বইকথাঃ রুমেলা দাস


দুরন্ত ঈশান
অদিতি ভট্টাচার্য্য
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণঃ চিরঞ্জিত সামন্ত
প্রকাশকঃ আলোকবর্ষ ও সুচেতনার যৌথ প্রয়াস
দামঃ ১৫০/-

সত্যি কথা বলতে, রূপকথা পড়তে আজও সবসময় সাধ জাগে। ‘দুরন্ত ঈশান’ বইটার প্রচ্ছদ দেখে তাই পড়ার উথালপাথাল ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গিয়েছিল কয়েক ধাপ। লেখিকা অদিতি ভট্টাচার্য্যর এই প্রথম দুটো উপন্যাস পড়লাম।
শুরুতেই ঐতিহাসিক ভালোলাগায় ভর করে কল্পনার রঙিন মিশেল মনকে আচ্ছন্ন করেছে। ছোট্ট ছোট্ট নিটোল বাক্যে জটিলতার লেশমাত্র নেই। অথচ অদ্ভুত রোমাঞ্চ কানায় কানায়। দুই ভাই সূর্য, ঈশান ও রাজকুমার শৌর্যকে নিয়ে ঘটনার ঘনঘটা ব্যাপৃত হলেও কিশোর মনের আড়ালে যে সৎ দীপ্ততা লুকিয়ে থাকে, তার বিচিত্র রূপ দেখতে পাই। ঈর্ষা, লোভ, দ্বেষ তাতে মন ক্ষণিকের আনন্দ পায় বটে, কিন্তু প্রকৃত শান্তি নিহিত থাকে সৎ, স্বাভাবিক যাপনে। শুধু ছোটোদের নয়, এধরনের মেসেজ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করেছেন লেখিকা। ইতিহাসের পাতায় দেশ, কাল, জীবনের নিত্য ছবি ফুটে উঠলেও কোথাও এতটুকু মনে হয়নি উপন্যাসদুটো ভারী হয়ে উঠেছে। কাহিনির দীর্ঘতা, কথোপকনের সরলতা এঁকে গেছে একের পর এক দুর্ধর্ষ অভিযান।
প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ ও কাহিনি বিন্যাসে ছোটোবেলার ‘রাজকাহিনি’র রেশকে আবারও মনে করায়। চারপাশের ঘৃণ্যতা সরিয়ে সত্যের জয়গান গাইতে সাধ হয়। সাধ হয় এমন কোনও ঈশান এসে তুলে ধরুক সত্যের মশাল।
অপেক্ষায় আরও অনেক, আরও এমন কল্পিত কাহিনির যা কেবল পবনের পক্ষীরাজে চড়েই পড়া সম্ভব।
_____




দুর্দান্ত দশ
কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ মিত্র ও ঘোষ
দামঃ ১০০/-

মোট দশটি গল্প, গল্পের বাঁক। দশটি পথ। দশটি খুঁজে পাওয়া কিশোর মনের আড়াল আবডাল। কখনওই একই ধারাপাতে বয়ে চলা নয়। অন্তত পাঠক হিসাবে বইয়ের নামকরণ দেখে মনে হয়েছিল হয়তো বা গভীর বনের নিবিড় নিস্তব্ধতাকে কলম ফুটিয়ে তুলেছে তার আপন মুন্সিয়ানায়। তেমনটা নয়, সংকলনের শুরু বন বন্দুক বাইসন রহস্যে মোড়া। মোচড়টা একেবারেই আচমকা। গল্পটি আগে পড়া থাকলেও মেজর মনজিৎ কাপুরের কথা বলার ভঙ্গী, অসাধারণ মনোবল ও তার দৈহিক ফিটনেসের যে একটি স্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন তাতে গল্পে একটা অতিরিক্ত স্মার্টনেস দাবি তো করেই।
রাজপুত্রের বন্ধু টানটান রহস্য থেকে ফ্যান্টাসি কল্পনা, সার বেঁধে কিশোর মনে জমাট বাঁধে। শুধু কী তাই! শেখায় কল্পনা থেকেও পাক খেয়ে উঠতে পারে ঘোর বাস্তবের কিছু নিখুঁত সারসত্য।
ভ্যাবলার গাড়ি গল্পটা বেশ লাগল। শ্রেণী বৈষম্য দু’হাতে সরিয়ে মাঝেমধ্যে এমন কিছু পাঠ ছোটো নয়, আমাদের ব্ল্যাকবোর্ডেও লিখে ফেলতে হয়। ভ্যাবলার বাবার মতো আমাদেরও কখনও কখনও পরবর্তী প্রজন্মকে বুঝিয়ে যেতে হবে ‘ভেদ’ শব্দটা নিতান্ত ঠুনকো। সম্বল অন্তর, অন্তরাত্মার খুশি।
অতীতের তীর হতে ঐতিহাসিক প্রলেপ মাখা একটি গল্প। সংকল্প, সংকল্পে অটুট থাকার সংজ্ঞাটা আরও একবার দেখিয়ে দেয়। গল্পের সার্থকতা সেখানেই।
হরেনদার কৃতজ্ঞতা গল্পের ঝিমঝিমে পরিবেশে বুঝেছিলাম প্রথমেই, কোথায় তার বাঁক। তবুও কিছু একটা আকর্ষণ থেকেই যায় এমন গল্পে। মানব, মানবমনের ভালোবাসার আরেকটি কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা তুলে ধরেছেন লেখক।
ভয়ংকরোবোট কল্প ও বিজ্ঞানের অটুট যুগপৎ। হিংসা, ক্রোধ, লোভ আজও মুখ, মুখোশের অন্তরালে হয়তো বা উপস্থিত জড়তেও। খুঁজতে হবে, খুঁজে পেতেই হয় সেসব আমাদের। সমূলে নির্মূল করাই যে প্রধান উদ্দেশ্য।
টুইটি মিষ্টি গল্প। শেখায় শিশুমনের সরল পাঠ।
ডাকাতের মুখোমুখি বেশ একটা ভয় ভয় ভাব গোটা গল্পে। এ গল্পের চমক মন কাড়ে।
তদন্তঃ তারামণ্ডল-এ গল্পকার আবারও পুরনো মেজাজে। কলকাতার আবহে রহস্য আর রহস্যের কিনারায় ‘তীর্থদা’-র চরিত্রে মস্তিষ্কের স্মার্টনেস পাঠককে শেষ অবধি ভাবায়।
পাহাড় পুঁথি পাইথন এ সংকলনে আমার পড়া সেরা গল্প। গল্পের নামের সাথে সাথে মেজর মনজিৎ কাপুর যেভাবে দুষ্প্রাপ্য জৈন পুঁথি উদ্ধারে অপরাধীর জাল গুটিয়েছেন, তাতে পাঠক-মন চরিত্রের সঙ্গে আরও খানিকটা তরতাজা হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে দুর্দান্তই ‘দশ’! তবে মন চাইছিল, মেজর মনজিৎ কাপুরের গল্পগুলো আরও বেশ খানিকটা বড়ো হোক। মনে হচ্ছিল, আরও কিছুটা পাক খেয়ে উঠুক রহস্যের ধোঁয়া। মজা যে তাতেই! আর গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আরও কিছু অলঙ্করণ হলে শিশু থেকে বুড়োমন আরও একটু খুশি খুশি হত।
_____




