রতি পদেই অসুবিধা। ভোর চারটেয় যে বিউগল বাজে তার নাম ‘রিভেলিーতখন ফ্ল্যাগ ওঠানো হত। সন্ধেয় যেটা বাজে তার নাম ‘রিট্রিট’ーফ্ল্যাগ নামানোর সময়। সারাদিনের কর্মসূচি এমনিভাবে তৈরি বিউগলের শব্দ সব সময়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করত।
যা হোক ক্রমে সবই অভ্যাস হয়ে গেল। চলাফেরা, কথা বলা সবই নিয়মশৃঙ্খলার দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। আমি ১৯৩৬ সালের কথা বলছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হবার তিনবছর আগের কথা। আমাদের প্রত্যেক কাজ লাইন দিয়ে করতে হত। এত ভিড়, এত লোক, কিন্তু এতটুকু কোনও গণ্ডগোল নেই। সবই যেন ভিন্ন জগতের ব্যাপার। এখানে আসার আগে তো এরূপ দেখিনি। ছাত্রজীবনে, সমাজ-জীবনে যেন সব কাজেই একটা বিশৃঙ্খলা দেখে এসেছি। তাই এত শৃঙ্খলার অধীনে থেকে সব সময়ে একটু গর্ব অনুভব করতাম।
কলেজে পড়বার সময়ে County Cricket Match নামে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। তার একটি কথা আমার মনে পড়ল। সেখানে ছিল To be one of numerous body, অর্থাৎ দলের একজন হওয়া আর To have the authority to say – WE, অর্থাৎ একটি দলের হয়ে কিছু করা বা বলার অধিকার যে কত গর্ব আর আনন্দের জিনিস তা প্রতি পদক্ষেপে অনুভব করতাম। তবে সব উৎসাহ উবে যেত পিটি বা ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের দিন। একঘণ্টা চলত খালি পায়ে ও স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। সে নাচাকোঁদা যেন শেষ হতে চাইত না। মাঘ মাসের শীতে পদ্মার ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস যখন আমাদের অনাবৃত শরীরে হাজার মৌমাছির হুল ফোটাত তখন মনে হত বোধহয় এখান থেকে আর ফিরে যেতে পারব না। এইজন্যেই কি প্রথম মাসের সকালে প্রতিদিনই Quinine Parade হত! অর্থাৎ, লাইন করে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের মাঠে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত। তারপর ভীমাকৃতির কালো রঙের একজন লোক এসে প্রত্যেককে ওষুধের গ্লাসে করে এক গ্লাস তরল পদার্থ গলায় ঢেলে দিত। তার প্রচণ্ড তেতো স্বাদ আজও যেন গলায় লেগে আছে।
এই ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের একদিনের ঘটনা মনে করলে এখনও আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। অনেকগুলো কঠিন শরীরচর্চার মধ্যে কেবল দুটোর কথা আমি বলব। একটি হল দশ ফুট উঁচু কংক্রিটের দেওয়াল টপকানো (Wall jumping), আর আরেকটা পঞ্চাশ ফুট দড়ি বেয়ে ওঠা আর নামা (Rope climbing)। এসব কিন্তু নিজের ইচ্ছামতন করলে চলবে না। ইন-চার্জ হাবিলদারের কমান্ড মতন চলত ক্রমপর্যায়ে। শীতের সকালে যখন ব্যায়াম করতে করতে এই দেওয়ালের কাছে আসতাম তখন ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকত। শীতের শিশিরসিক্ত এই দেওয়ালের বুকে লাথি মারতে গেলেই অধিকাংশ সময়ে পা পিছলে বুকে ও নাকে আঘাত লেগে যাওয়ার খুব বেশি সম্ভাবনা থাকত।
একদিন সত্যিই একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এরূপভাবে লাথি মারতে গিয়ে আমাদের একজন পা হড়কে হঠাৎ বুকে ও মুখে সাংঘাতিকভাবে আঘাত পাওয়ার জন্য তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম ট্রেনিং নেওয়ার মতন শারীরিক যোগ্যতা সে আর ফিরে পায়নি ও কাজেই এই চাকরিও তাকে আর করতে হয়নি। তার কথা মাঝে-মাঝেই আমার মনে হত। পরে পরিচিত অনেকের কাছে তার খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু কোনও সংবাদই আর জানতে পারিনি। শুনেছি Rope climbing-এও এরূপ দুর্ঘটনা হত। পরে অবশ্য এই দুটিই উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমাদের আইনের ক্লাসের একজন ইনস্পেক্টর শিক্ষক ছিলেন। ঘোড়া থেকে পড়ে তার ডানপায়ে চোট লাগে এবং শেষপর্যন্ত পা কেটে বাদ দিতে হয়। Field work-এর অনুপযুক্ত হওয়ার জন্য উনি হয় আইন ক্লাসে পড়াতেন, নয়তো পুলিশ কোর্টের মামলা পরিচালনা করতেন।
ঘোড়া হতে আরম্ভ করে মেথর পর্যন্ত সকলেই আমাদের শিক্ষক ছিল। কারোর আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করা চলত না। যা হোক এ হেন ট্রেনিং করে জেলা হেড কোয়াটার্সে ফিরে এলাম বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে। তখন মনে হয়েছিল সত্যিই তো প্রকৃত যুবক তৈরি হতে হলে এরূপ ধরনের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষার সুযোগ দেশের প্রত্যেক যুবকের প্রয়োজন। আজ দেশ স্বাধীন। আমার মনে হয়, এরূপ ট্রেনিং বাধ্যতামূলক হলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভালোই হত।
সব হাবিলদারই যে অশুদ্ধ উচ্চারণ করত তা নয়। ক্রমে এদের সবরকম কমান্ড আমাদের আয়ত্ত হয়ে গিয়েছিল আর আমরাও এদের শিক্ষক হিসেবে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। ট্রেনিং কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ ও প্রধান ড্রিল শিক্ষক, সুবাদার প্রভৃতি উর্দ্ধতন সম্প্রদায় থেকে আমাদের আগলে রাখতে তাদের চেষ্টা দেখেছি। ফাইনাল প্যারেডে যখন কৃতকার্য হয়ে বেরিয়ে এলাম তখন আমাদের চেয়ে তাদের গর্বই বেশি ছিল।

