অণুগল্পঃ ঢেঁকুরঃ তন্ময় বিশ্বাস


প্রত্যেকটা শহরেরই একটা করে ভয়ের গল্প থাকে। একটা গা শিরশিরে, রক্ত চলকে ওঠা, হাড়ে ডিও স্প্রে মেরে যাওয়া ভয়ের গল্প! আর সেটা যদি হয় রাত দুটোর যাদবপুর এইট-বি বাসস্ট্যান্ডের নিঝুম সেই চৌরাস্তা, যার দু’দিকে দুটো সাবওয়ে দু’মুখো অ্যানাকোন্ডার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তাদের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় যদি একটা অবুঝ হাওয়া আটকে পড়ে সাপের নিঃশ্বাসের মতো শনশন শব্দে ভরিয়ে তোলে চারিদিক, তবে সেটা আর ভয়ের গল্প থাকে না। হরর ফ্যান্টাসি হয়ে যায়।
এদিকে লোডশেডিং প্রায় হয় না বললেই চলে। যখন আপনি এমনই এক সাবওয়ের সামনে এসে দাঁড়ান যার ছাদের দিকে চেটানো দাদ, হাজা, চুলকুনি আর বশীকরণের সস্তা কাগজের বিজ্ঞাপনগুলো ছিঁড়ে গিয়ে সূচালোভাবে ঝুলে আছে মাথার ওপর এবং সবথেকে কাছের নিয়ন বালবটা আলোর থেকে অনেক বেশি ছায়া পাঠিয়ে সেগুলোকে করে তুলেছে অবিকল পাইথনের দাঁতের মতো!
এই মাঝরাতেও যদি কোনও দাঁড়কাক এমনি এমনি ঘুম ভেঙে চিৎকার করে ওঠে, তাহলে যতই ঠেক কাঁপানো যুক্তিবাদী হোন না কেন, আপনার মন কু ডাকতে বাধ্য।
আমার তো এই রাতেই কারবার। কী কাজ? কোন কাজ? আপনার জানার দরকার আমার গন্তব্য ওই সাবওয়ে, তার সিঁড়ির নিচের দু’নাম্বার খোপ। তাতে রাখা পেট মোটা সুটকেস অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। যাকে কিনা এই গেল সন্ধেতেই গলা অবধি গেলানো হয়েছে ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবি ছাপা সবুজ কাগজ!
এই দেখুন, আমি সেই পোস্টার ছেঁড়া দাঁত উড়িয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। কাগজগুলো কিছুক্ষণ কেঁপে কেঁপে স্থির হয়ে গেল আবার। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে হল, রবারের জন্য হাঁটাচলাও যেন কেমন পিচ্ছিল হয়ে গেছে। মরা বেড়ালের শরীর থেঁতলে যেন হেঁটে যাচ্ছি পায়ে পায়ে। ভেতরে কোথাও পাইপ লিক হয়েছে, টপ টপ করে শব্দ আসছে তার।
আমার পা নিজে থেকেই যেন সিঁড়ির ওপর পিছিয়ে গেল কয়েক পা। আরও কয়েক পা এগোতাম হয়তো। কিন্তু ততক্ষণে আলো কমে এসেছে। সেই পোস্টারের কাগজেরা নেমে এসে ঢেকে দিল বাকি মুখটুকুও। আমার পায়ের নিচের সমস্ত সিঁড়ি নরম হয়ে এল জেলির মতো। আমি তাতে গেঁথে গেলাম কয়েক আঙুল। তারপর সেই সিঁড়িই সচল হয়ে আমাকে ছুড়ে দিল পেটের ভেতর।
সেখানে তখন জমে ওঠা বুক জলে নেমে গিয়ে আমার বোধহয় কয়েক সেকেন্ড লেগে গেছিল বুঝতে, যে এটা জল নয়! ততক্ষণে চোখ সয়ে গিয়ে ভালোই দেখতে পেয়েছি, আমার জলে ডোবা অংশটুকুতে আর কোনও মাংস অবশিষ্ট নেই। কশেরুকাটাকেও একসময় ভেসে যেতে দেখলাম স্পষ্ট!
আমি আর সাবওয়েতে না ঢুকে হাঁটা দিলাম সোজা। সত্যি সত্যি তো আর কোনও সুটকেস নেই! আমিও তো ঠিক আপনার মতোই। আপনার মতোই গড়িয়াহাটের দিকে হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্পষ্ট শুনতে পেলাম ‘আউউউউও’ করে শব্দ তুলে আটকা পড়া সেই বাতাস বেরিয়ে এল সাবওয়ে দিয়ে। যাকে কিনা এই ভূত-ভুতুমের বাজারে যেকোনও প্রাণীর ঢেঁকুরের শব্দ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় সহজেই।

_____

No comments:

Post a Comment