গল্পঃ সারপ্রাইজঃ ধূপছায়া মজুমদার




কাল কিট্টুর মুখেভাত। বাড়িভর্তি লোকজন। কাল সকালে আরও অনেকে আসবে। ভাইয়ের গায়ে নতুন জামা, মাথায় ফুলের মুকুটーমামাই কিট্টুকে কোলে বসিয়ে ভাত খাওয়াবে, কত্ত হইচই হবে! ঝিনুকও হইচই করবে খুব। নতুন জামাও পরবে। আনমনা হয়ে ভাবতে থাকে সে। কিন্তু কী যেন একটা অস্বস্তি কাঁটার মতো খচখচ করতে থাকে। চোখে ধুলো ঢুকলে যেমন চোখ করকর করে, তেমন মনে হয় যেন।
কাল আঠারোই এপ্রিল। অন্যান্য বছর এই দিনটাকে নিয়ে দু-তিন সপ্তাহ আগে থেকে জল্পনা কল্পনা চলে, পিপি, পিমণি, পিসাই, পিসান সবাই ছুটি নিয়ে চলে আসে, বাবা-কাকাই অফিস যায় না সেদিন, বাড়িতে সকাল থেকে লুচি, আলুর দম, দুপুরে ফ্রায়েড রাইস, মাটন, বিকেলে সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়াーহুল্লোড়ে কেটে যায় কালকের দিনটা প্রতিবছর।
কালকেও দেদার মজা হইহই হবে, কিন্তু ঝিনুককে ঘিরে কিচ্ছু হবে না। সবই হবে ওই সেমিকোলনের মতো দেখতে এইটুকুনি ভাইটাকে ঘিরে। ঝিনুকের কি হিংসে হচ্ছে একটু একটু? না বোধহয়। ভাইকে তো ও খুব ভালোবাসে। ভালোবাসলে কেউ কাউকে হিংসে করে নাকি? তাছাড়া কিট্টুকে নিয়ে মা যেদিন বাড়ি এল, তারপর থেকে কি ঝিনুক সমানে ভাইয়ের কাজ করছে না? ভাই কাঁদলে তাকে ভোলায়, ভাইয়ের কাঁথাগুলো ভাঁজ করে রাখে স্কুল থেকে এসে, ভাইকে পাশে শুইয়ে পড়তে বসে... হিংসে করলে এতকিছু করতে পারত?
আজকাল দাদুন রোজ সকালে উঠে, ‘আমার ঝিনুকবুড়ি কই রে?’ বলে হাঁক পাড়েন না আর, ‘কিত্তুদাদাই কী করে রে?’ বলে ঝিনুকের কোল থেকে ভাইকে তুলে নেন। ঝিনুককে বলেন, ‘পড়তে বসো দিদিভাই, ক্লাস এইট হল এবার, আর খেলে-টেলে সময় কাটিও না।’ ঝিনুকের গলায় তখন ব্যথা করে। তাও কাউকে কিচ্ছু না বলে সে বইখাতা টেনে নিয়ে পড়তে বসে।
কিন্তু কাল? কাল যখন দুপুরবেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজিয়ে সবাই মিলে কিট্টুকে ঘিরে বসবে, মামাই ওকে পায়েস খাওয়াবে, তখনও কি কারও কিচ্ছু মনে পড়বে না? সবাই এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ভুলে যায় কী করে? নাকি এটাই নিয়ম, নতুন কেউ এলে পুরনোদের কথা আর কেউ মনে রাখে না? রাত্তিরে মায়ের পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে আবোলতাবোল ভাবতে থাকে ঝিনুক। কিট্টুটা ঘুমের মাঝে এত হাত-পা ছোড়ে, আর এতবার তার ঘুম ভাঙে, যে মা কিট্টুকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে সারারাত। তাই তিনি বোধহয় খেয়ালই করে না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেও ঝিনুক আসলে ঘুমিয়েছে অনেক রাত্রে। আর তার চোখে ঘুম আসার আগে তার চোখের জলে বালিশের একটা কোনা কিছুটা ভিজে গেছে।
পরেরদিন সকাল থেকে অবশ্য ঝিনুকের সময়ই ছিল না এক জায়গায় দু’দণ্ড বসার, ভাবনা বা মন খারাপ করার। ভোরবেলা উঠে সে আর কাকাই মিলে সারা বাড়ি বেলুন দিয়ে সাজিয়েছে, পিপির সঙ্গে আল্পনা দেওয়ার কাজে হাত লাগিয়েছে, তারপর চান করে নতুন জামা পরে বড়োদের সব্বাইকে প্রণাম করেছে। অদ্ভুত লেগেছে বড়োদের ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা দেখে। না, কিট্টুর মুখেভাত বলে তোমরা তারিখ-টারিখ সব ভুলে যেতে পার, তা বলে ঝিনুক চান করে এসে সবাইকে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করছে, তা দেখেও কারও কিচ্ছু মনে পড়ল না? কেউ অবাক হল না, জিজ্ঞেসও করল না ভাইয়ের মুখেভাতের দিন দিদি কেন সবাইকে প্রণাম করছে? তাহলে কি ঝিনুক কী করল, কী ভাবল তাতে এদের কিছুই আসে যায় না? এসব ভাবতে ভাবতে ঝিনুকের মনে একটা অদ্ভুত চিন্তার উদয় হয়। আচ্ছা, এমনটা নয় তো, ঝিনুক এদের বাড়ির কেউ নয়? সেই কোন ছোটোবেলায় হয়তো এরা তাকে খুঁজে পেয়েছিল কোথাও, বাড়ি নিয়ে এসে আদর করে মানুষ করেছিল! এখন কিট্টুকে পেয়ে আর ঝিনুকের ওপরে কারও কোনও টানই নেই! বিশ্বাস করা একটু শক্ত বটে, কিন্তু হতেও তো পারে!
