গল্পঃ রাজকুমারী ও গরিব ছেলের গল্পঃ অমিতাভ সাহা



প্রাচীন ভারতের মিথিলা নগরের রাজবংশে এক অতি সুন্দরী রাজকুমারী ছিল। সে বিবাহযোগ্যা হয়ে ওঠায় রাজা ঠিক করেছিলেন, স্বয়ম্বর সভা করে রাজকন্যার জন্য উপযুক্ত পাত্র স্থির করবেন। সেইমতো বিভিন্ন রাজ্যে সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন যাতে রাজকুমাররা এসে স্বয়ম্বর সভায় অংশ নিতে পারেন। ঐ নগরেই এক বৃদ্ধ জাদুগর ছিল। সে ছিল অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির। কালা জাদু, সম্মোহন ইত্যাদি শয়তানি বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিল সে। তার কাজই ছিল মানুষের অনিষ্ট সাধন করা। একদিন রাজকুমারী সখীদের নিয়ে গল্প করতে করতে পথ ধরে যাচ্ছিল। জাদুগরও ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। রাজকুমারীকে দেখে জাদুগর অত্যন্ত আহ্লাদিত হয়ে তাকে একান্তে ডেকে বলল, “তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আমি শীঘ্রই রাজামশায়ের সাথে দেখা করে তোমার পাণিপ্রার্থনা করব। স্বয়ম্বর সভার কী দরকার? আমিই তো আছি।”
রাজকুমারী হেসে বলল, “আপনার কি মাথার ঠিক আছে! আয়নায় নিজের মুখ দেখেছেন? আমার বিয়ে হবে কোনও সুদর্শন সুপুরুষ যুবকের সাথে; আপনার মতো কোনও কদাকার বৃদ্ধের সাথে নয়।” বলে ভেংচি কেটে চলে গেল।
জাদুকর তাতে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করল। সে ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল। রাজকুমারীর ক্ষতিসাধন করার জন্য ফন্দি আঁটল সে। রাজপরিবারের পাকশালে এক বাবুর্চি ছিল। সে ছিল ভীষণ লোভী। জাদুগর তাকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রার লোভ দেখিয়ে রাজকুমারীর খাবারে এক জাদু তরল মিশিয়ে দিতে বলল। বাবুর্চি প্রথমে রাজী হচ্ছিল না। এক হাজার মুদ্রার বিনিময়ে এই জঘন্য কাজটি করতে রাজী হল শেষে। জাদুগর বাবুর্চিকে ভয় দেখাল, যদি কোনওদিন কেউ একথা জানতে পারে তাহলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলবে। বাবুর্চি অত্যন্ত গোপনে রাজকুমারীর খাবারে ঐ জাদু তরলটি মিশিয়ে দিল।
ক’দিন পর থেকেই তরল তার ক্রিয়া শুরু করল। রাজকুমারীর গায়ের রঙটি দিনের পর দিন কালো হয়ে যেতে লাগল। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে না পেরে রাজকুমারী দিনরাত কান্নাকাটি আরম্ভ করল। রাজা অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে দেশবিদেশের নামকরা হাকিম, বৈদ্য, কবিরাজদের ডেকে দেখাতে লাগলেন। তাঁরা অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেও গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণটি আবিষ্কার করতে পারলেন না। অবশেষে রাজকুমারীর গায়ের রঙটি মিশমিশে কালো হয়ে গেল। রাজকুমারী নাওয়াখাওয়া ছেড়ে নিজের ঘরে আবদ্ধ হয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে গুটিয়ে নিল, আর বাইরে বেরোত না। রাজা স্বয়ম্বর সভাটি বিলম্বিত ঘোষণা করলেন। সেই সঙ্গে ঢোল পিটিয়ে সারা রাজ্যে ঘোষণা করে দিলেন, যে রাজকুমারীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারবে, তাকে অর্ধেক রাজত্ব দান করবেন
ঐ রাজ্যেই এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে রামু নামে একটি ছেলে ছিল। ছেলেটি জোয়ান। খুব কম বয়সে মাকে হারায়। বাবা দীর্ঘদিন নেশা করে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, আর ছিল সৎ মা। সংসারের সমস্ত দায়ভার রামুর উপর এসে পড়েছিল। আর্থিক অনটনের কারণে খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেনি। ওদের একমাত্র সম্বল ছিল তিন বিঘে কৃষিজমি। সেই জমিতে বেগুন, পটল, লাউ, মিষ্টি কুমড়ো ইত্যাদি শাকসবজি চাষ করত রামু। সবজি বাজারে বিক্রি করে খুব কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালাত। সৎমা রামুকে খুব জ্বালাতন করত। বাজার থেকে যা পয়সা কামাই হত, তা দিয়ে চাল-ডাল-তেল-নুন কেনার পর যা পড়ে থাকত সব নিয়ে নিত। রামুকে সবসময় পাইপয়সার হিসেব বুঝিয়ে দিতে হত। কোনওদিন বিক্রিবাট্টা কম হলে বাজার খরচ করার পর কোনও পয়সাই পড়ে থাকত না আর। সেদিন রামুর কপালে খাবার জুটত না। কোনও কোনওদিন তো রামুকে ঘরেই ঢুকতে দিত না সৎ মা। রামু এই কষ্টকে অদৃষ্টের লিখন বলেই মেনে নিয়েছিল।
রামু দুটো ডালিতে শাকসবজি সাজিয়ে একটি বাঁশের লাঠির দু’ধারে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দিত। ঐ লাঠিটি কাঁধে নিয়ে সবজি বিক্রি করতে যেত বাজারে। একদিন বিকেলের হাটে গেল শাকসবজি নিয়ে। বৈশাখ মাসের দিন ছিল। হাট বসার কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ কালো হয়ে উঠল। তারপর দমকা হাওয়া দিয়ে বৃষ্টি নামল। সেই বাদলায় হাটে আর তেমন লোকজন জড়ো হল না। বিক্রিবাট্টাও বিশেষ কিছু হল না। তাছাড়া ক’দিন থেকেই বাজার মন্দা যাচ্ছিল। আজ নিশ্চয়ই সৎ মা বাড়িতে ঢুকতে দেবে না - একথা ভাবতে লাগল রামু।
অনেকক্ষণ পর বৃষ্টিটা একটু কমল। রামু পসরা গুটিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াল। পথে একটা ছাগল ওর পিছু পিছু আসতে লাগল। অনেকটা পথ হাঁটার পরেও লক্ষ করল, ছাগলটা সেই পিছু পিছুই আসছে। রামু ভাবল, ছাগলটা বোধহয় খুব ক্ষুধার্ত। তাই কাঁধ থেকে লাঠি নামিয়ে কিছু শাক খেতে দিল একে। ছাগলটা মুখ ফিরিয়ে নিল। রামু ছাগলটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। দেখল, ছাগলটার চোখ থেকে জল পড়ছে। ছাগলকে কখনও মানুষের মতো কাঁদতে দেখেনি রামু। তাই ওর একটু আশ্চর্যই লাগল।
ও ছাগলটাকে বাড়ি নিয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গেছিল। যথারীতি সৎমার কাছ থেকে প্রচুর তিরস্কার জুটল। রাত্রিবেলা ছাগলটাকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে খড়ের বিছানা করে ঘুমোল রামু। পরদিন সকালে ছাগল দেখেই তুলকালাম আরম্ভ করলেন সৎমা। আগেরদিন রাতের অন্ধকারে ছাগলটিকে লক্ষ করেননি। রামুকে বললেন, “এক্ষুনি বিদেয় কর ঐ ছাগল আমার চোখের সামনে থেকে। বাড়ি নোংরা করলে কে পরিষ্কার করবে? দূর কর এখুনি।”
রামু ছাগলটিকে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল। ও খেয়াল করল, ছাগলটির গলায় একটি মোটা হার। দেখে সোনার বলেই মনে হল। পরে ভাবল, নিশ্চয়ই সোনার জলে চোবানো। হারটা ছাগলের গলায় শক্ত হয়ে কামড়ে বসেছিল, তাই নিচের চামড়ায় ঘা হয়ে গিয়েছিল। ও ভাবল, ওটা কেটে দিলে ছাগলটা খুব স্বস্তি পাবে, কিন্তু এত কঠিন যে অনেক চেষ্টা করেও হারটা কাটতে পারল না। অবশেষে ছাগলটাকে নিয়ে গেল এক স্বর্ণকারের দোকানে। ওদের কাছে ধাতু গলানোর অনেকরকম তরল থাকে। স্বর্ণকার কাচের শিশি থেকে কী একটা ফোঁটা ফোঁটা করে হারের উপর ফেলতেই হারের ঐ জায়গাটা গলে খুলে গেল। তারপর হারটা পরীক্ষা করে বলল, “ভাই, এ তো আসল সোনা। এত মোটা সোনার হার তো রাজাবাদশা ছাড়া কোনও সাধারণ মানুষের পরার সাধ্যি নেই। ছাগলের গলায় এই হার এল কী করে?”
স্বর্ণকার হারের বিনিময়ে ভালোরকম মূল্য দিতে রাজি হল, কিন্তু রামু হারটা বিক্রি করল না। ওর মাথায় হঠাৎ খেলে গেল, এ আসলে ছাগল নয়, কোনও মানুষ শাপগ্রস্ত হয়ে ছাগলের রূপ নিয়েছে। রামু তখন এক নামকরা গুণিনের কাছে গেল। উনি ছাগলটার গতিবিধি লক্ষ করে বললেন, “তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ। কোনও মানুষ কারও ইন্দ্রজালের প্রভাবে পশুদেহ প্রাপ্ত হয়েছে। এই বিদ্যাটি আমার জানা আছে। দাঁড়াও দেখছি।”
গুণিন একটি ট্রাঙ্ক খুলে কতকগুলো শুকনো গাছের শিকড় বের করে আনলেন। তারপর শিকড়বাকড়গুলো শিলনোড়াতে পিষে গুঁড়ো করে ফেললেন। একটি ধুনুচি নিয়ে তাতে নারকেল ছিবড়ে দিয়ে তার উপর শেকড়ের গুঁড়ো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। যখন ধোঁয়া উঠতে শুরু করল, তখন তিনি বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে মন্ত্রপাঠ করতে শুরু করলেন। ধোঁয়া আচমকা একটি তরঙ্গের আকার নিয়ে ছাগলটির নাকে গিয়ে প্রবেশ করল। ছাগলটি মাটিতে গড়াগড়ি করতে লাগল এবং কিছুক্ষণ ছটফট করার পর একটি যুবকের রূপ ধারণ করল। গুণিনের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হল রামু। মানবদেহ প্রাপ্ত হয়ে যুবকটি এসে রামুকে জড়িয়ে ধরে অশেষ ধন্যবাদ জানাল এবং গুণিনকে প্রণাম করে তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করল। তারপর তাঁর কাহিনিটি বলতে আরম্ভ করল, “আমার নাম প্রদ্যুম্ন। আমি রাজপরিবারের বাবুর্চির ছেলে। বৃদ্ধ জাদুগর আমার এই হাল করেছে। আপনারা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন, রাজকুমারীর গায়ের রঙটি কালো হয়ে গেছে। কিন্তু এর পিছনের সত্যটি আপনাদের জানা নেই। এই ঘৃণ্য কাজটি করেছে জাদুগর। আর তাঁর সঙ্গ দিয়েছে আমার বাবা। বাবার লোভী মনোবৃত্তির সাহায্য নিয়ে বাবাকে দিয়ে এই কাজটি করিয়েছে জাদুগর। একদিন আমার ঘোড়াটিকে নিয়ে গেছিলাম ঘোড়দৌড়ের মহড়া দিতে। ঘোড়ার পায়ে তারকাটা ফুটে খুব কষ্ট পাচ্ছিল, তাই ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসি ওর চিকিৎসা করাতে। এসে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি, বাবার ঘরে জাদুগর ফিসফিস করে বাবাকে কী যেন বলছে। আমি ভালো করে কান পেতে পুরো ঘটনাটি শুনে ফেলি। জাদুগর রাজকুমারীর খাবারে তরল মিশিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র করছিল। দরজায় অল্প ধাক্কা লেগে আওয়াজ হওয়ায় ওরা আমাকে দেখে ফেলে। জাদুগর আমাকেও স্বর্ণমুদ্রার লোভ দেখিয়েছিল, কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমি রাজামশাইকে গিয়ে সবকথা বলে দেব। তখন জাদুগর আলখাল্লা থেকে এক মুঠো ভস্ম বের করে সেটি মন্ত্রপূত করে আমার উপর নিক্ষেপ করে। তারপরই আমার এই হাল হয়। আমার গলার হারটি রাজামশাই আমি একবার ঘোড়দৌড়ে বিজয়ী হবার পর আমায় উপহারস্বরূপ দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস দিয়েছিলেন! নাহলে তোমার মাথায় আমার ভাবনাও আসত না, আর আমি মানবদেহও ফিরে পেতাম না।”
রামু প্রদ্যুম্নকে নিয়ে রাজামশায়ের কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত খুলে বলল। রাজা সব শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বাবুর্চিকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন এবং জাদুগরকে ধরে আনার জন্য সৈন্যসামন্ত পাঠালেন। সৈন্যসামন্ত এসে জাদুগরের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও জাদুগরকে পেল না। রামু রাজামশাইকে বলল, “কোনওভাবে আঁচ পেয়ে জাদুগর বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। আমি যেখান থেকে পারি ওকে ধরে আনবই। এই জঘন্য অপরাধের শাস্তি ওকে ভোগ করতেই হবে।”
রামু প্রথমে গেল গুণিনের কাছে। কিন্তু তিনি জাদুগরের কোনও খোঁজ দিতে পারলেন না। তবে একটি পরামর্শ দিয়ে বললেন, “আমি যতদূর জানি, দণ্ডকারণ্যের জঙ্গলে এক অতি বৃদ্ধ পীরবাবা জাদুবিদ্যা নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করেছেন। তুমি তাঁর কাছে যাও। তিনি জাদুগরের ঠিকানা বলে দিলেও দিতে পারেন।”
গুণিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রামু প্রদ্যুম্নের ঘোড়াটি নিয়ে দণ্ডকারণ্যে যাত্রা করল। গভীর জঙ্গলে তিন-চারদিন ঘুরে বেড়াবার পর পীরবাবার সন্ধান পেল। তাঁকে প্রণাম করে রামু জাদুগরের কীর্তির কথা খুলে বলল। সব শোনার পর পীরবাবা বললেন, “তুমি যে জাদুগরের কথা বলছ, সে আমারই শিষ্য। আমার কাছ থেকেই জাদুবিদ্যা শিখেছে সে। আমি ওর গুরু। ওকে সাবধান করে দিয়েছিলাম, জাদুবিদ্যা যেন মানুষের অকল্যাণে প্রয়োগ না করে। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি। আমার শেখানো বিদ্যার অপপ্রয়োগ করছে। ওর অন্তিমকাল সমাগত।”
রামু পীরবাবাকে করল, “আপনি কি বলতে পারেন, উনি এখন কোথায় আছেন?”
উনি গণনা করে বললেন, “ও তোমাদের রাজ্যেই আছে, কিন্তু অদৃশ্য অবস্থায়, তাই তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। ভালো করে নজর রাখো। ও নিশ্চয়ই ধরা পড়বে।”
রামু পীরবাবাকে নমস্কার জানিয়ে ফিরে এল। জাদুগরের বাড়িতে গোপনে নজরদারি আরম্ভ করল। রাত্রিবেলা ঝোপের আড়ালে বসে খেয়াল করত জাদুগর বাড়িতে ফেরে কি না। একদিন মাঝরাতে লক্ষ করল, বাড়ির সদর দরজাটি আস্তে করে খুলে গেল। যদিও কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। রামু পা টিপে টিপে পিছু নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে একটি ফুটোতে চোখ রাখল। আবছা আলোয় দেখল, একটি টুপি মাথা থেকে খোলার সাথে সাথে জাদুগরকে দেখা গেল। টুপিটি খুলে পাশের টেবিলে রেখে জাদুগর বিছানায় শুয়ে পড়ল। জাদুগরের অদৃশ্য হবার মূলে ছিল ঐ জাদু টুপিটি, রামু এটা বুঝতে পারল। প্রথমে ধীর কদমে ঘরে ঢুকে ঐ টুপিটি রামু পকেটে পুরে নিল। তারপর হুঙ্কার দিয়ে, “জাদুগর, আজ তুই শেষ।” বলে জাদুগরের টুটি চেপে ধরল।
জাদুগর দেখল, রামুর হাত থেকে ছাড়া পাবার কোনও উপায় নেই। তখন বলল, “তোমার যা ইচ্ছে করো। আগে আমাকে আল্লাহ্‌র নামটি স্মরণ করতে দাও।”
রামু হাতের মুঠি আলগা করল। জাদুগর একটি মাদুরের উপর হাঁটু গেড়ে বসে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। তারপর হঠাৎ বলল, “চল রে উড়ে জাদুই পাটি!”
বলার সাথে সাথে মাদুরটি জাদুগরকে নিয়ে ঘর থেকে হুস করে উড়ে গেল। রামু ধরতে গিয়েও ফসকে গেল। জাদুগর আকাশপথে উড়তে উড়তে নজরের বাইরে চলে গেল। এত কাছে পেয়েও জাদুগর হাতছাড়া হওয়াতে রামুর খুব আফসোস হচ্ছিল।
রামু আবার জাদুগরের গুরুর কাছে গেল। তিনি অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে ধ্যানস্থ হয় বসে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি, এক অতি দুর্গম স্থানে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছে জাদুগর। কিন্তু স্থানটি আমাদের দেশে নয়। আরব বা ইরানদেশের কোনও জায়গা হবে। আমি সঠিক স্থানটি বলতে পারছি না। তুমি পশ্চিম ভারতে কচ্ছের জঙ্গলে যাও। ওখানে জঙ্গলে অনুসন্ধান করে তুমি একটি ব্যাঙ্গমা পাখির সন্ধান পাবে। ওর সহায়তায় তুমি জাদুগরের কাছে পৌঁছাতে পারবে। জাদুগরকে ধরতে পারলে আমাকে সংবাদ দিও। তারপর ওর প্রতিবিধান করা যাবে।”
রামু কখনও পদব্রজে, কখনও বা অশ্বারোহণ করে নদীনালা খানাখন্দ পেরিয়ে আট-দশদিন টানা সফর করে কচ্ছের জঙ্গলে উপস্থিত হল। ওখানে কয়েকদিন খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও ব্যাঙ্গমা পাখির সন্ধান পেল না। অবসন্ন হয়ে একদিন দুপুরবেলা একটি বটবৃক্ষের তলায় বিশ্রাম করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মানুষের কথা বলার আওয়াজ পেয়ে চোখ মেলে দেখে, গাছের উপরে দুটি পাখি মানুষের ভাষায় কথা বলছে। এরা নিশ্চয়ই ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী হবে, এমনটা রামুর মনে হল। রামু ব্যাঙ্গমাকে সম্বোধন করে নেমে আসতে বলল। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী দু’জনেই নিচে নেমে এল। রামুর কাছে সবকথা শুনে বিশেষ করে রাজকুমারীর দুর্দশার কথা শুনে তারা খুব ব্যথিত হল এবং ব্যাঙ্গমা রামুকে বলল, “আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব। আমি আগে গিয়ে দেখে আসি জাদুগর কী করছে। তারপর তোমাকে নিয়ে যাব।”
রামু ব্যাঙ্গমাকে ধন্যবাদ জানাল।
ব্যাঙ্গমা পরদিন সকালেই উড়ে চলল জাদুগরের সন্ধানে এবং বিকেলের দিকে ফিরেও এল। তারপর বলল, “বড়োই দুর্গম স্থান। আরবদেশে সুউচ্চ পাহাড়ের গায়ে কণ্টকাকীর্ণ জঙ্গলে একটি গুহায় আস্তানা গেড়েছে জাদুগর। আমি তোমাকে আমার পিঠে বসিয়ে গুহার কাছে পৌঁছে দিতে পারব। কিন্তু গুহার ভিতরে প্রবেশ করতে পারব না। জাদুগরকে পাকড়াও করার কাজটি তোমাকেই করতে হবে।”
রামু রাজী হল। পরদিন সকালে ব্যাঙ্গমার পিঠে চেপে আরবদেশে যাত্রা করল সে। আকাশপথে বহু শহর, জনপদ, নদীনালা পেরিয়ে দুপুরের দিকে একটি পাহাড়ের উপরে অপেক্ষাকৃত সমতল স্থানে অবতরণ করল ব্যাঙ্গমা। ঐ স্থান থেকেই গভীর জঙ্গলের শুরু। রামু ব্যাঙ্গমার পিঠ থেকে নেমে একাকী জঙ্গলে প্রবেশ করে অগ্রসর হতে লাগল। অনেকদূর যাওয়ার পর দূর থেকে গুহাটি দেখতে পেল। রামু ধীরে ধীরে গুহার মধ্যে প্রবেশ করল। অনেকটা ভেতরে যাবার পর একটা কুঠুরিমতো দেখতে পেলেন। কুঠুরির মধ্যে ঢুকে একটি খালি বিছানা দেখতে পেল। বুঝল, এটাই জাদুগরের আস্তানা। আচমকা পেছন থেকে জাদুগর এসে একটা লাঠি দিয়ে রামুর মাথার পেছনে সজোরে আঘাত করল। আসলে পায়ের আওয়াজ পেয়ে জাদুগর আগে থেকে সতর্ক হয়ে গেছিল। রামু প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। জাদুগর অট্টহাস্য হাসতে হাসতে একটি প্রকাণ্ড পাথর তুলে নিয়ে রামুকে পিষে মারতে চাইল। আসন্ন মৃত্যু দেখে রামু পকেট থেকে জাদুগরের সেই জাদু টুপিটি বের করে মাথায় দিল এবং মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। জাদুগর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাতড়াতে লাগল, কারণ রামু আশেপাশেই ছিল। চোখে দেখতে না পেলেও হাতে ঠেকে যাওয়ার কথা। রামু অদৃশ্য হয়ে জাদুগরকে দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু জাদুগর ওকে দেখতে পাচ্ছিল না। রামু যন্ত্রণা সামলে নিয়ে টুপিটি মাথায় দিয়ে জাদুগরের সামনে প্রকট হল এবং সবলে লাথি মেরে জাদুগরকে ভূলুণ্ঠিত করে দিল। তারপর একগাছা দড়ি নিয়ে জাদুগরের হাতদুটো পেছনে শক্ত করে বেঁধে দিল এবং চুল ধরে টানতে টানতে গুহার বাইরে বের করে আনল। তারপর ব্যাঙ্গমার পিঠে করে জাদুগরকে নিয়ে মিথিলা নগরে ফিরে এল। রামু ব্যাঙ্গমা পাখিকে প্রণাম করে তাঁর অশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বিদায় জানাল এবং জাদুগরকে ধরে এনে রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে তরবারি বের করে জাদুগরের মস্তক ছেদন করতে উদ্যত হলেন।
জাদুগর অট্টহাসি হেসে উঠে বলল, “আমাকে মেরে ফেললে রাজকুমারী আর কোনওদিন পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে পারবে না। ঐ টোটকাটি একমাত্র আমার জানা আছে। যদি আমাকে ছেড়ে দেবেন প্রতিশ্রুতি দেন, তবেই আমি রাজকুমারীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব।”
রাজা বললেন, “তোর মতো কপটিকে ছেড়ে দেবার প্রশ্ন ওঠে না। তুই না জানি কত নিরীহ মানুষের সর্বনাশ করেছিস। শাস্তি তোকে ভোগ করতেই হবে।”
রাজা মাথা ঠাণ্ডা করে আপাতত জাদুগরকে হাত-পা-মুখ বেঁধে কারাগারে নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন। রামু রাজামশায়কে সঙ্গে নিয়ে পীরবাবার কথামতো জাদুগরের ধরা পড়ার সংবাদটি তাঁকে দিতে গেল। পীরবাবার দরগায় হাজির হয়ে রামু রাজাকে তাঁর পরিচয় দিয়ে বলল, “রাজামশাই, ইনি জাদুগরের গুরু।”
রাজা বললেন, “রাজকন্যার কথা আপনি নিশ্চয়ই রামুর কাছে শুনেছেন। আমি ও আমার কন্যা অশেষ যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছি। জাদুগর রাজকুমারীকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবার টোটকাটি বলছে না। আবার ওকে শাস্তি দেওয়াও অনিবার্য। এমতাবস্থায় কী করণীয় যদি বলে দেন, তাহলে বাধিত হই।”
পীরবাবা বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, ওর অন্তিমকাল সমাগত। ছল কপট করে বেশিদিন পার পাওয়া যায় না। ও টোটকাটি বলতে চাইছে না, কারণ এতে ওর অঙ্গহানি হবে। আমি ওর গুরু। ওর দুষ্কর্মের শাস্তিস্বরূপ টোটকাটি আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি। তুমি গিয়ে তরবারির এক কোপে জাদুগরের নাকটি কেটে ফেলো। ফিনকি দিয়ে যে রক্ত বেরবে, সেটি একটি পাত্রে সংগ্রহ করবে। সেই রক্ত রাজকুমারীর সারা শরীরে লেপন করতে হবে। জাদুগরের রক্ত রোমকূপ দিয়ে রাজকুমারীর শরীরে প্রবেশ করলে যে জাদু তরলের প্রভাবে রাজকুমারীর এই হাল হয়েছে, তার প্রভাব কেটে যাবে এবং রাজকুমারী কিছুদিনের মধ্যেই পূর্বাবস্থা প্রাপ্ত হবেন।”
রাজা ফিরে এসে পীরবাবার কথামতো তরবারির কোপে জাদুগরের নাক কেটে দিলেন এবং রক্ত সংগ্রহ করে তাকে হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থাতেই কালকুঠুরিতে নিক্ষেপ করলেন। সেই রক্ত রাজকুমারীর সারা শরীর লেপন করা হল। কয়েকদিন পর ধীরে ধীরে রাজকুমারী তাঁর আগের গাত্রবর্ণটি ফিরে পেলেন।
রাজা রামুকে কথামতো অর্ধেক রাজত্ব দান করলেন এবং রামু সাহসিকতার সাথে রাজ্য পরিচালনার কাজে রাজাকে সহযোগিতা করতে লাগল। তার আগের মতো দৈন্যদশা আর রইল না।
কয়েকমাস পরেই রাজকুমারীর জন্য স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করা হল। রাজকুমারী তাঁর মনোমতো উপযুক্ত রাজকুমারকে বেছে নিয়ে তাঁকে বিয়ে করে রাজকুমারের রাজ্যে চলে গেলেন এবং সুখে দিনাতিপাত করতে লাগলেন।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

1 comment:

  1. স্বর্ণদীপ চৌধুরীর অলংকরণটি খুব সুন্দর হয়েছে।

    ReplyDelete