বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ কেন করি খাই খাই (শেষ পর্ব) কিশোর ঘোষাল


শেষ পর্ব


এক


গত সংখ্যায় চাল, গম আর মাংসের পুষ্টির যে চার্ট দিয়েছিলাম, সেটা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পেরেছি, শুধু ভাত, শুধু রুটি অথবা শুধু মাংস দিয়ে মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় খাদ্যশক্তি অর্জন করা বেশ শক্ত। সেক্ষেত্রে মাংস-ভাত, কিংবা মাংস-রুটি, অথবা মাংস-ভাত-রুটি সঠিক পরিমাণে খেলে আমাদের সহজে শক্তিলাভ হয়, সব খাবারের মিলিত নানান পুষ্টিতে শরীর সুস্থ হয়, আবার খেতেও ভালো লাগে।
ধান-গম আবিষ্কারের পর ধীরে ধীরে আদিম মানুষ যত কৃষিনির্ভর হতে লাগল, ততই তাদের প্রাত্যহিক খাদ্য চিন্তা কমতে লাগল। তার কারণ, প্রত্যেকদিন ভোরে উঠে শিকারে যাওয়া, সারাদিন দুর্গম জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মনোমতো পশু পাওয়া বা না পাওয়ার অনিশ্চয়তা, শিকার করার সাফল্য ও ব্যর্থতার দুশ্চিন্তা ও বিপদ এবং দিনের শেষে পশু বয়ে এনে তাকে খাদ্য বানানো - সব মিলিয়ে সে ছিল প্রাণান্ত পরিশ্রম। তারপর ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত শরীরে পরের দিন ভোরে আবার শিকারে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত্রের ঘুম। এইভাবেই দিনের পর দিন, মাস, বছর কেটে যেত অবকাশ বা অবসরের জন্য প্রচণ্ড বর্ষার দিনগুলো ছাড়া। অন্য কোনও সময়ই ছিল না।
অন্যদিকে বছরে পাঁচ-ছ’মাস অনেক কম বিপজ্জনক পরিশ্রম করে কৃষিকাজে উৎপন্ন ফসল থেকে সারাবছরের খাদ্যসংস্থান পরিবারের প্রত্যেকের হাতে এনে দিল পর্যাপ্ত অবসর। এই নিশ্চিন্ত অবসর সময়টা মানুষ নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে শিখল।
আগুনের ব্যবহার এবং তারপর চাষবাস শিখে রান্না করা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্র অনেক হালকা হতে লাগল। রান্না করা খাবার চিবোনো অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায় চোয়ালের পেশী এবং দাঁতের গঠন বদলে গিয়ে মানুষের মুখ ও মাথার গঠনও বদলাতে লাগল। খাবার সময় কমে গিয়ে এবং খাবারের বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে শুধু খাওয়া, ঘুম আর বেঁচে থাকার চিন্তা ছাড়াও মানুষের হাতে অনেকটা সময় বেঁচে রইল। সেই সময়টা ব্যবহার হতে লাগল নানান চিন্তাভাবনায়। অতএব বেড়ে গেল মস্তিষ্কের ব্যবহার। সেই চিন্তাভাবনা যত সুসংহত হল, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ হতে লাগল দ্রুত। আগে শুধু কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাংস খেতে এবং হজম করতে যে পরিমাণ পুষ্টি-শক্তি ক্ষয় হত, এখন সেই উদ্বৃত্ত পুষ্টি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে চলল। অভিনব চিন্তাভাবনা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আরও উন্নতির দিকে, আরও সুস্থ, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে।
এখন আদিম মানুষের তিনটি পর্যায়ের কথা তুলনা করা যাক। নিচের প্রথম ছবিটি হোমো হ্যাবিলিস যারা পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করতে শিখেছিল, দ্বিতীয় হোমো ইরেক্টাস যারা আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, আর তৃতীয়টি আমাদের অত্যন্ত নিকট আত্মীয় হোমো স্যাপিয়েন্সের আদিম মানুষ, যারা চাষবাস, পশুপালন শিখে আধুনিক মানব সভ্যতার সূত্রপাত করেছিল। এদের নাক, মুখ, চোয়াল, ভুরু এবং মাথার গঠনের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো নয় কি? অবশ্য এই ক্রমোন্নতি ঘটতে লেগে গিয়েছিল লক্ষাধিক বছর।

যারা খুব কাজের মানুষ, তারা অবসর সময়েও বসে না থেকে নানান ফন্দিফিকির করে পশুপালন আয়ত্ত করে ফেলল। গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া পালন করে দুধ, মাংস এইসব খাদ্যের সহজ যোগান যেমন নিশ্চিত করল, তেমনি পশুদের কাজে লাগিয়ে চাষবাসের কাজেও প্রভূত সুবিধে হয়ে গেল। কেউ চাকা আবিষ্কার করে মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার ছোটো গাড়ি আবিষ্কার করে ফেলল। কেউ কেউ মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার জন্যে গড়গড়িয়ে চাকা চলার মতো রাস্তা বানিয়ে ফেলল! কেউ কেউ চিন্তাভাবনা করে আবিষ্কার করতে লাগল কৃষিকাজের সুবিধের জন্য নানান যন্ত্রপাতি। কাঠের লাঙ্গল, ধান ভাঙার ঢেঁকি, পাথরের দুই চাকার মধ্যে চেপে ডাল কিংবা গম গুঁড়ো করার জাঁতাকল। নিত্যপ্রয়োজনের জন্য গৃহস্থালী হাঁড়ি, কলসি, থালা, বাটি, নানান তৈজসপত্রাদি। এইভাবে জেগে উঠল মানুষের কারিগরি সত্ত্বা। গড়ে উঠতে লাগল নানান বৃত্তি - কুম্ভকার, সূত্রধর, কর্মকার, বাস্তুকার আরও কত!
বয়স্কদের কেউ কেউ বসে বসে লক্ষ করতে লাগল প্রকৃতি এবং ঋতুর পরিবর্তন। শুরু হয়ে গেল, সূর্য ও চাঁদ এবং নক্ষত্রদের চিনে দিন গোনা, পক্ষ, মাস, ঋতু ও বছর গোনা। তাদের মাথার মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করল অঙ্ক এবং হিসেব। জেগে উঠল মানুষের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সত্ত্বা। কারণ সেই হিসেবেই প্রাক-বর্ষায় জমি প্রস্তুত করা, প্রথম বর্ষায় বীজ বপন, শরৎ পার করে হেমন্তে পাকা ফসল কাটার আনন্দময় দিনগুলো আসে।
এই আনন্দ থেকেই জন্ম নিতে লাগল নানান উৎসব। মানুষের প্রথম উৎসব হয়তো নবান্ন। যে উৎসব আজও সারা ভারতে পালন করা হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে, কিন্তু একই মকরসংক্রান্তির দিনে। এই উৎসব পাকা ফসল ঘরে তোলার উৎসব। এই উৎসব ঘিরেই শুরু হয়ে গেল পাখিদের সুরে সুর মিলিয়ে গান বাঁধা। নানান বাদ্য আবিষ্কার করে বাজনা বাজানো। নাচ, গান, বাদ্য নিয়ে জেগে উঠল মানুষের শিল্পীসত্ত্বা। কেউ হল নট-নটী, কেউ বাদক-বাদিকা কিংবা গায়ক-গায়িকা।
অভিজ্ঞ, বৃদ্ধ মানুষেরা, যাঁরা কায়িক শ্রম আর তেমন করতে পারেন না, তাঁরাও চিন্তা করতে লাগলেন এই মানবজীবন নিয়ে। এই জীবন কোথা থেকে এল, এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই জগতের প্রকৃতি, জীব, জড় ও মানুষের সৃষ্টিকর্তা কে? সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র কার নির্দেশ মেনে এমন নিয়মিত? সূর্য আলো দেন, উত্তাপ দেন, মেঘ সৃষ্টি করেন, মেঘ বৃষ্টি ঝরায়, মাটিতে উপ্ত বীজ থেকে উদ্ভিদ জন্ম নেয়। আর চন্দ্র সেই উদ্ভিদের বৃদ্ধি দেন, ফল দেন, শস্যে রস ও পুষ্টি সঞ্চার করেন। মানুষের মধ্যে জেগে উঠল আশ্চর্য দার্শনিক সত্ত্বা। তাঁরা নিজেরাই চিন্তাভাবনা করে এই ধরনের নানান প্রশ্নের উত্তর খুঁজে মুখে মুখে বানিয়ে তুললেন ছন্দবদ্ধ জ্ঞান, যার নাম বেদ, উপনিষদ! তাঁরা ঋষি, মুনি, তাঁরা আজও আমাদের কাছে অদ্ভূত চিন্তাশীল জ্ঞানী হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র।
শিকারী আদিম মানুষদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিষ্ঠুর প্রতিকূল প্রতিবেশে বেঁচে থাকার একমাত্র তাগিদ। দয়া, মায়া, মমতা, করুণা - মনের এইধরনের সুকুমার প্রবৃত্তি জেগে ওঠার মতো পরিস্থিতিই ছিল না। যেটুকু ছিল, সেটুকুও অব্যক্ত, অস্পষ্ট। শিকারের নৃশংসতা ভুলে গিয়ে কৃষিকাজে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তাদের মনের প্রকৃতিও দ্রুত বদলে যেতে লাগল। তাদের এখন বছরের অনেকটা সময় কাটে সিক্ত শীতল মাটি, মেঘমেদুর আকাশ, অবিরল বর্ষণে পূর্ণ হতে থাকা হরিৎ শস্যক্ষেত্রে। এই সংস্পর্শ মানুষের মনকে অনেক নরম, স্নিগ্ধ করে তুলতে লাগল। এমনকি, ফসল কাটার পর শূন্য জমির দিকে তাকিয়েও তাদের মনের মধ্যে বেজে উঠতে লাগল রিক্ততার সুর। সেই সুরে তাদের মনে বাজতে লাগল সবুজ শস্যের সজীব মাধুর্য এবং তার বিপরীতে ফসল ফলানো শস্যের মৃত্যুর নিঃস্বতা। বেড়ে উঠল পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধনের নিবিড়তা। পরিবারের, সমাজের, গ্রামের অসুস্থ, দুর্বল মানুষের জন্য সুস্থ মানুষদের মনে এল সহানুভূতি। কীভাবে এই অসুস্থ মানুষগুলোকে নীরোগ করা যায়, সেই চিন্তা এবং ব্যাকুলতা থেকে ধীরে ধীরে কিছু মানুষ ঝুঁকলেন চিকিৎসাচর্চায়। নানান লতাগুল্ম, শিকড়, পাতা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে করতে গড়ে উঠতে লাগল আয়ুর্বেদশাস্ত্র। অসহায়, অক্ষম মানুষদের প্রতিও তারা অনুভব করতে লাগল দয়া, নিঃস্বার্থ দান হয়ে উঠল মানুষের পরম পুণ্যকর্ম।