_____

অণুগল্পঃ পিছুটানঃ শাশ্বতী চন্দ




জোরে ধাক্কা দিলেন গিন্নি কর্তাকে, “এই ওঠো। চোর এসেছে ঘরে!”
আচমকা ঘুম ভেঙে যেতে ক্ষিপ্ত কর্তা, “দুত্তোর। শান্তিতে দু’দণ্ড ঘুমাতেও দেবে না? সারাজীবন তাই করেছ। আমি ঘুমালেই তোমার ঝনর ঝনর করে বাসন মাজা, ঘসর ঘসর করে ঘর ঝাঁট দেওয়া, না হলে কটর কটর করে কথা বলা। এই তো অভ্যাস ছিল তোমার। তাই বলে এখনও তাই করবে?”
গিন্নি মুখ ভার করে বললেন, “তুমিও তো সারাজীবনের অভ্যাসই বজায় রেখেছ। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে যাচ্ছ তো যাচ্ছই। এই ঘুমের ফেরে পড়েই তো কোনও কাজকারবারই করলে না। বাপ-পিতেমোর বিষয়সম্পত্তি ভাঙিয়ে খেয়েই চালিয়ে দিলে।”
“তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে শুনি? ছেলে নেই, পুলে নেই। টাকা রেখে যেতাম কার জন্য? যাও তো। নিজে ঘুমাও, আমাকেও ঘুমাতে দাও।”
“আরে আবার ঘুমায়!” মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে গিন্নি, “চোর যে সর্বস্ব চুরি করে নিয়ে যাবে গো!”
“হাসালে গিন্নি। কী আর নেবে চোর? সবই তো ভোলা আগেই নিয়ে গিয়েছে। আরে বাবা, তুই আমার একমাত্র ভাইপো। সব বিষয়সম্পত্তি তো তুইই পেতি। আমাদের মরা পর্যন্ত তর সইল না? বোকা ছেলে। কীসের পিছুটানে জেগে আছ গিন্নি? শান্তিতে ঘুমাও দেখি।”
খানিক চুপ করে থাকেন গিন্নি। তারপর বলেন, “ভাঁড়ার ঘরের মেঝের তলায় যে আমাদের হাড়গোড়গুলো আছে, সেগুলোর যদি খোঁজ পেয়ে যায় চোর! যদি নিয়ে যায়? পিছুটান কি আর সহজে যায় গো?”
_____

অণুগল্পঃ মিষ্টিমুখঃ বিভাবসু দে




সাতসকালে কলিং-বেলের শব্দে দরজা খুলতেই দেখি বাইরে ধীমানদা দাঁড়িয়ে। মুখে বেশ চওড়া একখানা দন্তকান্তি স্মাইল!
“গুড মর্নিং, মাই ডিয়ার অজিত!” বলেই একেবারে জড়িয়ে ধরে বেশ একটা জম্পেশ কোলাকুলি সেরে ফেলল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, গুড মর্নিং। তা এত সেজেগুজে? কী ব্যাপার?”
“আরে তেমন কিছু না। এই নে, আগে মিষ্টিগুলো ধর, তারপর বলছি।” বলেই এক হাঁড়ি রসগোল্লা এগিয়ে দিল আমার দিকে। ধীমানদার হাতে রসগোল্লা! স্বপ্ন নয় তো? নিজেকে নিজেই একবার চিমটি কেটে দেখে নিলাম। যে ব্যক্তি জীবনে কাউকে এক কাপ চা খাওয়াল না, সে আজ বাড়ি বয়ে এসে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে! ব্যাপারটা কী? কিছু গোলমাল নেই তো?
“না না, বিশেষ কিছু না।” নিজে থেকেই বলতে লাগল ধীমানদা। “আসলে এই ক’দিন হল একটা নতুন চাকরিতে ঢুকেছি, তাই ভাবলাম সবাইকে একটু মিষ্টিমুখ করিয়ে সুখবরটা জানাই।”
“বাহ্, দারুণ খবর তো! তা কী চাকরি?”
“ওই যে স্যুইট ড্রিমস কোম্পানি, নাম শুনেছিস নিশ্চয়ই, তাতেই সেলস ম্যানেজার। বেতনটাও বেশ ভালোই দিচ্ছে।”
নামটা যদিও চেনাশোনা ঠেকল না, তবুও ঘাড় নেড়ে বললাম, “জব্বর! অভিনন্দন, ধীমানদা!”
মনে মনে বেশ খুশিই হয়েছিলাম। তবে ওর চাকরির জন্যে ততটা নয় যতটা ওর মতো হাড়কেপ্পনের টাকায় মিষ্টিমুখে।
সেদিন আর বেশিক্ষণ বসল না ধীমানদা, চা-টা খেয়েই উঠে পড়ল। ওর নাকি আরও কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করা বাকি।
সারাটা দিন ধীমানদার রসগোল্লায় বেশ রসিয়ে রসিয়ে মিষ্টিমুখ করে বিকেল নাগাদ চায়ের কাপটা নিয়ে বসলাম বারান্দায়। মনমেজাজটা বেশ ফুরফুরে। এমন সময় হঠাৎ এক অপরিচিত ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন।
“আজ্ঞে, আপনিই অজিত বসু?”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“এই যে আপনার বিল, তিনশো টাকা।”
“কীসের বিল?”
“সকালবেলা আপনি আমাদের স্যুইট ড্রিমসের ‘বাড়ি বসে মিষ্টিমুখ’ সার্ভিসে যে একহাঁড়ি রসগোল্লা কিনেছিলেন, তারই বিল। আমাদের সেলস ম্যানেজার ধীমানবাবু নিজেই তো নিয়ে এসেছিলেন।”
পাশের টেবিলে তখনও মুখ হাঁ করে পড়ে আছে রসগোল্লার খালি হাঁড়িটা। চায়ে ডোবানো বিস্কিটের আধখানা আমার হাত থেকে টুপ করে খসে তলিয়ে গেল চায়ের কাপে।


_____

অণুগল্পঃ বশীকরণঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়




ক্লাস ইলেভেনের ফাইনাল পরীক্ষা। শেষ হবে অঙ্ক দিয়ে। পরীক্ষা শুরু হবার ঠিক দশ মিনিট আগে আমার পাশের ডেস্কে এসে বসল আমাদের ক্লাসের বিখ্যাত ছাত্র দেবেশ। গত দু-দুটো বছর ফেল মেরে আমাদের ক্লাসে তৃতীয়বারের জন্য সে ভাগ্য পরীক্ষায় নেমেছে। ডেস্কে বসেই আমায় বলল, “এই যে গুড বয়! সব তৈরি? হুঁ হুঁ বাওয়া, এবার আমাকে কেউ বিট করতে পারবি না দেখিস!”
দেবেশ পারে না হেন কোনও কাজ নেই। অঙ্ক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে আবার কী ভেল্কি দেখাবে কে জানে! আর বসবি তো বস আমার পাশেই? পকেট থেকে কিছু কদাকার শুকনো শিকড়বাকড় বার করে ডেস্কে রেখে ফিসফিস করে বলল, “এই হল বশীকরণ মন্ত্র লাগানো জড়িবুটি। এবার আমার একশোয় একশো পাওয়া কে আটকায় দেখি।”
ইতিহাসের স্যার জীবনবাবু সেদিন গার্ডের ডিউটিতে। প্রশ্ন আর উত্তরপত্র ডেস্কে রাখতেই না রাখতেই দেবেশ উঠে গিয়ে জীবনবাবুর সামনে জোড়হাত করে দাঁড়াল। হাতে জড়িবুটি। স্যার সভয়ে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা কী? মতলবটা কী রে?”
“স্যার, বুড়োশিবতলায় মানত করেছি। বাবার মন্ত্রপূত আশীর্বাদ। এবার পাশ করতেই হবে। রেখে দিই?”
স্যার আপত্তি করলেন না। ডেস্কে ফিরে এসে দেবেশ বিড়বিড় করে বলল, “এবার বশীকরণের জাদু দেখবে বাছাধন।”
পরীক্ষাপত্র বিলি করে কিছুক্ষণের মধ্যে জীবনস্যার টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। বুঝলাম, দেবেশের বশীকরণ কাজ শুরু করে দিয়েছে। দেবেশ পকেট থেকে মোবাইল বার করে সব উত্তর লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দেবেশের কুকীর্তি মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। বেজায় রাগ হল। শেষ ঘণ্টা বাজার ঠিক আধঘণ্টা আগে হেডস্যার পরীক্ষার হলে ঢুকে বললেন, “এ কী জীবনবাবু, আপনি ঘুমোচ্ছেন?”
জীবনবাবু ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, “সরি স্যার, আসলে সকালে ভাতের সাথে কলাইয়ের ডাল আর আলুপোস্ত খাইয়ে দিল বাড়িতে, তাই চোখটা… তবে ওরা খুব ভালো ছাত্র স্যার, গোলমাল করলে আমি ঠিক শুনতে পেতাম।”
রেজাল্ট বেরুল। কোনওমতে কান ঘেঁষে অঙ্কে পাশ করে টুয়েলভে উঠে গেলাম। শুনলাম, দেবেশ আবার ফেল। ওর অঙ্কে শূন্য পাওয়াটা বিস্ময়কর। স্কুল গেটের সামনের গাছতলায় শুকনো মুখে ওকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে, তুই যে সেদিন মোবাইল খুলে টুকছিলি? তাহলে এমন হল কী করে?”
“আর বলিস না। যে সাইট দেখে উত্তর লিখছিলাম, ওটা নাকি বোকা বানাবার এক ঘোস্ট সাইট!”
হাসি চেপে ফিরে আসছি, জীবনবাবু দেখি আমাদের দিকেই হেঁটে আসছেন। দেবেশকে দেখে বললেন, “দুঃখ করিস না বাবা। তিন-তিনবার ফেল করলে স্কুল টিসি তো দেবেই। তবে সেদিন টেবিলে যে জড়িবুটিগুলো রেখেছিলি, সেগুলো বড়ো উপকারি। বায়োলজির অঙ্কিতবাবু বলছিলেন, ওগুলো সুগারের যম। একমাত্র পাহাড়ের দিকেই নাকি পাওয়া যায়। কী বলব বাবা, খেয়ে আমার সুগার একদম নিচে নেমে গেছে!”

_____

অণুগল্পঃ ভূতনাথবাবুর ডায়েরিঃ কৌশিক ভট্টাচার্য



১০ নভেম্বর ০১৮
‘অমাবস্যার রাতে শ্মশানের বুড়ো অশ্বত্থগাছের নিচে বসে বিশ্বনাথবাবু হাই তুললেন।’
আমার ‘অদ্ভুতুড়ে রাত’ গল্পটা শুরু করেছিলাম এইভাবে। শিহরণ জাগানো গল্প। সাড়ে বারো পৃষ্ঠার মধ্যে মোট চোদ্দটা অপঘাত-মৃত্যু ঘটিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হল, যে সম্পাদককেই শোনাতে যাই, প্রথম লাইনটা শুনেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে থাকে। সবারই এক প্রশ্ন, দুনিয়াতে এত জায়গা থাকতে বিশ্বনাথবাবু হঠাৎ অমাবস্যার রাতে শ্মশানে গিয়ে বসলেন কেন? কী অদ্ভুত! দুনিয়াতে পাগল কি কম? স্রেফ সম্পাদকগুলোকে এক জায়গায় করলেই তো কত পাগল পাওয়া যাবে!

১১ নভেম্বর ২০১৮
একটু আগে ডম্বরু পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলাম গল্পটা নিয়ে। সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি আদক প্রথমে সময় নেই বলে হঠিয়ে দিতে যাচ্ছিল, তারপর হঠাৎ আমার হাতের লাঠিটার দিকে চেয়ে কী ভেবে বলল, “ঠিক আছে, পড়ে শোনান।”
শোনালাম গল্পটা। পুরো সাড়ে বারো পৃষ্ঠা। ঘড়ি ধরে ঠিক পঞ্চান্ন মিনিট সময় লাগল। মাঝে ধ্রুবজ্যোতি বার ছয়েক একটু ছটফট করেছিল, কিন্তু প্রতিবারই আমার লাঠিতে হাত রাখার সাথে সাথে সেটা বন্ধ হয়। গল্পটা শেষ করে বললাম, “কী? কেমন লাগল?”
“এক মিনিট দাঁড়াবেন একটু, বাথরুম যাব!” এই বলে আমি কিছু বোঝার আগেই সুড়ুত করে ধ্রুবজ্যোতি ভেতরে মিলিয়ে গেল। ফিরে এল যখন, দেখি ওর হাতেও একটা লাঠি一আমার লাঠির চেয়েও বড়ো আর মোটা। হাতে লাঠি থাকার জন্যই কিনা জানি না, ধ্রুবজ্যোতির মুখে আঠালো একটা হাসি লেগে আছে।
“দেখুন ভূতনাথবাবু, আপনার লেখার মূল সমস্যা হল অভিজ্ঞতার অভাব। ভূত নিয়ে এত লিখছেন, নিজে কি ভূত হয়েছেন কখনও? হা! হা! হা!”

