গল্পঃ আশ্চর্য আধুলিঃ দেবলীনা দাস



স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের একদম ল্যাজের দিকে এই বেঞ্চটা কেন রেখেছে কে জানে। কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচের এই বেঞ্চটা এত একটেরেーসাধনবাবু আর কাউকে কখনও বসতে দেখেননি। মাঝেসাঝে মনে হয়, তাঁর কথা চিন্তা করেই রেল কোম্পানি ওই বেঞ্চটা ওখানে লাগিয়েছে।
খবরের কাগজটা দিয়ে জায়গাটা একটু ঝেড়েঝুড়ে নিয়ে আয়েস করে হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন সাধন মিত্তির। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্যি, সাধনবাবুর আয়েস করে বসার এই একটাই জায়গা। শনিবার তাড়াতাড়ি অফিস ছুটি হয়। স্টেশনে নেমে বাড়ি না গিয়ে এখানেই ঘন্টা দুই বসেন সাধনবাবু। পেপার পড়েন, কখনও বা দশ টাকা দামের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন। ভ্রাম্যমান চাওয়ালার কাছ থেকে খুদি প্লাস্টিকের কাপে চা খান। আলো পড়ে এলে পেপার পড়া যায় না আর, তখন বসে বসে লোকজন দেখেন। আস্তে-সুস্থে ছ’টা সাড়ে ছ’টা নাগাদ উঠে বাড়ির দিকে হাঁটা দেন।
অভ্যেসবশত একবার ঘড়ি দেখলেন সাধনবাবু। তিনটে পঞ্চাশ। বাড়িতে এখন মিনতির এন্ডিগেন্ডি পড়ুয়াগুলো থাকবে। ক্যাচরম্যাচর লেগেই আছে। কখনও কোনওটার দুষ্টুমি বা পড়ায় অমনোযোগে তিতিবিরক্ত হয়ে ঠাঁই ঠাঁই দু’ঘা বসিয়ে দেয় মিনতি, ভ্যাঁ ভ্যাঁ-র চোটে টেকা দায় হয়ে ওঠে। একেকদিন সাধনবাবুর চশমা লুকিয়ে ফেলে, বই ছেঁড়ে, পেন চিবোয়। মিনতিকে কিছু বলতে পারেন না সাধনবাবু। মেয়ের বিয়ের পর থেকে এই নিয়েই মেতে আছে মিনতি। তাছাড়া মিনতির গলার নামডাক পাড়াময়। কে জানে অঞ্চলময় কি না। মোট কথা, মিনতিকে কিছু বলে পার পাওয়া সাধন মিত্তিরের কম্ম নয়। তাসপত্তর খেলতে পারেন না, ভালোও লাগে না। ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স, সাহিত্য, সিনেমাーকিছু নিয়েই আলোচনা করার মতো জ্ঞানের ভাণ্ডার তাঁর নেই। নিউজ পেপার ঘাঁটেন প্রচুর, কিন্তু এক্সপার্ট ওপিনিয়ন কিছুতেই তৈরি করে উঠতে পারেননি। দুয়েকবার হেড মাস্টারমশাইয়ের বাড়ির আড্ডায় গিয়ে দেখেছেন, আধঘন্টা পর থেকে ঘন ঘন হাই উঠতে থাকে কেবল। হাই চেপে কাঁহাতক হুঁ-হাঁ আর ‘বটেই তো, বটেই তো’ করা যায়। অগত্যা কার্লসন কোম্পানির মেজবাবু সাধন মিত্তিরের স্টেশনের বেঞ্চিই ভরসা।
পেপারটা মেলে আধঘন্টাটাক বসেছেন সাধনবাবু। বেশ একটা মৃদুমন্দ হাওয়া ছেড়েছে, চোখ ঢুলুঢুলু, মন ফুরফুরে হয়ে এসেছে তাঁর। এমন সময় কে একটা না কী একটা পায়ের কাছে খচরমচর করে উঠল। ঝিমুনি কেটে গিয়ে নড়েচড়ে বসলেন সাধনবাবু। বসে দেখলেন, একটা ঢ্যাঙা শুঁটকোমতো লোক সামনে উবু হয়ে বসে বেঞ্চের তলায় তাঁর পায়ের পাশে হাতড়াচ্ছে। ত্রস্ত হয়ে পাদুটো খানিক সরিয়ে নিয়ে সাধনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু খুঁজছেন নাকি ভাই?”
কাকের বাসার মতো একমাথা চুলের নিচ থেকে চকচকে বাদামি একজোড়া চোখ তুলে লোকটি, না না ছেলেটি, নাকি লোকটিই খুব চিন্তান্বিত প্রশ্ন করল সাধনবাবুকে, “একটা পঞ্চাশ পয়সার কয়েন। দেখেছেন নাকি?”
“পঞ্চাশ পয়সার কয়েন? পাওয়া যায় এখনও?” যারপরনাই চমৎকৃত হয়ে সাধনবাবু প্রশ্ন করেন। সঙ্গে উপদেশও জুড়ে দেন উপযাচক হয়ে, “পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে অত টেনশন করার কী আছে? গেলে গেছে, ও আবার অত আঁতিপাঁতি করে খোঁজে নাকি?”
লোকটা মহা বিরক্ত হয়ে বলে, “দেখেননি তো বলে দিলেই হয়! জ্ঞান দিতে কে বলেছে? জানেন ওটা আমার ফুলপিসিমার স্মৃতিবিজড়িত কয়েন? তাও আবার এমনি কয়েন নয়, ম্যাজিক কয়েন! উফ্‌, কে জানে ট্রেনের মধ্যেই পকেট থেকে পড়ে গেল কি না। কী গেরোয় পড়লাম রে বাবা!” লোকটা মাথা চুলকোতে চুলকোতে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা লাগাল স্টেশনের জমজমাট দিকটায়।
পিসির স্মৃতিবিজড়িত কয়েন, তাও আবার পঞ্চাশ পয়সার! লোকটার মাথার অন্তত খান কয়েক স্ক্রু ঢিলে। সাধনবাবু আবার ডুব দিলেন পেপারে এবং অচিরেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলেন। সে ঘুম ভাঙল একেবারে পাঁচটা পাঁচের ট্রেন ঢোকার আওয়াজে। নাহ্‌, আজ আর দেরি করা যাবে না। মিনতি বড়ি না বিউলির ডাল কী একটা নিয়ে যেতে বলেছে। সে আবার গঙ্গা ভাণ্ডারের জিনিস ছাড়া চলবে না। টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে যাবেন অতএব। একটা আড়মোড়া ভেঙে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যাবেন, প্ল্যাটফর্মের একেবারে ধারের দিকে একটা ভাঙা পাথরের খাঁজে কী যেন চকচক করে উঠল পড়ন্ত রোদ লেগে। কিছুটা কৌতূহলবশতই এগিয়ে গিয়ে জিনিসটা তুলে নিলেন সাধনবাবু। ও মা, এ তো সত্যি সত্যিই একটা পঞ্চাশ পয়সার কয়েন!
ম্যাজিক কয়েন কি না বোঝা গেল না, তবে বড্ড চকচকে জিনিসটা। রুপোর মতো, আবার ঠিক রুপোও নয়। অদ্ভুত একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু সে ব্যাপারটা ধরি ধরি করেও ধরা যাচ্ছে না। পয়সাটাকে দু’আঙুলে একটু ঘষে দেখলেন সাধনবাবু। হেই! একটা চিড়িক করে মিনি শকের মতো লাগল মনে হল! চমকে ওঠায় হাত থেকে কয়েনটা পড়েই গেল। তোলার পরে আরেকবার আঙুল দিয়ে ঘষলেন সাধনবাবু। কিন্তু এবার কিছুই হল না। মনের ভুল, বোঝাই যাচ্ছে। সাতপাঁচ ভেবে কয়েনটা পকেটে রেখে দিলেন সাধনবাবু। কাল বড়পিসিকে দেখতে যাওয়ার আছে। লোকটাকে কাল যদি আবার দেখেন এখানে, তাহলে ফেরত দিয়ে দেবেন।

দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে আটটার ঘন্টা বাজল। সাধনবাবু ইজিচেয়ারে শয়ান ছিলেন। চোখটা আরও চেপেচুপে বন্ধ করে ফেলে গভীর ঘুমের ভান করলেন। হাওয়া ভালো নয় মোটে। গঙ্গা ভাণ্ডার থেকে ঠিক কী আনতে হবে মনে না পড়ায় বিউলির ডাল আর বড়ি, দুটোই নিয়ে এসেছিলেন তিনি। মানে সেফ সাইডে থাকা আর কী। তা দেখা গেল দুটোর কোনওটারই প্রয়োজন ছিল না, বাড়িতে বাড়ন্ত বস্তুটির নাম বেসন। সাধনবাবু একবার মিনমিন করে বলতে গিয়েছিলেন, “তা বেগুনি আজ না করলেই তো হয়। আজ বরং একটু আলু-ফুলকপি ভাজা, কালোজিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে...” মিনতির আগুনঝরা দৃষ্টিতে মনে হয় কেবল ব্রহ্মতেজ-টেজের অভাব ছিল, তাই আজ সাধন মিত্তির ভস্মীভূত হয়ে যাননি। রান্নাঘর থেকে গজগজ আর বাসনের ঠোকাঠুকি এখনও শোনা যাচ্ছে। ঐ হেঁশেলের দরজায় ঝনাৎ শেকল পড়ল। এবার মিনতি সিরিয়াল দেখতে আসবে। মরা মানুষকে যেমন নাকি ভালুক ছোঁয় না, তেমন হয়তো ঘুমন্ত স্বামীকে মিনতি রেহাই দেবেーএই আশাটুকু সম্বল করে সাধনবাবু প্রাণপণ ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।

