ধারাবাহিকঃ তুষার যুগঃ (দ্বিতীয় পর্ব) অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


দ্বিতীয় পর্ব



ড্রিফট থিওরি

১৮৪০ সালে আগাসিজ ড্রিফট থিওরির উপর তার লেখা বই নিজের পকেটের পয়সায় ছাপালেন। বিখ্যাত এক বিজ্ঞানী আগাসিজকে বললেন, “এইসব বই লেখার চাইতে বরং মাছের জীবাশ্মের উপর কিছু গবেষণালব্ধ তথ্য লেখো, যা মানুষের উপকারে আসবে।” আগাসিজ একটুও দমে না গিয়ে চলে গেলেন ব্রিটেনে। ভূবিজ্ঞানী উইলিয়াম বাকল্যান্ডকে বোঝাতে সক্ষম হলেন তার লেখা বইয়ের সারবত্তা নিয়ে। লন্ডনের জিওলজিকাল সোসাইটি আগাসিজের গবেষণাকে গুরুত্ব দিল।
আগাসিজ প্রবর্তিত ড্রিফট থিওরির গোড়ার কথা হল, আল্পস পর্বতমালা সৃষ্টির আগে সারা পৃথিবীর অনেকটাই বরফে ঢাকা পড়ে ছিল। ব্রিটেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া, উত্তর সমুদ্র, ভূমধ্যসাগর–সব ছিল একটা একক বরফের চাদরে মোড়া। তারপর যখন পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে লাগল, তখন বরফ গলতে শুরু করল। হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার বয়ে চলল এক ভৌগলিক স্থান থেকে আরেক স্থানে। সঙ্গে করে তারা বয়ে নিয়ে চলল পলিমাটি, নুড়িপাথর, বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই। জমি জেগে উঠল স্থানে স্থানে। সরে যাওয়া হিমবাহ পাথরের উপরের স্তরে রেখে গেল আঁচড়ের দাগ।
আগাসিজের থিওরিতে অনুপ্রাণিত হয়ে আল্পস পর্বত অভিযান করে বিজ্ঞানীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জোগাড় করে ফেললেন, যাতে বোঝা গেল, তুষার যুগ ছিল, তা কোনও কল্পবিজ্ঞান নয়, আকাট সত্য। ভূবিজ্ঞানীরা ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ইর‍্যাটিক বোল্ডারস বা লক্ষ্যভ্রষ্ট পাথরের দেখা পেলেন। সারা পৃথিবী জুড়ে হিমবাহ বাহিত জমাট পদার্থের (গ্লেসিয়াল ডিপোসিটস) খতিয়ান লিপিবদ্ধ হল। বিজ্ঞানীরা জানালেন, একটা নয়, অনেক তুষার যুগ এসেছে ও চলে গেছে পৃথিবীর বুকে। অনেক অনুসন্ধানের পরে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি পাঁচটি তুষার যুগের সন্ধান দিতে পারলেন। পাথরের বিভিন্ন স্তরের জমাট বাঁধার প্রকৃতি ও তাদের বয়স নির্ধারণ করে তারা তুষার যুগের ম্যাপ তৈরি করে ফেললেন।
হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার আর হিমশৈল বা আইসবার্গ কিন্তু প্রকৃতিতে ভিন্ন। বিরাট বরফের আস্তরণ যখন ভূখণ্ডে জমা হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে, তাকে বলা হয় হিমবাহ। আর সমুদ্রের জলে যে বিশালাকার বরফ খণ্ড ভাসতে থাকে, তাকে বলা হয় হিমশৈল।
প্রচণ্ড ভরের কারণে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে হিমবাহ উঁচু জায়গা থেকে গড়িয়ে সমতল ভূমিতে বয়ে যায়। চলার পথে আলগা পাথরের চাঁই ও টুকরো হিমবাহে আটকে গিয়ে একস্থান থেকে আরেক স্থানে বাহিত হয়। হিমবাহ আবার অনেক ভাগে ভাগ করা যায়, পাহাড়ি হিমবাহ, পিডমন্ট হিমবাহ, মহাদেশীয় হিমবাহ, নাতিশীতোষ্ণ হিমবাহ।
◽পাহাড়ের উপর যে বরফের আস্তরণ টুপির মতো জমা হয়ে নিচের দিকে বয়ে যায়, তাকে বলা হয় পাহাড়ি হিমবাহ।
◽পাহাড়ের পাদদেশে যদি হিমবাহ সোজা সমুদ্রে নেমে আসে, তাকে বলা হয় পিডমন্ট হিমবাহ।
◽অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে যে হিমবাহ দেখা যায় তাকে বলা হয় মহাদেশীয় হিমবাহ।