এই সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতে ঝিনুক যেন বেশ কয়েকটা হিসেব মেলাতে পারে। ঠিক, আগে প্রত্যেকটা পেরেন্ট টিচার মিটিংয়ে বাবা-মা দু’জনেই যেত। গতমাসের পিটিএম-এ কেউ যায়নি। সেদিন নাকি কিট্টুর ভ্যাকসিন দেওয়ার ছিল। ওরা নাকি দর্শনাম্যামের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিল। ঝিনুকের কেসটা এখন স্পেশাল, ম্যাম এসে ওদের ক্লাস টিচারকে বলছিলেন, ঝিনুক শুনেছে। স্পেশাল কেন বলবে? নিশ্চয়ই এ-বাড়ি থেকে স্কুলকে জানানো হয়েছে আসল সত্যিটা, যেটা এখনও ঝিনুক জানে না। তাহলে কি এবার ঝিনুককে আর কেউ ভালোবাসবে না? দাদুন আর ‘ঝিনুকবুড়ি’ বলেন না, কাকাই ‘থুম্পুবুড়ি’ না বলে সেদিন থেকেই ‘ম্যাডাম’ বলছে। বাবা ‘হুতুম্ভুশ’ বলত ক’দিন আগেও। এখন আর বলে না। বরং কিট্টুকে একদিন ‘নেপলুঝেপলু’ বলেছে। সে বলুক গে, কিন্তু ওর প্রতি এদের হাবভাব এমন বদলে যাচ্ছে কেন সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। আর মা! সে তো কিট্টু ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারছে না। এমনকি টিফিনে একদিন রুটি আর বরবটির তরকারি দিয়েছে, যেটা দেখলেই ঝিনুক ওয়াক তোলে। মা জানে খুব ভালো করে, তাও দিয়েছে।
এসব ভাবনাচিন্তা করতে করতে কান্না মতন চলে এসেছিল। বাবলিদিদি, পিকলুদা, বকাইমামা এরা সব এসে পড়তে তাড়াতাড়ি মুখচোখ মুছে ঝিনুক উঠে দাঁড়াল। কিট্টুর ভাত খাওয়ার সময় গেছে, সবাইকে যেতে হবে ওখানে। পায়ে পায়ে ঝিনুক এগিয়ে যায় হলঘরের দিকে।
সেখানে তখন মহা হইচই। কিট্টুবাবু ইলাস্টিক দেওয়া ধুতি আর চকচকে পাঞ্জাবি পরে মাথায় পাগড়ি পায়ে নাগরা এঁটে মামাইয়ের কোলে গ্যাঁট হয়ে বসে আছেন আর গলায় দোলানো ফুলের মালা থেকে ফুল ছিঁড়ে মুখে তোলার চেষ্টা করছেন। তার সামনে থালায় সাজানো ভাত, পাঁচরকম ভাজা, শুক্তো, রকমারি তরকারি, মাছের ইয়াব্বড় মাথা, চাটনি, পায়েস, মিষ্টি, পান মোটকথা এলাহি আয়োজন। একটু দূরে পিলসুজে রাখা প্রদীপটা জ্বলছে, আর শাঁখ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দিম্মা। পাশেই ক্যামেরা রেডি করে দাঁড়িয়ে আছে কাকাই। বাকিরা এদের ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর হা-হা, হি-হি করেই চলেছে। ঝিনুককে কেউ খুঁজছে-টুজছে না। সব দেখেশুনে চোখদুটো আবার ঝাপসা হয়ে এল।
ঝাপসা চোখেই হঠাৎ খেয়াল হল, কিট্টুদের পাশেই আরেকটা থালা রাখা আছে, আরেকটা আসন পাতা আছে, একইভাবে সাজানো। আর সেই আসনটার পাশে বসে মিটিমিটি হাসছে মা আর বাবা। চোখাচোখি হতেই বাবা হাত নেড়ে ডাকল ঝিনুককে। সে তো অবাক! ভেবলে যাওয়া মুখ নিয়ে আসনটায় গিয়ে বসতেই সবাই মিলে এমন জোরে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গেয়ে উঠল যে কিট্টুবাবু ভয় পেয়ে কান্না জুড়লেন। ঝিনুকের দু’গাল বেয়ে তখন নেমেছে জলের ধারা।
“এ বাবা, থুম্পুবুড়ি কাঁদছে!”
“হুতুম্ভুশ, জন্মদিনে কেউ কাঁদে নাকি, ছি ছি!”
“আমার ঝিনুকবুড়ি কাঁদে কেন রে?”
চেনা নামে চেনা ডাকগুলো শুনতে শুনতে আর মায়ের হাতে পায়েস খেতে খেতে ঝিনুক ভাবছিল, সত্যি সত্যি বড়ো হতে তাহলে অনেক দেরি এখনও। ঢের দেরি সত্যি সত্যি সবকিছু বুঝে ফেলতেও।
_____

1 comment:

  1. sotti to, bachha ra sarajibon chotoi thakey baba mayer kache

    ReplyDelete