আলোর দিশারীঃ পুষ্টিবিজ্ঞানী কমলা ভাগবত সোহনিঃ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়



‘রমন বড়ো বিজ্ঞানী হলেও ছিলেন খুবই সংকীর্ণমনা। শুধুমাত্র আমি নারী হওয়ার কারণে যে আচরণ তিনি আমার সঙ্গে করেছিলেন তা আমি ভুলতে পারি না। তা ছিল আমার প্রতি এক চরম অপমান। সেই সময় (বিজ্ঞানের জগতে) মহিলাদের বিরুদ্ধে মনোভাব ছিল খুবই প্রবল। একজন নোবেলজয়ীও যদি এইরকম ব্যবহার করেন, তাহলে আর কী আশা করা যায়?’
১৯৯৭ সালে ইন্ডিয়ান ওমেন সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাতে এই কথা বলেছিলেন কমলা ভাগবত সোহনি। আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে প্রথম পা ফেলেছিলেন যে কয়েকজন ভারতীয় মহিলা, কমলা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যে ঘটনার কথা তিনি বলেছেন, তা উনিশশো তিরিশের দশকের। সেই সময় মহিলাদের বিজ্ঞানের আঙিনায় প্রবেশকে অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। রমনও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কমলার অভিযোগ, একজন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীও উদার হতে পারলেন না, মহিলারা যে পুরুষদের মতোই বিজ্ঞান গবেষণা করতে পারে তা বিবেচনায় আনলেন না!
কমলা অবশ্য সমস্যার মুখোমুখি হয়ে দমে যাননি। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খুবই দৃঢ়চেতা। সেই সময় ঘরের বাইরে কাজ করতে গেলে মহিলাদের অবশ্য শক্ত মনের হতেই হত। কমলা ভাগবতের জন্ম হয় মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। সম্ভবত ১৯১১ সালে তাঁর জন্ম, তারিখ নিশ্চিত জানা যায় না। তাঁদের পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত, বাবা নারায়ণরাও ভাগবত ব্যাঙ্গালোরের টাটা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স থেকে রসায়ন পড়েছিলেন। কাকা মাধবরাও ভাগবতও ছিলেন রসায়নবিদ। তিনিও একই জায়গা থেকে শিক্ষালাভ করেছিলেন। বিজ্ঞানে আগ্রহ কমলা তাঁদের থেকেই পেয়েছিলেন। মাধবরাও ছিলেন বেশ মোটাসোটা চেহারার। ছোটবেলায় কমলাও বেশ মোটা ছিলেন, তাই ছোট্ট কমলার মনে হয়েছিল তাঁরও রসায়ন নিয়েই পড়া উচিত।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৩ সালে রসায়ন প্রধান বিষয় নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বিএসসি পাস করলেন কমলা। বাবা-কাকা যেখানে পড়াশোনা করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই এবার সেই টাটা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কমলা।
টাটা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও গল্পের মতো। ১৮৯৮ সালে ইউরোপগামী জাহাজে জামসেদজী টাটার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সাক্ষাৎ হয়। বিবেকানন্দ টাটাকে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটা প্রতিষ্ঠান তৈরির কথা বলেন। জামসেদজী প্রচেষ্টা শুরু করেন। স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ শাসকদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারা এই প্রস্তাবকে নানাভাবে বাধা দিয়েছিলেন। দেশীয় রাজ্য মহীশুরের রাজা তাঁর দেওয়ান শেষাদ্রি আয়ারের অনুরোধে ইনস্টিটিউটের জন্য ব্যাঙ্গালোরে তিনশো বাহাত্তর একর জমি দান করেন। জামসেদজীর মৃত্যু হলেও তাঁর পরিবার দেন মোট তিরিশ লক্ষ টাকা। ১৯০৯ সালে যাত্রা শুরু করে টাটা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স যা আজ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স নামে দেশের অন্যতম বৃহৎ গবেষণা কেন্দ্র।
প্রথম যুগে এই ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর বা অধিকর্তারা ছিলেন ব্রিটিশ। সি.ভি. রমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন ১৯১৭ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত। তারপরে তিনি ইনস্টিটিউটের প্রথম ভারতীয় অধিকর্তা হিসাবে যোগ দেন। তিনি অধিকর্তা থাকার সময়েই কমলা সেখানে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। কমলা আশা করেছিলেন রমনের সম্মতি শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর আবেদন নামঞ্জুর হয়। কারণ হিসাবে বলা হয় তিনি মহিলা! কমলার বাবা ও কাকার অনুরোধেও রমনের মত পালটাল না।
কমলা সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী ছিলেন না। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে বিশ্বাসী কমলা রমনের অফিসের বাইরে অবস্থান সত্যাগ্রহ শুরু করেন। অবশেষে রমন বাধ্য হয়ে তাঁকে ভর্তি করেন, কিন্তু শর্ত দেন যে প্রথম একবছর তিনি শিক্ষানবিশ থাকবেন। ঐ একবছরে রমন দেখবেন যে তাঁর গবেষণার ক্ষমতা আছে কি না এবং তাঁর জন্য পুরুষ গবেষকদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না। কিন্তু কমলার ক্ষমতাকে অস্বীকার করার কোনও সুযোগ ছিল না। একবছর পরে কমলাকে ইনস্টিটিউটের নিয়মিত ছাত্রী হিসাবে মেনে নিলেন রমন। এই আচরণে খুবই আহত হয়েছিলেন কমলা। সারাজীবনেও তা তিনি ভুলতে পারেননি।
রমনের সমর্থনে হয়তো একটাই কথা বলা যায় যে সে যুগে প্রায় সমস্ত ভারতীয় বিজ্ঞানীই নারীদের বিজ্ঞান গবেষণা করার ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। রমনও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। বিদেশেও যে পরিস্থিতি খুব অন্যরকম ছিল, তা নয়। মাদাম কুরিকে গবেষণাতে কত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা আমরা অনেকেই পড়েছি। মাদাম কুরির অভিজ্ঞতাকে ব্যতিক্রম বলা যাবে না। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই এমি নোয়েথারের নাম জানেন। প্রতিসাম্য বিষয়ে নোয়েথারের উপপাদ্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক মূল স্তম্ভ। জার্মানির গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে নিয়োগ করতে অস্বীকার করেছিল, কারণ তিনি মহিলা। গটিনগেনে সেই সময় ছিলেন সেই যুগের সেরা গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট। তিনি নোয়েথারের কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তিনি একসময়ে বলেছিলেন, “গটিনগেন তো বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ স্নানাগার নয়। এখানে নিয়োগের সময় পুরুষ নারী কেন বিচার করা হবে?”
কমলা সম্ভবত টাটা ইনস্টিটিউটের প্রথম মহিলা ছাত্রী নন। তাদের রেকর্ডে আরও দু’জন ছাত্রীর নাম আছে। ১৯২০ সালে এম.এম. মেহতা ও ১৯২২ সালে আর.কে. ক্রিস্টি নামের দুই মহিলা ভর্তি হয়েছিলেন, তবে তাঁদের সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। ইনস্টিটিউটে কমলা এমন একজন শিক্ষককে পেয়েছিলেন যিনি তাঁকে সাহায্য করতে দ্বিধা করেননি। তাঁর নাম ছিল এম শ্রীনিবাসাইয়া, ভারতে মাইক্রোবায়োলজি বা অণুজীববিদ্যা গবেষণাতে পথিকৃৎদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কমলা তাঁর অধীনে বায়োকেমিস্ট্রি বা প্রাণরসায়ন বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। কমলা দুধ, ডাল ও দানাশস্যের মধ্যে প্রোটিনের প্রকৃতি ও পরিমাণ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। ভারতের মতো দরিদ্র দেশে এই গবেষণার গুরুত্ব নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে তিনি কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। বায়োকেমিক্যাল জার্নাল গবেষণা পত্রিকাতে তার মধ্যে দুটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৫ সালে ‘The non-protein nitrogen of pulses’ ও ১৯৩৬ সালে ‘The non-protein nitrogen of pulses: Partitioning of the nitrogen and a determination of the essential amino-acids’। এই দুটি গবেষণাপত্রে কমলা ও শ্রীনিবাসাইয়া দেখান যে ভারতের সাধারণ ডালের মধ্যে সরল ও সহজপাচ্য পেপটাইড আছে যা শিশু ও অথর্বদের পুষ্টির পক্ষে খুবই উপকারী। ১৯৩৬ সালে তিনি এই গবেষণা বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন ও এম.এস.সি. ডিগ্রি পান।
কমলার সাফল্য তাঁকে বিদেশে গবেষণার সুযোগ এনে দেয়। বোম্বাইয়ের হ্যাফকিন ইনস্টিটিউট অফ ট্রেনিং রিসার্চ অ্যান্ড টেস্টিংয়ে অল্প দিন কাটিয়ে তিনি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। গবেষণার জন্য তিনি বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্রিঙ্গার গবেষণা বৃত্তি ও স্যার নাথুভাই বৃত্তি পেয়েছিলেন। কেমব্রিজে তিনি অধ্যাপক ডেরেক রিখটারের অধীনে বায়োকেমিক্যাল অ্যান্ড ফিজিওলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন। বছরটা ছিল ১৯৩৭। রিখটার ও তাঁর সহযোগীরা তার অল্প দিন আগে মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ নামের একটি এনজাইম বা উৎসেচককে চিহ্নিত করেছিলেন। যে সমস্ত পদার্থ দেহের এক স্নায়ুকোশ থেকে অন্য স্নায়ুকোশে সঙ্কেত পাঠানোকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বলে নিউরোট্রান্সমিটার। রিখটাররা দেখিয়েছিলেন মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ অ্যাড্রেনালিন, নর‍্যাড্রেনালিন, হিস্টামিন ও সেরোটনিন জাতীয় নিউরোট্রান্সমিটারের বিপাকে অংশ নেয়। হ্যাফকিনে কাজ করার সময়ে কমলা এ বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তিনি সরাসরি গবেষণা শুরু করেছিলেন। প্রথমেই তিনি বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহে পাওয়া মনোঅ্যামিন অক্সিডেজের অনুরূপ উৎসেচকদের তুলনামূলক আলোচনা করেন। তারপরে কয়েকটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর মস্তিষ্ক, যকৃৎ, প্লীহা, পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত মনোঅ্যামিন অক্সিডেজ বিশ্লেষণ করেন।
অল্প দিন পরেই ডেরেক রিখটার কেমব্রিজ ছাড়েন। কমলা তখন রবার্ট হিলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। হিল খুবই বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সালোকসংশ্লেষের সময় অক্সিজেন নির্গমনের বিক্রিয়া ক্ষেত্রে তাঁর আবিষ্কৃত বিক্রিয়াকে বলা হয় হিল রিঅ্যাকশন। এছাড়াও কোশের মাইটোকন্ড্রিয়াতে সাইটক্রোম সি প্রোটন আবিষ্কারের জন্যও তিনি বিশেষ পরিচিত।
হিলের ল্যাবরেটরিতেই কমলার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিনগুলো কেটেছে। হিল তাঁকে উদ্ভিদ কোশের মাইটোকনড্রিয়ার উৎসেচক সাইটোক্রোম অক্সিডেজ সম্পর্কে গবেষণা করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাঁদের যৌথ গবেষণা বিখ্যাত নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে সপুষ্পক উদ্ভিদ ও প্রাণীর শ্বসনে সাইটোক্রোম অক্সিডেজ সম্পর্কিত একই প্রক্রিয়া কাজ করে।
কমলার সাফল্য দেখে রবার্ট হিল তাঁকে কেমব্রিজেই ফ্রেডরিক হপকিন্সের ল্যাবরেটরিতে কাজ করার জন্য আবেদন করতে উৎসাহ দেন। হপকিন্স ১৯২৯ সালে বৃদ্ধি সহায়ক ভিটামিন আবিষ্কারের জন্য শারীরবিদ্যাতে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। কমলার আবেদন গৃহীত হয় ও ১৯৩৯ সালে তিনি সেখানে কাজ শুরু করেন। এছাড়াও তিনি আমেরিকা থেকে এক বৃত্তি পেয়েছিলেন যার সাহায্যে তিনি ইউরোপের নানা পরীক্ষাগারে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি এই সময় তাঁর ডক্টরেট থিসিস জমা দেন। ডক্টরেটের কাজ করতে তাঁর মোট সময় লেগেছিল মাত্র চোদ্দ মাস। ৪০ পাতার এই থিসিসে তিনি উদ্ভিদ কোশের শ্বসনে সাইটোক্রোমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। থিসিসের দৈর্ঘ্য সাধারণত অনেক গুণ বেশি হয়। তবে তার জন্য কোনও অসুবিধা হয়নি। ১৯৩৯ সালে তিনি পি.এই.চ.ডি. অর্থাৎ ডক্টর অফ ফিলোসফি ডিগ্রি পেয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছিলেন। কোথাও কোথাও বলা হয় যে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানে ডক্টরেট ভারতীয় মহিলা। কিন্তু তা ঠিক নয়। ১৯৩১ সালে আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যাতে ডক্টর অফ সায়েন্স হয়েছিলেন জানকী আম্মাল। তাঁরও আগে ১৯২৩ সালে প্রভাবতী দাশগুপ্ত জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে ডক্টরেট পেয়েছিলেন, তবে সেই সময় মনোবিজ্ঞানকে সায়েন্স না বলে আর্টসের বিষয় ধরা হত। প্রভাবতী দেশে ফিরে শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।
কমলার সামনে ছিল নিশ্চয়ই গবেষণাতে আরও সাফল্যের হাতছানি। কিন্তু তিনি ভারতে ফিরতে মনস্থ করলেন। রেসোন্যান্স পত্রিকাতে কমলার জীবন সম্পর্কে লিখেছেন অনির্বাণ মিত্র, কমলার ছেলে অনিল সোহনি তাঁকে জানিয়েছেন যে কমলার দেশে ফেরার পিছনে ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেওয়ার তাগিদ। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ কমলা পোশাক হিসাবে শুধুমাত্র খদ্দর ব্যবহার করতেন, কোনও গয়না পরতেন না। দেশে ফিরে তিনি বোম্বাইতে বেশ কিছু সভা ও মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। কমলা অবশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানকারী একমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন না। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, মেঘনাদ সাহা, বিশ্বেশ্বরাইয়ার মতো অনেকেই নানাভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কমলা তখনও বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠা লাভ করেননি। বিদেশের প্রথম শ্রেণীর ল্যাবরেটরি ছেড়ে দেশে ফিরে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান নিশ্চয়ই তাঁর ভবিষ্যতের পক্ষে ঝুঁকির কাজ ছিল, কিন্তু কমলা সে কথা গ্রাহ্য করেননি।
১৯৩৯ সালেই দেশে ফেরেন কমলা। অল্প দিন বোম্বাই পুরসভাতে কাজ করার পরে তিনি দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে নবনির্মিত প্রাণরসায়ন বিভাগের প্রধান পদে যোগ দিয়েছিলেন। এরপরে তিনি তামিলনাড়ুর কুন্নুরের নিউট্রিশন রিসার্চ ল্যাবরেটরির সহ-অধিকর্তা পদে যোগ দেন। এখানে তিনি বিভিন্ন ভারতীয় খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ভিটামিনের পরিমাণ নির্ণয়ের বিষয়ে মন দেন। বিশেষ করে দেশের দরিদ্র জনগণের জন্য এই কাজটা ছিল খুবই জরুরি। তবে কুন্নুরে গবেষণার সুযোগ ছিল খুবই কম।
ইতিমধ্যে কমলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল মাধব সোহনির। মাধব লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বীমা বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে তাঁরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলেন। বিয়ের পরে কমলা বোম্বাইতে ফিরে এলেন, যোগ দিলেন রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের নবনির্মিত প্রাণরসায়ন বিভাগে। বর্তমানে ঐ প্রতিষ্ঠানের নাম হয়েছে ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স। ল্যাবরেটরির বাইরেও কমলার আরও একটা জগত ছিল। রান্না করতে ভালোবাসতেন, ভালো টেনিস খেলতেন। চার বছরের মধ্যে তাঁদের দুই ছেলের জন্ম হয়। পারিবারিক সমস্ত দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন করেও গবেষণাতে তিনি ছেদ পড়তে দেননি।
বোম্বাইতে তিনি বেশ কিছু বিষয়ে কাজে মন দিয়েছিলেন। তাঁর সমস্ত গবেষণাই ছিল খাদ্যদ্রব্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত, বিশেষ করে ভারতীয় খাদ্যদ্রব্যের বিষয়ে তিনি উৎসাহী ছিলেন। তাঁর দুয়েকটি গবেষণার উল্লেখ করা যায়। থায়ামিনেজ জাতীয় উৎসেচক ভিটামিন বি-ওয়ানকে ভেঙে দেয়। বোম্বাই ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যে সমস্ত মাছ সাধারণত পাওয়া যায়, তার মধ্যে থায়ামিনেজের পরিমাণ নিয়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা কাজ করেছিলেন। ট্রাইস্পিন ইনহিবিটর হল এমন এক প্রোটিন যা অন্য কিছু প্রোটিনের বিপাকে বাধা দেয়। আলু এবং বিন বা শুঁটির মধ্যে ট্রাইস্পিন ইনহিবিটরের পরিমাণ নিয়েও তাঁরা কাজ করেছিলেন। এছাড়াও নানা ভারতীয় খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে প্রোটিনের পরিমাণ তাঁরা নির্ণয় করেছিলেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি কমলাকে নীরা অর্থাৎ তালের রসের খাদ্যগুণ বিশ্লেষণ করার পরামর্শ দেন। এই রস ভারতের গ্রামে খুবই জনপ্রিয়। কমলা সারাদেশের নানা জায়গা থেকে রস সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি দেখেন যে তালের রসে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও লোহার যৌগ আছে। তাই এর পুষ্টিগুণ খুব বেশি। তাছাড়াও এর মধ্যে সালফাইড্রিল জাতীয় যৌগ যা এই রস থেকে গুড় তৈরি হলেও ভিটামিন সি বাঁচিয়ে রাখে। তালের গুড় ও তালপাটালি দীর্ঘদিন রাখলেও নষ্ট হয় না, তার মধ্যের ভিটামিন সি অবিকৃত থাকে।
কমলার বিজ্ঞান গবেষণার সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল তা ছিল সবসময়েই মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষ যে ধরনের খাবার সহজে পেতে পারে, তিনি সেই সমস্ত খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়েই কাজ করেছিলেন। যখন দেখলেন যে তালের রস ও গুড় বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য খুব উপকারী, তখন তাকে জনপ্রিয় করার জন্য গরিবদের মধ্যে প্রচার করা শুরু করলেন। বোম্বাইতে এক দুধের কোম্পানিকে তিনি দুধ যাতে না কেটে যায় তার পদ্ধতি ঠিক করে দিয়েছিলেন। এই সমস্ত কাজের জন্য কমলা রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। একটু দেরিতে হলেও অবশেষে ১৯৬৪ সালে কমলার তাঁর ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা পদ পেয়েছিলেন। সারা পৃথিবীতেই তখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা পদে নারীর সংখ্যা খুবই কম ছিল, এখনও সেই ধারার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ১৯৬৯ সালে তিনি অধিকর্তা হিসাবেই ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স থেকে অবসর নিয়েছিলেন।
অবসরের পরে নিরুপদ্রব জীবন কমলার জন্য নয়। ১৯৬৬ সালে বোম্বাইতে প্রতিষ্ঠা হয় কনজিউমার গাইডেন্স সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া। কমলা ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে অন্যতম। অবসরের পরে তিনি সেই সংস্থার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি এই সংস্থার সভাপতিও হয়েছিলেন। খাবারের গুণমান নির্ণয়, বাটখারার পরীক্ষা - এইধরনের কাজ আমাদের দেশে প্রথম শুরু করেছিল এই সংস্থা। বাড়িতেই খাবারের ভেজাল ধরার জন্য সরঞ্জাম তৈরি করেছিলেন কমলা। মারাঠি ভাষায় ছোটোদের জন্য বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি বইও তিনি লিখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে বিজ্ঞানে অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। পরের বছর ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। অনুষ্ঠান মঞ্চেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
যে সময় দেশে নারীদের বিজ্ঞান গবেষণার কথা প্রায় চিন্তার বাইরে ছিল, সেই সময় কমলা সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত এক বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। কমলার অভিজ্ঞতার পরে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে, এমনকি রমনের ল্যাবরেটরিতেও ছাত্রীদের প্রবেশের পথ সুগম হয়েছিল। রমনের ছাত্রীদের তারপরেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তবে তা পৃথক আলোচনার বিষয়। স্বাধীনতা আন্দোলন ও মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ কমলা বিদেশে গবেষণার অপেক্ষাকৃত সহজ পথ ছেড়ে দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করার দুরূহ রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। কমলার জীবনের অবসান হলেও তাঁর উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে চলেছে সারাদেশের বহু মহিলা বিজ্ঞানী ও ছাত্রী।

(এই প্রবন্ধের নানা তথ্য আমি অনির্বাণ মিত্রের লেখা কমলার জীবনী থেকে পেয়েছি। তাঁর তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল Resonance পত্রিকার এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি প্রকাশিত Lilavati’s Daughters বইতে কমলার জীবনী লিখেছেন বসুমতী ধুরু। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স থেকে প্রকাশিত Connect পত্রিকার জুন ২০১৮ সংখ্যায় ওই ইনস্টিটিউটে নারীদের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন এস. দীপিকা। এছাড়াও ইন্টারনেটে তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি লেখা থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছি।)

_____

No comments:

Post a Comment