গল্পঃ নির্জীবঃ অপর্ণা গাঙ্গুলি



তার নাম রাখা হয়েছিল নির্জীব। এইটুকু একরত্তি এক মুরগির খোকা। নাহ্‌, তার অন্য ভাইবোনেরা তার মতো ছিল না মোটেই। তারা সব তাগড়াই, গাঁট্টাগোট্টা। তাদের বাবা লেগহর্ন মুরগি কিনা। থাকত রহিমচাচার খামারেই। সবক’টাতে। আর আমি যখন সেই খামারে ঘোড়াকে বিচালি-দানা খাওয়াতে যেতাম, রোজ দেখতাম নির্জীবকে। রোদ্দুর পোহাত বসে। অন্য মুরগিছানাদের মতোছটফট করত না মোটেই। মানে, করতে পারত না আর কি। কী করে করবে? তার গায়ের পালক কম, কেমন উড়ো উড়ো আর চেহারা কেমন ল্যাগব্যাগে যে!
আমাকে দেখেই ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত ওদের ঘরের মধ্যে আর ওইখান থেকে ডানার মধ্যে থেকে এক চক্ষু বুজে কী অদ্ভূতভাবে দেখত। মনে মনে হয়তো ভাবত, আমি কখন চলে যাব বাড়ি আর ও বাইরে বেরুবে। আমার খুব কষ্ট হত ওর জন্য। আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু লালার কথা মনে পড়ত। ওর পায়ের কী একটা অসুখ। ভারি খুঁড়িয়ে হাঁটে আর আমাদের স্কুলের দুষ্টু ছেলেরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আমি ওদের খুব বকে দিই। মা বলেছেন, কারও শরীরের গঠন নিয়ে ঠাট্টা না করতে।
এখানেও দেখলুম নির্জীবের ভাইবোনেরা ওকে ক্যাঁক ক্যাঁক করে কেমন ব্যঙ্গ করে। কেউ ওকে সাহায্য করে না। নির্জীব আমাকে ভুল বোঝে। ওকে তো আমি সাহায্য করতেই চাই, বলো? কিন্তু আমাকে দেখলে ও ভয় পেয়ে ছুটে পালায়। তা সেদিন হল কী, রহিমচাচা শহরে গেছেন তাঁর খামারের জিনিসপত্র বিক্রি করতে। বিরাট বড়ো কুমড়ো, লাউ, ইয়া বড়ো শালগম, বীট, গাজর ফলেছে এবার। তাই এইসব জিনিসপত্র নিয়ে রহিমচাচা গেছেন শহরে। আমাকে বলে গেছেন খামারের দেখাশোনা করতে। এমন সময়ে পাড়ার দুটো দুষ্টু ছেলে খামারের ভেতরে ঢুকে পড়ে খুব দুষ্টুমি আরম্ভ করেছে। গাছের পাতা ছেঁড়ে আর গাছগুলো ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে, ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলছে এদিক সেদিক, আপেল পেড়ে অর্ধেক খেয়ে এমন ছুড়ছে যে মাঠে ঘোড়াদের গায়ে, গরুদের গায়ে আঘাত লাগছে। তারপর কালী-গরুর দুধের বালতিতে ময়লা ফেলছে, হাঁস-মুরগি ছেড়ে দিচ্ছে এধারে ওধারে, ঘোড়াদের লেজ পেঁচিয়ে দিচ্ছে এমন যে তার চিহি-হি-চিহি-হি করে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে মরছে। আমি ওদের বারণ করতেই ওরা মুখ ভেংচিয়ে, কলা দেখিয়ে আরও দুষ্টুমি বাড়িয়েছে।
আমি শুধু মনে মনে ভাবছি এদিকে, নির্জীবের কাছে যেন না আসে। ওমা, যেই ভাবা সেই কাজ। এদিকেই তো আসছে ওরা। আর এসেই হাস-মুরগিদের তাড়া করে ঘরে ঢোকাতে চেষ্টা করছে। বেচারি নির্জীব ভয়ে পালাতে গিয়ে দু’বার উলটে পড়েছে। ছেলেগুলো তাই দেখতে পেয়ে আরও জোরে তাড়া করেছে ওকেই। আমি দেখলাম, ওমা অবাক কাণ্ড, নির্জীবের পা ভাল হয়ে গেছে! ও স্বাভাবিকভাবে ছুটছে তো! ছেলেরা যত তাড়া দেয়, ও আরও ছোটে। সারা মাঠ জুড়ে ছুটতে থাকে বেচারা নির্জীব। আমার আনন্দ হচ্ছে, বাহ্‌, ও ছুটতে শিখে গেল তাহলে!
কিন্তু না। একটু পরেই উলটে পড়ল নির্জীব। ছেলেগুলো কাছে গিয়ে বুঝল কী হয়েছে, আর এ-ওর মুখে তাকিয়ে দে ছুট। শুধু আমি বসে রইলাম মাঠে একা একা রহিমচাচা ফিরে আসার অপেক্ষায়। আমার চোখে জল। আহা রে, বেচারা নির্জীবের দুর্বল দেহ এত পরিশ্রম নিতে পারেনি শেষে। সেদিনের বিকেলটা অন্যদিনের মতো নয়। বড্ড মায়া মায়া, বড্ড কষ্টের। যেন নির্জীবের দুঃখকষ্টের কথা ছড়িয়ে আছে সারাটা আকাশ জুড়ে।
ছেলেগুলো চলে যেতেই ওর ভাইবোন বাবা-মা সবাই নির্জীবকে ঘিরে রইল। আর রহিমচাচা এসে সব শুনে আকাশের দিকে মুখ তুলে শান্ত গলায় বিড়বিড় করে বললেন, “ঈশ্বর ওকে নিজের কোলে নিয়েছেন। তুমি ভেব না, ওর থাকার আরও ভালো জায়গা হয়েছে।”
সেই রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম। নির্জীব টুকটুক করে হেঁটে বেড়াচ্ছে সারা মাঠ, আর আমার দিকে এগিয়ে আসছে আস্তে আস্তে। ওর মাথায় ভগবানের দেওয়া ফুলের মুকুট।
আর সেই যে দুষ্টু ছেলেগুলো, এই ঘটনার পর ওদের কঠিন শিক্ষা হয়েছিল মনে হয়। আর কোনওদিন দুষ্টুমি করতে সাহস পায়নি তারপর থেকে।
_____

1 comment:

  1. ভারী মায়াময় লেখা। গল্প বলার ভঙ্গিটি খুব সুন্দর।
    এই ভাবেই লিখতে থাকো অপর্ণা।

    ReplyDelete