গল্পঃ স-রোষ সতীঃ সঞ্জীবকুমার দে




কলিং বেলের শব্দে উঠে এলাম লেখার টেবিল ছেড়ে। দরজা খুলতেই সেইসব চাঁদবদন, যাদের তখন বদন দেখাবার কথা চাঁদার বিল বই হাতে।
“অনেকদিন পর এলাম কাকু,” একজনের সহাস্য ভূমিকা, “সেই এসেছিলাম কালীপুজোর আগে।”
“তবে জগদ্ধাত্রী পুজোটা বাদ দিয়েছ কেন?”
“কে বলল বাদ দিয়েছি! সব পুজোতে আমরা আছি, চাঁদা তুলতে এসেছিল ভোম্বলরা। ওটা আমরা অদলবদল করে করি। ক্লাবের বা আয়োজকদের নামের ব্যাপারেও তাই।”
মৃদু হাসলাম।
“আসলে চক্ষুলজ্জা বলে তো কিছু আছে! নাকি! বলুন না।”
ওদের মজার কথায় শব্দ করে হাসতে হল। যোগ দিল ওরাও। এমনই সম্পর্ক ওদের সঙ্গে। আছে, রাখবও যদি না নিজেরই ওই ফেলে আসা বয়সটাকে স্বীকার করার সাহস হারাই। প্রশ্ন করলাম, “কত লিখছ?”
“যা আপনি দেবেন।”
“পাঁচ।”
“পনেরো লিখে ফেললাম যে!” বিল লিখছিল যে তার কণ্ঠ।
“মাথা খারাপ!” জোরালো প্রতিবাদ করে উঠলাম। “কত চাঁদা যায় জানো আমার, এই পুজোয়!”
“কত? পঞ্চাশ!”
“পঞ্চাশ! হিসেব করো।”
“বলুন। মুখে মুখে যোগ করি।”
“ছেলের স্কুলের পনেরো, মেয়ের স্কুলে দশ। ছেলের কোচিংয়ে পনেরো, মেয়ের নাচ শেখার স্কুলে পাঁচ। আমার অফিসে হঠাৎ বাধ্যতামূলক পনেরো, লাইব্রেরিতে দশ। তাও দশ টাকা বলে-কয়ে কমিয়েছি, লাইফ মেম্বারদের বিশ। কত হল?”
“সত্তর।”
“তার ওপর আবার বাড়ির পুজো।” মনে করাল মাতব্বর ছেলেটি।
“তবে!”
“ঠিক আছে,” প্রসন্ন মুখে বিলটি হাতে ধরিয়ে দিল মূর্তিমান, “এই নিন।”
চেয়ে দেখি টাকার অঙ্কটা সত্যি সত্যি পাঁচই। অতএব না হেসে পারি? টাকাটা আনতে ভেতরে গেলাম।
ফিরে এসেই দেখি দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড! আমার বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটের দরজায় বুঝি নক করেছে ছেলেগুলো। মিঃ অ্যান্ড মিসেস দত্তের ফ্ল্যাট। তাঁদের সঙ্গেই বুঝি চাঁদা নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু করেছে যথারীতি। এ একেবারে প্রতিবারেরই চিত্র। মিঃ দত্ত নিরীহ ও সদাশয় ব্যক্তি। মিসেস দত্ত একটু কঠিন ও রাশভারী। তাঁর সঙ্গে চাঁদা আদায়কারীদের সংঘাত লাগবেই। এবারও তাই।
মিঃ দত্ত কী যেন বলতে চাইছিলেন, তাঁকে ধমকে চুপ করালেন মিসেস দত্ত, “তুমি চুপ করো।” তারপর কনুইয়ের ধাক্কায় তাঁকে ঠেলে এগিয়ে এলেন আমার দিকে, “এই যে!”
থতমত খেয়ে অস্ফুট স্বরে শুধোই, “কী?”
“এদের চাঁদা দিয়েছেন আপনি?”
কোনওমতে মাথা নাড়ি।
“হাউ মাচ?”
আমি কিছু বলতে যাবার আগেই ছেলেগুলোর একজনের উত্তর, “ফিফটিন।”
যাক বাবা, খুব বেঁচে গেছি। মিথ্যে আমাকে বলতে হয়নি। আবার ফ্ল্যাটের স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য সত্য গোপন করাটাও জরুরি।
“লিখেছিল কত?” বাজখাঁই গলায় চিৎকার দত্ত-সহধর্মিণীর।
“ফিফটিনই।” একটু ধাতস্থ গলায় বলি আমি।
“ডিসগাস্টিং!” গর্জে উঠলেন তিনি। “যা লিখল তাই দিয়ে দিলেন আপনি? যে যা খুশি দেয় দিক, আমি দেব না।”
“সেই জন্য তো বলছি, আমি দিয়ে দিই না, ক্ষতি কী!” মিঃ দত্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় মরিয়া।
“ইউ শাট আপ!” মিসেস দত্তর দাঁত কিড়মিড়। “কাছা খোলা মানুষ, যে যা খুশি ঠকিয়ে নিক!”
“ঠকিয়ে নেওয়া বলছেন কেন?” প্রতিবাদ সমস্বরে, “আমরা কি ঠকিয়ে নিচ্ছি?”
“তাছাড়া পাড়ার পুজো,” বলে মাতব্বর ছেলেটি, “আমরা চাঁদা চাইতে এসেছি। আপনি দেবেন না বলছেন, কারণটা জানতে পারি?”
“তোমরা এ-পাড়ার ছেলে প্রমাণ কী?”
“আমি সকলের মুখ চিনি।” থাকতে না পেরে বলি।
মিঃ দত্ত এবার সাহস পেলেন। “রোজই তো যাতায়াতের পথে এদের দেখি। ভালো ছেলে, পরোপকারী।”
ভ্রূ কুঞ্চিত হল মিসেস দত্তর। “কী করে জানলে ভালো ছেলে? পরোপকারী?”
“ওদের সম্বন্ধে পাড়ায় তো কোনও অভিযোগ নেই। আমাদের দেখে সম্মান করে, হেসে কথা বলে। পরের বিপদে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।”
মিঃ দত্তর কথায় আবার আমার সংযোজন, “তাছাড়া শিক্ষিতও, ওরা প্রত্যেকেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। এই নানারকম পুজো-পাব্বনের ছলছুতোয় একটু হুল্লোড়ে মাতে, এই আর কী!”
কটমট করে আমাদের দিকে তাকালেন মিসেস দত্ত। “আপনাদের প্রশ্রয়েই ওরা মাথায় ওঠে। সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন ভালো, শিক্ষিত কত কী!”
“টেস্ট নেবেন, নিন না, সন্দেহ রেখে লাভ কী?” বলে মাতব্বর ছোকরাটি।
“সরস্বতীর গোটা পাঁচেক নাম বলব?” আরেকজনের কণ্ঠ।
“কিংবা সরস্বতী বানান লিখে দিই?” বিল হাতের ছেলেটি।
“বিলেই বরং ওই নামটা লেখো।” মিঃ দত্তর উক্তি, “ওটা ওরই নাম।”
“হাউ ফানি!” উল্লসিত ছোকরা, “আপনার নাম সরস্বতী, জেঠিমণি?”
“হোয়াট!” রাগে বুঝি ফেটে পড়বেন মিসেস দত্ত। “কে জেঠিমণি?”
“কেন, আপনি! ওঁকে তো আমরা জেঠু বলি।” মিঃ দত্তকে ইঙ্গিত করল ছেলেটি।
মিঃ দত্ত সম্মতি জানালেন মাথা নেড়ে।
“এই দেখুন, নির্ভুল বানানে আপনার নাম লিখে ফেলেছি, জেঠিমণি।”
সবাই দেখলাম, বিলের কাউন্টার পার্টে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা শ্রীমতী সরস্বতী দত্ত।
“অ্যামাউন্টটা তবে পনেরোই লিখি?”
“নো!” নিষ্ফল আক্রোশে চেঁচান সরস্বতী। “উনি পনেরো দিতে পারেন, তা বলে আমাকেও দিতে হবে নাকি?” ইঙ্গিত আমাকে।
“উনি কত অসুবিধের মধ্যেও দিলেন। আপনাদের কত সুবিধেーদু’জন মাত্র মানুষ, তাও ডবল ইঞ্জিন।”
“মানে!”
“ডবল ইঞ্জিন। মানে দু’জনেই চাকুরীজীবী।”
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সরস্বতী। তারপর ভেতরে গটমট করে চলে গেলেন টাকা আনতে। তার আগে শুনিয়ে যেতে ভুললেন না, “পাঁচ টাকার এক পয়সাও বেশি দেব না আমি।”
চাপাস্বরে আক্ষেপ করলেন মিঃ দত্ত, “কী যে মনোবৃত্তি মশাই বুঝি না। দেদার খরচ করবে, কিন্তু ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনাকাটায় আর চাঁদা দেওয়াতেই যতরকম বিপত্তি।”
মৃদু হাসলাম। হাসলেন মিঃ দত্তও। বোঝা গেল, মুহূর্তটি বেশ উপভোগ করলেন তিনি। বললেনও সে কথা, “ছেলেগুলো বেশ দু’কথা শুনিয়েছে। আমি খুশি।”
টাকা নিয়ে এলেন মিসেস দত্ত। আবার কিছু কথা কাটাকাটি। যাই হোক, টাকা ও বিলের বিনিময়ের মধ্য দিয়ে চাঁদা পর্বের ইতি।
দরজা বন্ধ করে টেবিলে এসে বসেছি কি বসিনি আবার কলিং বেলে শব্দ, সঙ্গে বাইরে মিসেস দত্তর তুমুল চেঁচানি। দৌড়ে এসে দরজা খুললাম। “কী ব্যাপার!”
“দেখুন আপনাদের ভালো ছেলেদের ডেঁপোমি।” বিলটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন শ্রীমতী সরস্বতী, “ওরা ভেবেছেটা কী?”
পেছনে হাতে মুখচাপা দিয়ে হাসি আড়াল করছেন মিঃ দত্ত।
বিলে নজর দিতেই ব্যাপারটা বুঝলাম। ছোকরাগুলো নামটির বানানে বৈচিত্র্য ঘটিয়ে লিখে দিয়ে গেছেーস-রোষ সতী!
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ জয়ন্ত বিশ্বাস

No comments:

Post a Comment