১২ নভেম্বর ২০১৮
কী কাদাখোঁচার মতন বেরসিক এই ধ্রুবজ্যোতি আদক! তবে হা হা করে হাসলেও পরে মনে হল, কথাটা যেটা বলেছে সেটা মিথ্যে নয়। শুধুমাত্র ভূত সম্বন্ধে সরাসরি অভিজ্ঞতার অভাবই আমার লেখাকে দুর্বল করছে। সত্যিই তো, নিজে ভূত না হলে যা লিখব ভূত নিয়ে সবই তো তাহলে আর পাঁচজন লেখকের মতন গাঁজাখুরি গপ্প হবে। নাহ্‌, বাংলা সাহিত্যের আরও উন্নতির প্রয়োজনে যেভাবেই হোক ভূত হতে হবে আমাকে।

২০ নভেম্বর ২০১৮
আজ সাতদিন হল গলায় দড়ি দিয়ে ভূত হয়েছি। এই সাতদিনেই যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তা বলার নয়। চাইলেই ভূত নিয়ে সতেরোটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারি এখন। একটাই সমস্যা। মানুষ সম্পাদকদের মতন ভূত সম্পাদকরাও দেখছি আমার লেখার প্রথম লাইন শুনেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসা শুরু করে। বিরক্ত হয়ে তাই ঠিক করেছি, কি মানুষ কি ভূত, আর কোনও সম্পাদক নয়। এবার সরাসরি সত্যিকারের রসিক পাঠকদের লেখা শোনাব।
তোমরা তো আমার এই লেখা এতদূর পড়লে একটুও না থেমে। খুব ভালো লেগেছে নিশ্চয়ই? দেখা হচ্ছে তাহলে আজ রাতে!

_____

অণুগল্পঃ মানুষের মতো মানুষঃ অরিন্দম দেবনাথ


মানুষের মতো মানুষ

অরিন্দম দেবনাথ


“জানো বাবা, অডিটোরিয়ামের পর্দায় ভিডিওটা দেখার পর সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল। হাততালি আর থামছিল না। তারপর আমাকে ষ্টেজে ডেকে নিয়ে হেডমিস এই বইটা দিয়ে বললেন, ‘তুমি খুব লড়াকু। বড়ো হয়ে এই বইটা পড়বে।’ আর আমাদের ক্লাস টিচার-মিস ষ্টেজেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললেন, ‘ফরগিভ মি মাই সন, আই অ্যাম রিয়েলি সরি। গড ব্লেস ইউ।’ জানো, আজকে টিফিনের পর একটাও ক্লাস হয়নি। ছুটির পর বোমেস ওর ফেভারিট ডোরেইমন ইরেজারটাও আমাকে গিফট করেছে।”
“সে কি, কাল বললি যে গায়ে কাদা মাখার জন্য তোদের ক্লাস টিচার তোকে টিফিনের পর কান ধরে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করে রেখেছিল! আজ কী এমন করলি যে স্কুলের অর্ধেক ক্লাস বন্ধ করে অডিটোরিয়ামে নিয়ে তোকে প্রাইজ দিল?”
“ওই কাদা মাখার জন্যই তো প্রাইজ পেলাম।”
“সে কি!”
“সেটাই তো অডিটোরিয়ামের পর্দায় দেখাল।”
“সব ক্লাস বন্ধ করে?”
“হ্যাঁ, ভিডিও দেখানোর আগে হেডমিস কী বললেন জানো?”
“কী?”
“আমরা এতদিন তোমাদের ভালো নাম্বার পাবার জন্য চাপ দিয়ে এসেছি। কিন্তু কতগুলো শিক্ষা দিতে ভুলে যাচ্ছি। গতকাল ক্লাস ওয়ানের একটি খুদে আমাদের সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই কাজটা করতে গিয়ে গায়ে মাটি-কাদা লাগার অপরাধে সে শাস্তিও পেয়েছে। আজ আমারা সেই কাজটির ছবি দেখব।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী? পর্দায় আমাকে দেখাল!”
“পর্দায় তোকে দেখাল মানে? তোর ছবি তুলল কে?”
“বাবা, তুমি সব ভুলে যাও! জানো না, আমাদের স্কুলে অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে?”
“কী করেছিলি শুনি?”
“বকবে না তো?”
“না না, বল।”
“আমদের খেলার মাঠের ধারে, যেখানে আমরা সবাই বসে টিফিন খাই, সেখানে একটা গর্তে একটা ছোট্ট বেড়ালছানা পড়ে গিয়ে উঠতে পারছিল না। আমি সবাইকে বললাম, চল বেড়ালছানাটাকে গর্ত থেকে বের করি। বকা খাবার ভয়ে সবাই চলে গেল। কী আর করি। আমার ওয়াটার-বটলের জল ঢেলে মাটি নরম করে টিফিন কৌটোর ঢাকনা দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাচ্চাটাকে বের করি।”
“এই কায়দাটা শিখলি কী করে?”
“অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট থেকে!”
উপহারের প্যাকেটটা খুলতে বেরিয়ে এল বহু পুরনো একটি বই। বরিস পলেভয়ের ‘মানুষের মতো মানুষ’।