*****

“মন্ত্রীমশাই! ও মন্ত্রীমশাই! এই যে, মন্ত্রীমশাই!”
ধড়মড় করে উঠে বসে এদিক ওদিক চেয়ে সাধনবাবু চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিলেন আরেকটু হলে। চেয়ার মানে তাঁর ইজিচেয়ার নয়। সিংহাসনমতো কী একটা গদি আঁটা জিনিস। তাঁর আটপৌরে বসার ঘরটি কোন জাদুবলে হিরেমাণিক বসানো সোনালি দেওয়ালের রাজসভায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর চারপাশে হোমরাচোমরা মুকুট-কুণ্ডল পরা সব লোকজন, সামনে সিংহাসনে ভুঁড়িওয়ালা এক রাজামশাই বসে ভারি বিরক্ত মুখে গোঁফে তা দিচ্ছেন। আর বাকি সব লোকজনরা, তারা মুখে হাতচাপা দিয়ে খিকখিক করে হাসছে। এমনকি রাজার দু’পাশে দাঁড়ানো চামর দোলানোর লোকগুলোও।
ভারি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সাধনবাবু চোখ কচলে নিতে যাবেন সবে, রাজামশাই তারই মধ্যে একখান হাঁকাড় পাড়লেন। “বলি মন্ত্রীমশাই, কাজের কথার মধ্যে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন যে বড়ো? অ্যাঁ? কখন থেকে ডাকছি, কিছু কানেই যাচ্ছে না!”
সাধনবাবু আপাদমস্তক থরথর করে কেঁপে-ঝেঁপে অস্থির তখন। বহু কষ্টে হাতজোড় করে প্রশ্ন করতে পারলেন, “আজ্ঞে, আ-আ-আমাকে বলছেন?”
সভাসদদের খিকখিক হাসি হো হো হয়ে উঠবে উঠবে করছে, রাজামশাই আবার গর্জন করলেন, “চোপরাও সব! পাঠশালের পড়ুয়াদের মতো সব বিষয়ে মশকরা না করলে হচ্ছে না? হ্যাঁ মন্ত্রীমশাই, আপনাকে বলছি। শরীর খারাপ নাকি আপনার? অসুস্থ বোধ করছেন?”
‘রীতিমত অসুস্থ বোধ করছি,’ বলতে গিয়েও সাধনবাবু বলার সাহস করে উঠতে পারলেন না। ঘাড় যথাসম্ভব ঝুঁকিয়ে করজোড়ে বললেন, “আজ্ঞে, আপনার দয়ায় শরীর ভালোই আছে হুজুর।”
রাজা খানিক ঘাড় বাঁকিয়ে সাধনবাবুকে দেখলেন। তারপর বললেন, “তা এই বিষয়ে আপনার মতামত ব্যক্ত করুন একটু, শুনি। আপনি কী বলেন, কী করা উচিত?”
সাধনবাবু আবার খাবি খেলেন। কী বিষয়ে মতামত দিতে হবে সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। মাথা চুলকোতে গিয়ে দেখেন মাথায় ইয়াব্বড় এক পাগড়ি, সেটা থেকে আবার মুক্তোর মালা-টালা কীসব ঝুলছে। উষ্ণীষ বুঝি একেই বলে?
রাজামশাই ক্রমে ক্রমে ধৈর্য হারাচ্ছিলেন। আবার ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন বলুন, দিগনগরের রাজাকে কি যুদ্ধে আহ্বান জানানো উচিত হবে?
এক ছোকরা সভাসদ কোথা থেকে লাফিয়ে উঠল। বলল, “অবশ্যই উচিত হবে, মহারাজ। দিগনগরের রাজা ব্যাটা অর্বাচীন, মহারাজকে অপমান করে...”
রাজামশাই আবার গর্জে উঠলেন। বললেন, “আপনাকে জিজ্ঞেস করেছি? অ্যাঁ?”
সাধনবাবু মহাবিস্ময়ে লক্ষ করলেন, ছোকরাকে একদম নতুন জুনিয়র ক্লার্ক ফক্কর অতনুর মতো দেখতে।
রাজামশাই আবার সাধনবাবুর দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। কেমন হেড মাস্টারমশাই গোছের হাবভাব রাজার। আর দেরি না করে সাধনবাবু পড়া বলতে শুরু করলেন অগত্যা। যস্মিন দেশে যদাচার। “আজ্ঞে, আমার মতে যুদ্ধ-টুদ্ধ মোটে ভালো ব্যাপার নয় আজ্ঞে। দু’পক্ষেই প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি-টতি, প্রাণহানি-টানির সম্ভাবনা থাকে আর কী। প্রজাদের অকারণ কষ্ট। ক্ষেতখামারে, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগবে, ভাঙচুর হবে। খাওয়াপরার জিনিসপত্তরের খামোখা দাম-টাম বেড়ে যাবে। দিগনগরের রাজা অধম, মহারাজ কেন তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের নামযশ জলে দেবেন! মহারাজ প্রজার মাঈবাপ, মানে পিতৃমাতৃতুল্য, প্রজার যাতে মঙ্গল হয়, মহারাজের তাই করা উচিত।”
এতখানি ভাষণ আজ অবধি কখনও কোথাও দেননি সাধন মিত্তির। প্রয়োজন পড়েনি। পারেন বলেই জানতেন না। নিজের বক্তৃতায় নিজেই চমৎকৃত হচ্ছেন, তখন দেখলেন রাজামশাইয়ের চোমরানো গোঁফের নিচে ঝিকিমিকি করছে একফালি হাসি। সুরুত করে হাসিখানাকে আড়াল করে ফেলে রাজা বললেন, “উত্তম বলেছেন। ঠিক আছে, আপনাদের সবার মতামত শুনলাম। একটু বিবেচনা করি। আপনারা আজ আসুন সবাই, কাল এ নিয়ে আলোচনা করব আবার।”
সভা ভঙ্গ হওয়ায় সাধন মিত্তির আবার মুশকিলে পড়লেন। এবার তিনি যান কোথায়। সভাঘরের বাইরে বিশাল মাঠ, বাগান। সেখানে এদিক ওদিক ইতিউতি হাঁটছেন। কোমরে আবার একখানা তরোয়াল বাঁধা। সেটা এমন ভারী, হাঁটতে গিয়ে তাঁর কোমর বেঁকে যাচ্ছে। হঠাৎ দেবদূতের মতো এসে উদয় হল একটা অল্পবয়সী ছেলে। বলল, “মন্ত্রীমশাইয়ের কি আজ শরীরটা ভালো নেই?”
সাধন কী উত্তর দেবেন ভাবতে ভাবতে ছেলেটা আবার বলে উঠল, “রাজামশাই বললেন, ওরে তারক, মহামন্ত্রীর শরীরটা আজ জুতের নেই, তাঁকে একটু তাঁর মহলে পৌঁছে দিয়ে আয়। আপনাকে ধরে নিয়ে যাব আজ্ঞে? তলোয়ারখানা ধরব নাকি, হাঁটতে কষ্ট পাচ্ছেন বোধ হচ্ছে!”
সাধনবাবু বাক্যহারা হয়ে তারকের পিছু পিছু সুবিশাল মন্ত্রীমহলের দিকে এগিয়ে গেলেন। খুব শিগগিরি এই আজব দেশ থেকে বেরোনো যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

