বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ যা দেখি, যা শুনি, তারই উত্তর খুঁজিঃ (দ্বিতীয় পর্ব) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বিতীয় পর্ব

রাতের অন্ধকারে মোমবাতি বা হারিকেন জ্বালালে পতঙ্গের দল সেদিকে ধেয়ে আসে কেন?


লক্ষ করলে দেখা যাবে সাধারণত পুরুষ পতঙ্গগুলিই আলোর দিকে ধেয়ে আসে। ফরাসি পতঙ্গবিজ্ঞানী ফেবরি (Fabre)-এর মতে, আলোক উৎস থেকে নির্গত হওয়া একধরনের বিকিরণই এর কারণ। স্ত্রী পতঙ্গদের পেটে এক বিশেষ গ্রন্থি থাকে যা থেকে ফেরোমোন (Pheromone) নামে এক ধরনের অণু কণা নিঃসৃত হয়। এই রাসায়নিকটি থেকে কিছু পরিমাণ অবলোহিত রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। গন্ধ এবং রশ্মির আকর্ষণে পুরুষ পতঙ্গগুলি স্ত্রী পতঙ্গদের দিকে ধাবিত হয়। মোমবাতি, হারিকেন ইত্যাদির মতো আলোক উৎস থেকে নিঃসৃত অবলোহিত (infrared) রশ্মিকে স্ত্রী পতঙ্গের শরীর থেকে নিঃসৃত অবলোহিত রশ্মি অনুমান করে পুরুষ পতঙ্গেরা সেই দিকে ধাবিত হয়। এর ফলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে তাদের মারা পড়তে হয়। মোমবাতির আলোতে এইধরনের রশ্মির পরিমাণ বেশি থাকে বলে পতঙ্গেরা সেইদিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। যেসব আলোক উৎসে এইধরনের রশ্মি খুব কম থাকে বা একেবারেই থাকে না সেই আলোর দিকে এরা আকর্ষিত হয় না।


জুতা পালিশ করলে চকচকে দেখায় কেন?
    
নতুন অবস্থায় জুতা চকচকে থাকে। কিছুদিন ব্যবহারের পর সেটা ম্যাড়ম্যাড়ে দেখায়। পালিশ করলে আবার আগের মতো চকচকে দেখায়। এই ঘটনার সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি কেন এমনটা হয়?
কোনও বস্তু চকচকে দেখাবে কি না তা নির্ভর করে বস্তুটির তলের মসৃণতার উপর। চামড়ার জুতার উপরিভাগ অতি সূক্ষ্ম এবড়ো-খেবড়ো এবং ছোটো ছোটো লোমে ভরা থাকে। এই অমসৃণ তলে আলো পড়ার পর তা বিক্ষিপ্ত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জুতার উপরি তলটি ম্যাড়ম্যাড়ে দেখায়। পালিশ করার জন্য আমরা যে জুতার কালি ব্যবহার করি তাতে মোম মেশানো থাকে। এই মোম চামড়ার উপরের ছোটো ছোটো ছিদ্রগুলোকে ভর্তি করে দেয়। সেই সঙ্গে সুক্ষ্ম লোমগুলিও চামড়ার গায়ে লেপটে থাকে। পালিশ লাগিয়ে তার উপর ব্রাশ দিয়ে বারবার ঘষলে চামড়া মসৃণ হয়। ছোটো কাপড়ের টুকরো দিয়ে জুতার উপর ঘষলে মোমের কণাগুলি গলে যায় এবং ভালোভাবে চামড়ার উপর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জুতো আরও বেশি চকচকে দেখায়।


শুকনো কাগজ ছেঁড়ার সময় শব্দ হয়, অথচ ভেজা কাগজ ছেঁড়ার সময় শব্দ হয় না কেন?
    
যেকোনও শব্দেরই সৃষ্টি হয় কম্পন থেকে। কাগজ তৈরি হয় সেলুলোসের তন্তু বা আঁশ দিয়ে। যেকোনও বস্তুকে টানলে সেটা আবার নিজের জায়গায় ফিরে যেতে চায়। পদার্থের এই ধর্মকে বলা হয় স্থিতিস্থাপকতা। কাগজ ছেঁড়ার সময় আঁশগুলো একটার পর একটা ছিঁড়তে থাকে। শুকনো অবস্থায় কাগজের আঁশগুলোর স্থিতিস্থাপকতা ভিজে কাগজের তুলনায় বেশি থাকে বলে, তাকে ছিঁড়তে বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়। এর ফলে আঁশগুলির মধ্যে যথেষ্ট জোরে কম্পনের সৃষ্টি হয় এবং কাগজে কাঁপন জাগায়। এই কম্পন সংলগ্ন বায়ুস্তরে সঞ্চালিত হয়ে শব্দের সৃষ্টি করে। ভিজে অবস্থায় কাগজের আঁশগুলোর স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ায় সামান্য চাপেই তা ছিঁড়ে যায়। ফলে আঁশগুলোর কম্পনের মাত্রা খুবই কম হয়। এরফলে শব্দ এতটাই কম হয় যে আমরা তা শুনতে পাই না।


ভুট্টার খই ভাজার সময় ফটাস করে ফোটে কেন?   
    
ফট-ফট-ফটাস! আওয়াজটা নিশ্চয়ই শুনেছেন। মনে করতে পারছেন না, তাই তো? বেশ, ধরিয়ে দিচ্ছি। ভুট্টার খই ভাজার সময় এই শব্দটা শুনেছেন কি না মনে করে দেখুন তো। গ্রামে-গঞ্জে যাঁরা থাকেন এবং যাঁদের বাড়িতে মুড়ি, চিঁড়া, খই ভাজা হয় তাঁদের কাছে ফুট-ফুট-ফুটুস শব্দটা অপরিচিত নয়। খোলাতে খই ফোটার সময় এই শব্দটা শোনা যায়। যাঁরা শহরে থাকেন তাঁরা অবশ্য এই শব্দের সঙ্গে ততটা পরিচিত নন। তবে ফট-ফট-ফটাস শব্দের সঙ্গে পরিচিত। কারণ আজকাল অনেকেই বাড়িতে ভুট্টার খই ভাজেন। অনেকে এটাও লক্ষ করেছেন যে খই ভাজার সময় কিছু খই খোলা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য লাফ দেয়। কেন এমন হয় কখনও ভেবেছেন কী?
খোলায় ভুট্টার খই ভাজার সময় তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছলে ভুট্টাদানার ভিতরের জলীয় ভাগের কিছু অংশ বাষ্পে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এর ফলে দানার ভিতরের চাপ বাড়তে শুরু করে। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তাপমাত্রা পৌঁছলে এই চাপ বেড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে বাতাসের যে চাপ থাকে তার প্রায় দশ গুণ হয়ে যায়। এই প্রচণ্ড চাপে ভুট্টাদানার বাইরের খোলস ফেটে যায়। ফলে দানার ভিতরকার চাপ হঠাৎ করে ভীষণ কমে যায়। এতে ভুট্টাদানার ভিতরের স্টার্চ-যুক্ত শাঁস আয়তনে বেড়ে গিয়ে ফেটে বেরিয়ে আসে। ভুট্টাদানার খোলস পরপর ফাটতে থাকে আর সেই সঙ্গে জলীয় বাষ্প হঠাৎ করে মুক্ত হতে থাকায় ওই ফট-ফট-ফটাস আওয়াজটা হতে থাকে।
খই ফোটার সময় লাফ দেয় কেন? এবারে সেই কথায় আসি। ফাটা খোলস থেকে প্রথমে খইয়ের সামান্য একটা অংশ বেরিয়ে আসে। অত্যধিক চাপে খোলস সম্পূর্ণ ফেটে গেলে দানার ভিতরের চাপ হঠাৎ করে হ্রাস পায়। এতে স্পঞ্জের মতো সাদা খই আয়তনে বেড়ে গিয়ে বেরিয়ে আসে এবং লাফিয়ে ওঠে। কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত এরা হাই-জাম্প দিতে পারে। আর এই পুরো ঘটনাটি ঘটতে সময় লাগে ৯০ মিলি সেকন্ডেরও কম। ব্যাপারটা বেশ মজার। তাই না?


এরোপ্লেনের ‘ব্ল্যাক বক্স’ কি সত্যিই কালো?
    
এরোপ্লেনের এক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র হল ফ্লাইট রেকর্ডার যা ব্ল্যাক বক্স নামে পরিচিত। এটি বিমানে ব্যবহৃত একটি ইলেকট্রনিক রেকর্ডিং ডিভাইস, যাতে বিমানের আকাশে উড়ানকালীন তার সমস্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। যেকোনও বিমান দুর্ঘটনার তদন্তে এটি ব্যবহৃত হয়। জনসাধারণের কাছে এই যন্ত্রটি ব্ল্যাক বক্স নামে পরিচিত হলেও এভিয়েশন বা বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বলে থাকেন।
প্রতিটি বিমানেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র থাকে — ‘ডিজিটাল ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার’ এবং ‘ককপিট ভয়েস রেকর্ডার’। নিরাপত্তার কারণে দু’ট যন্ত্রই মরিচাবিহীন ইস্পাত বা টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি বাক্সের মধ্যে থাকে। এই বাক্সগুলি ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সহ্য করতে পারে। কোনও আঘাতেও সেগুলি নষ্ট হয় না। যন্ত্রের ভিতরে থাকে মরিচাবিহীন ইস্পাতের তৈরি টেপ, যার ফলে সেগুলি জলে নষ্ট হয় না। ককপিট ভয়েস রেকর্ডারটি থাকে বিমানের সামনের দিকে, আর অপরটি থাকে পিছনের দিকে।
ফ্লাইট রেকর্ডার তৈরির উদ্যোগ প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেওয়া হলেও প্রকৃত কাজ শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। এটি আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড ওয়ারেন। তিনি তখন অস্ট্রেলীয় সরকারের অ্যারোনটিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে গবেষণারত ছিলেন। যন্ত্রটি ১৯৬২ সালের ২৩ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার একটি বিমানে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ফ্লাইট রেকর্ডার যন্ত্রের বাক্সদুটির নাম ব্ল্যাক বক্স হলেও এগুলির রঙ আদৌ কালো নয়, বরং জলের নিচে বা স্থলের যেকোনও জায়গায় বাক্সগুলো যাতে সহজেই চোখে পড়ে তাই এগুলো কমলা রঙের হয়ে থাকে। এমন একটি যন্ত্রের নাম কেন ব্ল্যাক বক্স হল তার সঠিক কারণ জানা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনও ধাতব প্রযুক্তি নতুন আবিষ্কৃত হলে তাকে কালো রঙ দিয়ে ঢেকে রাখার রেওয়াজ ছিল। অনেকের ধারণা, এই কারণে যন্ত্রটির নাম ব্ল্যাক বক্স। তবে এ নিয়ে দ্বিমত আছে। অনেকে বলেন, দুর্ঘটনা, মৃত্যু ইত্যাদির কারণে এটিকে ব্ল্যাক বক্স বলা হয়।
ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার হল বহুপথযুক্ত একটি রেকর্ডার। এতে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক ডজন তথ্য রেকর্ড করা যায়। এইসব তথ্যের মধ্যে থাকে বিমানের ওড়া-নামা, গতিবেগ, ইঞ্জিনের শব্দ, বিমানের মধ্যেকার উষ্ণতা ও চাপ, বাতাসের গতিবেগ,  পরিবেশ, তাপের পরিবর্তন, সময়, শব্দ ইত্যাদি নানা বিষয় মিলিয়ে প্রায় ৬৪টি তথ্য এই যন্ত্রটির মধ্যে সঞ্চিত থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে এই যন্ত্র থেকে বিশেষ উপায়ে সংগৃহীত তথ্যসমূহের পাঠোদ্ধার করা হয়।
ককপিট ভয়েস রেকর্ডার একধরনের টেপ রেকর্ডার, যার মধ্যে একটি চৌম্বক ফিতা থাকে। এটি থাকে বিমান চালকদের ঘরের মধ্যে। এতে পাইলটদের নিজেদের মধ্যের কথাবার্তা, পাইলটদের সাথে বিমানের অন্য ক্রুদের কথা, ককপিটের সাথে এয়ার কন্ট্রোল ট্রাফিক বা বিভিন্ন বিমানবন্দরের সাথে রেডিও যোগাযোগের কথা রেকর্ড হতে থাকে। বিগত আধঘন্টাব্যাপী সব কথোপকথন এর মধ্যে রেকর্ড হয়ে থাকে। পূর্বের তথ্যগুলো আপনা আপনি মুছে যায়। এইভাবে এটিতে ক্রমান্বয়ে কথোপকথন লিপিবদ্ধ হতে থাকে।
দুটি রেকর্ডার একত্রে ফ্লাইট ইতিহাস সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য দেয়, যা পরবর্তী তদন্তের কাজে লাগে। দুর্ঘটনার পর এটি ৩০ দিন পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে, এমনকি সমুদ্রের তলদেশেও।


মাথার চুল যত তাড়াতাড়ি বাড়ে, ভ্রূ, চোখের পাতা বা হাত-পায়ের চুল বা লোম তত তাড়াতাড়ি বাড়ে না কেন?
     
চুলের জন্ম আমাদের শরীরের বা মাথার চামড়ায় থাকা অতি ক্ষুদ্র একধরনের কোষ থেকে। জন্মের পর থেকেই চুলের বৃদ্ধি শুরু হয়। এই বৃদ্ধি তিনটি পর্যায় হয়ে থাকেঃ
  • অ্যানাজেন (Anagen) - এই পর্যায়ে চুল ধারাবাহিকভাবে এবং সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। এই পর্যায়কাল চার থেকে আট বছর হলেও শরীরের সর্বত্র সমান নয়।
  • ক্যাটাজেন (Catagen) - প্রথম পর্যায়টি শেষ হওয়ার পর এই পর্যায়টি শুরু হয়। এই সময়ে চুলের বাড় অত্যন্ত ধীরগতিতে হয়।
  • টেলোজেন (Telogen) - এই পর্যায়ে চুলের বৃদ্ধি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। পুরনো চুল খসে পড়ে এবং সেখানে নতুন চুল গজায়। বলা যায়, এটা চুলের বৃদ্ধকাল। 
কোন চুল কতটা বাড়বে তা নির্ভর করে সেটা কোন পর্যায়ে কতদিন থাকবে তার উপর। মাথার চুল অ্যানাজেন পর্যায়ে বেশিদিন থাকে ন্যূনতম চার বছর এবং সর্বোচ্চ আট বছর। এরপরে আসে ক্যাটাজেন পর্যায়। তখন চুলের বৃদ্ধি ভীষণভাবে কমে যায়। তারপরে টেলোজেন পর্যায়ে পুরনো চুল পড়ে গিয়ে সেখানে নতুন চুল গজায়। মাথার চুলের ক্ষেত্রে অ্যানাজেন পর্যায় দীর্ঘ সময় ধরে চলে। তাই সেখানকার চুল তাড়াতাড়ি বাড়ে এবং অনেক বেশি লম্বা হয়। এই কারণে অনেকে মাথার চুল মাঝে মাঝে ছেঁটে ফেলেন। শরীরের অন্যান্য অংশের চুল বা লোমের ক্ষেত্রে অ্যানাজেন পর্যায় থাকে মাত্র এক মাসের মতো। এরপরেই আসে দ্বিতীয় পর্যায়। তখন চুলের বাড় এত সামান্য থাকে যে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। এক্ষেত্রে তৃতীয় পর্যায়টি মাস চারেকের মতো থাকে। আগেই বলেছি, এই সময় পুরনো চুল পড়ে যায় এবং নতুন চুল জন্মায়। ভ্রূ, চোখের পাতা, হাত-পা ইত্যাদি অংশে চুলের পরিমাণ মাথার চুলের তুলনায় অনেক কম। তাই এখানকার চুল পড়া আমরা তেমনভাবে টের পাই না। যাই হোক, উপরে উল্লিখিত তিনটি পর্যায়ের স্থায়িত্বকালের হেরফেরের জন্যই আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের চুলের বাড় বিভিন্ন হয়। এই কারণেই মাথার চুল বেশি এবং তাড়াতাড়ি বাড়ে, ভ্রূ, চোখের পাতা এবং হাত-পায়ের চুল কম বাড়ে।


(চলবে)

No comments:

Post a Comment