গল্পঃ বজঘট বনাম পলুঃ মৃণালকান্তি সামন্ত


সেনাপতিগড় রাজ্যটি বড়ো মনোরম। চারদিকে পাহাড় আর জঙ্গলে প্রকৃতি যেন নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে। জঙ্গলের গাছপালার আড়াল দিয়ে বয়ে গেছে লাজুক এক নদী। ছায়াতনু নাম তার। নিস্তব্ধ পরিবেশে কুলু কুলু শব্দে এগিয়ে চলে গেছে তা রাজ্য ছাড়িয়ে আরও দূরে। বাতাসে পাখিদের রকমারি আওয়াজই শুধু সে শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে। জঙ্গলে গাছ কাটা কিংবা পশুপাখিদের প্রাণ নেওয়ার চেষ্টায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেনাপতিগড়ের মহারাজের। জঙ্গলের সীমানা বাদে চাষের বিশাল ঊর্বর জমি ছড়িয়ে রাজ্য জুড়ে। সেসবের চাষ-আবাদে শস্য ফলিয়ে প্রজাদের ভালোই চলে যায়। রাজকোষে খাজনা দিয়েও খাওয়া-পরায় তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই। শিক্ষা সংস্কৃতি শরীর স্বাস্থ্য থেকে গানবাজনা খেলাধুলো সমস্ত দিক দিয়ে রাজ্যের মানুষকে সুখশান্তিতে রাখায় তীক্ষ্ণ নজর মহারাজের। বেশ কিছু বড়ো বড়ো চিকিৎসালয় এখানে ওখানে। মানুষের চিকিৎসা পরিষেবার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা তাদের প্রতিটায়।
এদিকে আবার রাজদরবারে গানবাজনার আসর যেমন বসে, খেলাধুলোর ব্যবস্থাও রাজ্যে করা হয় মহাসমারোহে। প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য আয়োজন হয় কুস্তি প্রদর্শনীর। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন জড়ো হয় তা উপভোগ করতে। কোথাও কোন নামী কুস্তিগীরের খবর কানে এলে মহারাজ তাকে নিজের রাজ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেনই। দু-চারজন এমন কুস্তিগীর রাজ্যে থেকে যায় বছরভর। তাদের নিয়ে নিয়মিত চলে কুস্তির আখড়া।
এমন রাজ্যেই কিনা একবার আকাল পড়ে গেল কুস্তিগীরের! পুরনোরা বুড়ো হয়ে মারা গেছে অথবা দেশে ফিরে গেছে। নতুন করে বাইরের কোনও কুস্তিগীরের খবরও আসে না বহুদিন। কুস্তির আখড়া কিংবা প্রদর্শনী বন্ধ অনেকদিন। আপাতত রাজ্যে পুঁজি মাত্র একজন কুস্তিগীরই। শ্রী বজঘট সিং আলুওয়ালিয়া। দক্ষ কুস্তিগীর। চেহারাখানা অতীব ভয়ংকর! লম্বায় প্রায় ফুটবল গ্রাউন্ডের গোলপোস্ট। বুকের ছাতি পুরনো অশ্বত্থের গুঁড়িকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলে আর কী! গায়ের রঙ আবলুস কালো। যেন অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিশাল আয়তনের চৌকো মুখ। মুখের মাঝখান জুড়ে চওড়া টাঙ্গি গোঁফজোড়া। মাঝেমধ্যেই তা ঠোঁট কাঁপিয়ে নেচে ওঠে। মাথার চুল মিলিটারি ধাঁচে নয়া পয়সা ছাঁটে কাটা। ওর হাসিশূন্য নির্দয় চাউনি হাড় হিম করে দেয়। কচিকাঁচারাই শুধু নয়, রাস্তাঘাটে ওকে দেখলে পালাবার পথ পায় না বড়োরাও।
এমন মানুষের মনে ঘনিয়ে উঠে ধোঁয়ার মতো পাক খাওয়া গভীর এক দুঃখ। বলবান কুস্তিগীর হয়েও অনেকদিন তার কুস্তিই লড়া হচ্ছে না। লড়বে কীভাবে? তার সঙ্গে লড়ার দ্বিতীয় কেউই তো নেই। শেষ একজন দোসরই ছিল গতবছর পর্যন্ত। শেখ সোলেমান। গত কুস্তি প্রদর্শনীর সময় বজঘটেরই বেকায়দা একখানা প্যাঁচে প্রাণ গেছে বেচারা সোলেমানের। সেই থেকে আর লড়াই নেই বজঘটের সামনে। অনেক খুঁজেও কুস্তিগীরের সন্ধান মিলছে না। মহারাজ হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মনমরা হয়ে শুয়ে বসে দিন কাটে বজঘটের।
এমন হাহাকারের দিনে একটি চমকপ্রদ খবর এসে পৌঁছাল সেনাপতিগড়ে। পাশের রাজ্য কল্যাণখণ্ডে বাহাদুর ওঝা নামে বিখ্যাত এক কুস্তিগীর এসেছে। কিন্তু মুশকিল হল কল্যাণখণ্ডের রাজামশাই আগেই তাকে রাজসভায় নিয়ে ফেলেছেন। আর তো তাকে সেনাপতিগড়ে আনা সম্ভব নয়। তবুও খবরটা কানে আসতেই লাফিয়ে উঠলেন মহারাজ। লাফাল বজঘটও। আনন্দে হেসে উঠল তার কুতকুতে দুই চোখ। বুকের ভিতর কলজেটা যেন দু’বার ডিগবাজি খেয়ে নিল সার্কাসে ট্রাপিজের খেলার মতো। হাতদুটো কনুই থেকে ক’বার ভাঁজ করে ফেলল। বাহুর মাংসপেশী লম্বা লাউয়ের মতো ফুলে ফুলে উঠল। মহারাজের অনুমতি নিয়ে দরকার হলে সে চলে যাবে কল্যাণখণ্ড। মুখোমুখি হতে হবে বাহাদুর ওঝার। আহা! ম্যাড়মেড়ে হয়ে পড়া জীবনে আবার ফিরবে লড়াই। ফিরবে কুস্তির স্বাদ। সুখের সন্ধান যখন পাওয়া গেছে, দেরি করে লাভ কী! সোজা চলে গেল মহারাজের কাছে। মহারাজকে অভিবাদন জানিয়ে নিবেদন করল ওর কল্যাণখণ্ড যাবার আর্জি। মহারাজ ওর মনের অবস্থা বুঝলেন। তাছাড়া বজঘট আজ পর্যন্ত হার মানেনি কোথাও। হার মানা ওর ধাতেই নেই। বাইরের রাজ্যে গিয়ে যদি কুস্তি জিতে সেনাপতিগড়ের সম্মান বাড়িয়ে আসে তো মন্দ কী? অভিবাদন গ্রহণ করে মহারাজ খুশি হয়ে অনুমতি দিলেন। বললেন, “তবে মনে রেখো, তোমার উপর কিন্তু নির্ভর করছে রাজ্যের মানসম্মান। বীরত্বের সঙ্গে তাকে যেন বাঁচিয়ে ফিরে এস। অবশ্য আমার বিশ্বাস যে সেনাপতিগড়ের মুখ তুমি উজ্জ্বল করেই ফিরবে।”
কোমরের উপর থেকে শরীর ঝুঁকিয়ে খুশি হয়ে মহারাজকে আবার অভিবাদন করল বজঘট। মহারাজ হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন। নিজের ঘরে ফিরে দরকারি জিনিসপত্রের সঙ্গে নিজেকেও মনে মনে গুছিয়ে নিতে লাগল সে। লড়াইয়ের মতো লড়াই দিতে হবে। যতই লড়াকু হোক সে, রাজ্যের বাইরে গিয়ে তো লড়েনি কোনওদিন। অপরিচিত পরিবেশ-পরিস্থিতিতে গিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে ঠিকঠাক লড়ে রাজ্যের মান রাখা বোধহয় খুব সহজ নয়। সেজন্যই হয়তো মহারাজ সাবধান করে দিলেন। আনন্দের সঙ্গে খানিকটা কী হয় কী হয় ভাবও ঢুকে গেল ওর ভিতর।
দেরি করল না বজঘট। সেজেগুজে রওনা দিল পরদিন ভোরে। রাতের অন্ধকার মুছে ধোঁয়া ধোঁয়া ঝুঁঝকি ফুটছে সবে। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ। দুয়েকটা পাখির ঘুমভাঙা ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ এদিক ওদিক। ব্যাগপত্র নিয়ে পা বাড়াল বজঘট। পিছনে ছোটোখাটো চেহারার ওর এক নম্বর সাকরেদ - শ্রী পুলিনবিহারী ভট্ট। দু’জনের জন্য দু’খানা টগবগে ঘোড়া দিতে চেয়েছিলেন মহারাজ। পুলিনবিহারীর মন খুশিতে নেচেও উঠেছিল। ঘোড়ার খুরের ধুলো উড়িয়ে অন্য রাজ্যে অভিযান তো মস্ত এক মজার ব্যাপার। কিন্তু তাতে জল ঢেলে দিল বজঘটই। হাতজোড় করে মহারাজকে বলল, “না মহারাজ, তার দরকার হবে না। ভোর ভোর পা চালিয়ে রওনা দিলে আমরা দিনে দিনে ঠিক পৌঁছে যাব।”
এতবড় কুস্তিগীর কিনা ঘোড়ায় চড়ে যাবে কুস্তিতে! তার চে’ জোরে পা চালানো অনেক সম্মানের। তাছাড়া অনেকদিন কুস্তি লড়া হয় না। শরীরকে কিছুটা ওয়ার্ম আপ করারও তো দরকার আছে। আবার এটাও ঠিক যে কল্যাণখণ্ডের দূরত্ব খুব কম নয়। অনেক মাঠঘাট পেরোলে তবে না একটা আলাদা রাজ্য? তবে না পৌঁছানো যাবে সেখানে? হু হু করে পা চালাতে লাগল ওরা। চালাতেই হবে। সন্ধের আগে সেখানে পৌঁছানো দরকার শুধু নয়, স্বেচ্ছায় ঘোড়া না নেওয়া বজঘটের পক্ষে সেটা একটা চ্যালেঞ্জও। হু হু করে এগোতে লাগল বেলা। সূর্যটাকে তো আর কুস্তির থাবায় থামিয়ে রাখা যাবে না। তার গতির সঙ্গে হাঁটার প্রতিযোগিতা চালানো ছাড়া উপায় কী? খোলা মাঠে সারাদিন চলতে থাকল সেই প্রতিযোগিতা।
কল্যাণখণ্ডে যখন পৌঁছাল, দিন প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে সন্ধেকে। রাজদরবারে খাতির-যত্ন জুটল ভালোই। সেনাপতিগড়ের অতিথি বলে কথা! আবার তার মতো নামী কুস্তিগীর। কল্যাণখণ্ডের রাজামশাইয়ের নির্দেশে অতিথিনিবাসে খুব সুন্দর সাজানো গোছানো ঘর বরাদ্দ হল ওদের। সঙ্গে দেখভালের জন্য দু’জন লোকও। তাদের তৎপরতায় খাওয়াদাওয়া সহ বিশ্রামের এলাহি ব্যবস্থা বজঘটদের।
খিদে-ক্লান্তি কাটিয়ে সেই রাতেই বজঘট গিয়ে মুখোমুখি হল কল্যাণখণ্ডের রাজামশাইয়ের। রাজামশাইকে অভিবাদন জানিয়ে ওঁর হাতে তুলে দিল সেনাপতিগড়ের মহারাজের পাঠানো গোল করে পাকানো লিপিখানা। তারপর হাতজোড় করে নিজের ইচ্ছেটি নিবেদন করে ফেলল।
বাহাদুর ওঝার সঙ্গে কুস্তির কথা শুনে রাজামশাই বললেন, “তোমার প্রস্তাব তো খুবই ভালো, বজঘট। কিন্তু মুশকিল হল, বাহাদুর দেশে গেছে দিন চারেক হল। ওর বাবা ভীষণ অসুস্থ। তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে বলেও তো মনে হয় না।”
বজঘট বিনয়ের সঙ্গে বলল, “অনেক আশা নিয়ে অতদূর থেকে এসেছিলাম, রাজামশাই। খালি হাতে ফিরে যাব তা’লে! কেউ কি নেই এত বড়ো রাজ্যে, যে আমার সঙ্গে লড়তে পারে?”