_____

অণুগল্পঃ ঢেঁকুরঃ তন্ময় বিশ্বাস


প্রত্যেকটা শহরেরই একটা করে ভয়ের গল্প থাকে। একটা গা শিরশিরে, রক্ত চলকে ওঠা, হাড়ে ডিও স্প্রে মেরে যাওয়া ভয়ের গল্প! আর সেটা যদি হয় রাত দুটোর যাদবপুর এইট-বি বাসস্ট্যান্ডের নিঝুম সেই চৌরাস্তা, যার দু’দিকে দুটো সাবওয়ে দু’মুখো অ্যানাকোন্ডার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তাদের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় যদি একটা অবুঝ হাওয়া আটকে পড়ে সাপের নিঃশ্বাসের মতো শনশন শব্দে ভরিয়ে তোলে চারিদিক, তবে সেটা আর ভয়ের গল্প থাকে না। হরর ফ্যান্টাসি হয়ে যায়।
এদিকে লোডশেডিং প্রায় হয় না বললেই চলে। যখন আপনি এমনই এক সাবওয়ের সামনে এসে দাঁড়ান যার ছাদের দিকে চেটানো দাদ, হাজা, চুলকুনি আর বশীকরণের সস্তা কাগজের বিজ্ঞাপনগুলো ছিঁড়ে গিয়ে সূচালোভাবে ঝুলে আছে মাথার ওপর এবং সবথেকে কাছের নিয়ন বালবটা আলোর থেকে অনেক বেশি ছায়া পাঠিয়ে সেগুলোকে করে তুলেছে অবিকল পাইথনের দাঁতের মতো!
এই মাঝরাতেও যদি কোনও দাঁড়কাক এমনি এমনি ঘুম ভেঙে চিৎকার করে ওঠে, তাহলে যতই ঠেক কাঁপানো যুক্তিবাদী হোন না কেন, আপনার মন কু ডাকতে বাধ্য।
আমার তো এই রাতেই কারবার। কী কাজ? কোন কাজ? আপনার জানার দরকার আমার গন্তব্য ওই সাবওয়ে, তার সিঁড়ির নিচের দু’নাম্বার খোপ। তাতে রাখা পেট মোটা সুটকেস অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। যাকে কিনা এই গেল সন্ধেতেই গলা অবধি গেলানো হয়েছে ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবি ছাপা সবুজ কাগজ!
এই দেখুন, আমি সেই পোস্টার ছেঁড়া দাঁত উড়িয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। কাগজগুলো কিছুক্ষণ কেঁপে কেঁপে স্থির হয়ে গেল আবার। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে হল, রবারের জন্য হাঁটাচলাও যেন কেমন পিচ্ছিল হয়ে গেছে। মরা বেড়ালের শরীর থেঁতলে যেন হেঁটে যাচ্ছি পায়ে পায়ে। ভেতরে কোথাও পাইপ লিক হয়েছে, টপ টপ করে শব্দ আসছে তার।
আমার পা নিজে থেকেই যেন সিঁড়ির ওপর পিছিয়ে গেল কয়েক পা। আরও কয়েক পা এগোতাম হয়তো। কিন্তু ততক্ষণে আলো কমে এসেছে। সেই পোস্টারের কাগজেরা নেমে এসে ঢেকে দিল বাকি মুখটুকুও। আমার পায়ের নিচের সমস্ত সিঁড়ি নরম হয়ে এল জেলির মতো। আমি তাতে গেঁথে গেলাম কয়েক আঙুল। তারপর সেই সিঁড়িই সচল হয়ে আমাকে ছুড়ে দিল পেটের ভেতর।
সেখানে তখন জমে ওঠা বুক জলে নেমে গিয়ে আমার বোধহয় কয়েক সেকেন্ড লেগে গেছিল বুঝতে, যে এটা জল নয়! ততক্ষণে চোখ সয়ে গিয়ে ভালোই দেখতে পেয়েছি, আমার জলে ডোবা অংশটুকুতে আর কোনও মাংস অবশিষ্ট নেই। কশেরুকাটাকেও একসময় ভেসে যেতে দেখলাম স্পষ্ট!
আমি আর সাবওয়েতে না ঢুকে হাঁটা দিলাম সোজা। সত্যি সত্যি তো আর কোনও সুটকেস নেই! আমিও তো ঠিক আপনার মতোই। আপনার মতোই গড়িয়াহাটের দিকে হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্পষ্ট শুনতে পেলাম ‘আউউউউও’ করে শব্দ তুলে আটকা পড়া সেই বাতাস বেরিয়ে এল সাবওয়ে দিয়ে। যাকে কিনা এই ভূত-ভুতুমের বাজারে যেকোনও প্রাণীর ঢেঁকুরের শব্দ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় সহজেই।