সাধনবাবু মনে মনে প্ল্যান করেছিলেন চুপচাপ চোরের মতো মহলে সেঁধিয়ে এককোণে বসে থাকবেন, বসে বসে পলায়নের পরিকল্পনা ভাঁজবেন। কাল আবার রাজসভা বসার আগেই পালাতে হবে যে করেই হোক। তা তারক ছেলেটা সেসব হতে দিলে কই! দরজার পাল্লা এঁটে হুমদো দুই দারোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের গম্ভীর গলায় হুকুম করলে, “হৃদয়হরণকে ডেকে আনো এক্ষুনি, মহামন্ত্রী বিশ্রাম করতে ইচ্ছা করেছেন।”
তড়িঘড়ি সেলাম বাজিয়ে তারা দু’জন তক্ষুনি দৌড় লাগাল ভেতরের দিকে। সাধন মিনমিন করে বলতে গিয়েছিলেন, ‘থাক না বাপু, আবার হৃদয়-টিদয়কে নিয়ে কেন টানাটানি? বিশ্রাম করতে গেলে আবার লোকজন লাগে নাকি বাবা!’ তারপর ভাবলেন, লাগে হয়তো। রাজাগজার ব্যাপার, কে বলতে পারে!
তা হৃদয় লোকটা দেখা গেল নিরীহমতো। মন্ত্রীমশাইয়ের খাস চাকর বোধহয়। রুপোর থালায় জল ঢেলে সাধনবাবুর কেঠো পা ধুইয়ে ভেলভেট না কীসের একটা চটিমতো পরিয়ে দিল। আজীবন টিউকল চেপে জুতোসমেত পা ধোওয়ায় অভ্যস্ত সাধনবাবু এমন ঘাবড়ে গেলেন, যে হাত-পা আবার কাঁপতে শুরু করল। তারপর যখন থালা-রেকাব বোঝাই করে তিনটি দাসী মিলে লুচি-মোহনভোগ-মিষ্টি নিয়ে এল, তখন গাওয়া ঘিয়ের গন্ধে তাঁর প্রায় হার্ট ফেল হতে বসল বলা চলে। ঘিয়ে ভাজা লুচির কথা সাধন মিত্তিরের মতো লোকজন শুধু গল্পেই পড়ে থাকেন। বাড়িতে আগে ডালডায় লুচি ভাজা হত, এখন হয় সাদা তেলে, তাও গুনেগেঁথে চারটের বেশি জোটে না। হাপুসহুপুস ছ’-সাতখানা গলাধঃকরণ করার পরে আর পারলেন না অবশ্য। ছাপোষা বাঙালির পেটে কত আর ঘি সয়। এমন মুখ মেরে গেল, যে মিষ্টি আর খেতে ইচ্ছেই করল না।
হৃদয়হরণ লোকটা এতক্ষণ চুপচাপ পেছনে দাঁড়িয়েছিল। এবার একটা রুপোর কেটলিমতো জিনিস আর একটা পাত্র নিয়ে এগিয়ে এসে সাধনবাবুর হাত ধোওয়াতে এল। সাধনবাবু চিরাচরিত অভ্যেসে বেসিন-বাথরুম গোছের কিছু খুঁজছিলেন, অবাক হওয়ারও অবকাশ পেলেন না। সুদৃশ্য একখানা কাপড়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে ভাবছিলেন, আনকোরা নতুন জামাই হিসেবে শ্বশুরবাড়িতেও তাঁর এত খাতিরদারি হয়নি। তখন কানে এল হৃদয়হরণ মিহি গলায় শুধোচ্ছে, “এখন শরীরটা একটু ভালো লাগছে, কর্তামশাই?”
রাতারাতি মন্ত্রী হয়ে যাওয়া সাধন মিত্তির একখানা ঢোঁক গিলে গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, “অ্যাঁ, মানে হ্যাঁ, শরীর ভালো আছে। শরীর খারাপের ব্যাপার নয়।”
তাঁকে অবাক করে দিয়ে হৃদয়হরণ উত্তর করলে, “সে আমি আগেই বুঝেছি আজ্ঞে। ব্যাপার শরীরের নয়, মনের। তবে কিনা ঐ তারক হল রাজবাড়ির লোক, ওর সামনে ঘরের খবর বেশি ভেঙে বলা উচিত নয় বলে কিছু বলিনি।”
সাধন মিত্তির আবার অবাক হলেন। মিনিট খানেক হাঁ করে থেকে তারপর বললেন, “মনের ব্যাপার মানে?”
এবার হৃদয় একটু অপ্রস্তুত হল যেন। মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে, ঐ আপনি কর্তাদাদাদের ব্যাভার নিয়ে মনোকষ্টে ভুগছেন, তাই আর কী। মাফ করবেন কর্তা, ছোটো মুখে বড়ো কথা বলে ফেলেছি আজ্ঞে।”
কর্তাদাদা ব্যাপারটা আবার কী? ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক সাধন মিত্তির হাত নাড়িয়ে বলেন, “আরে না না, ও ঠিক আছে।”
হৃদয় এবার একটু সহজ হয়। গলা নামিয়ে বলে, “কর্তা, বড়গিন্নিমা আবার ছোটদাদাকে পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা দিয়েছেন। তিনি পায়রা কিনবেন, পায়রা ওড়াবেন। বড়দাদা জানতে পারলে তিনিও টাকা চেয়ে অশান্তি করবেন এখন। একখানা ভালো ঘোড়ার সন্ধান পেয়েছেন, সেটা না কিনলেই নাকি তাঁর হচ্ছে না।”
অ, কর্তাদাদাগুলি তাইলে মন্ত্রীর বখে যাওয়া পুত্রসন্তান! ভয়ের চোটে সাধন মিত্তিরের হেঁচকি উঠতে লাগল। বিপথে চলে যাওয়া জোয়ান ছেলেদের কী করে বাগে আনতে হয় তার বিন্দুমাত্র জ্ঞান তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নেই। বাস্তব জীবনে তিনি একটি কন্যার জনক। সে মেয়ে বড়ো লক্ষ্মী। একটু বড়ো হওয়ার পর থেকে সে সাধনবাবুর প্রায় মাতৃসমা হয়ে বসেছিল। তার বিয়ে হয়ে যাওয়া থেকে সাধনবাবু অনাথ হয়ে গেছেন।
মেয়ের মুখখানা মনে পড়ায় সাধনবাবুর চোখ ফেটে জল আসতে চায়। মনে মনে বলেন, ‘দেখ তো রে মা, কী ঝামেলায় আমি পড়েছি! বুড়ো বয়সে কোথাকার মন্ত্রী হয়ে বসেছি। তার আবার দুখানা ছেলে, ওই পাশের বাড়ির পল্টুর মতো বড়োলোকের কুসন্তান। কী করে এখান থেকে ছাড়া পাই বল তো এখন! তোকে, তোর মাকে কি আর কোনওদিন দেখতে পাব না?’
না না, যে করেই হোক এখান থেকে বেরোতে হবে। সোনার থালায় ঘিয়ে ভাজা লুচি-মোহনভোগ খাওয়া-টাওয়া খুব ভালো কথা, কিন্তু রাজকার্যে সাহায্য করতে গেলে, মন্ত্রী হয়ে মন্ত্রণা দিতে হলে যে বুদ্ধির দরকার তা তাঁর পেটে নেই। অতএব চোখ-টোখ পাকিয়ে তিনি হৃদয়কে বলেন, “আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, এখন তুমি যাও হৃদয়। দরজাখানা টেনে বন্ধ করে দিয়ে যাও, আমায় যেন কেউ বিরক্ত না করে। সদর দরজার সামনে থেকে ওই ষণ্ডাদুটোকে নিয়ে এসে পাহারায় বসাও বরং। কাউকে ঢুকতে দেবে না। আমি এখন, অ্যাঁ, হ্যাঁ, যুদ্ধবিষয়ক চিন্তা করব।”
হৃদয় মাথা হেলিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, “ও, কর্তামশাই, বলছি কী, মেজগিন্নিমার পানের বাটাখানা হারিয়ে গেছে। সেই থেকে তিনি কেঁদে সারা হচ্ছেন, সকাল থেকে কিচ্ছু খাচ্ছেন না। রাঁধুনি বামনি বললে আপনাকে বলতে।”
মেজগিন্নিমা? এই একটু আগে বড়গিন্নিমার কথা কী বলল না? হা কপাল, মন্ত্রীর গিন্নি কি একাধিক নাকি? এ কী সাড়ে সর্বনাশ হল সাধন মিত্তিরের? একা মিনতিকেই তিনি আজ আঠাশ বছরে এঁটে উঠতে পারেননি, এখানে দু-দু’জন গৃহিণী!
কম্পিত গলায় সাধন মিত্তির বললেন, “দেখো হৃদয়, এসব গেরস্থালীর তুচ্ছ ব্যাপারে আমাকে একদম বিরক্ত করবে না বলে দিলুম। দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে চলে যাও। কাউকে আসতে দেবে না। তুমিও পাহারা দাও, যাও।”
হৃদয় আবার করজোড়ে মাথা হেলায় এবং চলে যেতে যেতে আবার দাঁড়ায়। বলে, “ও, কর্তামশাই। বলছি ছোটগিন্নিমা একবার বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছে করেছেন। আপনার সঙ্গে একবার কথা বলতে চেয়েছেন। আসতে বলব এখন?”
ছোটগিন্নিমা! সাধন মিত্রের গায়ে ঘাম ছোটে, বুকে লাবডুব দ্রুত হয়। প্রেশার বাড়িয়ে ছাড়বে এরা! হাত নেড়ে ক্ষীণ গলায় তিনি বলেন, “কাউকে আসতে দেবে না। দরজার বাইরে খান দশেক দারোয়ান বসাও। গিন্নিমাদের সবাইকে বাপের বাড়ি দিয়ে এসো আজকেই।”
হৃদয়হরণ কিন্তু কিন্তু করতে থাকে। ইঁদুরের হুঙ্কারের মতো স্বরে সাধনমন্ত্রী বলেন, “বললাম না যেতে! যা-আ-আ-ও!”
দরজা বন্ধ হতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সাধনবাবু। তারপর ভাবেন, সাবধানের মার নেই। ভেবে দরজার দশমনি হুড়কোখানা আটকে দিয়ে এসে পালঙ্কে আধশোয়া হয়ে চিন্তা করতে থাকেন কীভাবে এই রূপকথার দেশ থেকে পালানো যায়। মন্ত্রীবুড়োর কলজের জোর আছে বাবা, তিনখানা তার বৌ। তাঁর অত শখ নেই। মানে মানে বাড়ি ফিরে যেতে পারলে বাঁচেন। নির্ঘাত ওই ম্যাজিক কয়েনের কাণ্ড এসব। ইস, কী কুক্ষণে যে ওটাকে ছুঁতে গেছিলেন! ভাবতে ভাবতে সাধনবাবুর চোখ লেগে আসে আবার।