বজঘটের শেষকথাটা গিয়ে ধাক্কা মারল রাজামশাইয়ের সম্মানে আর রাজ্যের মর্যাদায়। যে করেই হোক লোকটার কুস্তি লড়ার একটা ব্যবস্থা করে দিতেই হবে। তাঁর রাজ্যে এসে তাঁকেই এত বড়ো কথা শুনিয়ে যাবে? চারদিকে খবর পাঠালেন রাজামশাই। কুস্তি লড়ার লোক চাই। যে সে লোক নয়, বজঘটের সঙ্গে লড়ার মতো লোক। রাজ্যের মানমর্যাদা বাঁচানোর লোক।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু লোকজন এসে জমা হল রাজদরবারের সামনে। তাদের মধ্যে খেলাধুলো করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা লোকজনও নেহাত কম নেই। রাজামশাই বাইরে এসে বললেন, “আপনাদের মধ্যে থেকে কাউকে অবশ্যই বেছে নিয়ে দায়িত্ব দেব কুস্তি লড়ার। কিন্তু যার সঙ্গে লড়তে হবে, তাকে একবার দেখে নিলে আপনাদের বোধহয় সুবিধা হবে।”
দু’জন কর্মচারী গিয়ে অতিথিশালার ঘর থেকে নিয়ে এল বজঘটকে। তার ভয়ংকর চেহারা দেখে ভিড় কমতে খুব বেশি সময় লাগল না। এমনকি ওই চেহারার দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর ঝুঁকিও অনেকে নিতে পারল না। শেষমেশ পুরো চত্বর খালি। ভুল করেও দাঁড়িয়ে রইল না একজনও। চারদিকে বজঘটের চেহারা প্রচার হয়ে যাওয়ায় পরের দিনগুলোতে আর কেউই ভিড়ল না রাজদরবারের আশপাশে। কপালে চিন্তার ভাঁজ রাজামশাইয়ের। কীভাবে যে কুস্তি লড়ার লোক পাওয়া যাবে! চোখের ঘুম তাঁর উধাও হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এভাবে বেশ ক’টা দিন কেটে গেল। আশা একরকম ছেড়েই দিলেন রাজামশাই।

কল্যাণখণ্ড রাজ্যে পলু নাপিতের খ্যাতি মূলত তিনটি কারণে। এক, তুখোড় বুদ্ধি তার। দুই, অসম্ভব দুঃসাহস। আর তিন, গাছে চড়ায় তল্লাটে তার জুড়ি মেলা ভার। ওর খুব ইচ্ছে বজঘটের সঙ্গে কুস্তি লড়ে। বাকি লোকেদের মতো সেদিন কুস্তির আর্জি নিয়ে ও রাজদরবারে যায়নি। বজঘটের চেহারা নিজের চোখে তাই দেখতেও পায়নি। কিন্তু লোকমুখে যা শুনেছে সেটাই যথেষ্ট। তার পক্ষে ওইরকম চেহারার সঙ্গে সরাসরি কুস্তি লড়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়। আর তা করতে গেলে সেটা হয়ে যাবে কুস্তি নয়, হাসির প্রদর্শনী। কিন্তু ভিতরের লড়ার ইচ্ছেটাকে যে সে কোনওভাবেই দমাতে পারছে না। শুধু ইচ্ছেটাও বড়ো কথা নয়, এই দুর্দিনে রাজামশাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মানসম্মান বাঁচানোটাও তো একটা জরুরি কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। বুদ্ধি-ফুদ্ধি খাটিয়ে কিছু একটা করে কোনওভাবেই কি চ্যালেঞ্জটা নেওয়া যায় না?
অনেক ভাবনাচিন্তা করে রাস্তা একটা বের করার ছক কষে ফেলল পলু। দেখা যাক তা কতটা ফলাফল তুলে আনতে পারে। দেরি না করে সেইমতো ধাপে ধাপে এগোতে থাকল। রাত তখন অনেকটা গভীর। অন্ধকারে খুব গোপনে রওনা দিল সে রাজপ্রাসাদের দিকে। সোজা পথে গেলে রক্ষীদের নজরে পড়ে যেতে পারে। এদিক ওদিক করে অনেক ঘুরপথ ধরতে হল। তাতে রাস্তাও হাঁটতে হল অনেক বেশি। চারদিকের আলো থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে চলে গেল একেবারে অতিথিনিবাসের পিছনদিকটায়। বজঘটকে সেখানে কোন ঘর দেওয়া হয়েছে, তার একটা আগাম খবর ছিলই ওর কাছে। গুঁড়ি মেরে সেই জায়গায় ঠিক পিছনে চলে গেল। দূর থেকে ঘরের পিছনের জানালাটাকে খুঁজে নিল। ভিতরে আলো জ্বলছে। দু’জন লোকের ঘোরাফেরাও আবছা নজরে আসছে। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে আর আস্তে আস্তে তার খুব কাছে পৌঁছাল। এবার জানালা দিয়ে ঘরের ভিতরটা একেবারে স্পষ্ট। নিজেকে লুকিয়ে মনযোগ দিয়ে চোখ রাখল জানালায়। ওহ্‌, মস্ত দৈতের মতো চেহারার লোকটাই তা’লে বজঘট! দেখে বেশ চমকে গেল পলু। আরে বাবা! এই চেহারার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নেবে সে? ভাবতেই হাড় হিম হয়ে যাবার জোগাড়। তবুও ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরে ঘরের ভিতর চুপচাপ চোখ ফেলে রাখল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদ্ভুত মজার এক দৃশ্য ধরা দিল ওর চোখে। তা দেখতে দেখতে কী যেন এক আবিষ্কারের আনন্দ ঝিলিক মেরে উঠল ওর মাথায়। মেঘের ভিতর বিদ্যুৎ চমকের মতো। আর দাঁড়াল না সে। যেমন চুপি চুপি এসেছিল, তেমনই গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল ফিরতি পথে। রাজপথের আলো আর রাজপ্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে ফিরে গেল বাড়ি। ঘরের ভিতরের দৃশ্যটা চুরি করতেই যেন এসেছিল সে এত মেহনত করে। আর তার চিন্তা নেই বোধহয়। বজঘটের বিপরীতে নাম দিতে পরদিনই চলে গেল সে রাজসভায়।
পলুকে রাজসভায় দেখে অবাক রাজামশাই। বেঁটেখাটো চেহারা, রোগাপটকা গড়ন। মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁচাপাকা দাড়ি। কুস্তির ব্যাপারে নয়, নিশ্চয়ই অন্য কোনও কাজে এসেছে লোকটা। কিন্তু ওর কথাগুলোয় রাজামশাই যে অবাক না হয়ে পারলেন না! ওঁকে প্রণাম জানিয়ে বজঘটের সঙ্গে নিজের কুস্তি লড়ার ইচ্ছেটা প্রকাশ করে ফেলল পলু। অথচ চেহারায় বজঘটের কাছে সে যে একেবারেই শিশু। লড়বে কীভাবে! ওর এমন আজব কথায় মুখে কোনও কথাই সরল না রাজামশাইয়ের। শেষে অনেক কষ্টে বললেন, “বজঘটের চেহারাটা দেখেছ তো?”
মাথা চুলকে পলু বলল, “আজ্ঞে দেখিনি। তবে শুনেছি।”
ওকে দেখানোর জন্য বজঘটকে সামনে নিয়ে আসা হল। রাতে চুরি করে দেখলেও সামনাসামনি দেখে আবারও খানিক চমকাল পলু। কিন্তু বাইরে কোনওভাবেই তা প্রকাশ করল না। নিজের কথায় অটল থেকে বলল, “হ্যাঁ রাজামশাই, আমি রাজী।”
বজঘটকে নিজের ঘরে পাঠিয়ে পলুকে একান্তে দ্বিতীয়বার ভাবার কথা বললেন রাজামশাই। পলুও দমে যাবার পাত্র নয়। ওর ছোটোখাটো চেহারাটার দিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকালেন হতবাক রাজামশাই। বললেন, “মনে রেখো, এ কিন্তু ছেলেখেলা কিংবা ফাজলামির ব্যাপার নয়। রীতিমতো রাজ্যের ইজ্জতের লড়াই। পারবে তো? নাকি মানসম্মান সব খুইয়ে ছাড়বে?”
পলু হাতজোড় করে আত্মবিশ্বাসের সুরে বলল, “সাধ্যমতো চেষ্টা করব, রাজামশাই। আপনি শুধু আশীর্বাদ করুন আর ভরসা রাখুন আমার উপর।”
ভয়ে তো এই এক পলু ছাড়া আর কেউ এগিয়েই এল না। মহারাজের ভরসা না রেখে আর উপায়ই বা কী? হার মানতে হলে হবে। এ ছাড়া কী করার আছে তাঁর?