_____

গল্পঃ স-রোষ সতীঃ সঞ্জীবকুমার দে




কলিং বেলের শব্দে উঠে এলাম লেখার টেবিল ছেড়ে। দরজা খুলতেই সেইসব চাঁদবদন, যাদের তখন বদন দেখাবার কথা চাঁদার বিল বই হাতে।
“অনেকদিন পর এলাম কাকু,” একজনের সহাস্য ভূমিকা, “সেই এসেছিলাম কালীপুজোর আগে।”
“তবে জগদ্ধাত্রী পুজোটা বাদ দিয়েছ কেন?”
“কে বলল বাদ দিয়েছি! সব পুজোতে আমরা আছি, চাঁদা তুলতে এসেছিল ভোম্বলরা। ওটা আমরা অদলবদল করে করি। ক্লাবের বা আয়োজকদের নামের ব্যাপারেও তাই।”
মৃদু হাসলাম।
“আসলে চক্ষুলজ্জা বলে তো কিছু আছে! নাকি! বলুন না।”
ওদের মজার কথায় শব্দ করে হাসতে হল। যোগ দিল ওরাও। এমনই সম্পর্ক ওদের সঙ্গে। আছে, রাখবও যদি না নিজেরই ওই ফেলে আসা বয়সটাকে স্বীকার করার সাহস হারাই। প্রশ্ন করলাম, “কত লিখছ?”
“যা আপনি দেবেন।”
“পাঁচ।”
“পনেরো লিখে ফেললাম যে!” বিল লিখছিল যে তার কণ্ঠ।
“মাথা খারাপ!” জোরালো প্রতিবাদ করে উঠলাম। “কত চাঁদা যায় জানো আমার, এই পুজোয়!”
“কত? পঞ্চাশ!”
“পঞ্চাশ! হিসেব করো।”
“বলুন। মুখে মুখে যোগ করি।”
“ছেলের স্কুলের পনেরো, মেয়ের স্কুলে দশ। ছেলের কোচিংয়ে পনেরো, মেয়ের নাচ শেখার স্কুলে পাঁচ। আমার অফিসে হঠাৎ বাধ্যতামূলক পনেরো, লাইব্রেরিতে দশ। তাও দশ টাকা বলে-কয়ে কমিয়েছি, লাইফ মেম্বারদের বিশ। কত হল?”
“সত্তর।”
“তার ওপর আবার বাড়ির পুজো।” মনে করাল মাতব্বর ছেলেটি।
“তবে!”
“ঠিক আছে,” প্রসন্ন মুখে বিলটি হাতে ধরিয়ে দিল মূর্তিমান, “এই নিন।”
চেয়ে দেখি টাকার অঙ্কটা সত্যি সত্যি পাঁচই। অতএব না হেসে পারি? টাকাটা আনতে ভেতরে গেলাম।
ফিরে এসেই দেখি দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড! আমার বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটের দরজায় বুঝি নক করেছে ছেলেগুলো। মিঃ অ্যান্ড মিসেস দত্তের ফ্ল্যাট। তাঁদের সঙ্গেই বুঝি চাঁদা নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু করেছে যথারীতি। এ একেবারে প্রতিবারেরই চিত্র। মিঃ দত্ত নিরীহ ও সদাশয় ব্যক্তি। মিসেস দত্ত একটু কঠিন ও রাশভারী। তাঁর সঙ্গে চাঁদা আদায়কারীদের সংঘাত লাগবেই। এবারও তাই।
মিঃ দত্ত কী যেন বলতে চাইছিলেন, তাঁকে ধমকে চুপ করালেন মিসেস দত্ত, “তুমি চুপ করো।” তারপর কনুইয়ের ধাক্কায় তাঁকে ঠেলে এগিয়ে এলেন আমার দিকে, “এই যে!”
থতমত খেয়ে অস্ফুট স্বরে শুধোই, “কী?”
“এদের চাঁদা দিয়েছেন আপনি?”
কোনওমতে মাথা নাড়ি।
“হাউ মাচ?”
আমি কিছু বলতে যাবার আগেই ছেলেগুলোর একজনের উত্তর, “ফিফটিন।”
যাক বাবা, খুব বেঁচে গেছি। মিথ্যে আমাকে বলতে হয়নি। আবার ফ্ল্যাটের স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য সত্য গোপন করাটাও জরুরি।
“লিখেছিল কত?” বাজখাঁই গলায় চিৎকার দত্ত-সহধর্মিণীর।
“ফিফটিনই।” একটু ধাতস্থ গলায় বলি আমি।
“ডিসগাস্টিং!” গর্জে উঠলেন তিনি। “যা লিখল তাই দিয়ে দিলেন আপনি? যে যা খুশি দেয় দিক, আমি দেব না।”
“সেই জন্য তো বলছি, আমি দিয়ে দিই না, ক্ষতি কী!” মিঃ দত্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় মরিয়া।
“ইউ শাট আপ!” মিসেস দত্তর দাঁত কিড়মিড়। “কাছা খোলা মানুষ, যে যা খুশি ঠকিয়ে নিক!”
“ঠকিয়ে নেওয়া বলছেন কেন?” প্রতিবাদ সমস্বরে, “আমরা কি ঠকিয়ে নিচ্ছি?”
“তাছাড়া পাড়ার পুজো,” বলে মাতব্বর ছেলেটি, “আমরা চাঁদা চাইতে এসেছি। আপনি দেবেন না বলছেন, কারণটা জানতে পারি?”