“বলি গোটা সন্ধেটা তো পড়ে পড়ে ঘুমোলে, এবারে উঠে রাতের খাবারটা গিলে আমাকে উদ্ধার করো, আমিও একটু শুতে পারি তাহলে গিয়ে!”
চেনা ঝঙ্কারে চোখ খুলেই লাফ দিয়ে উঠে বসেন সাধনবাবু। না বাবা, সোনালি দেওয়াল-টেওয়াল নয়, এ তাঁর রঙচটা মধ্যবিত্ত বৈঠকখানা। একবার চোখদুটো তাও ভালো করে কচলে নেন তিনি। নাহ্‌, চলে যায়নি, এই তো আছে। বিয়ের সোফা জামা চড়িয়ে চলনসই করে রাখা, তক্তপোশে বিছানা পাতা, উপরে দুটো কুশন দিয়ে ভদ্রস্থ বসার জায়গা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সেন্টার টেবিলটা নড়বড় করছে ক’দিন হল, নতুন কিনতেই হবে মনে হয়। টিভিতে দাদাগিরি না কী একটা চলছে, হাততালিতে ফেটে পড়ছে দর্শকরা। ক্যালেন্ডারের পাশ থেকে একটা টিকটিকি উঁকি দিয়েই সরে পড়ল আবার।
একবার মাথায় হাত বোলালেন সাধনবাবু। নাহ্‌, উষ্ণীষ না কী ওটা নেই আর। তাঁর সাধের চারগাছি চুল ঘুমের মধ্যে কখন ঘেঁটে এদিক থেকে ওদিক হয়ে গেছে। উঠে একটু এক্সপেরিমেন্টালি হেঁটে-চলে দেখে নেবেন ভাবেন তিনি। কোমরে তরোয়ালটা না থাকায় ভারি ফুরফুরে লাগছে। জাব্বাজোব্বা জামাগুলোও ভারি অসুবিধের ছিল। ফতুয়ার মতো আরাম রাজবেশে নেই বাবা।
হেঁটে শো-কেসটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন সাধনবাবু। শো-কেসে কিছু বইপত্তর, তার মধ্যে মুনাইয়ের কলেজের বইও দেখতে পেলেন কিছু। খয়েরি প্লাস্টিকে মলাট দেওয়া, গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে নাম লেখা। বড়ো গোছানো, লক্ষ্মী মেয়ে মুনাই। নিচের দুটো তাক মিলিয়ে তিনটে ছবি সস্তার ফ্রেমে লাগানো। তাঁদের বিবাহের অব্যবহিত পরবর্তী সাদাকালো যুগল ছবি, মুনাইয়ের অন্নপ্রাশনের ছবি আর একখানা মুনাইয়ের বিয়ের, বরের পাশে সলজ্জ নবপরিণীতা বধূবেশে। বুকের কোথায় যেন ভালোবাসা চিনচিন করে ওঠে। রান্নাঘরের ঠুংঠাংকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন, “হ্যাঁ গো, মুনাই ফোন করেছিল আজ?”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে কীসের একটা ঢাকা দেওয়া বাটি টেবিলে রাখেন মিনতি। আঁচলে হাত মুছে উত্তর করেন, “করবে না কেন? রোজই তো দু’বার করে করে। কেন, জিজ্ঞেস করছ কেন?”
মাথা নেড়ে হেসে সাধনবাবু বলেন, “না না, এমনি। তা সব ভালো আছে তো ওরা? কালকে রোববার তো বড়পিসিকে দেখতে যাচ্ছি, পরের রোববার আসতে বলো না ওদেরকে, মেয়েটাকে দেখিনি কতদিন।”
মিনতি একটু অবাক হন। বলেন, “তা না হয় বললাম, কিন্তু কতদিন দেখোনি কী বলছ? এই তো আগের সপ্তায় মেয়ে-জামাই ঘুরে গেল! ভুলে গেলে নাকি?”
আটাশ বছরের বিবাহিত স্বামীর চোখমুখ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেন মিনতি। কী দেখেন কে জানে। জিজ্ঞেস করেন, “তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
সাধনবাবু আবার মাথা নাড়েন। হেসে বলেন, “শরীর দিব্যি ভালো আছে। এত ভালো অনেকদিন লাগেনি।”
মিনতির বোকা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে খেয়াল পড়ে না সাধনের। আলো জ্বেলে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে তিনি বলেন, “ভাত বাড়ো দেখি, ভয়ানকরকম খিদে পেয়েছে।”

পাতলা মুসুর ডাল দিয়ে ভাত মেখে তৃপ্তি সহকারে হাত চেটে চেটে খান সাধন মিত্তির। টাকরায় শব্দ তুলে বলেন, “আহ্‌ মিনতি, আলু-ফুলকপি ভাজাটা যা হয়েছে না! আর একটু আছে নাকি? আরে আবার তোমার ভাগেরটা দিয়ে দিও না। মনে আছে, মুনাই যখন ছোটো ছিল? কোনও রান্না আমার, মুনাইয়ের বা বাবার ভালো লাগলে তুমি নিজের ভাগটা অবধি আমাদের তুলে দিতে? আমার মনে আছে।”
মিনতি উদ্যত চামচে আলু-ফুলকপি তুলে হাঁ মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন। মনে আছে মানে? মানুষটা খেয়াল করেছে কোনওদিন, তাই তো জানতেন না তিনি।
সাধন খেয়াল করেন না এসব। থালার শেষ আলু-ফুলকপিটুকু মুখে চালান করে তিনি বলেন, “আহ্‌! কোথায় লাগে গাওয়া ঘিয়ের লুচি! দাও দাও মিনতি, দাও আরও দু’চামচ।”
মিনতি দিতে যাচ্ছিলেন। আবার আটকে যায় হাত। বলেন, “আ মরণ! কোথায় আলু-ফুলকপি ভাজা, আর কোথায় ঘিয়ে ভাজা লুচি! আর ঘিয়ে ভাজা লুচি কোথায় খেলে গো তুমি? হ্যাঁ?”
অমৃতের স্বাদ নিতে নিতে রহস্যময় হাসেন সাধনবাবু মিনতির দিকে তাকিয়ে। উত্তর করেন না। উলটে বলেন, “ঐ বাটিতে ওটা কী? আলু-বড়ি দিয়ে পোনা মাছের ঝোল নাকি? আ-হা-হা-হা। তোমার হাতের রান্নার স্বাদ দিনে দিনে আরও চমৎকার হচ্ছে, মিনু!”
মিনতির রান্নাকে সাধন খারাপ বলেননি কখনও। কিন্তু এমন ভূয়সী প্রশংসাও তো করেননি কোনওদিন! আজ কী যে হল লোকটার! মিনতি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়েন চেয়ারে। অকারণ আবার জিজ্ঞেস করেন, “হ্যাঁ গো, তোমার শরীরটা কি খারাপ লাগছে নাকি? মেয়েকে ফোন করে আসতে বলব?”

“ও মা, দুটো পয়সা দাও না মা! ও মা!”
হাতের কাজকর্ম সেরে সব গুছিয়ে রেখে সবে পেপারখানা নিয়ে শুতে গিয়েছিলেন মিনতি। বুড়ির ডাকে উঠে বসলেন। সংসারের আর পাঁচটা জিনিসের মতো এই ভিখারিণীও তাঁর নিত্যদিনের। দু’দিন না এলে চিন্তাই হয় একরকম।
“একটু শোওয়ার জো নেই বাবা!” স্বভাবসিদ্ধ গজগজ করতে করতে খুচরো পয়সার বাটিখানা হাতড়ান মিনতি। বলবে দু'পয়সা, কিন্তু পাঁচ টাকার কমে ছোঁবে না বুড়ি। একমুঠো কয়েন তুলে চোখ কুঁচকে দেখেন তিনি। কে জানে ক’টা কী পয়সা, চশমাটা পরা হয়নি তো এখনও। যাক গে, দুটো বেশি টাকা ভিখারিকে দিলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পয়সাগুলো বুড়ির হাতে দেন মিনতি। বলেন, “এই নাও, ধরো।”
বুড়ি রোজকার স্বভাবমতো নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখে পয়সাগুলো। পাঁচ টাকার বেশি হয় বোধহয় গুনতিতে, ফোকলা মুখে হাসি ফোটে। মিনতি পর্দা সরিয়ে ঘরে যাচ্ছিলেন আবার; হাসিমুখেই বুড়ি একটা কয়েন বাড়িয়ে ধরে। “পঞ্চাশ পয়সা দেছো মা? ও কেউ নেয় না আজকাল, জানো না?”
দিব্যি জানেন মিনতি। পঞ্চাশ পয়সা নাকি এটা? এল কোত্থেকে? তুলে চোখের কাছে ধরেন মিনতি। হবে হয়তো। কেমন চকচক করছে। নির্ঘাত মুনাইয়ের বাবার পকেট থেকে নেওয়া পয়সাগুলোর মধ্যে ছিল। তালকানা মানুষ, তায় আবার কাল থেকে কেমন অদ্ভুত ব্যবহার করছে, কে একটাকা দু’টাকার জায়গায় গছিয়ে দিয়েছে পঞ্চাশ পয়সা আর কী! ভাবতে ভাবতে আনমনা দু’আঙুলে কয়েনটাকে ঘষেন মিনতি এবং চমকে গিয়ে ফেলে দেন কয়েনটাকে। একটা পুঁচকে মতো শক লাগল যেন!
কয়েনটাকে মেঝে থেকে তুলে চোখের সামনে এনে দেখেন মিনতি। চোখে চশমা নেই, কিছুই বুঝতে পারেন না। আরেকবার ঘষে দেখেন, কই কিছু বোঝা গেল না তো! কয়েনটাকে বাটিতে ফেরত পাঠান না মিনতি। কিন্তু কী ভেবে বাজে কাগজের ঝুড়িতেও ফেলেন না সেটাকে। ড্রেসিং টেবিলের এককোণে কয়েনটা রেখে দিয়ে আবার খাটে শুয়ে পড়েন মিনতি। চশমা চোখে লাগিয়ে পেপারখানা ধরেন বটে নাকের সামনে, কিন্তু খবরে মন বসে না। মুনাইয়ের বাবার কেমন কেমন ভাবটা আজও কাটেনি। সকালবেলা ডাঁটাচচ্চড়ি খেয়ে প্রায় আনন্দাশ্রু ফেলতে ফেলতে, মিনতির হাতের রান্নার গুণ গাইতে গাইতে, গুনগুন গান গাইতে গাইতে তিনি গোবিন্দপুরবাসী বড়পিসিমার বাড়ির পানে রওনা দিয়েছেন। মিনতি এমন চিন্তায় পড়েছেন যে মেয়েকে ফোন পর্যন্ত করেছিলেন। তা মেয়েটা বিয়ের পরে এমন পাকা হয়েছে, সে কোনও পাত্তাই দিলে না! হি হি করে হাসতে হাসতে কথাই বলতে পারছিল না সে। শেষে বহুকষ্টে কী ক’টা কথা বলল, হ্যাঁ, “বুড়ো বয়সে গিয়ে আবার করে রোম্যান্স জাগে গো মা! এই সুযোগ, সেকেন্ড হানিমুনে ঘুরে এসো এবার! ওহো, তোমাদের তো ফার্স্ট হানিমুন। বিয়ের পর তো যাওইনি কোথাও! একদম প্রথমবার আর কী, হি হি!” মিনতি রেগেমেগে ঠক করে ফোন রেখে দিয়েছেন। এসব ফাজলামি তাঁর একদম হজম হয় না। মেয়েটা অবধি সিরিয়াসলি নিল না! কী যে করেন তিনি! পিসিমার বাড়ি তাঁরও সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল কি? রাস্তাঘাটে হারিয়ে-টারিয়ে যাবে না তো রে বাবা? সন্ধেবেলা ফিরলে পরে ভোলা ডাক্তারের কাছে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবেন নাকি একবার? ভাবতে ভাবতে কর্মক্লান্ত মিনতির চোখ লেগে আসে।

*****

“মামিমা! মামিমা!”
“কে, কে রে, কে ডাকে?” জড়ানো গলায় জবাব দেন মিনতি। তারপরেই টং করে মাথায় তাঁর বিপদঘন্টি বাজে। সত্যিই তো, ডাকবেটা কে? ঘরে তো তিনি একা!
ধড়মড় করে উঠে বসতে যান মিনতি। কাজটা মোটে সহজ হয় না। সিল্কের শাড়ি পরে সাটিনের বেড কভারের ওপর উঠে বসা কি মুখের কথা নাকি? তাও কোনওরকমে উঠে বসেন মিনতি। উঠেই চোখ পড়ে তাঁর হাতজোড়া বালা-কঙ্কণ-চুরগুলোর দিকে। যে শাড়িখানা তাঁর পরনে, সেরকম দামের শাড়ি তিনি নিজের মেয়ের বিয়েতেও পরতে পারেননি। কী ক্যাটকেটে রঙ, ম্যা গো! সিরিয়ালের হিরোইনদের মতো জমকালো শাড়ি-গয়না পরে তিনি ভাতঘুম কেন দিচ্ছেন সেটাই মাথায় ঢুকতে চায় না তাঁর। খানিক হাঁ করে থাকেন তিনি। আরও থাকতেন। বাদ সাধে সামনে থেকে ভেসে আসা মিষ্টি গলা, “মামিমা!”
স্বামীর এটি কোন ভাগনি সেটা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন মিনতি। কিন্তু অচিরেই তিনি বুঝতে পারেন, অল্পবয়সী মেয়েটি তাঁকে মামিমা নয়, রানিমা বলে ডাকছে। চোখে পড়ে ঝলমলে দেওয়াল, তার কোথাও নোনা ধরে পলেস্তারা খসে পড়ছে না, কোথাও তার গায়ে গয়নার দোকানের বাংলা ক্যালেন্ডার লাগানো নেই, নেই তাঁর স্বর্গত শ্বশুর-শাশুড়ি, তাঁর মায়ের প্লাস্টিকের ফুলে সাজানো ফোটো। পালঙ্কখানা, না খাট নয়, এ পালঙ্কই হবেーফুটবল মাঠের মতো বিশাল। বাবা গো, এ আবার কী ব্যাপার! চোখ কচলে নেন তিনি ভালো করে। কিন্তু সোনার মহল, সোনার খাট-পালঙ মিলিয়ে যায় না হাওয়ায়, সেখানেই থাকে।
মিনতি ঘাবড়ে যান বটে, কিন্তু কার্লসন কোম্পানির মেজবাবুর চাইতে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি কিছু বেশি হওয়ায় তিনি নিজেকে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি গুছিয়ে তুলতে পারেন। সামনের মেয়েটি পিন আটকে যাওয়া গ্রামোফোনের মতো আবার যখন রানিমা বলে সম্বোধন করে তাঁকে। তখন তিনি একখানা ‘উঁ’ গোছের উত্তর করেন। মেয়েটি করজোড়ে তাঁকে বলে, “রানিমা, নীলাম্বরী শাড়ি নিয়ে সেই বিদেশি সওদাগর এসেছে।”
আর কী আশ্চর্যের কথা, মিনতি যথেষ্ট সাবলীলভাবে তাকে বলেন, “এই বুড়ো বয়সে আর নীলাম্বরী পরে লোক হাসাতে হয় না মা, তুমি গিয়ে বরং মেয়ে-বৌদের ডাক দাও গে। আর সবচেয়ে হালকা রঙের সুতির শাড়ি কী আছে বের করে দাও আমাকে, আগে এই বেনারসি না আনারসিখানা ছেড়ে বাঁচি। গা কুটকুট করছে।”
মেয়েটি এবার মিনতির চেয়েও বেশি ঘাবড়ে যায়। “আ-আ-আজ্ঞে রানিমা,” বলে সে একরকম দৌড়ে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি মেয়ে তেমনি দৌড়ে ঢুকে আসে ঘরে। তার সাজপোশাক আর পালিশ করা রূপ দেখলেই বোঝা যায় সে রাজকুমারী। আগের মেয়েটি দাসী ছিল বোধহয়। নবাগতা মেয়েটি হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়ে মিনতির পা চেপে ধরে। বলে, “আমি কিছুতেই উজ্জ্বলনগরের রাজাকে বিয়ে করব না, মা। তিনি আমার বাবার বয়সী, আমার বয়সী তাঁর ছেলেপুলে আছে। রাজায় রাজায় কী যুদ্ধবিগ্রহের কারণ ঘটেছে মা, তার মাশুল আমি কেন দেব? আরেক রাজার ছেলেভোলানো খেলনা আমাকেই হতে হবে? আমার গর্ভধারিণী মা পর্যন্ত মুখ ফুটে আমার পক্ষে একটি কথা বললেন না! আপনি বাবাকে বলুন মা, আপনি পাটরানি, আপনার কথা তিনি কক্ষনও ফেলতে পারবেন না। সতীনের মেয়ে বলে ফেলে দেবেন না মা আমায়, দয়া করুন!”
আরিব্বাস, জমজমাট পুরো যেন বাংলা সিরিয়াল! মিনতি খাট নাকি পালঙ্কটা থেকে উলটে পড়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি পাটরানি শুনে তাঁর এমন হাসিখানা পেল যে মিনিট দুয়েক তাঁকে পেট চেপে গড়াগড়ি খেতে হল আগে। রাজাটা কে রে বাবা, সাধন মিত্তির নাকি! দেখতে হচ্ছে!
স্বামীকে রাজারূপে কল্পনা করে আরেক প্রস্থ হাসি পায় মিনতির। কিন্তু মেয়েটির ফুটফুটে মুখ চেয়ে এবারের হাসি চাপেন তিনি। গম্ভীর গলায় বলেন, “যাও দেখি মা, তোমার বাপকে ডেকে নিয়ে এসো। দেখি তিনি কত বড়ো রাজা। মিনতি মিত্তির সহজ ঠাঁই নয়!”
মিনতি মিত্র ব্যাপারটা খায় না মাথায় মাখে বুঝতে না পেরে রাজকন্যে হাঁ করে বসে ছিল বোধহয়। মিনতি তাকে আলতো ঠেলা দিয়ে বলেন, “যাও যাও, দেরি কোরো না। আমি বাড়ি যাব না, নাকি? আর সুতির শাড়ি দিল না কেন দেখো তো মা খোঁজ করে। পাটরানির হুকুমের একটা ইয়ে থাকতে নেই!”

নাহ্‌, এ রাজা তো মুনাইয়ের বাবা নয়!
দশমনি দরজাখানা ঠেলে যে মানুষটা ঘরে ঢোকে, আড়েদিঘে সে সাধন মিত্তিরের ডবল সাইজ। তার দিকে তাকালে ভুঁড়িটি আগে চোখে পড়ে। ভুঁড়ি যায় আগে আগে, রাজা চলেন পিছে পিছে। ইয়া মোচ, অ্যাইসা গালপাট্টা, বাবরি চুল উঁকি মারছে মুকুটের নিচ থেকে। রাজা, না ডাকাত রে এটা? চুলে আর গোঁফে আবার কলপ করা হয়েছে! রানির মতো রঙচঙে বেশবাস তাঁরও। পরনের জামার দিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মিনতি সবেমাত্র রাজার বুড়ি মায়ের পরা একটা বিস্কুটরঙা তাঁত গায়ে চাপিয়ে ঠাণ্ডা হয়েছিলেন, রাজাকে দেখে তাঁর গা আবার কুটকুট করতে লাগল।
রাজারও গা-মাথা কুটকুট করছিল সেটা তক্ষুনি বোঝা গেল। কারণ, তিনি পালঙ্কে বসেই মুকুটখানা খুলে মাথা চুলকোতে লাগলেন। অ মা, বাবরি চুলের ওপরে যে মাথা ফাঁকা! টাকটা দৃশ্যমান হয়ে রাজার চেহারায় একটা নরমসরম, বোকাসোকা হাবভাব এনে দিল। মিনতি একটু সাহস পেয়ে হাঁক দিলেন একটা, “কে আছ, রাজামশাইয়ের জন্য ঠাণ্ডা শরবত কিছু নিয়ে এসো তো বাবা।”
রাজা মিনতির দিকে তাকিয়ে একটা বোকা হাসি হেসে বলেন, “হ্যাঁ রানি, সেই গজমোতির মালাটা তো? সে কবে পেয়ে গেছি আমি। সঙ্গের ধুকধুকিখানা নরহরি স্যাকরাকে বানাতে দিয়েছি, এক্কেবারে তোমার দেওয়া নকশা মতো। তা সে আজ সাতদিন হল পালাজ্বরে ভুগছে…”
মিনতি গজমোতি শুনে একটু ভেবলে গিয়েছিলেন। কিন্তু নরহরি স্যাকরার পালাজ্বরের বিবরণ শোনার মতো ধৈর্য আর তিনি ধরতে পারেন না। রাজাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “হ্যাত্তেরি, কথাটা বলতে দেবেন তো নাকি! কখন থেকে ভুলভাল বকে যাচ্ছেন! বলছি এই যে একরত্তি মেয়েটার বিয়ে নাকি আপনি কোন বুড়ো রাজার সঙ্গে দেবেন ঠিক করেছেন?”
রাজামশাই এতটা আক্রমণাত্মক, সোজাসাপটা প্রশ্নের জবাবে প্রথমটা ‘হ্যাঁ মানে, না মানে’ বাদে কাজের কথা কিছুই বলতে পারছিলেন না। তারপর সামলে উঠে আমতা আমতা করে বলেন, “হ্যাঁ মানে ইয়ে আর কী, মা অবন্তিকা, তুমি একটু বাইরে যাও তো মা। তোমার ঘরে যাও।”
মিনতি তাঁর পাড়া বিখ্যাত গলায় খেঁকিয়ে ওঠেন, “কেন, বাইরে যাবে কেন? ওরই তো বিয়ের কথা হচ্ছে, নাকি? এখন কি আর আমার আপনার যুগ আছে ভেবেছেন, ছেলেমেয়ের মত না নিয়ে তাদের যেখানে ইচ্ছে যার সাথে ইচ্ছে বিয়েশাদি দিয়ে দেওয়া যায়?”
যুগ পরিবর্তনের কথা রাজা এতখানি তলিয়ে কখনও ভাবেননি বোধহয়, চিন্তার চোটে তাঁর আবার মাথা চুলকুনি শুরু হয়। দাসীটির হাত থেকে শরবতের গেলাসখানা নিয়ে তিনি খানিক লজ্জিতভাবে বলেন, “আসলে ব্যাপারখানা হয়েছে কিনা ইয়ে, মানে ওই যে গেল মাসে মৃগয়ায় গিয়ে না, উজ্জ্বলনগরের মহারাজের সঙ্গে একটু বেয়াড়ারকম রসিকতা করে ফেলেছি। মানে ওই দু’পাত্র পেটে গিয়ে আর কী, হেঁ হেঁ। তা মহারাজ আর তাঁর পাত্রমিত্ররা ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেননি। মানে ব্যাপারটা একটু গণ্ডগোলের দিকে চলে গেছে। মহারাজ বিচক্ষণ ব্যক্তি, আর বয়োবৃদ্ধ মহামন্ত্রী যুদ্ধের বিপক্ষে মত দিয়েছেন বলে কেবল যুদ্ধ বাধেনি এখনও। আমার চর তাই খবর দিয়েছে। কিন্তু উস্কানি দেওয়ার লোকের কি আর অভাব আছে? আর মহারাজের সঙ্গে যুদ্ধে এঁটে ওঠা কি আমার কম্ম! এই বয়সে আর যুদ্ধে-টুদ্ধে যেতে চাই না। মানে চেহারাখানা ভারী হয়ে গেছে তো। তাই মন্ত্রীরা বলছিলেন, ইয়ে মানে বিবাহযোগ্যা কন্যা থাকতে, মানে ইয়ে আর কী…”
মিনতির অগ্নিচক্ষুকে যে কেবল সাধন মিত্তির ভয় পান না সেটা আজ প্রমাণিত হয়ে গেল। রাজার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে মিনতি বলেন, “মানে? অশান্তি আপনি সৃষ্টি করেছেন, সেটা থামানোর জন্য এখন কচি মেয়েটার জীবন নষ্ট করবেন? আপনি বাপ, না কসাই?”
রাজা করুণ মুখে একবার রানি, একবার কন্যার মুখপানে তাকিয়ে বলেন, “তা-তা-তাহলে কী করব?”
মিনতি আবার খ্যাঁক করেন, “কী করবেন তা আমি কী করে বলব? মদ খেয়ে বদ রসিকতা করার আগে কি রানিদের জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলেন?”
রাজার কান-টান লাল হয়ে যাচ্ছে দেখে সুর নরম করে তিনি অবন্তিকাকে বলেন, “যাও মা, তুমি এবার ঘরে যাও।”
তার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করে তারপর রাজাকে তিনি বলেন, “শুনুন, এক কাজ করুন। মেয়ের স্বয়ম্বরসভা ডাকুন। উজ্জ্বলনগরের মহারাজকে নিজে গিয়ে উপঢৌকন না কী বলে সেই দিয়ে নিমন্ত্রণ করে আনুন। ক্ষমা চান। তাঁর শুনেছি অবন্তিকার বয়সী ছেলেপিলে আছে, চাই কি তাদের একটিকে মেয়ের মনে ধরে যেতে পারে।”
রাজার কান আরও লাল হয়। জড়ানো গলায় তিনি বলেন, “ক্ষমা চাইব? দিগনগরের রাজা ক্ষমা চাইবে?”
মিনতি সপাটে উত্তর দেন, “তা মহারাজকে অপমানটা কে করেছিল, দিগনগরের রাজা, নাকি অবন্তিকা?”
রাজামশাইয়ের ভ্যাবলানো অবস্থা দেখে মায়া লাগে তাঁর। তাও সত্যি কথা তো বলতেই হয়। অতএব বলেন তিনি জোর গলায়, “আরে ক্ষমা চাওয়াটা কি মেয়ের বিয়ে বুড়ো বরের সঙ্গে দেওয়ার চেয়ে কঠিন কাজ? আমার বাবা বলেন...”
মিনতির পূজ্য পিতৃদেব ভূতপূর্ব পোস্টমাস্টার নগেন্দ্র চন্দ্র দত্ত কী বলেন সেটা আর বলার সুযোগ না দিয়ে রাজা বলেন, “আহা, তোমার বাবাকে এর মধ্যে আনার দরকার কী! এই বুড়ো, মানে বৃদ্ধ বয়সে তাঁর যা দাপুটে মেজাজ, তোমার কথা অমান্য করেছি শুনলে হয়তো তিনি গুপ্তঘাতক দিয়ে আমাকে পরলোকে পাঠাবেন। তোমার বড়ো জামাইবাবুর কী অবস্থা হয়েছিল সে নিয়ে আজও আমি দুঃস্বপ্ন দেখি।”
পাটরানির বাবাকে না দেখেই খানিক ভালোবেসে ফেলেন মিনতি। বুক ফুলিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, তো সব বাবারা কি ওরকম হন নাকি, মেয়ে জন্ম দেন জলে ফেলে দেওয়ার জন্য?”
রাজা মাথা-টাথা চুলকে বলেন, “মেয়েটার প্রতি বড়ো অন্যায় হয় সত্যিই। আচ্ছা, তাহলে রাজপুরোহিতকে ডাকি। তুমি একটু কথা কইবে নাকি?”
মিনতি আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠেন, “কেন, আমি কথা বলব কেন? মেয়ের মাকে ডাকতে পারেন না? মেয়ের বিয়ে নিয়ে তার দুটো সাধ আহ্লাদ থাকতে নেই? আপনার না বুদ্ধিসুদ্ধি বড়ো কম!”
রাজা বেরিয়ে যেতেই অবন্তিকা ছুট্টে এসে ঘরে ঢোকে আবার। সে কোত্থাও যায়নি, ঘরের বাইরে কোথায় লুকিয়ে ছিল। মিনতির পা ধরে আবার বসে পড়ে সে বলে, “ধাইমা ঠিক বলে মা, আপনার ওপরটা কঠোর স্বভাব হলে কী হবে, আসলে আপনার মতো মানুষ হয় না।”
মেয়েটার মুখখানায় কোথায় যেন মুনাইয়ের মুখের ধাঁচ খুঁজে পান মিনতি। মুনাই শ্যামাঙ্গী, অবন্তিকার মতো এমন কুঁচবরণ গায়ের রঙ তার নয়। না তার মাথার চুল মেঘবরণ এক ঢাল। তবুও কোথায় যেন, কী যেন... তবে কি দীঘল চোখদুটি? না সারা মুখে আলো ছড়ানো হাসিখানা? মেয়ের কথা মনে আসতেই মিনতির প্রাণ আনচান করে ওঠে। আর না, এবার ফিরতে হবে। না ফেরার সম্ভাবনা মিনতির মাথাতেই আসে না। তাঁর যেখানে জায়গা সেখানে তিনি ফিরতে পারবেন না সে কখনও হতে পারে! কার্লসন কোম্পানির মেজবাবুর চাইতে তাঁর আত্মবিশ্বাসও কিছু বেশি। অবন্তিকার মাথায় আলতো চাপড় মেরে তিনি বলেন, “হয়েছে, হয়েছে। এবার ওঠো তো মা, তোমার সঙ্গে রাজবাড়িখানা ঘুরে দেখি একটু।”
হেঁশেল দিয়ে প্রাসাদ পরিক্রমা শুরু করেন মিনতি। অবন্তিকা কিন্তু কিন্তু করে। রাজকন্যে-রাজবধূরা রান্নাবান্নার ধার দিয়ে যান না। কেউ আজ অবধি রান্নাঘরের মুখদর্শন করেননি। তার ওজর আপত্তি এক ফুৎকারে নস্যাৎ করে দিয়ে দৃপ্ত পায়ে পাদুকা ফটফটিয়ে হেঁশেলে ঢুকে পড়েন মিনতি এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে ওঠেন, “অ মা গো, কী নোংরা করে রেখেছে দেখো জায়গাটা!”
পরবর্তী চল্লিশ মিনিট রান্নাঘরে মিনতি নাম্নী সাইক্লোন ঝড় বয়ে গেল। মেঝে, তাক, মায় জানালা-দরজা অবধি তিনি সাবানজল দিয়ে ধোয়ালেন। সবজিপত্তর কাটা-ধোওয়া, অতিরিক্ত পরিমাণে মাছ-মাংস খাওয়ার অপকারিতা, রান্নায় তেলমশলার আধিক্য ও রাজার ভুঁড়ির মধ্যেকার জটিল সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রাঁধুনি ও তাদের সহকারীদের বেশ কয়েকটি ক্র্যাশ কোর্স দিলেন। হেঁশেলে হুলূস্থুল কাণ্ড করে সব ঢেলে সাজিয়ে দিয়ে মিনতি আবার রাজবাড়ি বেড়াতে বেরোলেন।
মধ্যবিত্তের গৃহিণীর জীবনের কত আশা আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়ে যায়। যাক গে, একখানা আস্ত রাজবাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখে নেওয়া গেল, এ নিয়ে অন্তত মনে আর কোনও দুঃখ থাকবে না মিনতির। কী বিশাল বাগানখানা, তাতে কত ফুল-ফলের গাছ। ভারি মনে ধরল মিনতির। বটগাছের বাঁধানো বেদীতে আরও খানিকক্ষণ বসতে পারলে ভালো লাগত, কিন্তু বাড়ি যেতে হবে যে। সন্ধে দিতে হবে, মুনাইয়ের বাবা ঘরে ফিরবে। চা-নিমকি, আটটার সিরিয়াল। অতএব মিনতি পা চালান। হাতিশালে হাতি দেখেন, ঘোড়াশালে ঘোড়া। চিঠি নিয়ে যাওয়ার পায়রা দেখেন, শিকারে নিয়ে যাওয়ার বাজপাখি দেখেন। রাজবাড়ির মন্দিরে রাজার মাকে দেখেন। ফোকলা সদাহাস্যময়ী বুড়িকে তাঁর ভারি পছন্দ হয়। কেমন যেন তাঁর স্বর্গতা মায়ের মতো। তাঁর সঙ্গে বসে থাকা তরুণী মেয়েটি, নাকি রাজার ছোটরানি, তাকেও দিব্য লাগে। অন্তঃপুরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানোর মাঝে মধ্যবয়সী যে মহিলা তাঁর হাত চেপে ধরে অস্ফুটে ধন্যবাদ জানায়, সে অবন্তিকার মা। আরও দু’জন রানি আছেন রাজার। তাঁদের সঙ্গে আলাপ হয় না আর। সতীন মাত্রেই কূটকাচালে হয় না, এটুকু খালি বোঝা যায়।
অজানা এই দেশের অদেখা পাটরানির সংসার ভরে থাকুক আনন্দের কলরোলে, এই প্রার্থনাটুকু বুকে নিয়ে মিনতি রানির গয়নার বাক্সখানা খোলেন। সুটকেস সমান সে জিনিসের পেটের খোলে হাজার একখানা হিরেজহরত ঝলমলিয়ে ওঠে। ভারী ভারী গয়নার ভিড়ের মধ্যে থেকে একটু কম জ্যাবড়া একখানা হার বের করে অবন্তিকার গলায় পরিয়ে দেন মিনতি। তার চিবুকখানা ছুঁয়ে বলেন, “সুখে শান্তিতে থেকো মা।”
অবন্তিকার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। সে বলে, “মা, এ তো আপনার মায়ের দেওয়া হার!”
মিনতি মৃদু হেসে বলেন, “তাই তো। মায়ের কাছ থেকে মেয়ের কাছে যাবে বলেই তো সাধ করে গয়না গড়ানো। এক যুগ থেকে আরেক যুগ চিহ্ন দিয়ে যাওয়া। তুমি এবার ঘরে যাও দেখি। অনেক হাঁটাহাঁটি করলুম, এবার আমার ঘুম পাচ্ছে। দুপুরের ভাতঘুমখানা না পুরোলে একদম চলে না।”

*****

ট্রেন থেকে নেমে পায়ের তলায় মাটি পেতে না পেতেই লোকটাকে দেখতে পেয়ে গেলেন সাধনবাবু। পিসির গাছের পেয়ারার, বাগানের লাউশাকের প্যাকেট সামলে সামনের খান দুই লোককে নির্মমভাবে গুঁতিয়ে-গাঁতিয়ে কোনওক্রমে তার কনুইয়ের নাগাল পেতে না পেতেই একটা মোক্ষম হোঁচট খেলেন। অতএব শেষটায় কার্যত একটা অচেনা লোকের কনুই ধরে ঝুলতে ঝুলতে তাকে সাধন মিত্র বললেন, “ও ভাই, তোমার কয়েনখানা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেইদিনই।”
একমাথা চুলের নিচ থেকে চকচকে চোখে কেমন অদ্ভুতভাবে লোকটা তাকিয়ে রইল সাধনবাবুর দিকে। কয়েক সেকেন্ড, তার বেশি নয়, কিন্তু তাকানোর ধরনখানা যেন কেমনধারা। তারপর বলল, “ফেরত দেবেন? তা দিন।”
সাধনবাবু সোজা হয়ে উঠেছেন ততক্ষণে। খান দুই পেয়ারা প্ল্যাটফর্মে গড়িয়ে গেছে। সেদিকে দৃকপাত না করে প্যান্টের পকেটে হাত চালান সাধনবাবু। পকেট ফাঁকা। অন্য পকেটও একইরকমভাবে খাঁ খাঁ। সেরেছে! কী হল ব্যাপারটা? বোকামুখে হাঁ করে ভাবতে ভাবতেই জলবৎ তরলং হয়ে যায় ব্যাপার। মিনতি। আজীবনের স্বভাবমতো শনিবার রাতে সে তাঁর পকেট মেরে খুচরো নিয়ে তার বাটিখানা ভর্তি করেছে নির্ঘাত! এবার? এবার কী হবে?
আচমকা বেজায় ভয় পেয়ে যান সাধনবাবু। যদি মিনতি চলে গিয়ে থাকে? যদি ফিরে না আসতে পারে? তিনি নিজে এসেছেন বটে। কিন্তু প্রতিবার আসা যায় কি? আটকে পড়ে যদি কেউ? জ্ঞানচক্ষু খুলে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয় সাধনের। তাঁর মনে হতে থাকে যে পুরুষের তিন স্ত্রী, তার চেয়েও বেশি হতভাগ্য সে। প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় পৌঁছে যার একমাত্র স্ত্রী বিনা নোটিশে নেই হয়ে যায়।
অবশ্য নেই হয়ে গেছে সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা এখনই সম্ভব নয়। তবুও সাধনবাবুর ভয় করতে থাকে। লোকটার কনুই আবার খামচে ধরে তিনি বলেন, “কয়েনটা বাড়িতে রয়ে গেছে, ভাই। তুমি একটু আমার সঙ্গে চলো না, বাড়ি থেকে নিয়ে নেবে।”
কিন্তু লোকটা সাধনবাবুকে সঙ্গ দিয়ে তাঁর মনোবল বাড়ানোর কোনও ইচ্ছেই দেখায় না। হাত-পা নেড়ে বলে, “ওটি হচ্ছে না। দিনকাল ভালো নয়। আজকাল আমি অচেনা লোকজনের মুখের কথায় তাদের বাড়ি-টাড়ি চলে যাই না। আপনি এক কাজ করুন, কাল সন্ধে ছ’টা ছত্তিরিশে, নাহ্‌, ছত্তিরিশে হবে না তো, তেত্তিরিশে বিনোদবাবুর সঙ্গে দেখা করার টাইম দিয়েছি, আপনি বরং কাল সন্ধে ছ’টা একুশ নাগাদ এখানে দাঁড়াবেন কয়েনটা নিয়ে। যদি কয়েনটা খুঁজে পান আর কী।”
এই অবধি বলেই লোকটা পেছন ঘুরে হনহন হাঁটা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু সাধনবাবু যেতে দেন না তাকে। পড়ি কি মরি করে তাকে প্রায় জাপটে ধরে বলেন, “বলছি ভাই, ওই ম্যাজিকের জায়গাটা থেকে ফিরে আসা যায় তো? কেউ থেকে যায় না তো ওখানে?”
লোকটা কাঁউমাঁউ করে ওঠে, “ছাড়ুন ছাড়ুন, লাগে যে! ওহ্‌, আপনি রোগা মানুষ, কে দেখে বলবে গায়ে এত জোর! উহ্‌! ফিরে আসাটা নির্ভর করে।”
সাধন হাঁ হয়ে শুধোন, “কীসের ওপর?”
গা-হাত-পা ঝাড়া দেয় লোকটা। তারপর সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “ফেরার ইচ্ছে আছে কি না তার ওপর।”
সাধন তখনও হাঁ করে আছেন দেখে সে বোঝায়, “বুঝছেন না? কারওর তো নাও ইচ্ছে করতে পারে মন্ত্রীসান্ত্রীর জীবন থেকে পাতি কেরানিগিরিতে ফিরে আসার! এটা কোশ্চেন পেপারের অপশনের মতন। বাছাবাছি, পছন্দ করার স্বাধীনতা আপনার।”
আর শোনেন না সাধনবাবু, ছোটেন রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে। প্রথম রিকশাটা বেশি ভাড়া চায়, তাতেই রাজি হয়ে রিকশা চেপে বসেন তিনি। ছোকরাকে বলেন, “জলদি চালাও ভাই, বাড়িতে এমার্জেন্সি আছে।”
তাঁর মাথায় হাজার হিসেব ঘুরতে থাকে। কয়েনটা কি মিনতি হাতে নিয়েছে? সে কি ফিরে আসতে চাইবে? আটাশ বছরের বিবাহিত জীবনে খান কয় দীঘা-পুরী-দার্জিলিং ট্রিপ বাদে কি এমন তিনি দিতে পেরেছেন মিনতিকে? গয়না কেনা তো হয়ইনি কখনও, উলটে টানাটানির সময়ে ঘর থেকে কিছু বের করে দিতে হয়েছে। মেয়ের বিয়ের বালা আর চেনখানা দোকান থেকে গড়ানো কেবল, বাকি সব মিনতির বিয়ের জিনিস। দামি শাড়িও ইনস্টলমেন্টে কিনতে হত আগে। এখন কী করতে হয় অতটা খবর রাখেন না সাধন। কেরানির গিন্নি হয়ে থাকার জন্য কি মিনতি ফিরে আসবে?

দরজায় দাঁড়িয়ে পাগলাঘণ্টি বাজান সাধন মিত্র। কুলকুল ঘামছেন তিনি, বুকে ব্যথা শুরু হবে হবে করছে। কপালজোরে হার্ট অ্যাটাক অবধি যাওয়ার আগেই মিনতি দরজা খুলে দেন। বলেন, “বাবা গো, এমন করে কেউ বেল বাজায়! একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়েছি আজ, তা উঠে আসতে সময় দেবে তো নাকি! ও কী, অত ঘামছ কেন তুমি?”
মিনতিকে মাথা থেকে পা অবধি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নেন সাধন। নাহ্‌, গিন্নি গোটাই আছেন মনে হচ্ছে। অতঃপর আর দেরি করেন না তিনি, দুই লাফে ঘরে গিয়ে ঢোকেন। যেতে যেতে মিনতিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে যান, “তোমার খুচরো পয়সার বাটিটা কই গো?”
মিনতি রান্নাঘরে যেতে যেতে উত্তর করেন, “ওই আধুলিটা খুঁজছ তো? ও-বাটিতে নেই, ড্রেসিং টেবিলে রেখেছি দেখো।”
চকিতে একবার গিন্নির দিকে তাকান সাধন। কিন্তু তিনি তখন রান্নাঘরে গ্লুকন-ডির গ্লাসে ঠুংঠাং চামচ নাড়ছেন।
গেলাসখানা মিনতির হাত থেকে নিয়ে সাধনবাবু বলেন, “কয়েনটা ফেরত দিয়ে দিই, কী বলো?”
এক মুহূর্তও না ভেবে মিনতি বলেন, “দিয়ে দাও। ও আমাদের দরকার নেই।”
কী দরকার নেই সেটা আর কেউ কাউকে ভেঙে বলেন না। চার কামরার বাড়িখানা আজ নাম না জানা কীসে যেন ভরে থাকে কানায় কানায়।

রাতে খেতে বসে ছোটো ট্যাংরা মাছের ঝাল চেটেপুটে খাচ্ছিলেন সাধন। পাশে বসে মিনতি বড়পিসির বাড়ির লাউডাঁটার গুণগান করছিলেন। তা এর মাঝে কলিংবেল বেজে উঠে খাবার ঘরের শান্তিভঙ্গ করল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় সাধনবাবু বলেন, “এখন সাড়ে ন’টার সময় আবার কে এল?”
মিনতি চাপা গলায় পরামর্শ দেন, “হাতে লাঠিখানা নিয়ে দরজা খোলো, নাকি? তোমায় কত করে বললুম আই হোল করাও দরজায়, তুমি তো আমার কোনও কথাই শোনো না।”
শেষে বাঁ হাতে পেয়ারাগাছের ডালের লাঠিটাকে লুকিয়ে ধরে দরজা খোলেন সাধন। খোলেন মানে চিলতে ফাঁক করেন। দিনকাল মোটে ভালো নয়। ও মা, সামনে দাঁড়িয়ে সেই তালঢ্যাঙা শুঁটকো লোকটা! আকর্ণবিস্তৃত একটা হাসি দিয়ে সে বলে, “প্ল্যান চেঞ্জ। অনিবার্য কারণবশত আমাকে আজ রাতেই একটু আফ্রিকা যেতে হচ্ছে। তাই ভাবলাম, আমার কয়েনখানা নিয়ে যাই। এমনিতেও ও-জিনিসে আপনার আর প্রয়োজন পড়বে না।”
তড়িঘড়ি কয়েন হাতে বাইরে যেতে যেতে মিনতির কানে ফিসফিসিয়ে সাধন বলেন, “কয়েনের মালিক।”
বসার ঘরে ল্যান্ড ফোন বেজে ওঠে, মিনতি সেইদিকে হাঁটা দেন।
লোকটার হাতে পঞ্চাশ পয়সাটা তুলে দিয়ে সাধন বলেন, “আমার বাড়ি চিনলে কী করে? আর তুমি যে বললে অচেনা লোকের বাড়ি আসো না?”
লোকটা পয়সাটা পকেটে পুরে অদ্ভুত হাসে। বলে, “কই আর অচেনা! চিনে নিলাম তো।”
খাওয়ার টেবিলে আর কিছু কথা হয় না আধুলি নিয়ে। মেয়ে ফোন করে জানিয়েছে জামাইয়ের হুট করে দিল্লি ট্যুর পড়েছে, তাই কাল বিকেলে সে এসে মা-বাবার কাছে কয়েকদিন থেকে যাবে। পড়ে পাওয়া ছোট্ট সুখখানি নিয়ে নাড়াচাড়া করে করে সাধন-মিনতির আশ মেটে না, রাজাগজার ঘরের গল্প করার সময়য় আর পান না তাঁরা। মিনতি বলেন, “কাল সকালে বাজারে দেখো না একটা ছোটো ইলিশ পাও কি না। মাছের মাথাখানা দিয়ে লাউশাকটা করি। কী কচি লকলকে ডাঁটা, মেয়েটা ভালোবাসে।”
সাধন বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখব আমি। কাল ভোরে উঠে বাজার চলে যাব। ছোটো মাছও কিছু নিয়ে আসি বলো, মুনাই ছোটো মাছের পাগল!”
তবে কথা হয়। রাতে খাটে শুয়ে আলো নেভার পর কথা হয়। অন্ধকার অনেক কথাকে সহজ করে দেয়। আটাশ বছর পুরনো বিয়ের খাটে পাশ ফেরেন সাধন। খাট স্বভাবমতো ক্যাঁচ করে আপত্তি জানায়। মিনতি হাতের চটাস শব্দে মশা মারেন। খাট কোঁচ করে। ফিসফিস করে সাধন বলেন, “আফসোস হবে না, মাঝেমাঝে?”
মিনতিও ফিসফিসে উত্তর দেন, “হোক গে। হওয়াই তো স্বাভাবিক। তবে ভেবে দেখো, ওরাও তো আমাদের মতোই, দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ-হাসি নিয়েই তো ঘর করছে। রাজাগজা হলেই কি সবটুকু সুখের হয়?”
সাধন মাথা নাড়ান। মন্ত্রীবুড়োর তিন বৌয়ের নানান ঝামেলা, তার বখাটে ছেলেগুলিকে মনে পড়ে যায় তাঁর।
মিনতি আবার বলেন, “এইটুকু তো জানা হয়ে গেল, যে চোখে যেটুকু দেখা যায় শুধু সেটুকু নয়। আরও আছে, এর পরেও আছে।”
সাধন মাথা নাড়েন। তিনি কেবল সাধন মিত্তির নন, তাঁর মধ্যে একজন আস্ত মন্ত্রী লুকিয়ে আছেন, সেকথা ভেবেই তাঁর কেমন অসুস্থ বোধ হয়। প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে তিনি মিনতিকে জিজ্ঞেস করেন, “হ্যাঁ গো, কাল মাটন আনব? নাকি দু’দিন পরে? মুনাই থাকবে তো বলল ক’দিন?”
পেল্লায় হাই তুলে মিনতি বলেন, “না না, কাল নয়। ওর যাওয়ার আগের দিন এনো’খন। আড়াইশো মতো। আমার এখন তেলমশলা দেওয়া মাছমাংস দেখলেও গা গুলোবে।”
সাধনের আবার সেই গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ মনে পড়ে যায়। এহ্‌, বড্ড তেল-ঘি খায় লোকগুলো।
ওপাশ ফিরতে ফিরতে মিনতি প্রশ্ন করেন, “হ্যাঁ গো, তুমি লোকটার নামধাম জিজ্ঞেস করলে না?”
আনমনে সাধন উত্তর দেন, “করলাম তো। বলল, আমি বিশ্বেশ্বর। আপনার সুবিধের জন্য আপনি আমায় বিশু বলে ভাবতে পারেনーআরে ও কী, বিষম খেলে নাকি! কী হল, আহা, জল আনি দাঁড়াও!”

আপনিও চোখ খোলা রাখুন। তালঢ্যাঙা শুঁটকো চেহারা তার, একমাথা ঝাঁকড়া চুল, চকচকে ঝিকিয়ে ওঠা চোখ। পকেট থেকে কখন সে ফেলে দেবে তার আশ্চর্য আধুলি। সে বিশ্বেশ্বর। আপনি তাকে বিশু বলেও ডাকতে পারেন।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

No comments:

Post a Comment