ধারাবাহিকঃ কুরুপাণ্ডব কথাঃ (চতুর্থ পর্ব) মৈত্রেয় মিত্র


চতুর্থ পর্ব



দ্রোণের আচার্য পদ

রাজকুমারেরা প্রাসাদে ফিরে পিতামহ ভীষ্মের কাছে সমস্ত ঘটনার কথা এবং সেই ব্রাহ্মণের রূপ ও আশ্চর্য গুণের কথা বর্ণনা করলেন। এও বললেন, সেই ব্রাহ্মণ আচার্য কৃপের ভবনে থাকেন। মহামতি ভীষ্ম কুমারদের বর্ণনা শুনেই বুঝতে পারলেন, যে মনোমতো আচার্যের সন্ধান না পেয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন, সেই দ্রোণ দৈবক্রমে তাঁদের নগরেই উপস্থিত হয়েছেন। তিনি দেরি না করে নিজেই দ্রোণের কাছে গেলেন। তারপর সসম্মানে নিজের প্রাসাদে এনে তাঁর সেবা করে জিজ্ঞেস করলেন, “হে দ্বিজবর, আপনার হস্তিনাপুরে আসার কারণ কী? আর কেনই বা এতদিন নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন?”
দ্রোণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হে মহাত্মন, শৈশবকালেই পিতা ভরদ্বাজের কাছে আমার সমস্ত বেদ ও বেদাঙ্গের পাঠ শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাল্যাবস্থাতে পিতার মৃত্যু হওয়ায় পিতার কৃতী শিষ্য মহর্ষি অগ্নিবেশ আমাকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ব্রহ্মচর্য ব্রত পালনে আত্মসংযম ও তপস্যা করে অনেক বছর গুরু অগ্নিবেশের সেবা করেছিলাম। গুরুদেব প্রসন্ন হয়ে আমাকে সকল বিদ্যা এবং একটি দিব্য আগ্নেয় অস্ত্র দান করে তার প্রয়োগ এবং সংযম শিক্ষা দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছিলেন। এই দিব্য অস্ত্রটি আমার পিতাই তাঁকে দান করেছিলেন।
“গুরু অগ্নিবেশের আশ্রমে ওই সময়েই পাঞ্চালদেশের রাজপুত্র দ্রুপদও অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষার জন্যে বাস করত। বাল্যকাল থেকে দ্রুপদের সঙ্গে একসাথে থাকা, একই গুরুর কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্যে আমাদের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। একদিন সে বলেছিল, ‘ভাই দ্রোণ, আমি পিতার সব থেকে প্রিয় পুত্র। তিনি আমাকে যখন পাঞ্চালরাজ্যের রাজা ঘোষণা করবেন, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমার যাবতীয় সুখ, সম্পদ, ক্ষমতায় তোমারও সমান অধিকার থাকবে।’ এই কথার কিছুদিন পরেই দ্রুপদ আশ্রমের পাঠ সম্পূর্ণ করে নিজের রাজ্যে ফিরে গেল। কিন্তু দ্রুপদের বন্ধুত্বের কথা সর্বদাই আমার মনে পড়ত।
“ওই সময়ে সর্বশাস্ত্রজ্ঞ, সর্বজ্ঞানসম্পন্ন ঋষি জমদগ্নির পুত্র পরশুরাম তাঁর সর্বস্ব ব্রাহ্মণদের দান করার সঙ্কল্প নিয়েছিলেন। আমি সেকথা জানতে পেরে মহাত্মা পরশুরামের কাছে ধনুর্বেদ, দিব্য অস্ত্র সমূহ ও নীতিশাস্ত্র জ্ঞান লাভ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। মহেন্দ্র পর্বতের কাছে এক অরণ্যে গিয়ে তাঁর দেখা পেলাম। মহাবীর পরশুরাম সংসার ত্যাগ করে তখন অরণ্যেই বাস করছিলেন। আমি ভগবান পরশুরামের সামনে গিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করে বললাম, ‘হে মহাত্মন, আমি মহর্ষি অঙ্গিরার বংশের মহর্ষি ভরদ্বাজের পুত্র, আমার নাম দ্রোণ। আমি গুরু অগ্নিবেশকে সন্তুষ্ট করে দিব্য আগ্নেয় অস্ত্র সংগ্রহ করেছি। এখন আমি আপনার কাছেও কিছু পাওয়ার আশায় এসেছি।’ ক্ষত্রিয়বংশ ধ্বংসকারী ভগবান পরশুরাম প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, আমার যা কিছু সোনা ও অন্যান্য সম্পদ ছিল, সবই ব্রাহ্মণদের দান করে ফেলেছি। নিজের বাহুবলে আমি যে বিশাল রাজ্য জয় করেছিলাম, তাও মহর্ষি কশ্যপকে দিয়ে দিয়েছি। এখন আমার কাছে অবশিষ্ট আছে আমার শরীর আর কিছু দিব্য অস্ত্রশস্ত্র। এগুলির মধ্যে তুমি কী চাও বলো, আমি তোমাকে দান করে দেব।’
“তাঁর এই কথায় আমি নতজানু হয়ে করজোড়ে বললাম, ‘হে বীরশ্রেষ্ঠ পরশুরাম, আপনি প্রসন্ন মনে আপনার সমস্ত দিব্য অস্ত্র আমাকে দান করুন। আমাকে ওই সকল অস্ত্রের প্রয়োগ এবং সংযমের পদ্ধতি শিখিয়ে দিন।’ মহাত্মা পরশুরাম ‘তাই হোক’ বলে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র এবং ওই সমস্ত অস্ত্রের ধনুর্বেদ আমাকে দান করলেন। এইভাবে ভগবান পরশুরামের কৃপা আর তাঁর থেকে মনোমতো দিব্য অস্ত্র সম্ভার পেয়ে আমার আনন্দের সীমা রইল না।
“হে শান্তনুপুত্র, আশ্রমের পাঠ সম্পূর্ণ হওয়ার কিছুদিন পরে পিতা ভরদ্বাজের পূর্ব নির্দেশমতো মহাত্মা শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে আমি বিবাহ করলাম। আমাদের পুত্রের নাম অশ্বত্থামা। আমার পিতা যেমন আমাকে পেয়ে খুশী হয়েছিলেন, তেমনি অশ্বত্থামাকে পেয়ে আমিও ভীষণ খুশী হয়েছিলাম। একদিন কোনও ধনী বালকের দুধ খাওয়া দেখে বালক অশ্বত্থামা আমার কাছে এসে কাঁদতে লাগল। বলল, ‘পিতা, আমি দুধ খাব। আমার মন ভীষণ চঞ্চল হল। আমি এমনই দরিদ্র পিতা, প্রিয় পুত্রের জন্য একটু দুধের সংস্থানও করতে পারি না! বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম একটু দুধের সন্ধানে। আমি একজন ধার্মিক অগ্নিহোত্র ব্রাহ্মণ, আমি একজন অস্ত্রবিদ। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও গাভীর দুধ সংগ্রহ করতে পারলাম না। বিষণ্ণ মনে ঘরে ফিরে এসে দেখলাম, ধনী বালকেরা অশ্বত্থামাকে পিটুলিগোলা দিয়ে লোভ দেখাচ্ছে। বলছে, ‘এই নে দুধ, খেয়ে দেখ।’ সরল বালক অশ্বত্থামা সেই পিটুলিগোলা পান করে মহানন্দে নৃত্য করছে, আর বলছে, ‘কী মজা, দুধ খেলাম।’ ধনী বালকের পিতারা বলল, ‘দেখ, এই বালক অশ্বত্থামা কীরকম হতভাগ্য, সে পিটুলিগোলাকেই ভাবছে দুধ! দরিদ্র দ্রোণের কিছুমাত্র লজ্জাও কি নেই?’ এইসব দেখে এবং শুনে আমার মন দুঃখের আগুনে যেন পুড়ে গেল। আমি নিজেকে ধিক্কার দিয়ে ভাবলাম, এই চরম দারিদ্র্যের জন্যে অন্য ব্রাহ্মণেরা আমাকে ত্যাগ করেছে! উপোস করেছি, তাও অর্থ উপার্জনের জন্যে কোনও অধর্মের কাজ আমি করিনি। কিন্তু প্রিয় পুত্রের এই দুরবস্থা দেখে আমি স্থির থাকতে পারলাম না।