“তোমরা এ-পাড়ার ছেলে প্রমাণ কী?”
“আমি সকলের মুখ চিনি।” থাকতে না পেরে বলি।
মিঃ দত্ত এবার সাহস পেলেন। “রোজই তো যাতায়াতের পথে এদের দেখি। ভালো ছেলে, পরোপকারী।”
ভ্রূ কুঞ্চিত হল মিসেস দত্তর। “কী করে জানলে ভালো ছেলে? পরোপকারী?”
“ওদের সম্বন্ধে পাড়ায় তো কোনও অভিযোগ নেই। আমাদের দেখে সম্মান করে, হেসে কথা বলে। পরের বিপদে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।”
মিঃ দত্তর কথায় আবার আমার সংযোজন, “তাছাড়া শিক্ষিতও, ওরা প্রত্যেকেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। এই নানারকম পুজো-পাব্বনের ছলছুতোয় একটু হুল্লোড়ে মাতে, এই আর কী!”
কটমট করে আমাদের দিকে তাকালেন মিসেস দত্ত। “আপনাদের প্রশ্রয়েই ওরা মাথায় ওঠে। সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন ভালো, শিক্ষিত কত কী!”
“টেস্ট নেবেন, নিন না, সন্দেহ রেখে লাভ কী?” বলে মাতব্বর ছোকরাটি।
“সরস্বতীর গোটা পাঁচেক নাম বলব?” আরেকজনের কণ্ঠ।
“কিংবা সরস্বতী বানান লিখে দিই?” বিল হাতের ছেলেটি।
“বিলেই বরং ওই নামটা লেখো।” মিঃ দত্তর উক্তি, “ওটা ওরই নাম।”
“হাউ ফানি!” উল্লসিত ছোকরা, “আপনার নাম সরস্বতী, জেঠিমণি?”
“হোয়াট!” রাগে বুঝি ফেটে পড়বেন মিসেস দত্ত। “কে জেঠিমণি?”
“কেন, আপনি! ওঁকে তো আমরা জেঠু বলি।” মিঃ দত্তকে ইঙ্গিত করল ছেলেটি।
মিঃ দত্ত সম্মতি জানালেন মাথা নেড়ে।
“এই দেখুন, নির্ভুল বানানে আপনার নাম লিখে ফেলেছি, জেঠিমণি।”
সবাই দেখলাম, বিলের কাউন্টার পার্টে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা শ্রীমতী সরস্বতী দত্ত।
“অ্যামাউন্টটা তবে পনেরোই লিখি?”
“নো!” নিষ্ফল আক্রোশে চেঁচান সরস্বতী। “উনি পনেরো দিতে পারেন, তা বলে আমাকেও দিতে হবে নাকি?” ইঙ্গিত আমাকে।
“উনি কত অসুবিধের মধ্যেও দিলেন। আপনাদের কত সুবিধেーদু’জন মাত্র মানুষ, তাও ডবল ইঞ্জিন।”
“মানে!”
“ডবল ইঞ্জিন। মানে দু’জনেই চাকুরীজীবী।”
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সরস্বতী। তারপর ভেতরে গটমট করে চলে গেলেন টাকা আনতে। তার আগে শুনিয়ে যেতে ভুললেন না, “পাঁচ টাকার এক পয়সাও বেশি দেব না আমি।”
চাপাস্বরে আক্ষেপ করলেন মিঃ দত্ত, “কী যে মনোবৃত্তি মশাই বুঝি না। দেদার খরচ করবে, কিন্তু ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনাকাটায় আর চাঁদা দেওয়াতেই যতরকম বিপত্তি।”
মৃদু হাসলাম। হাসলেন মিঃ দত্তও। বোঝা গেল, মুহূর্তটি বেশ উপভোগ করলেন তিনি। বললেনও সে কথা, “ছেলেগুলো বেশ দু’কথা শুনিয়েছে। আমি খুশি।”
টাকা নিয়ে এলেন মিসেস দত্ত। আবার কিছু কথা কাটাকাটি। যাই হোক, টাকা ও বিলের বিনিময়ের মধ্য দিয়ে চাঁদা পর্বের ইতি।
দরজা বন্ধ করে টেবিলে এসে বসেছি কি বসিনি আবার কলিং বেলে শব্দ, সঙ্গে বাইরে মিসেস দত্তর তুমুল চেঁচানি। দৌড়ে এসে দরজা খুললাম। “কী ব্যাপার!”
“দেখুন আপনাদের ভালো ছেলেদের ডেঁপোমি।” বিলটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন শ্রীমতী সরস্বতী, “ওরা ভেবেছেটা কী?”
পেছনে হাতে মুখচাপা দিয়ে হাসি আড়াল করছেন মিঃ দত্ত।
বিলে নজর দিতেই ব্যাপারটা বুঝলাম। ছোকরাগুলো নামটির বানানে বৈচিত্র্য ঘটিয়ে লিখে দিয়ে গেছেーস-রোষ সতী!
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ জয়ন্ত বিশ্বাস