রুলপুই
পাঁচ উপন্যাসিকা সংকলন
একপর্ণিকা প্রকাশনী
দামঃ ২৫০/-

প্রথমেই বলি প্রচ্ছদের কথা। অদিতি সরকারের লেখার উপর ভিত্তি করেই সংকলনের নামকরণ, প্রচ্ছদ অঙ্কন হলেও ছবিতে কখনও রহস্য, কখনও রোমাঞ্চের যে স্বাদ ফুটে উঠেছে তা সংকলনের পাঁচ উপন্যাসের আবছা অবয়বে সক্ষম। কমলা, কালো খোপ কাটা একটি ভয়াবহ ময়াল জড়িয়ে রয়েছে ডালপালা। অসম্ভব চোরা ফাঁদ তার চোখে। শিল্পী স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন প্রচ্ছদে।
অদিতি সরকারের রুলপুই আদ্যন্ত রহস্যে ভরা। মেজর মাথুর ও এক্স ইন্ডিয়ান আর্মি প্রাক্তন সৈনিক কর্ণেল সাইলো বাঁচান বিয়াতে জাতির মানুষ রিকি দার্নেইকে। তারপরই একের পর এক অজানা আতঙ্ক ক্রমাগত ভয়াবহ ময়াল হয়ে জাপটে ধরে তাঁদের জীবনের বাঁক। রুদ্ধশ্বাস, টানটান উত্তেজনায় ঘেরা এ কাহিনির শেষ না হওয়া অবধি পাঠকের অবকাশ নেই। কিশোর-মন এমনই রোমাঞ্চ চায়! এ সংকলনের সেরার অন্যতম।
পুণ্ডরীক গুপ্তের মেঘ জমেছিল ঈশানে শুরুটা কিছুটা এলোমেলো মনে হয়েছিল। তারপর ঈশানগঞ্জের ঘটনা পরম্পরা, সহজ ভাষার প্রকাশ, বুজরুকি কিছু অন্ধবিশ্বাস যা আজও মানুষের চোখে ধুলো দেয়, স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, এই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য লেখককে ধন্যবাদ দিতেই হয়।
কৌশিক শর গয়নার গণ্ডগোল। বাবিনদার লেখা আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের। এতই সোজাসাপটা, নিখাদ ভালোলাগা থাকে যা উপেক্ষা করা সহজ নয়। এখানেও তাই। কিশোর উপযোগী এমন গল্প ভাবায় ভালোলাগায় বড়োদেরও। মুখ, মুখোশের আড়ালে আছে চাকচিক্য, আছে সামাজিক অন্যায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই লেখক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আরও এক চমক গল্পের শুরু। যে কেউ ভাববে গল্পটি হয়তো সেই খাতেই বইবে। কী সেই মোচড় জানতে পড়তেই হবে গয়নার গণ্ডগোল।
কিশোর ঘোষালের পেত-ন-তাৎ-তিক নামকরণের চমকে, চমকে গিয়েছিলাম। হাস্যরসের সঞ্চার হয়। লেখক বেশ মজা করে রসিয়ে লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বোধ। ভালো লাগে। আমাদের সকলের জীবনে এই হাসিখুশি মেজাজটা ফিরিয়ে আনাই তো প্রকৃত সাহিত্যিকের কাজ। আর এখানেই বাজিমাত। হয়তো ঘটনা কিংবা ঘটনার মোড় অনেক গল্পেই পেয়েছেন পাঠক, কিন্তু গল্প বলার ছন্দ, অপরাধবোধের ফাঁকে মানবিক মূল্যবোধ কাহিনিকে অন্যমাত্রা দিয়েছে।
সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের ওয়াখানের অভিজ্ঞতা আরও এক সেরা সংকলনের। আফগানিস্তানের চরম ভয়াবহ প্রকৃতির আবহে অলৌকিক রূপরেখা এঁকেছেন। অথচ মিথকে কাহিনির বাঁকে একটুও আলগা হতে দেননি। কিরগিজ গ্রামে পৌঁছনোর সুযোগ না হলেও কাহিনির চিত্রায়নে স্পষ্ট কিছু ছবি এঁকে গেছেন লেখক।
সবমিলিয়ে রাজীব কুমার সাহা দাদার সম্পাদনায় পাঁচটা স্বাদ মিলেমিশে সংকলনে পাঁচ আঙুলের শক্ত মুঠি হয়ে উঠেছে। তাই ‘রুলপুই’ না পড়লে মিস করবেন অনেকেই। মন্দ লাগা বলতে গল্পের পাশাপাশি মনছোঁয়া কিছু অলঙ্করণ দাবি করে বইতে। আসলে শিশুমন যে আমাদের প্রত্যেকেরই!
_____




মায়াতোরঙ্গ
দীপঙ্কর চৌধুরী
কিশোর গল্প সংকলন
প্রকাশকঃ জয়ঢাক
দামঃ ২৩০/-

দশটি অনবদ্য গল্প। গল্পের ছন্দ। মায়াতোরঙ্গই বটে! একের পর এক সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গল্পের বিষয়াদি। বড়ো অদ্ভুত বিচিত্র তার রেশ। এর আগে ‘ডাইনি ও অন্যান্য গল্প’-এ লেখক তাঁর লেখনী ও গল্প কথক বিজুদার সঙ্গে পরিচয় ঘটে আমার। বলতে গেলে বেশ অন্য একটা স্বাদ পাই। তাই মায়াতোরঙ্গের প্রচ্ছদ তেমনভাবে চোখ না টানলেও শুধুমাত্র সেই সচরাচর ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চমকপ্রচ সাই-ফাই, কল্পনা, কখনও নিখাদ বাস্তবে উঁকি দিতেই পড়ে ফেলি বইটা।
মায়াতোরঙ্গের ঝাঁপি খুলে বেরিয়ে আসে অতীতের সাদা কালো ফ্রেম বর্তমানের জীবনরূপে (মায়াতোরঙ্গ), আবার পৃথিবীর ইতিহাসে মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠা আজব কল যখন শিল্প বিপ্লবের মশাল তুলে ধরে (খট্টরবাবা), কখনও লৌকিক ধ্যানধারণার আবহে সাউন্ড প্রজেকশন সাউন্ড মেশিনে বিজ্ঞান ফল্গুধারার মতো বয়ে চলে দেখে (কড্ডাশিনি), এই স্রোতেই চিরাচরিত সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকে কিছু তাক লাগা কারিগরি (রোদ্দুর! রোদ্দুর)। চমক যেন ভাঙতেই চায় না!
আছে আরও অনেক। আরও নতুন কিছু। একটু অন্যরকম। গল্পে শেষেও যা শেষ হয় না। ভাবায়। ভাবনার পিঠে চড়ে বিজ্ঞান, কল্পনা, চারপাশের মানুষের মাঝে ঘুরে বেড়ায় কিছু মায়াবী লুকোচুরি।
এমন গল্প, গল্প কথকের অপেক্ষায় থাকবে পাঠক চিরদিন।

_____

No comments:

Post a Comment