আমার স্কুলঃ আমার পাঠশালা জীবনঃ (প্রথম পর্ব) সুস্মিতা কুণ্ডু


প্রথম পর্ব



বাবার চাকরির সূত্রে জীবনের প্রথম দশটা বছর কাটিয়েছিলাম মেদিনীপুর জেলায়। সে হবে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের মাঝ বরাবর, তখনও মেদিনীপুর পূব-পশ্চিমে ভাগাভাগি হয়নি। উড়িষ্যার প্রায় গা ঘেঁষে, দাঁতন নামে একটা আধা শহর আধা গ্রাম, যাকে বলে কিনা মফস্বল। বাবা সেখানকার একটিমাত্র কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। দাঁতনে মোটামুটি কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, থানা, সিনেমাহল, ছেলেদের হাইস্কুল, মেয়েদের হাইস্কুল, ইংলিশ মিডিয়াম প্রাইমারি স্কুল - সবই একটা একটা করে ছিল।
পাঁচ বছর বয়স অবধি অক্ষর পরিচয় ছাড়াও আমার জীবন বড়ো সুন্দরভাবেই কাটছিল। মাঠেঘাটে আদাড়েবাদাড়ে ঘুরে, ছাগলছানাদের পেছনে পেছনে ছুটে, প্লাস্টিকের রান্নাবাটি নিয়ে ঘরকন্না করে দিনগুলো আমার সুখেই কাটছিল। কিন্তু বেশি সুখ কবে আর ছেলেমানুষদের কপালে সয়েছে! পাঁচ বছর বয়স হয়ে গেল এখনও ‘অ আ ক খ’ বলতে শিখিনি, কী বিষম লজ্জার কথা। অতএব আশেপাশের সবার উৎসাহে আমাকে ‘ইস্কুলে’ ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নিলেন আমার বাবা-মা। কিন্তু কোন ইস্কুল? হাতের কাছে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকতেও আমায় ভর্তি করা হল প্রায় মাইল খানেক দূরের একটা খুবই সাধারণ বাংলা মাধ্যম পাঠশালায়। আগামী চার বছরের জন্য আমার বিদ্যাচর্চা শুরু হল ‘একতারপুর তকিনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ।
একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থাকা সত্ত্বেও আগাগোড়া একটা বাংলা মাধ্যম পাঠশালায় যেখানে স্থানীয় সকল জাতি এবং উপজাতির ছেলেমেয়ে পড়ত সেখানে কেন আমাকে ভর্তি করা হল, তার কারণটা একটু বলে দিই। ওই পাঠশালার দুই বয়স্ক মাস্টারমশাই বাবার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন এবং তাঁরা বাবাকে কথা দিয়েছিলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের থেকে কোনও অংশে আমি কম বিদ্যেধরী হব না।
অতএব এক শুভ্র সুন্দর সকালে পাট পাট করে চুল আঁচড়ে, ঢেউ খেলানো ফ্রক পরে, হাওয়াই চপ্পল গলিয়ে মাস্টারমশাইয়ের সাইকেলের কেরিয়ারে চেপে পা দোলাতে দোলাতে আমার ইস্কুলযাত্রা শুরু হল। হ্যাঁ, বাবার বন্ধু সেই মাস্টারমশাইরা আমার পড়াশোনার সাথে সাথে বাড়ি থেকে এক মাইল দূরের স্কুলে আমাকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। আগামী চার বছর শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নির্বিশেষে এই এক রুটিন। অবশ্য প্রথম প্রথম ওঁদের সাইকেলে চেপে আসা যাওয়া দুটোই করলেও পরে হেঁটে হেঁটে ফিরতেই বেশি ভালোবাসতাম। তারও অবশ্য একটা কারণ ছিল। ফিরতি পথে দুপুর রোদের গরমে গলে যাওয়া পিচের রাস্তার আলকাতরাগুলো খুঁটে খুঁটে তুলতে খুব মজা লাগত। গুলি পাকিয়ে সেগুলোকে জমিয়ে রাখতাম, পরে মার্বেল খেলতাম তাই নিয়ে।
যাই হোক, ফিরে আসি প্রথম দিনটার কথায়। মাস্টারমশাইয়ের সাইকেলে চেপে পাঠশালার সামনে পৌঁছলাম। মাটির গোটা চারেক ঘর, ‘এল’ প্যাটার্নে সাজানো, মাথায় খড়ের ছাউনি। ক্লাস ওয়ান, টু আর থ্রি একটা বড়ো লম্বা টানা হলঘরে ছিল। মাঝখানে ক্লাস ওয়ান, দু’দিকে টু আর থ্রি, মাঝে দরমার বেড়া দিয়ে আলাদা করা। ছেলেমেয়ে সব একসাথেই বসত। এই হলঘরটার সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে ছিল দুটো ঘর। একটা ছোটো ঘর মাস্টারমশাইদের বসার জন্য, তার দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলত। একটা টেবিল, তার ওপারে একটা চেয়ার, এপারে দুটো বেঞ্চ। চেয়ারে বসতেন হেডমাস্টারমশাই। চারজন মাস্টারমশাই ছিলেন, তাঁদের নাম আজও মনে আছে। স্মৃতিকণ্ঠ হেডমাস্টারমশাই, অবনী মাস্টারমশাই, দিবাকর মাস্টারমশাই, অজিত মাস্টারমশাই। সকলেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরে স্কুলে আসতেন।
স্কুলের লাগোয়া ছোটো একটা মাঠ ছিল, তাতে অজস্র ইউক্যালিপটাসগাছ দাঁড়িয়ে থাকত আমাদের খেলার সাথী আর শৈশবের সাক্ষী হয়ে। আরও ছিল গোটা দুই লাল টুপি পরা শিমুলগাছ। স্কুলের পাশ দিয়ে লাল নদীর মতো বয়ে গিয়েছিল লাল মোরামের রাস্তা। সেই রাস্তা টপকে ওপারে গেলে একটা ছোট্টো মাঠ, তাতে একটা লোহার টিউবওয়েল। তাতে মুখ লাগিয়ে জল খেতাম আমরা। ঠাণ্ডা জলের সাথে একটা কেমন লোহা লোহা স্বাদ আসত মুখে, না জানি কেন, বেশ ভালো লাগত সেই স্বাদটা। গরমকালে ঠাণ্ডা জল বেরত আর শীতকালে উসুম-কুসুম গরম জল। ও হ্যাঁ! বড়ো বাইরে, ছোটো বাইরে সব বাইরেই করতে হত, আলাদা করে বাথরুম ছিল না।
প্রথম দিন, ক্লাস ওয়ানের সেই হলঘরে আমি আমার টিনের স্যুটকেসটা নিয়ে পদার্পণ করলাম। মনে আছে, সকালের রোদ্দুরে আমার হাতের স্যুটকেসটা রুপোর বাক্সের মতো ঝিলিক মেরে উঠতে সবাই চেয়ে দেখেছিল। আসলে যে স্কুলে সাঁওতাল ঘরের দস্যি দামালগুলো থেকে শুরু করে অত্যন্ত দরিদ্র ঘরের সন্তানেরা আসে বইখাতা হাতে অথবা নাইলনের বাজারের ব্যাগে নিয়ে পড়াশোনা করতে, সেখানে টিনের স্যুটকেসটা সকলের একটু নজর তো কাড়বেই। বেশ একটু সমীহের পাত্রী হয়ে গেলাম শুরুতেই সবার কাছে। এর পরের ঘটনাগুলো স্মৃতির স্লেটে বহুবার ডাস্টার বোলানোর ফলে সব ঝাপসা হয়ে গেছে। এটুকু শুধু মনে আছে যে প্রথম ক্লাসে মাস্টারমশাই এসে বলেছিলেন, কে কী শিখে এসেছে বাড়ি থেকে সেগুলো লিখে ফেলতে। ইস্কুলে পাঠানোর ক’দিন আগে মা একটুখানি শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল, একেবারে মুখ্যুসুখ্যু করে পাঠানো উচিত হবে না এই ভেবে। সেই বিদ্যেই স্লেটে জাহির করছিলাম। দেখি, আমার পাশে বসা একজন উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে। আমিও অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো তাকে স্লেটখানা এগিয়ে দিয়ে টুকলির প্রথম পাঠ দিয়ে দিয়েছিলুম। সেও মহা খুশি হয়ে একটা পেন্সিলের ধ্বংসাবশেষ আমায় গুরুদক্ষিণা হিসেবে দিয়েছিল।
পেন্সিল মানে কিন্তু কাঠের দেহে গ্রাফাইটের শিষওয়ালা পেন্সিল নয়। এগুলো সাদা কাঠের বর্ডার দেওয়া কালো স্লেটে লেখার পেন্সিল, কিন্তু চক নয়। সরু সরু, সাদা সাদা, বিঘত খানেক লম্বা পেন্সিল। চকের মতো এত ভঙ্গুর নয়, অল্প ঘষটানিতে গুঁড়ো ছড়ায় না। চাটলেও বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভালো সুস্বাদু লাগত। সেই শুরু, তারপর চার বছর ধরে বহুজনের অঙ্ক কষে দিয়ে পেন্সিলের টুকরো দক্ষিণা নিয়েছি। যত কঠিন অঙ্ক তত লম্বা পেন্সিল দক্ষিণা। বাড়ির কাছের পানের দোকানের এক চেনা কাকুর থেকে জর্দার খালি কৌটো নিয়ে তাইতে জমা করে রাখতাম আমার রোজগার। পরে বাণিজ্য আরেকটু বাড়িয়ে আলুর চপ, কয়েতবেল মাখা এসবের বিনিময়েও আঁক কষে দিয়েছি। এখন ভাবলে একটু লজ্জাও করে, আবার মজাও লাগে।
ভাবতে বসলে মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। একটার পর একটা ছবি জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। মনে পড়ে, মুখোমুখি দুটো ইউক্যালিপটাসগাছ খুঁজে নিয়ে তার মাঝের ভিজে মাটিতে গোড়ালি দিয়ে ছোটো ছোটো সাত সাত চোদ্দটা গর্ত খোঁড়া। সেই গর্তের ভেতর চারটে করে কাঁকরদানা দিয়ে এক মজার খেলা। তখন খেলাটার পোশাকি নাম জানতাম না, ‘সাত গর্ত’ বলেই চিনতাম। অনেক পরে জানলাম সেই খেলার নাম, ম্যাঙ্কালা(Mancala)। তারপর খেলতাম পায়ের ওপর পা, হাতের ওপর হাত দিয়ে উঁচু দেওয়াল বানানো, আর দূর থেকে দৌড়ে এসে লাফ মেরে ডিঙনোর খেলা। সে-খেলার নাম ছিল ‘ইচিং বিচিং’।
ইচিং বিচিং চিচিং চা
প্রজাপতি উড়ে যা!
শুধু কি তাই? খেলার উপকরণ তখন চতুর্দিকে। ঝরে পড়া শিমুল ফুলের ভেতরের কেশরগুলো দিয়ে দিব্যি তরোয়ালযুদ্ধ খেলা হত। যার কেশরের মুণ্ডুটা খুলে পড়ে যাবে সেই হেরো। অকারণ দৌড়োদৌড়ি, কুমিরডাঙা, সীতাহরণ, নানারকমের খেলায় টিফিনবেলা কোথা দিয়ে গড়িয়ে যেত।
ক্লাস টু-এর যে বেঞ্চে বসতাম, তার পেছনে ছিল একটা কাঠের গরাদ দেওয়া জানালা। তার নিচের চৌকাঠের মাটিতে ছোটো ছোটো গোল গোল গর্ত। সেই গর্তে থাকত ঘুরঘুর পোকা। একটা কাঠিতে করে সেই গর্তটা খুঁড়তাম আর মন্ত্র আওড়াতাম ‘ঘুরঘুরমাটি চন্দনকাঠি’। ধুলো-মাটি মাখা পোকাটা বেরিয়ে আসত, তাই দেখে আমাদের কী সাংঘাতিক আবিষ্কারের আনন্দ! ক্লাস থ্রি-তে মনে পড়ে এক মাস্টারমশাই ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন। কাঠের টেবলের ওপর লোহার সেফটিপিন, ডাইনে বললে ডাইনে যাচ্ছে, বাঁয়ে বললে বাঁয়ে যাচ্ছে। সেই প্রথম চুম্বক দেখলাম। মনে হয়েছিল যার কাছে একটুকরো চুম্বক থাকে সেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। কত ছোটো ছোটো জিনিস উপকরণ হয়ে উঠত অসীম আনন্দের।
মোরামের রাস্তা টপকে ছুটতে গিয়ে কতবার পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে যেত। ওষুধেরও অভাব ছিল না, হাত খানেক উঁচু ছোট্ট একধরনের গাছের পাতা ছিঁড়লেই টুপ করে বেরিয়ে আসত এক ফোঁটা রস। সেটা কাটা জায়গাতে লাগালেই সাংঘাতিক জ্বলুনি, কিন্তু অব্যর্থ ওষুধ।
একইরকম দেখতে ঝোপের গাছে ধরত ছোট্ট ছোট্ট সেঁকুল ফল। খেতে টোপাকুলের মতো স্বাদ, তবে আরও মিষ্টি। আমার সেই প্রত্যন্ত গ্রামের পাঠশালার সামনে আলুকাবলি, কারেন্ট নুন, ফুচকা কিছুই পাওয়া যেত না, ওসব খাবার তখন চিনতামও না।  সেঁকুল, করমচা, ঘষে ঘষে পেট ফুটো করা ঝিনুকের ছুরি দিয়ে ছাড়ানো কাঁচা আম - এগুলোই ছিল অমৃত সমান।
শেষমেশ একটা মজার ঘটনা বলে দাঁড়ি টানব। নতুন স্কুলে প্রথমদিনেই অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যেমন, টিউবকলের তলায় কীভাবে হাঁ পাততে হয়, মাস্টারমশাইয়ের সাইকেলের কেরিয়ারে কীভাবে বসতে হয় যাতে চাকায় পা না আটকে যায়, নানারকম অ-স্কুলীয় ব্যাপার মাথায় ঢোকাতে পেরে যারপরনাই বিদ্যে বেড়েছে বোধ হচ্ছিল। তবে মাথায় করে যে শুধু ওই জ্ঞানগুলো ছাড়া আরও অনেক কিছু এনেছিলাম সেটা তিনদিন বাদে আমি আর এক হপ্তা বাদে মা টের পেয়েছিল। উকুনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সোজা মাথার চুল সব উড়িয়ে নেড়ু-মুণ্ডু করে দেওয়া হল আমাকে। নতুন স্কুলে সবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না করতেই এহেন নেড়ু অবতার নেওয়ায় পেন্সিলের ব্যাবসা একটু ধাক্কা খেলেও ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগেনি।
আজও ভাবি যদি প্রথমদিন পাঠশালাটায় গিয়ে ভালো না লাগত, যদি ওখানে না পড়ে ওই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটায় যাওয়ার বায়না করতাম, তাহলে অনেক কিছু হারাতাম। চার বছরে সাঁওতালি ভাষা হোঁচট খেয়ে খেয়ে আর উড়িয়া ভাষা গড়গড়িয়ে বলতে পারতাম। আজ যদিও তার কিছুই মনে নেই, তবুও যেন কখনও আনমনে মনে পড়ে যায় অনেক কিছু।
অনুভব করি, সঠিক শিক্ষার জন্য মাধ্যমের কোনও মাহাত্ম্য নেই। বাংলা হোক বা ইংরাজি, শৈশবকে বিকশিত হতে দেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের ভারে, প্রতিযোগিতার নামে, শিশুমনের আনন্দ, উৎসাহ, খেলাধুলো সমস্ত কিছুকে দাবিয়ে দিলে যেকোনও স্কুলই জেলখানা হয়ে উঠতে বাধ্য। সময় বদলেছে, শিক্ষার ধরনধারণ বদলেছে, কিন্তু ছোট্ট মানুষগুলোর মন আগেও যতটা সরল ছিল এখনও ততটাই আছে। আমাদের বড়োদেরই দায়িত্ব তাদের সবুজ মনগুলো কোমল অনুভূতিগুলোকে আগলে রাখা, সে বাড়িতেই হোক বা স্কুলে।
_____

No comments:

Post a Comment