দুই


শিকারী আদিম মানুষেরা ছোটো ছোটো দলে যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াত এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে। এই দলগুলোর অধিকাংশই হত মূলত বৃহত্তর পারিবারিক সূত্রে বাঁধা। একটি দলের মানুষেরা সাধারণত অন্য দলের মানুষদের এড়িয়ে চলত। কখনও কখনও মুখোমুখি বা কাছাকাছি হলে দুই দলে বেঁধে যেত প্রচণ্ড লড়াই, দুই দলেরই অনেক মানুষ হতাহত হত। এই লড়াই হত প্রধানত কোনও এলাকার কিংবা জঙ্গলের দখল নিয়ে, কারণ একই জঙ্গলে দুই শিকারী দলের জন্য অসম্ভব ছিল পর্যাপ্ত পশুর যোগাড়।
কৃষিকাজ শিখে ফেলার পর একেকটা দল বিস্তৃত ব্যবধানে গড়ে তুলতে লাগল একেকটা গ্রাম। প্রথমদিকে কৃষিক্ষেত্র নিয়ে তাদের মধ্যে রেষারেষি ছিল; উৎপন্ন ফসল লুঠ করে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সখ্যতা, আদানপ্রদানের সম্পর্ক। এর পিছনেও ছিল মানসিক পরিবর্তন। শিকারী মনের নিষ্ঠুর হিংস্রতা থেকে মানুষ হয়ে উঠতে লাগল সহমর্মী এবং সহিষ্ণু। এক গ্রামের উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে অন্য গ্রামের উৎপন্ন যন্ত্রপাতি, তৈজসপত্রাদি বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্য সম্ভাবনা। ধীরে ধীরে একধরনের মানুষ বাণিজ্যকেই বৃত্তি করে নিয়ে পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দূরদূরান্তের গ্রামে। সমাজে নতুন এই শ্রেণীর নাম হল বণিক। এই বাণিজ্য থেকে কৃষিনির্ভর সাধারণ গ্রামগুলোও সমৃদ্ধ হতে হতে তার গায়ে ছোঁয়া লাগল অর্থনীতির।
এই বণিকেরাই হয়ে উঠলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের যোগসূত্র। তাঁরা যত দূরদেশে যান, ততই নানান পরিবেশ, নানান মানুষের সংস্পর্শে আসেন। দূর দূর গ্রামের বৈশিষ্ট্যবার্তা তাঁরাই বহন করতেন অন্য গ্রামে। তাঁদের পরোক্ষ সংযোগে গড়ে উঠতে লাগল বৃহত্তর মানুষের সমাজ। সে সমাজ কয়েকখানা মাত্র গ্রামে আর সীমাবদ্ধ রইল না, ব্যাপ্ত হতে লাগল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। একেক গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার, জ্ঞান-বিদ্যা পরষ্পরকে প্রভাবিত করে গড়ে উঠতে লাগল সর্বজনীন দেশাচার। গড়ে উঠতে লাগল সর্বজনমান্য এক সামাজিক বিধিবিধান, যার নাম ধর্ম। ধর্ম যা ধরে থাকে মানুষকে, ধর্ম যা বেঁধে রাখে সমাজকে। এই ধর্ম কোনও একক ব্যক্তির জীবনদর্শন নয়। এই ধর্ম সর্বজনের হিতের জন্য, সমাজের সকল মানুষের মঙ্গলের জন্য – সর্বজনীন, সনাতন।


তিন


এতক্ষণ যা কিছু বললাম, সবই অত্যন্ত ভালো, সুন্দর এবং যেন স্বপ্নের মতো। কিন্তু কৃষিকাজেও সর্বদাই যে সাফল্য আসবে, তেমনটা আজও হয় না, তখনও হত না। কৃষিকাজের অনেকটাই নির্ভর করে প্রকৃতির মর্জির উপর। যে বছর সুবর্ষা হয়, সে বছর ফসল খুব ভালো হয়। মাঝে মাঝে অতিবৃষ্টিতে মাঠে অতিরিক্ত জল জমে গাছ পচে যায়, ফসল হয় না। কোনও বছর আবার অনাবৃষ্টিতে ফসল হবার আগেই মাঠের গাছ শুকিয়ে মরে যায়। দুয়েক বছর এমন হলে একটু কষ্টে হলেও বিপদ হয়তো সামলে নেওয়া যায়, কিন্তু এমন অনেক অনেক বছর অনাবৃষ্টি হলে অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে।
অতি সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্রে আমাদের খড়্গপুর আইআইটির কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো উন্নত নগরসভ্যতা ছেড়ে সেখানকার মানুষ অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল সুদীর্ঘ অনাবৃষ্টির জন্য। তাঁদের অভিমত, প্রায় ন’শো বছর ধরে ওই অঞ্চলে এই অনাবৃষ্টিজনিত খরা চলেছিল। এই অনাবৃষ্টির জন্য, হিমালয়ের যে হিমবাহ (glacier) থেকে সিন্ধু ও সরস্বতী নদীর উৎপত্তি, সেই হিমবাহটিও প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে দুটি নদীই শুকিয়ে গিয়েছিল দীর্ঘদিন। প্রসঙ্গত, সরস্বতী নদী পরবর্তী কালে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ এই দুই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল অজস্র গ্রাম ও নগরসভ্যতা।
আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও যাঁরা কৃষিজীবী, তাঁদের কৃষির জন্য আজও প্রকৃতি ও সুবর্ষার উপরেই সবথেকে বেশি নির্ভর করতে হয়।
খরার কথা যেমন বললাম, তেমনই ছিল (এবং আজও আছে) অতিবৃষ্টি। এই অতিবৃষ্টিতে নদী প্লাবিত হয়ে ভাসিয়ে দেয় দুই পাশের গ্রাম ও কৃষিক্ষেত্র, নষ্ট করে দেয় ফসল ফলার সম্ভাবনা। সে যুগের সীমিত ক্ষমতায় বন্যা ও খরার থেকে রক্ষা পেতে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হত। যেমন বন্যার জল আটকাতে নদীর দু’পাড়ে উঁচু বাঁধ নির্মাণ। বর্ষার জলকে সঞ্চিত করার জন্যে গ্রামের ভেতরে কিংবা বাইরে পুকুর, দীঘি খনন। কিন্তু সে ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল এবং আজও আমাদের উন্নত প্রযুক্তির নানান সেচব্যবস্থায় (irrigation system) এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়নি।
সেই যুগের তুলনায় আজকের দিনে অনেক উন্নতি ও প্রগতি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে আজও কৃষিজীবীদের কাছে কৃষিকাজ অনেকটাই প্রকৃতি-নির্ভর অসম এক লড়াই এবং অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু গ্রামের মাঠে মাঠে তাঁরা কতটা পরিশ্রম করেন তার খবরও রাখি না আমরা। তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের ফসলে আমরা দু’বেলার নিশ্চিন্ত পুষ্টি পেয়ে বিজ্ঞানের নানান চর্চায় ব্যস্ত থাকি। আমরা শহরের আরামদায়ক অভ্যস্ত জীবনে যখন দূরদর্শন, কম্পিউটার এবং চৌকস দূরভাষের পর্দায় আধুনিক বিজ্ঞানের অদ্ভূত সাফল্যে বারংবার উচ্ছ্বসিত হই, তখন হাজার হাজার বছর ধরে কৃষিজীবী ওই মানুষগুলোর অবদানের কথা কী ভুলে থাকব? আজও কি আমরা স্বীকার করে নেব না, যে ওঁদের পরিশ্রমের ফসলেই আমাদের সকলের বিদ্যা-বুদ্ধি ও এই বিজ্ঞানচর্চার বাড়বাড়ন্ত? বিজ্ঞানের পাঠশালায় আধুনিক বিজ্ঞানের নানান জটিল বিষয় থাকতে হঠাৎ ধান-গম নিয়ে এই লেখাটা তাই মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়।

_____

No comments:

Post a Comment