“হে মহামতি ভীষ্ম, এইসব চিন্তার মধ্যে বন্ধু দ্রুপদের প্রতিজ্ঞার কথা মনে পড়ল। আমি আর দেরি না করে সপরিবারে পাঞ্চালরাজ্যের দিকে রওনা হলাম। পথে শুনলাম, দ্রুপদ কিছুদিন আগেই পাঞ্চালের নৃপতি হয়েছে। আমার মনে হল, আমার ভাগ্য এতদিনে সুপ্রসন্ন হয়েছে। বন্ধু দ্রুপদের সামনে উপস্থিত হয়ে বললাম, ‘হে রাজা দ্রুপদ, হে বন্ধুবর, আমি দ্রোণ, তোমার প্রিয়বন্ধু, চিনতে পারছ?’
“ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতার অহংকারে উদ্ধত রাজা দ্রুপদ আমাকে কোনও গুরুত্বই দিলেন না, বরং বিরক্ত মুখে বললেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, আমাকে বন্ধু বলে তুমি একেবারেই বোকার মতো কাজ করে ফেলেছ। তোমার মতো দরিদ্র শ্রীহীন লোকের সঙ্গে একজন ঐশ্বর্যবান রাজার কীভাবে বন্ধুত্ব হতে পারে? ছোটোবেলায় তোমার সঙ্গে আমার কিছুটা বন্ধুত্ব হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন আর সেই বন্ধুত্ব স্বীকার করার কোনও মানে হয় না। কোনও বন্ধুত্বই কখনও চিরস্থায়ী হয় না। কখনও মৃত্যু এসে, কখনও অত্যন্ত ক্রোধের কারণে বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ ঘটায়। অতএব সেই বন্ধুত্বের কথা তুমি এখন ভুলে যাও। হে ব্রাহ্মণ, পণ্ডিতের সঙ্গে মূর্খের কিংবা মহাবীরের সঙ্গে জড় ব্যক্তির বন্ধুত্ব যেমন কিছুতেই হতে পারে না, তেমনি একজন ধনবান ব্যক্তির সঙ্গে তোমার মতো দরিদ্রের বন্ধুত্ব কীভাবে হতে পারে? একজন রাজার কাছে কীসের লোভে তুমি আজ বন্ধুত্ব করতে এসেছ? তুমি বলছ, আমি তোমার সঙ্গে একসাথে রাজ্যভোগ ভাগ করে নেব বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম! কই, আমার কিন্তু সেকথা বিন্দুমাত্র মনে পড়ছে না। তবুও এসেই পড়েছ যখন, আজকের মতো খাওয়াদাওয়া করে রাতটুকু কাটিয়ে যাও। তার বেশি কিছু আর আশা করো না।’
“হে শান্তনুতনয়, দ্রুপদের মুখে এই কথা শুনে রাগে অপমানে আমার সারা শরীর জ্বলতে লাগল। আমি সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্চাল ছেড়ে চলে এলাম। আসার সময় মনে মনে যে ভীষণ প্রতিজ্ঞা আমি করেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে সেই প্রতিজ্ঞা পালন করতেই হবে। আর সেই আশাতেই আপনাদের আশ্রয়ে এসে শ্যালক কৃপের ভবনে উঠেছি। এখানে এসে পরিচয় গোপন রেখেছিলাম সংকোচে। ব্যর্থ এক জীবনের সংকোচ, চরম দারিদ্রের সংকোচ। আত্মগোপন করে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম। হয়তো আজই সেই সময়। এখন হে মহামতি ভীষ্ম, আপনার কোন প্রিয় কার্য করতে হবে, নির্দেশ করুন।”
মহামতি ভীষ্ম ধৈর্য ধরে দ্রোণের সকল কথা মন দিয়ে শোনার পর বললেন, “হে মহাত্মা, আপনার শরাসনে জ্যা আরোপ করুন। আপনি দয়া করে আমার বালক পৌত্রদের অস্ত্রশিক্ষার দায়িত্ব নিন এবং সর্বদা আমাদের পূজা পেয়ে প্রীতি প্রসন্ন মনে সুখভোগ করুন। কুরুদের যাবতীয় সম্পদ ও রাজ্য আপনার অধীনে থাকবে, আমরা হব আপনার আজ্ঞাবহ। হে দ্বিজবর, আপনি যখন যা ইচ্ছে করবেন সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আপনি নিজের ইচ্ছায় এখানে উপস্থিত হয়েছেন, আমাদের কৃপা করেছেন।”

পাণ্ডব ও কৌরব বালকদের অস্ত্রশিক্ষা

পিতামহ ভীষ্মের আন্তরিক সমাদরে প্রসন্ন হয়ে দ্রোণ রাজকুমারদের আচার্য পদ স্বীকার করে নিলেন। মহামতি ভীষ্ম আচার্য দ্রোণের থাকার জন্যে সুন্দর একটি ভবন ও প্রচুর ধন-সম্পদ উপহার দিলেন। পিতামহ ভীষ্মের আদেশে কৌরব, পাণ্ডব এবং অন্যান্য রাজকুমারেরা আচার্য দ্রোণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁকে প্রণাম করলেন। আচার্য দ্রোণ শিষ্যদের সম্মান ও শ্রদ্ধায় সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “হে শিষ্যগণ, আমি তোমাদের সকলকে খুব ভালোভাবে অস্ত্র শিক্ষা দেব। কিন্তু শিক্ষালাভের পর আমার মনের একটি ইচ্ছা তোমাদের পূরণ করতে হবে। যদি রাজি থাকো, এখনই প্রতিজ্ঞা করো।”
আচার্য দ্রোণের কথায় দুর্যোধন প্রমুখ কুরুপুত্রেরা সকলেই চুপ করে রইলেন। একমাত্র অর্জুন বললেন, “হে গুরুদেব, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আপনি যা আদেশ করবেন আমি তাই পালন করব।”।
এই কথা শুনে দ্রোণ আনন্দে অর্জুনকে আলিঙ্গন করলেন। অর্জুনের প্রতি স্নেহে তাঁর দুই চোখে অশ্রুধারা ঝরতে লাগল।
আচার্য দ্রোণ পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের নিয়মিত অস্ত্রশিক্ষা শুরু করলেন। এই সংবাদ পেয়ে অন্ধক বংশের রাজা সূতপুত্র কর্ণ এবং বিভিন্ন দেশের আরও অনেক রাজকুমারও অস্ত্রশিক্ষার জন্যে দ্রোণের কাছে আসতে লাগলেন। কর্ণ দুর্যোধনের সাহায্যে অর্জুন ও অন্যান্য পাণ্ডবদের প্রায়ই অপমান করতেন, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল আচার্য দ্রোণের সকল শিষ্যদের মধ্যে অর্জুনের সমকক্ষ আর কেউ নেই। তার উৎসাহ, শক্তি, বুদ্ধি এবং ধনুর্বেদ শিক্ষার আগ্রহ দেখে আচার্য দ্রোণ অর্জুনকে বিশেষ শিক্ষা এবং অতিরিক্ত উপদেশ দিতে শুরু করলেন।
সকল শিষ্য ও রাজকুমারদের একবার পুরষ্কার হিসেবে তিনি একটি করে ধারালো তির এবং মাটির পাত্র দিলেন। নিজের পুত্র অশ্বত্থামাকে দিলেন বড়ো মুখের মাটির কলস, আর অন্য সকলকে দিলেন ছোট্ট মুখের কমণ্ডলু। অস্ত্রশিক্ষা নিতে আসার সময় সকলকে সেই মাটির পাত্রে জল ভরে নিয়ে আসতে হত। বড়ো মুখের কলসে জল ভরতে সময় কম লাগে, ছোটো মুখ কমণ্ডলু ভরতে সময় লাগে অনেক বেশি। অতএব মাটির পাত্রে জল ভরে অন্যান্য সকলের আসার অনেক আগেই অশ্বত্থামা আচার্য দ্রোণের কাছে চলে আসতেন এবং সেই সময়টুকুর মধ্যে আচার্য দ্রোণ পুত্রকে বিশেষ বিশেষ অস্ত্রের বিশেষ শিক্ষা দিতেন। অর্জুন এই ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বারুণাস্ত্র দিয়ে নিজের কমণ্ডলু দ্রুত ভরে নিয়ে রোজ গুরুপুত্র অশ্বত্থামার সঙ্গেই এসে উপস্থিত হতেন। অর্জুনের এই বুদ্ধি, অস্ত্রশিক্ষা বিষয়ে তার অত্যন্ত আগ্রহ এবং গুরুর প্রতি তার একান্ত শ্রদ্ধা দেখে ধীরে ধীরে অর্জুন আচার্য দ্রোণের পুত্রের মতোই প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠলেন।
অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষায় এই আগ্রহ দেখে একদিন আচার্য দ্রোণ রাঁধুনিকে আড়ালে ডেকে বললেন, “হে বিজয়া, তুমি অর্জুনকে কোনওদিন অন্ধকারে খেতে দিও না। আর তোমাকে এই যে কথা বললাম, একথা অর্জুন যেন জানতে না পারে।”
এক রাত্রে অর্জুন খেতে বসেছেন, হঠাৎ প্রবল বাতাসে ঘরের দীপ নিভে গেল। অন্ধকারের মধ্যেও পাত্র থেকে মুখে খাবার তুলতে তুলতে অর্জুনের মনে হল, ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও পাত্র থেকে অন্নের গ্রাস নিয়ে অভ্যস্ত হাত ঠিকই মুখে উঠে আসছে তো! অর্থাৎ, যেমন অভ্যাস করা যায় তেমনই কুশলতা বাড়ে। এই চিন্তা করে সেই রাত্রেই অর্জুন ধনুর্বেদ অভ্যাস করতে শুরু করলেন। তাঁর ধনুকের টঙ্কার শুনতে পেয়ে আচার্য দ্রোণ অন্ধকারে বেরিয়ে এলেন। অবাক আনন্দে তিনি অর্জুনকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “বৎস অর্জুন, আমি কথা দিচ্ছি, এই পৃথিবীতে তোমার মতো দক্ষ ধনুর্ধর আর কেউ যাতে না হয় সে চেষ্টা আমি করব।”
পরদিন থেকেই তিনি অর্জুনকে বিশেষ শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। হাতির কিংবা ঘোড়ার পিঠ থেকে, রথে চড়ে অথবা মাটিতে দাঁড়িয়ে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, সেই বিষয়ে তিনি বারবার উপদেশ দিলেন। শুধু তির-ধনুক নয়, গদাযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ, তোমর (বল্লম) কিংবা প্রাস (বর্শা) যুদ্ধㅡসমস্ত ধরনের যুদ্ধেই তিনি অর্জুনকে পারদর্শী করে তুলতে লাগলেন। আচার্য দ্রোণের এই অদ্ভুত শিক্ষার কথা শুনে বহু দেশের রাজা ও রাজকুমারেরা তাঁর কাছে আসতে লাগলেন।

একলব্য ও আচার্য দ্রোণ

একবার নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য আচার্য দ্রোণের কাছে এসেছিলেন। তিনি জাতিতে অস্পৃশ্য, ম্লেচ্ছーসকলের সঙ্গে একসাথে তাঁকে শিক্ষা দেওয়া উচিত নয় ভেবে আচার্য দ্রোণ তাঁকে ধনুর্বেদ শিক্ষা দিতে সম্মত হলেন না। ব্যর্থ একলব্য বিষণ্ণ মনে গুরু দ্রোণের চরণ বন্দনা করে অরণ্যে ফিরে গেলেন। সেই অরণ্যে তিনি আচার্য দ্রোণের একটি প্রতিমা বানালেন এবং সেই প্রতিমাতে আচার্য-ভাব সংস্থাপন করলেন। তারপর কঠোর ব্রত ধারণ করে নিজের মতোই অস্ত্রশিক্ষা করতে লাগলেন।
এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আচার্য দ্রোণের নির্দেশে কৌরব ও পাণ্ডবেরা মৃগয়ার জন্যে অরণ্যে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু লোক ছিল, আর ছিল একটি শিকারি কুকুর। অরণ্যে ঢুকে রাজকুমারেরা যখন এদিক সেদিক পশুর সন্ধান করছিলেন, সেই সময় ওই শিকারি কুকুর একটি হরিণকে তাড়া করে অরণ্যের গভীরে ঢুকে গেল। হরিণকে তাড়া করে কুকুর হঠাৎ নিষাদরাজপুত্র একলব্যের সামনে গিয়ে উপস্থিত হল। একলব্যের শীর্ণ মলিন দেহ, মাথায় বিশাল জটা, পরনে কৃষ্ণাজিন (কৃষ্ণ হরিণের চামড়া) দেখে কুকুর ভীষণ চিৎকার শুরু করে দিল। নির্জন তপস্যায় বাধা পেয়ে একলব্য বিরক্ত হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় সাতটি তির ছুড়ে কুকুরের মুখের চারপাশ মাজলের মতো আবদ্ধ করে দিলেন। কুকুর আহত হল না, অথচ তার চিৎকার করার শক্তি রইল না। এমন অদ্ভুত ঘটনায় নীরব কুকুর ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে এল পাণ্ডবদের কাছে। পাণ্ডবেরা কুকুরের মুখে তিরের মাজল বাঁধা অবস্থা দেখে ভীষণ আশ্চর্য হলেন। তির নিক্ষেপের এমন ক্ষিপ্র দক্ষতা আচার্য দ্রোণের প্রিয়শিষ্য অর্জুনেরও নেই! কে এই আশ্চর্য ধনুর্ধর? অর্জুন মনে মনে তীব্র ঈর্ষা অনুভব করলেন অজানা সেই ধনুর্ধরের প্রতি।
কৌতূহলী পাণ্ডবেরা সেই বনের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে একসময় অদ্ভুতদর্শন সেই মানুষকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে বীরবর, তুমি কে? কার পুত্র? এই গভীর অরণ্যে তুমি কী করছ?”
একলব্য উত্তর দিলেন, “আমি নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য। মহাত্মা দ্রোণের শিষ্য। এই অরণ্যে আমি একা-একাই ধনুর্বেদ শিক্ষা করছি।”
পাণ্ডবেরা রাজধানীতে ফিরে এলেন; আচার্য দ্রোণকে একলব্যের আশ্চর্য দক্ষতার কথা বললেন। অর্জুন আচার্য দ্রোণকে প্রণাম করে একান্তে বললেন, “হে গুরুদেব, আপনি বলেছিলেন আপনার কোনও শিষ্যই আমার থেকে দক্ষ ধনুর্ধর যাতে না হয় সে চেষ্টা করবেন। কিন্তু এখন অন্যরকম দেখছি যে! নিষাদরাজপুত্র মহাবীর একলব্য আপনারই এক শিষ্য, কিন্তু সে আমার থেকেও অনেক ভালো ধনুর্বেদ শিখেছে!”
অর্জুনের এই কথায় আচার্য দ্রোণও আশ্চর্য হলেন, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে অরণ্যে গিয়ে দেখলেন, জটাধারী মলিন দেহ নিষাদরাজকুমার একলব্য একনিষ্ঠ মনে ধনুকের থেকে বারবার তির ছোড়া অভ্যাস করে চলেছে। তার পাশে রয়েছে তাঁর নিজেরই মূর্তি! আচার্য দ্রোণ একলব্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গুরু দ্রোণকে দেখে একলব্য দৌড়ে কাছে এলেন; গুরুর চরণ বন্দনা করে নিজেকে তাঁর শিষ্য বলে পরিচয় দিলেন। তারপর তাঁকে পুজো করে, বসার আসন দিয়ে জোড়হাতে সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। আচার্য দ্রোণ বললেন, “হে বীর, সত্যিই তুমি যদি আমার শিষ্য হয়ে থাকো তাহলে এখনই গুরুদক্ষিণা দাও।”
একলব্য আনন্দিত মুখে বললেন, “ভগবান, গুরুকে অদেয় আমার কিছুই নেই। আদেশ করুন গুরুদেব, কী দক্ষিণা দেব।”
“হে বীর, যদি সম্মত হও তাহলে তোমার ডানহাতের বুড়ো আঙুলটি কেটে আমার গুরুদক্ষিণা দাও।”
গুরুদেবের এই ভয়ংকর আদেশে একলব্য কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন গুরুদেবের নির্বিকার মুখের দিকে। তারপর স্মিত মুখে নিজের ডানহাতের বুড়ো আঙুলটি কেটে গুরুদক্ষিণা দান করলেন।
প্রিয় শিষ্য অজুনের কাছে নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা হওয়াতে আচার্য দ্রোণ স্বস্তি পেলেন। একলব্যের অদ্ভুত গুরুভক্তি দেখে অর্জুন যেমন অভিভূত হলেন, তেমনি এই পৃথিবীতে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ রইল না দেখে তিনি নিশ্চিন্তও হলেন।


ক্রোধপরায়ণ দুর্যোধন ও ভীম দু’জনেই আচার্য দ্রোণের কাছে গদাযুদ্ধ অভ্যাস করতেন। অশ্বত্থামা সকল অস্ত্রচালনায় তাঁদের দু’জনের থেকে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। নকুল ও সহদেব অসিযুদ্ধে দক্ষ হয়ে উঠলেন। যুধিষ্ঠির রথচালনায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। একমাত্র অর্জুনই বুদ্ধি, বল ও সকল অস্ত্রচালনায় দক্ষ হয়ে সসাগরা ভারতে প্রখ্যাত হয়ে উঠলেন। সমস্ত রাজকুমারদের মধ্যে অর্জুনই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হয়ে উঠলেন। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা বলশালী ভীম ও কৃতী অর্জুনের সাফল্যে ঈর্ষায় জ্বলতে লাগলেন।

রাজকুমারদের অস্ত্রশিক্ষার পরীক্ষা

শিষ্যদের না জানিয়ে কোনও এক শিল্পীকে দিয়ে আচার্য দ্রোণ একটি নীল ডানার পুতুল-পাখি তৈরি করালেন। একদিন সেই পাখিকে বড়ো এক গাছের উঁচু ডালে বসিয়ে সকল শিষ্যদের ডেকে বললেন, “আজ তোমাদের অস্ত্রশিক্ষার পরীক্ষা। হে রাজপুত্রেরা, তোমাদের নিজের নিজের ধনুতে তির স্থাপন করে প্রস্তুত থাকো। আমি তোমাদের একে একে ডাকব, আমার আদেশ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই তির ছুড়ে ওই পাখির মুণ্ড কেটে মাটিতে ফেলতে হবে।”
প্রথমেই তিনি যুধিষ্ঠিরকে ডাকলেন। যুধিষ্ঠির ধনুতে তির জুড়ে উপরের দিকে লক্ষ্য নিয়ে দাঁড়ালেন। আচার্য দ্রোণ বললেন, “বৎস, তুমি কি গাছের শীর্ষে ওই পাখিকে দেখছ?”
যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, “দেখছি, গুরুদেব।”
“তুমি কি ওই গাছ, এই আমাকে এবং তোমার ভাইদের সকলকে দেখতে পাচ্ছ?”
“আমি ওই গাছ, আপনাকে, আমাদের ভাইদের এবং ওই পাখিকেও বারবার দেখছি, গুরুদেব।”
যুধিষ্ঠিরের এই উত্তরে আচার্য দ্রোণ বিরক্তমুখে বললেন, “তুমি পারবে না, বৎস। তুমি এখান থেকে চলে যাও।”
এভাবেই তিনি একে একে সকল রাজকুমারদের ডেকে একই প্রকার প্রশ্ন করলেন, কিন্তু কেউই তাঁর মনোমতো উত্তর দিতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। এরপর বাকি রইলেন শুধু অর্জুন। অর্জুনকে ডেকে আচার্য দ্রোণ বললেন, “বৎস, এবার তোমার পালা। তোমাকেই এই লক্ষ্য বিদ্ধ করতে হবে। ধনুতে তির স্থাপন করে লক্ষ্য স্থির করো, তারপর আমার কথা শেষ হতে না হতে লক্ষ্যভেদ করো।”
অর্জুন গুরুর আদেশ অনুসারে প্রস্তুত হয়ে পাখির দিকে লক্ষ্য স্থির করলেন। আচার্য দ্রোণ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “বৎস, তুমি ওই গাছ, গাছের ওই পাখি, আমাকে এবং তোমার ভাইদের সকলকে দেখতে পাচ্ছ তো?”
“না, গুরুদেব। শুধুমাত্র পাখিটিকে ছাড়া আমি কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না।”
“বাহ্‌! তার মানে তুমি পাখিটিকেই ভালোভাবে দেখছ?”
“না গুরুদেব, আমি শুধু পাখির মাথা দেখতে পাচ্ছি।”
আচার্য দ্রোণ সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে বললেন, “তাহলে লক্ষ্যভেদ করো, বৎস অর্জুন।”
আচার্য দ্রোণের কথা শেষ হতে না হতে পাখির কাটা মাথা মাটিতে এসে পড়ল। আচার্য দ্রোণ আনন্দে অর্জুনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর মনে হল, যুদ্ধে রাজা দ্রুপদকে যদি কেউ পরাজিত করতে পারে তাহলে সে অর্জুন ছাড়া কেউ নয়। তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

অস্ত্রশিক্ষা পরীক্ষার কিছুদিন পরে আচার্য দ্রোণ সকল শিষ্যদের নিয়ে ভাগীরথীর তীরে গেলেন স্নান করার জন্যে। সকলেই যখন ভাগীরথীতে স্নান করতে ব্যস্ত, হঠাৎ এক ভয়ংকর কুমির আচার্য দ্রোণের পা কামড়ে ধরল। আচার্য দ্রোণ কুমিরের গ্রাস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারতেন, কিন্তু তা না করে শিষ্যদের পরীক্ষা করার জন্যে তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “আমাকে কুমিরের গ্রাস থেকে রক্ষা করো, শিষ্যগণ!”
গুরুর আর্তনাদ শোনামাত্র অর্জুন পাঁচটি তীক্ষ্ণ তিরে সেই কুমিরকে বিদ্ধ করলেন। কুমির নিহত হল, মুক্ত হল আচার্য দ্রোণের পা। অন্যান্য কুমারেরা আকস্মিক এই ভয়ংকর ঘটনার আতঙ্কে হতবুদ্ধি হয়ে পটে আঁকা ছবির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর সকল শিষ্যের মধ্যে অর্জুনই যে শ্রেষ্ঠ, সে বিষয়ে আচার্য দ্রোণ নিঃসন্দেহ হলেন। তিনি সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে বললেন, “হে মহাবীর, ব্রহ্মশিরা নামে এক অমোঘ অস্ত্র তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি, শিখিয়ে দিচ্ছি এই অস্ত্রের প্রয়োগ এবং নিবারণের কৌশল। কিন্তু বৎস, মানুষের প্রতি এই অস্ত্র কখনও প্রয়োগ করো না। এই অস্ত্র সামান্য অস্ত্র নয়, সাবধানে এই অস্ত্র গ্রহণ করো। প্রবল তেজা কোনও অমানুষ জীব যদি তোমাকে হঠাৎ আক্রমণ করে, তার সংহারের জন্যে এই অস্ত্র ব্যবহার করো। অন্যথায় সমস্ত বিশ্বচরাচর এই অস্ত্রের প্রভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”
অর্জুন অঞ্জলি হাতে দিব্য অস্ত্র গ্রহণ করে অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, “তাই হবে, হে গুরুদেব।”
আচার্য দ্রোণ প্রসন্ন মুখে বললেন, “তোমার তুল্য ধনুর্ধর এই জীবলোকে আর কেউ হবে না।”

[কৃতজ্ঞতাঃ মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, প্রকাশকঃ বসুমতী সাহিত্য মন্দির]

(চলবে)
অঙ্কনশিল্পীঃ দীপিকা মজুমদার

No comments:

Post a Comment