◽যেখানে হিমবাহ বরফের গলনাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় হওয়ার জন্য অপেক্ষাকৃত নরম হয়, তাকে বলা হয় নাতিশীতোষ্ণ হিমবাহ।
প্রতিটি প্রকারের হিমবাহের আলাদা আলাদা তাপমাত্রা আছে।
বরফের গলনাঙ্ক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বরফের উপরে চাপ বাড়লে গলনাঙ্ক কমে যায় অর্থাৎ, তাপমাত্রা যদি শূন্যের দুই এক ডিগ্রি উপরে থাকে তাহলেও চাপের প্রভাবে বরফ গলে যায়। হিমবাহের নিজস্ব চাপে তার নিচের অংশে বরফ গলে জল হয়ে গেলে ভূমির পাথরের সাথে হিমবাহের ঘর্ষণ কমে যায় এবং হিমবাহ এগোতে থাকে। হিমবাহের নিচের দিকে জল, মাটি, বালি আর পাথরের চূর্ণে কাদার সৃষ্টি হয়। যদি হিমবাহের ভর কম হয় বা পরিবেশের তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে থাকে, তাহলে হিমবাহের নিচের অংশে বরফ গলে জল হতে পারে না। সেক্ষেত্রে হিমবাহের নিচের অংশ শুকনো থাকে। ভূমির সাথে ঘর্ষণ কম হওয়ায় এই ধরণের হিমবাহ কম গতিশীল হয়। অ্যান্টার্কটিকায় এই ধরণের হিমবাহ দেখা যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, হিমবাহের নিচের অংশে জমা জলের উপর নির্ভর করে তার গতিবেগ। হিমবাহের গতিবেগ দিনে কয়েক সেন্টিমিটার থেকে তিরিশ বা চল্লিশ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
কোনও কোনও হিমবাহ একবারে দুধসাদা রঙের হয়, আবার কোনওটা হালকা নীল রঙের হয়ে থাকে। সাদা হিমবাহ অপেক্ষাকৃত কম পুরনো। কিন্তু নীল রঙের হিমবাহ কিন্তু অনেক অনেক বছর আগে জমে ওঠা বরফ থেকে তৈরি হয়। সাদা বরফ সবরকম তরঙ্গ দৈর্ঘের আলো বিচ্ছুরণ করে বলে আমাদের চোখ তাকে সাদা দেখে। পেঁজা তুলোর মতো হালকা তুষারের ভিতরে লুকিয়ে থাকে বাতাস। এর ঘনত্ব অনেক কম হয়। বরফ জমা হতে হতে উপরের বরফের স্তর নিচের স্তরকে চাপ দিতে থাকে। এর ফলে বরফের ভিতর লুকিয়ে থাকা বাতাস বেরিয়ে যায়, বরফের ঘনত্ব বাড়ে। যত চাপ বৃদ্ধি হতে থাকে তত বরফের ঘনত্ব বেড়ে জমাট পাথরের মতো হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমে ওঠা হিমবাহের বরফের নিচের অংশ কঠিন হওয়ায় শুধু মাত্র নীল আলোর তরঙ্গ বিচ্ছুরিত হয় আর আমরা তাকে নীল রঙের রূপে দেখতে পাই।
হিমবাহ
সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈলের চার-পঞ্চমাংশ জলের নিচে থাকে, এক-পঞ্চমাংশ ভেসে থাকে জলের উপর। সমুদ্রের জলে হিমশৈল গলে যায়, তখন বরফে আটকে থাকা পাথর ও মাটি সমুদ্র তলদেশে জমা হতে থাকে। সমুদ্রের তলদেশের জমে ওঠা পদার্থ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীতে অতীত যুগের হিমায়নের ইতিহাস জানা যায়।
হিমশৈল

ফিরে ফিরে আসে তুষার যুগ

জন্ম থেকেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চক্রবত পরিবর্তনের ফলে কখনও পরিবেশ হয়ে ওঠে উত্তপ্ত, বৃষ্টি ও বন্যায় ভাসে পৃথিবীর স্থলভাগ। আবার প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের ফলে তুষারপাত হয়, জমাট বাঁধা শক্ত বরফ হিমবাহের সৃষ্টি করে। তখন জীবজন্তুর বাসযোগ্য থাকে না পৃথিবী। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমে ওঠা বরফ আবার যখন উষ্ণতার প্রভাবে গলতে থাকে, জলে ও স্থলে নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয়।
এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে কমপক্ষে দুটি বা মত পার্থক্যে চার-পাঁচটি তুষার যুগের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে জানা গেল এই সংবাদ। এই গবেষণার পিছনে লুকিয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে অসংখ্য বিজ্ঞানীর গবেষণা। অ্যান্টার্কটিকায় জমাট বাঁধা বরফে ফুটো করে, বরফের স্তর ও হিমবাহ বাহিত জমা পাথরের স্তরের কার্বন ডেটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে জানা গেছে, কত বছর ধরে একেকটি তুষার যুগ কায়েম হয়েছে পৃথিবীর বুকে। তুষার যুগের নাড়ি ধরবার আরেকটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সব হিমবাহ গলে জল হয়ে শেষে সেই সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। কাজেই যত রাজ্যের পাথর-মাটি আর জৈব পদার্থ জমা হয়েছে সমুদ্রের তলদেশে। তাই সমুদ্রের গভীর তলদেশ মেশিন দিয়ে ফুটো করে, বিভিন্ন স্তরের অনুসন্ধান চালিয়ে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি করেছেন তুষার যুগ চক্রের চরিত্রের। নিচে দেওয়া ভূতাত্ত্বিক যুগের চার্ট দেখে বুঝে নেওয়া যাবে বিভিন্ন তুষার যুগের কাল।
ভূতাত্ত্বিক যুগ
বিগত তুষার যুগকে বলা হয় কোয়ার্টারনারি পিরিয়ড। এটিকে ভূতাত্ত্বিকেরা দু’ভাগে ভাগ করেছেন – প্লিস্টসিন ও হলোসিন। এর পূর্ববর্তী তুষার যুগ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে এবং এর চিত্র খুব পরিষ্কার নয়। বর্তমানের পৃথিবীর প্রাণীরা কোয়ার্টারনারি পিরিয়ডে সৃষ্ট। প্লিস্টসিন যুগ আজ থেকে ২৫,৮৮,০০০ বছর থেকে ১১,৭০০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এইটি সবচাইতে বেশি তুষারপাতের যুগ বলা যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই সময়টিকে বলেন প্যালিওলিথিক যুগ। ১১,৭০০ বছর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিস্তৃত হলোসিন যুগ। হলোসিন আসলে গ্রীক শব্দ, যার অর্থ অতি সাম্প্রতিক। এটিকে সাম্প্রতিক উষ্ণায়ন কালও বলা হয়।
একটি তুষার যুগের মধ্যবর্তী সময়ে বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রার হেরফেরের কারণে একেকটি তুষার যুগকে আবার অনেকগুলো বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুটি হিমায়নের (glaciation) মাঝে তাপমাত্রা বেড়ে যাবার সময়কে বলা হয় উষ্ণায়ন (inter glaciation)। বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে তাকে বলা হয় হিমায়ন আর তাপমাত্রা এর চাইতে বেড়ে গেলে বলা হয় উষ্ণায়ন।
উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের বিস্তৃত তুষারাচ্ছাদিত অঞ্চলে পশু ও উদ্ভিদের জীবাশ্ম যেন প্রাকৃতিক রেফ্রিজারেটারের মতো সংরক্ষণ করেছে লক্ষ লক্ষ বছরের শক্ত জমাট বাঁধা বরফ। সেই জীবাশ্ম পরীক্ষা করে জানা সম্ভব হয়েছে পৃথিবীর বুকে জীবনের বিবর্তনের ইতিহাস। বরফের স্তরে পাওয়া গেছে আগ্নেয়গিরির লাভার অস্তিত্ব। জানা গেছে, এক সময়ে অর্ধেক পৃথিবী জুড়ে পৃথিবীর উপরের স্তর ফেটে লাভা উদ্গিরন হয়েছে। বরফের স্তরের মধ্যে জমে থাকা বাতাস পরীক্ষা করে জানা গেছে লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোন কোন গ্যাসের কী কী পরিমাণ ছিল। তাই বরফের স্তর যেন এক টাইম ক্যাপসুল তৈরি করে রেখেছে ভবিষ্যতের মানুষকে সংবাদটি জানিয়ে দেওয়ার জন্য।
প্লিস্টোসিন যুগে কিন্তু বিশাল বরফের চাদর এক জায়গায় স্থির ছিল না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অন্যান্য ভৌগলিক কারণে তার গতি ছিল। অন্তত পক্ষে কুড়ি বার বরফের চাদর কখনও আগে বা কখনও পিছনে সরেছে। প্লিস্টোসিন যুগের পাঁচটি পর্যায় ছিল – গেলাসিয়ান, কালাব্রিয়ান, আইওনিয়ান ও টারান্টিয়ান। এই সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমান অত্যন্ত কম থাকায় বরফের সাথে ছিল শুষ্ক আবহাওয়া। কাজেই বৃষ্টিপাত হত নামমাত্র, আজকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। শীত ও গ্রীষ্মকাল উপস্থিত থাকলেও গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা এত কম ছিল, বরফ গলত খুব সামান্য। ফলে আরও তুষারপাত হলেও সেই তুষার গলে গিয়ে জলে পরিবর্তন না হতে পেরে বরফের চাদর আরও পুরু হয়ে উঠেছে।
প্লিস্টোসিন যুগে অন্য বড়ো স্তন্যপায়ী প্রাণীর সাথে সাথে মানুষ জন্মায় পৃথিবীতে। আজকের মানুষ, যাদের বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন হোমোস্যাপিয়ান, তাদের উদ্ভব হয় তেইশ লক্ষ বছর আগে। পৃথিবীতে আদিম প্রাণ সৃষ্টির নিদর্শন পাওয়া গেছে আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে। এখানে তুষার স্তরে প্রায় সবধরনের জীবজন্তু ও উদ্ভিদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এমনকি পাওয়া গেছে আদিম মানবী ও উলি ম্যামথের কঙ্কাল। আর পাওয়া গেছে দাঁতওয়ালা বাঘ, মুন র‍্যাট, স্লথ ইত্যাদি। অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণী এই সময়েই বিলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু আজকের পৃথিবীর বাসিন্দারা এই সময়েই জন্মায় ও তাদের বিবর্তন হতে থাকে। পাখিদের জন্ম ও বিবর্তনও এই সময়ে হয়ে থাকে। সরীসৃপদের জীবনচক্রও একই সময়ে শুরু হয়।
প্লিস্টোসিন যুগের শেষের দিকে আজ থেকে প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জীবজন্তুদের তিন-চতুর্থাংশ বিলীন হয়ে যায় একেবারে আচমকাই। এর প্রকৃত কার্যকারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বর্তমানে সবচাইতে বেশি গ্রাহ্য কারণ, পৃথিবীর বুকে এক ধূমকেতু বা উল্কার আছড়ে পড়া। কানাডা অঞ্চলে এই দুর্ঘটনা ঘটে এবং তার ফলে প্রস্তর যুগের অধিকাংশ সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায়।
হলোসিন যুগে হিমবাহ গলে গিয়ে তুষারের চাদর ছোটো হতে শুরু করলে হিমবাহ বাহিত পাথর ও নুড়ি খসে পড়ে, আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপী জমতে থাকে শক্ত জমিতে। হিমবাহ সরে যেতে থাকায় তার বিপুল চাপে সেইসব পাথর গুঁড়িয়ে যেতে থাকে, সৃষ্টি হয় বালি। বৃষ্টি, বাতাস ও তাপমাত্রার ওঠানামার প্রভাবে পৃথিবীর উপরের ভূস্তরে জমে ওঠা পদার্থ থেকে মাটির সৃষ্টি হয়। চাষের যোগ্য জমি তৈরি হলে মানুষ চাষ করতে শেখে। চাষবাসের উন্নতির সাথে সাথে লৌহযুগ থেকে তাম্রযুগে বিবর্তন হয়। প্রকৃতির প্রবল শৈত্যপ্রবাহ থেকে বাঁচতে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেওয়া মানুষ বায়ুমণ্ডলের তাপমান বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশ নতুন নতুন জমি ও উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। সভ্যতার অগ্রগতি হতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানবজাতির এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে স্থানান্তরণে সাহায্য করেছিল পৃথিবীর বুকে জমে থাকা বরফের আস্তরণ আর নিচু সমুদ্রতল। তাই সুদূর আফ্রিকা থেকে বেঁচে থাকার উপযুক্ত রসদের অনুসন্ধানে প্রাচীন মানুষ এশিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়। সমুদ্রের জল কিন্তু তখন আজকের তুলনায় অনেক নিচে ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আজ যদি সমস্ত হিমবাহ গলে যায়, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ ১৫০ ফুট উপরে উঠে যাবে। তখন কিন্তু দাঁড়ানোর জন্য উপযুক্ত জমি পাওয়া যাবে না।
সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন
সারা পৃথিবীর ভূস্তর পর্যবেক্ষণ করে বৈজ্ঞানিকরা হিমবাহ গলে যে উপত্যকার সৃষ্টি হয়েছে তার অপূর্ব চরিত্র চিত্রায়ন করেছেন। হিমবাহ যখন গলতে শুরু করে সরে যেতে লাগল, তখন পাথরের স্তরে তার চাপে সৃষ্টি হল ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের আকৃতির উপত্যকা। কোথাও কোথাও গলে যাওয়া জল প্রবল বেগে বইতে শুরু করায় সৃষ্টি হল নদী। নদীর জল মাটি কেটে, পাথর চিরে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে বইতে থাকলে যে উপত্যকার সৃষ্টি হল, তার আকার হল ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো। সেসব নদী আজ আর দেখতে পাওয়া যায় না। তাদের সব জল সাগরে মিশে গেছে, কিন্তু দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায় তার দাগ স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত হিমবাহের উপরিভাগে জল গলে সৃষ্টি হয় অস্থায়ী লেক। ফাটল দিয়ে সেই জল তার বয়ে চলার ধর্ম অনুযায়ী মিশে যায় মহাসমুদ্রে।
হিমবাহ সৃষ্ট উপত্যকা
খুব সম্ভব প্রথম তুষার যুগ আসে আজ থেকে ২৮ - ৩০ কোটি বছর আগে। এইটি সবচাইতে তীব্র তুষারপাতের সময়কাল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এর পিছনের পৃথিবীর ইতিহাস খুব স্পষ্ট করে বলা যায় না। এই তুষার যুগটিকে নাম দেওয়া হয়েছে পার্মো-কার্বনিফেরাস তুষার যুগ। এর আগে পৃথিবীর মাটিতে ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণে ছিল। তুষারের নিচে সেই সব উদ্ভিদ চাপা পড়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ক্রমশ ফসিল, তারপর কয়লায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভারতের মাটিতে অনুসন্ধান চালিয়ে বিজ্ঞানীরা পার্মো-কার্বনিফেরাস তুষার যুগের জমা পাথরের স্তর পেয়েছেন সর্বপ্রথম। এইধরনের পাথরের বৈজ্ঞানিক নাম টাইলাইট। পরবর্তী অনুসন্ধান দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় টাইলাইটের হদিস দিয়েছে।
যদিও অনেক ভূবিজ্ঞানী মনে করেন পার্মো-কার্বনিফেরাস তুষার যুগে সারা পৃথিবী বরফে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় ‘স্নো বল আর্থ’-এর সৃষ্টি হয়, কিন্তু অনেকেই এই ধারণা মেনে নিতে পারেননি। কারণ, বিষুবরেখার আশেপাশে বরফ যে জমতে পেরেছিল, সে-বিষয়ে কোনও তথ্য হাতে আসেনি। তবে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চল যে পুরু বরফের আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায়, এই নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

(চলবে)

No comments:

Post a Comment