বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ বংশবদ ও বেয়াড়া তরলের গপ্পোঃ সুজিতকুমার নাহা



প্রবাহী বলবিদ্যা (fluid mechanics) নিয়ে গভীরভাবে অনুধ্যান করেছিলেন নিউটন। এরই ফলশ্রুতিতে ‘জবর জবর তিন’ নয়, মাত্র একটি সমীকরণ উদ্ভাবন করেন তিনি। অবশ্য ভূতের রাজার দেওয়া তিন বরের চেয়ে নিউটনের দেওয়া একমাত্র সমীকরণের গুরুত্ব কিছুমাত্র কম নয়। যাই হোক, নিউটনের সমীকরণকে মানা কিংবা অবজ্ঞা করার স্বভাব অনুসারে তরল সমাজের সব সদস্যকে দুটি দলে ভাগ করা যায়। ব্যাপারটা কিঞ্চিত খোলসা করে বলি।
যেসব তরল নিউটনের সমীকরণ মেনে চলে তাদের বলা হয় নিউটনীয় তরল। নিউটনীয় ঘরানার তরলদের উদাহরণ হিসেবে নাম করতে পারি জল, তেল, শ্যাম্পু, গ্লিসারিন ইত্যাদির। অন্যদিকে কাদাজল, টমেটো কেচাপ, ক্রিম, কর্নস্টার্চের কাঁই ইত্যাদি অবাধ্য গোষ্ঠীর অনিউটনীয় তরলের দৃষ্টান্ত।
সমীকরণটিকে নিয়ে গভীরে চর্চা না করে শুধু মোদ্দা ব্যাপারটা বুঝে নিলেই কাজ চলবে আমাদের। তবে প্রথমেই জানতে হবে তরলের সান্দ্রতা (viscosity) বলতে কী বোঝায়। তরলের হালচাল থেকে প্রতীয়মান হয়, একধরনের আভ্যন্তরীণ রোধ তরলের ভেতর কাজ করে। এই রোধের কারণে শুধু নিজের চলনকে নয়, গতিশীল বস্তুকেও বাধা দেয় তরল। ডুবসাঁতার দেবার সময় জলের বাধা অনুভব করা যায়। আভ্যন্তরীণ রোধ তরলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌত ধর্ম। বিজ্ঞানীরা এরই নাম দিয়েছেন ‘সান্দ্রতা’।
নিউটনের সমীকরণ অনুসারে তরলের সান্দ্রতা তরলের ওপর প্রযুক্ত বলের ওপর নির্ভরশীল নয়। সহজ কথায়, প্রযুক্ত বল দুর্বল বা প্রবল যাই হোক না কেন, সান্দ্রতার কোনও হেরফের হবে না। নিউটনীয় তরলদের ‘পাণ্ডা’ জলের কেসটাই নেওয়া যাক। শান্ত দীঘি অথবা খরস্রোতা তটিনীর জলের সান্দ্রতা একই। বলের প্রভাবে জলের সান্দ্রতা বাড়লে উঁচু বহুতল বাড়ির নিচের তলগুলোর বাসিন্দারা ভীষণ অসুবিধেয় পড়তেন, কেননা কল খুললে জল আসত ফোঁটা ফোঁটা বা সুতোর মতো ধারায়।
বাধ্য নিউটনীয় তরলেরা সমীকরণের অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও অবাধ্য অনিউটনীয়রা এসবের ধার ধারে না। এদের সান্দ্রতা প্রযুক্ত বলের প্রাবল্যের ওপর নির্ভর করে। বল বাড়লে সান্দ্রতা বাড়তে পারে আবার কমতেও পারে। যাদের বাড়ে তাদের বলে ‘বলকঠিন পদার্থ’ (dilatant substance), কমে যাদের তারা ‘বলতরল পদার্থ’ (thixotropic substance)।
বলতরলদের দলের এক সদস্যকে আমরা সকলেই চিনি। টমেটো কেচাপ। সাধারণ অবস্থায় কেচাপ এত সান্দ্র যে বোতলের সরু মুখ দিয়ে বেরোতে পারে না। ঝাঁকুনি দিয়ে বলপ্রয়োগে কেচাপের সান্দ্রতা কমে বলেই বোতল থেকে ঢালা সম্ভব হয়।
বলকঠিন পদার্থের উদাহরণ কর্নস্টার্চের কাঁই (paste)। জিনিসটার ভেতরে সহজেই হাত ঢোকানো যাবে যদি কাজটা ধীরে করা হয়। কিন্তু ঘুষি মারার ভঙ্গিতে আঘাত করলে বস্তুটা এত শক্ত হয়ে পড়বে যে হাত একটুও ঢুকবে না!
বাধ্য ও অবাধ্য তরলের গল্প শেষ করার আগে আমার একটা দারুণ আইডিয়া সকলের সাথে ভাগ করে নেব। এটা ঠিক যে চলন্ত ট্রেনে বসে লাঞ্চ বা ডিনার করা খুবই অসুবিধাজনক। স্যুপ, ডাল, ঝোল গোছের  আইটেমগুলোর বলতরল সংস্করণ বানিয়ে তারপর প্যানট্রি কার থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?

_____

No comments:

Post a Comment