বাবুইডাঙার বিশাল মাঠে লড়াইয়ের আয়োজন। পাত্রমিত্র সহ রাজামশাইয়ের বসার বিশেষ ব্যবস্থা একেবারে সামনের দিকে। দুশ্চিন্তায় মুখে প্রায় কথা নেই তাঁর। হাসি তো বহুদিন থেকেই উধাও। ওঁর আমন্ত্রণে সেনাপতিগড় থেকেও এসেছেন বিশেষ কিছু অতিথি। তাঁদেরও জায়গা হয়েছে সামনের সারিতে রাজামশাইয়ের পাশাপাশি। দর্শক হিসেবে সারা রাজ্য থেকে মানুষজনের ঢল নেমেছে গোটা মাঠ জুড়ে। বিকেল হওয়ার বহু আগেই হাজার হাজার দর্শক ঘিরে ফেলল মাঠ। আশেপাশে বাড়ির ছাদে, গাছপালার ডালে ডালে লোকজন সব উঠে বসে আছে। টগবগে উৎসাহ মানুষের মধ্যে। তীব্র প্রতীক্ষা তাদের। কখন শুরু হবে কুস্তি লড়াই। ওদিকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বজঘট আর পলুও তৈরি। বিচারক বাঁশি হাতে নিজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন খেলার কোর্টের গা ঘেঁষে।
ঘড়ি দেখে ঠিক বিকেল চারটেয় পিলে চমকানো শব্দে শিঙা ফুঁকে ঘোষণা হল লড়াইয়ের সূচনা। বিশাল এক লাফ দিয়ে মাঠে নামল বজঘট। নীল স্যান্ডো গেঞ্জি আর খাকি হাফপ্যান্ট পরনে। রাগী রাগী চোখমুখ। হাঁটাচলায় এই মারে কি সেই মারে একটা ভাব। বজ্রাপাতের মতো ‘হুম’ শব্দে মাঠ কাঁপিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল।
পলুই বা কম যাবে কেন? সেও কোত্থেকে লোকজনের ভিড় সরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। হাঁটুর উপর ন্যাতানো ধুতি আর আধময়লা গেঞ্জিতে সাদামাটা চেহারা। বজঘট নামের পাহাড়ের আড়ালে ওকে ইঁদুর ছাড়া কিছু ভাবাই যাচ্ছে না। তবে হাবভাবে কোথাও ওর ভয়ের কণামাত্র নেই। বরং দু’চোখে ঝরে পড়ছে অসম্ভব দুঃসাহস। কাছা বাগিয়ে তিড়িং করে দিল একখানা তুড়ি লাফ। নিজের দুই উরুতে মারল জোরসে চাঁটি। সাহসী গলায় আওয়াজ দিল, “এস বাবা বজঘট, আমিও তৈরি। ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ তো দ্যাখোনি।”
সেই রাতের চুরি করা দৃশ্যটা মাথায় দাগ কেটে বসে আছে পলুর। খালি গায়ে খাটে বসে বজঘট। চোখ বন্ধ। দুই বাহু উঁচু করে তুলে ধরা। সাকরেদ পুলিনবিহারী বাহুর নিচে ওর চওড়া বগলে মাথা দিয়ে গুঁতো মেরে যাচ্ছে। গুঁতোর পর গুঁতো। বজঘট তাতে হেসে একেবারে লুটোপুটি! নিঃশব্দ অথচ জোরালো হাসি। অত বড়ো শরীরটা ওর একেবারে শিশু হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে বিশাল খাট জুড়ে। ওটাই হয়তো বজঘটের অবসর বিনোদন। কিংবা মজার এক খেলা। আর পলুর কাছে তা বিপুল আত্মবিশ্বাসের মোক্ষম এক রসদ।
সরাসরি কুস্তি শুরুর হুইসেল বেজে উঠল বিচারকের। বজঘট কিছু বুঝে ওঠার আগেই পলু এক ঝটকায় গুঁড়ি মেরে বজঘটের পা বেয়ে সুরুত করে উঠে গেল একেবারে ওর কোমরে। হাত দিয়ে বুক ওর এমনভাবে জড়িয়ে রাখল যেন কুস্তির জব্বর একখানা প্যাঁচ কষছে। দু’পায়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। মাথা একদম সুবিধামতো বজঘটর বগলের ঠিক নিচে। ব্যস। আর চিন্তা কী? পলুর অ্যাকশনে মুহূর্তে শরীর কাঁপানো হাসিতে কঁকিয়ে উঠল বজঘট। শেষমেশ মাঠে শুয়েই পড়ল। পলু আর দেরি করল না। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে গেল ওর বুকের উপর। ব্যস, লড়াই খতম। হাতের দু’আঙুল তুলে পলু দেখিয়ে দিল ‘ভি’। মানে ভিক্ট্রি। সবাই বুঝল, জিতে গেছে পলু। লোকে ধন্য ধন্য করল পলু নাপিতের। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন রাজামশাই। পলুর উপর অবিশ্বাস ওঁর ভেঙে একেবারে চুরমার। বাঁধভাঙা খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন তিনি। কল্যাণখণ্ডের মুখ রেখেছে পলু। শুধু সত্যিটা কেউ জানতেই পারল না। পলুর কাছে নয়, বজঘট আসলে হেরে গেছে নিজের হাসির কাছেই!
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment