অণুগল্পঃ বশীকরণঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়




ক্লাস ইলেভেনের ফাইনাল পরীক্ষা। শেষ হবে অঙ্ক দিয়ে। পরীক্ষা শুরু হবার ঠিক দশ মিনিট আগে আমার পাশের ডেস্কে এসে বসল আমাদের ক্লাসের বিখ্যাত ছাত্র দেবেশ। গত দু-দুটো বছর ফেল মেরে আমাদের ক্লাসে তৃতীয়বারের জন্য সে ভাগ্য পরীক্ষায় নেমেছে। ডেস্কে বসেই আমায় বলল, “এই যে গুড বয়! সব তৈরি? হুঁ হুঁ বাওয়া, এবার আমাকে কেউ বিট করতে পারবি না দেখিস!”
দেবেশ পারে না হেন কোনও কাজ নেই। অঙ্ক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে আবার কী ভেল্কি দেখাবে কে জানে! আর বসবি তো বস আমার পাশেই? পকেট থেকে কিছু কদাকার শুকনো শিকড়বাকড় বার করে ডেস্কে রেখে ফিসফিস করে বলল, “এই হল বশীকরণ মন্ত্র লাগানো জড়িবুটি। এবার আমার একশোয় একশো পাওয়া কে আটকায় দেখি।”
ইতিহাসের স্যার জীবনবাবু সেদিন গার্ডের ডিউটিতে। প্রশ্ন আর উত্তরপত্র ডেস্কে রাখতেই না রাখতেই দেবেশ উঠে গিয়ে জীবনবাবুর সামনে জোড়হাত করে দাঁড়াল। হাতে জড়িবুটি। স্যার সভয়ে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “এটা কী? মতলবটা কী রে?”
“স্যার, বুড়োশিবতলায় মানত করেছি। বাবার মন্ত্রপূত আশীর্বাদ। এবার পাশ করতেই হবে। রেখে দিই?”
স্যার আপত্তি করলেন না। ডেস্কে ফিরে এসে দেবেশ বিড়বিড় করে বলল, “এবার বশীকরণের জাদু দেখবে বাছাধন।”
পরীক্ষাপত্র বিলি করে কিছুক্ষণের মধ্যে জীবনস্যার টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। বুঝলাম, দেবেশের বশীকরণ কাজ শুরু করে দিয়েছে। দেবেশ পকেট থেকে মোবাইল বার করে সব উত্তর লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দেবেশের কুকীর্তি মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। বেজায় রাগ হল। শেষ ঘণ্টা বাজার ঠিক আধঘণ্টা আগে হেডস্যার পরীক্ষার হলে ঢুকে বললেন, “এ কী জীবনবাবু, আপনি ঘুমোচ্ছেন?”
জীবনবাবু ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, “সরি স্যার, আসলে সকালে ভাতের সাথে কলাইয়ের ডাল আর আলুপোস্ত খাইয়ে দিল বাড়িতে, তাই চোখটা… তবে ওরা খুব ভালো ছাত্র স্যার, গোলমাল করলে আমি ঠিক শুনতে পেতাম।”
রেজাল্ট বেরুল। কোনওমতে কান ঘেঁষে অঙ্কে পাশ করে টুয়েলভে উঠে গেলাম। শুনলাম, দেবেশ আবার ফেল। ওর অঙ্কে শূন্য পাওয়াটা বিস্ময়কর। স্কুল গেটের সামনের গাছতলায় শুকনো মুখে ওকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে, তুই যে সেদিন মোবাইল খুলে টুকছিলি? তাহলে এমন হল কী করে?”
“আর বলিস না। যে সাইট দেখে উত্তর লিখছিলাম, ওটা নাকি বোকা বানাবার এক ঘোস্ট সাইট!”
হাসি চেপে ফিরে আসছি, জীবনবাবু দেখি আমাদের দিকেই হেঁটে আসছেন। দেবেশকে দেখে বললেন, “দুঃখ করিস না বাবা। তিন-তিনবার ফেল করলে স্কুল টিসি তো দেবেই। তবে সেদিন টেবিলে যে জড়িবুটিগুলো রেখেছিলি, সেগুলো বড়ো উপকারি। বায়োলজির অঙ্কিতবাবু বলছিলেন, ওগুলো সুগারের যম। একমাত্র পাহাড়ের দিকেই নাকি পাওয়া যায়। কী বলব বাবা, খেয়ে আমার সুগার একদম নিচে নেমে গেছে!”

_____

1 comment: