প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র


প্রচ্ছদঃ বিশ্বদীপ পাল

সূচিপত্র

কচিপাতা
কমিকস
আঁকিবুঁকি

জীবনের গল্প

গল্প
রুমাল ইলিশ সঞ্জীবকুমার দে
ব্যবস্থা ঋজু গাঙ্গুলি
মহীপতি অরিন্দম দেবনাথ
জয় জগন্নাথ দেবলীনা দাস
বই নিয়ে বৈরিতা কিশোর ঘোষাল
ইয়েতির বিয়ে তন্ময় ধর
মোগলি ভূত তরুণকুমার সরখেল
উত্তর সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
দুটি গল্প সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী
খতরনাক খেল অরিজিৎ ভট্টাচার্য

ছড়া
হিটে কাবু হিটলার মধুমিতা ভট্টাচার্য
পুতুলের হাসি স্বপনকুমার বিজলী
দোস্তি সুস্মিতা কুণ্ডু
বর্ষায় বন্দী ধনঞ্জয় দত্ত
আগে শেখা টুম্পা মিত্র সরকার
আকাশ বাড়ি অমৃতাভ দে
ভূতের খোকা খুকি অঞ্জন ভট্টাচার্য

অণুগল্প
পরির চুমু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
গুরুদেবের পটলপ্রাপ্তি সুস্মিতা কুণ্ডু
কররেখা অরুণাচল দত্ত চৌধুরী
হীরা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
রক্ষক অরিন্দম দেবনাথ

দুষ্টুমিষ্টি

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি, যা শুনি (৩য় পর্ব) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
পর্যায়সারণীর দেড়শো বছর গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
দ্য ভিঞ্চির নোটবই তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়
রহস্যময় লেক কালীপদ চক্রবর্ত্তী

ধারাবাহিক
তুষার যুগ (৩য় পর্ব) অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার স্কুল

বিভাগীয় সম্পাদক
অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সুস্মিতা কুণ্ডু

কচিপাতাঃ কমিকসঃ ক্যাকটাস দিয়ে ভূত শিকারঃ শাশ্বত রায়


ক্যাকটাস দিয়ে ভূত শিকার




শাশ্বত রায়
দুর্গাপুর আর.ই. মডেল স্কুল

পড়ার ফাঁকে অবসরে কমিকস তৈরি করে শাশ্বত। মূল চরিত্র 'রাজুদা'। প্রত্যেক গল্পে আলাদা রস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। ছোটবেলা থেকেই কমিকসের প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক। সবচেয়ে ভালো লাগে নারায়ণ দেবনাথ রচিত 'হাঁদা ভোঁদা' ও 'বাটুল দি গ্রেট'। এছাড়া 'অরণ্যদেব', 'চাচা চৌধুরী', 'গোয়েন্দা কৌশিক' কমিকসগুলোও দারুণ প্রিয়। এই কমিকস তৈরির কাজে শাশ্বতর স্কুলের বন্ধুরাও বিশেষ সাহায্য করে থাকে।

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ সায়ন্তিকা ঘোষ



শিল্পীঃ সায়ন্তিকা ঘোষ
চতুর্থ শ্রেণী
সারদা শিশু মন্দির,
যমুনাবালি, পশ্চিম মেদিনীপুর

গল্পঃ রুমাল ইলিশঃ সঞ্জীবকুমার দে




খাবারটা শেষ করে সবে জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়েছি। আমার সহধর্মিণী বেলার যথারীতি প্রশ্ন, “কী খেলে বলো তো?”
নিয়মমাফিক নিষ্ফল চেষ্টা দেখালাম একটু। ইতস্তত করে বললাম, “গরম পরোটার সঙ্গে দারুণ জমেছিল কিন্তু।”
তারিফ পাওয়ার ব্যাপারটা বেলার কাছে প্রাত্যহিক ব্যাপার। তবুও এসব তার কাছে খুবই উপভোগ্য। দিগবিজয়ী হাসি ঠোঁটে ফুটিয়ে সে বলে উঠল, “বলতে পারলে না তো!”
একটু সময়ের অপেক্ষা, তারপরেই আবার রহস্যভেদের ভঙ্গি, “চিকেন চিচিঙ্গা।”
“মানে!” বিষম খেলাম প্রায়।
“চিকেনের সাথে চিচিঙ্গার প্রিপারেশন।”
“ইউনিক! ফাইন!” সামাল দিলাম উচ্ছ্বসিত হয়ে। “তোমার রেসিপি?”
“হ্যাঁ।” গর্বিত কণ্ঠস্বর বেলার, “একটা নতুন এক্সপেরিমেন্ট।”
এই নিত্যনতুন রান্নার এক্সপেরিমেন্টের চাপেই এখন আমার হাল ত্রাহি মধুসূদন।
আমার বাড়ির রান্নাঘরটিকে কোনও হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির সঙ্গে তুলনা করলে কোনও ভদ্রজন আশ্চর্য হবেন না। কী নেই সেখানে? বার্নার, কুকার, মিক্সার, রেফ্রিজারেটরের মতো সাজসরঞ্জামে বোঝাই। পোর্সেলিন, অ্যাকোলাইট, স্টিল, কাচের ডিশ-প্লেট-গ্লাস। বাদশাহি, চাইনিজ, দক্ষিণী, পশ্চিমি প্রভৃতি দিগ্বিদিকের স্বীকৃত রান্নার মশলাপাতি।
শুধু রাঁধলেই কেউ রন্ধন পটীয়সী হন! যদি না পরখ করার মতো সমঝদার গুণগ্রাহী থাকে! তারও আছে। প্রথমটায় ছিলাম একা আমি। এখন অগুনতি।
শুধু একটুকু পরিধির মধ্যেই এখন আর আবদ্ধ নেই বেলার গুণপনা। তার রন্ধন-খ্যাতির এখন বিশাল ব্যাপ্তি। বিভিন্ন সাময়িক পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে এখন তার পাঠানো রান্নার রেসিপি।
আহা বেচারা! এই নিয়ে মেতে আছে, থাক। এটাই তো ওর হবি। আমার যে হবিーএকটু আধটু লেখা-টেখা। ও কি বাধা দেয়? সুতরাং ওর উৎসাহে আমার বাধাদানের প্রশ্নও নেই। আমার বিড়ম্বনা বলতে ওই লাগামছাড়া অর্থব্যয়। তা যাক গে।
যাই হোক, চিকেন-চিচিঙ্গে শেষ করে গতদিনের সম্পূর্ণ না হওয়া একটা গল্পের পরবর্তী অংশটা শুরু করার ইচ্ছেয় সবে বসেছি লেখার টেবিলে, আবার বেলার আবির্ভাব। একহাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে একটা সুদৃশ্য সাদা খাম। আদুরে গলার অনুরোধ, আদুরে ভঙ্গিতেই মেলে ধরলাম খামটা। বড়ো বড়ো হরফে লেখাーপ্রেস ফটো, আর্জেন্ট। ডোন্ট ফোল্ড।
মনে পড়ল, দিন তিনেক আগেই বাড়িতে এসেছিলেন একটা বিখ্যাত বাংলা দৈনিকের এক চিত্র-সাংবাদিক। তাঁদের পত্রিকার ম্যাগাজিন পেজে নাকি খুব শীগগিরই যাচ্ছে ‘বেলাদেবীর সচিত্র বিচিত্র রন্ধন’।
উৎসাহের সঙ্গে ছবিগুলো বের করলাম। আহা! প্রথমটিই আমার সহধর্মিণীর কোমরে আঁচল জড়ানো চোখ জুড়নো ছবি। কী মেক-আপ! কী ড্রেস! চতুর্দিকে ছড়ানো ছেটানো তার সন্তানসন্ততি, মানে বার্নার, কুকার, মিক্সার-টিক্সার এইসব আর কী। আর ছবিগুলো ওইসব পদের। কোনওটা কলাপাতায়, কোনওটা প্লেটে, কোনওটা প্যানে। কী কারিকুরি, কী কায়দা, কী বাহার!
“অপূর্ব!” তারিফ করলাম। “ওরা দিয়ে গেল?”
“হ্যাঁ, প্রিন্ট হওয়ার আগে আমি একবার দেখব বলেছিলাম। আর আইটেমগুলোর নামকরণও বাকি। কাল অবশ্য সব পৌঁছে দেওয়ার কথা।”
“কাল পৌঁছে দেবে কে!” অবাক হয়ে বলি। “কাল ভোরবেলার ট্রেনেই তো তোমার বাপের বাড়ি যাবার কথা!”
“কাউকে দিয়ে দিও না গো পাঠিয়ে। নইলে পরের সপ্তাহে ছাপবে না।”
ঢেঁকি গিলতে হল অগত্যা। “বেশ, দেখা যাবে। তোমার যা কাজ বাকি সেরে রাখো এখন।”
বেলা কিন্তু তবুও নড়ল না। আমার চেয়ারের হাতলে সে বসে। এবার তার হাতের আঙুল আমার মাথায় বিলি কাটতে লাগল। লেখায় মন দিতে না পেরে এবার একটু বিরক্ত হলাম। “কী ব্যাপার?”
“দাও না গো আইটেমগুলোর জুতসই নাম ঠিক করে।”
“আমি!” চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। “আরে বাবা, এসব ব্যাপারে আমার কোনও ধারণাই নেই। আমাকে খেতে দাও, আমি খাই। খেয়ে ভালোমন্দ মন্তব্যও করতে পারি। কিন্তু এসবের নাম-টাম ঠিক করতে দেওয়া আর আমাকে ফাঁসি দেওয়া একই ব্যাপার।”
বেলাও নাছোড়। “দেখো, এত বড়ো কাগজে এই প্রথম সুযোগ। কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলো তো! রঙিন ছবি ছাপছে কতগুলো! বায়োডাটা দিচ্ছে আমার। সেজন্য রান্না শুধু চমকদার হলেই চলবে না, নামও চাই চমকপ্রদ। তাই তোমাকে বলা।”
বেলা থামল। উত্তরে আমি নীরব।
কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। তারপরই হঠাৎ ‘ফ্যাঁচ’। শেষ অস্ত্র ছেড়েছে বেলা।
ঠিক হল, এখন আমার অসমাপ্ত গল্পের অবশিষ্টাংশতেই মনোনিবেশ করব আমি। বেলার কাজটা করব ধীরেসুস্থে আগামীকাল।
দিন কয়েক পরেই সেই দৈনিকে বেরিয়ে গেল বেলার আর্টিকেল। সকালে খবরের কাগজের পৃষ্ঠা ওলটাতে-ওলটাতেই আবিষ্কার করলাম। রীতিমতো রোমাঞ্চকর অবস্থা আমার। নিজের গল্প প্রকাশ হতে দেখেও এই অনুভূতি হয়নি কখনও। বারবার করে দেখলাম ছবিগুলো, পড়লামও বেশ কয়েকবার।
খুব মনে পড়তে লাগল বেলাকে। কাছে নেই বেচারা। দিন কয়েকের জন্য গেছে বাপের বাড়ি দুর্গাপুরে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পেয়ে যাবে আজকের দৈনিক নিশ্চয়। খুব খুশি হবে। আর আনন্দিতও হবে ওর রেসিপির নামকরণ করে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছি জেনে।
সারাদিন অফিস জুড়ে হইচই। সহকর্মীরা অনেকেই মুগ্ধ ব্যাপারটায়।
চমক ছিল রাতে, বাড়িতে। নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বেলা ফিরে এসেছে। ঘাবড়ে গেলাম। “কী ব্যাপার?”
“কী করেছ এসব?” কৈফিয়ত তলব করে রংবাহারি পাতাটি আমার চোখের সামনে এগিয়ে দিল সে।
“কী করেছি?”
“আমার অত সুন্দর কিমা স্পেশালের নাম তুমি কী দিয়েছ? লঙ্কাকাণ্ড!”
“ও ওটা কিমা স্পেশাল! বুঝতে পারিনি। ছবিতে চারপাশে অত কাঁচালঙ্কা দেখে ওই নামটাই জুতসই মনে হয়েছে।”
“আর এটার নাম দিয়েছ চিনে-চিংড়ি!” সিংহীর গর্জন বেলার কণ্ঠে। “চাইনিজ মশলা ছিল কোথাও, লিস্টে?”
“সেজন্য তো এ নাম নয়। এ নাম চিনেমাটির প্লেটে চিংড়ি দেখে।”
রাগে চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বেলার। “আর এই চামচ-পোস্তটা কী? তোমার মাথা?”
“এভাবে কথা বলছ কেন!” আশ্চর্য হই। “পোস্ত ছড়ানো কলাপাতার মাঝখানে এক পেল্লায় চামচ। এছাড়া আর চমকদার নাম কী হতে পারে এটার!”
ধপাস করে বেলা বসে পড়ল বিছানার ওপর। মুখে কথা সরল না তার। এই সুযোগে শেষ পদটির নামেরও ব্যাখ্যা রাখলাম আমি। “একই কারণে রুমালের ওপর সাজানো ইলিশ দেখে তার নাম দিয়েছি রুমাল ইলিশ। কী, জুতসই হয়নি?”
_____



গল্পঃ ব্যবস্থাঃ ঋজু গাঙ্গুলি



কাল রাতে ভদ্রলোক মাতাল ছিলেন। আজ ঠিকঠাক অবস্থায় থেকেও গোঁয়ার্তুমি কাটেনি তেনার। ‘লোকটা’কে নিকেশ করলে কেন পৃথিবী আরও সবুজ হবে, আকাশ আরও নীল হবে, ইত্যাদি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেই চলেছেন উইন্টার্স। ভ্যালে হিসেবে এর উত্তরে, ‘যা বলেছেন স্যার।’ বলা ছাড়া আমার আর কীই বা থাকতে পারে?
মিস্টার উইন্টার্স পয়সাওয়ালা, বদমেজাজি এবং কাল রাত থেকেই রেগে আগুন। উক্ত লোকটা হল লিয়্যান্ডার ম্যাককালাম। গতরাতে ক্লাবে জিন রামি খেলার সময় উইন্টার্সের জোচ্চুরি তিনি ধরে ফেলেন। ফলশ্রুতি হিসেবে কথা কাটাকাটি এবং হাতাহাতি হয়।
“লোকটাকে মরতেই হবে, বুঝলে ক্ল্যারেন্স।” পারলে আমাকে দিয়েই সাধ মেটাবেন, এমন একটা ভঙ্গি করেন উইন্টার্স। “তুমি এর জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করো।”
“আমি কী করতে পারি, আর পারি না সেটা আপনি জানেন মিস্টার উইন্টার্স।” যথাসাধ্য শান্তভাবে বলি, “খুন করাটা আমার দ্বারা হবে না।”
“আহা,” সোজা হয়ে বসেন উইন্টার্স। “আমি কি বলেছি তোমাকেই... মানে তুমি নিজেই খুনটা করবে? আমি বলেছি, তুমি এমন কাউকে খুঁজে দাও যে এই কাজটা করবে। মানে কোনও পেশাদার খুনি। তেমন কাউকে খুঁজে বের করাই হবে তোমার কাজ। বুঝলে?”
“আজ্ঞে।” বলে আমি কথাটা মাথা থেকে বের করে দিই। মিস্টার উইন্টার্সের ভ্যালে তথা আপ্ত সহায়ক হিসেবে আমি বেশ ভালো মাইনে পাই, ভালোভাবেই থাকি, কিন্তু সারাদিন ধরে লোকটার খেয়াল রাখা যে কী পরিশ্রমের কাজ তা যদি জানতেন! গোটা দিনটা তাতেই কাটল, কিন্তু পরদিন সকালে আবার প্রসঙ্গটা উঠল।
“তাহলে ক্ল্যারেন্স,” কফির কাপটা নামিয়েই উইন্টার্স আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কাউকে পেলে?”
“কী ব্যাপারে, স্যার?”
“আরে তোমাকে বললাম না কাল!” রেগে ওঠেন উইন্টার্স।
“ওহ্‌!” আমি যথাসাধ্য নির্বিকার ভঙ্গিতে বলি, “পেশাদার খুনিরা ইয়েলো পেজে লিস্টেড থাকে না, স্যার। আমি তাদের মধ্যে কাউকে কীভাবে...”
“ক্ল্যারেন্স,” উইন্টার্সের গলাটা বরফের মতো হয়ে গেল শুনে আমি প্রমাদ গোনি। “আমি তোমাকে যথেষ্ট মাইনে দিই। তোমার কাজটা খুব কষ্টেরও নয়। নাকি তোমার আর এই চাকরিটা করতে ইচ্ছে করছে না?”
“করছে, স্যার।” আমি সসম্ভ্রমে বলি, “চমৎকার চাকরি। বস হিসেবে আপনিও আদর্শ।”
“তাহলে শুনে রাখো। আগামী শুক্রবারের মধ্যে তোমাকে একজন খুনি জোগাড় করে দিতে হবে আমার জন্য। কথাটা খেয়াল থাকবে তো? আগামী শুক্রবার। তার মধ্যে একজন পেশাদার খুনিকে জোগাড় করে দিতে না পারলে তোমার চাকরি...” নিজের গলার ওপর দিয়ে আঙুলটা আলতোভাবে আড়াআড়ি চালান উইন্টার্স।
ভ্যালে হিসেবে চাকরি করার ফাঁকে আমাকে নানা উদ্ভট কাজ করতে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু খুনিকে ভাড়া করা? না, এ জিনিস আমি আগে করিনি। করার কোনও ইচ্ছেও নেই। এদিকে উইন্টার্সের মাথা ঠাণ্ডা না হওয়া অবধি কিছু একটা করে ওঁকে আটকাতে না পারলে সাধের চাকরিটি যাবে। কী করা যায়?
একটাই উপায়। আমাকে অভিনয় করতে হবে, যা থেকে মনে হবে যে আমি কোনও পেশাদার খুনির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি।

পরদিন সকাল। উইন্টার্স গলা খাঁকরে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, “তারপর?”
“আমি একজনকে খুঁজে পেয়েছি, স্যার।” ঠাণ্ডা গলায় বললাম।
“অ্যাঁ!” কাপটা টেবিলে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে আরেকটু হলেই সেটা টেবিল থেকে ফেলে দিচ্ছিলেন উইন্টার্স। “তুমি... মানে... একজন সত্যিকারের পেশাদার খুনির সন্ধান পেয়েছ?”
“পেয়েছি, স্যার।” আমি গম্ভীর গলায় বললাম। “এটা মাথায় রাখতে হবে, যে মানুষ একবার খুন করেছে সে আবারও খুন করতে পারে। দরকার হলে সে বারবার খুন করতে পারে। আমরা আখছার কাগজে পড়ি, অমুক খুনি বারো বছর জেল খেটে ছাড়া পেয়েছে। গতকাল সন্ধেবেলা আপনি যখন ক্লাব থেকে বহিষ্কৃত হবেন কি না সেই নিয়ে কমিটির কাছে বক্তব্য পেশ করতে গেছিলেন তখন আমি ‘সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্র’-র অফিসটিতে হানা দিই। চিফ এডিটরকে ম্যানেজ করে আমি পুরনো ফাইলগুলো নিয়ে বসি। ওরকম ছাড়া পাওয়া খুনিদের নামগুলো নোট করি। টেলিফোন কোম্পানিতে আমার চেনাজানা কয়েকজনকে বলে চুপচাপ একটু খোঁজখবর নিই। তারপর একজনকে খুঁজে পাই, যাকে দিয়ে আমাদের কাজ চলবে।
ভালো কথা, কমিটি কী সিদ্ধান্ত নিল স্যার?”
“ওরা এখনও ব্যাপারটা খতিয়ে দেখছে।” মুখ কালো করে বলেন উইন্টার্স, “আচ্ছা, এই খুনির কী নাম?”
আমার মার পিসির পদবিটা মাথায় আসে। মনে মনে স্বর্গত মহিলার কাছে মাফ চেয়ে আমি বলি, “মার্শেটি।”
উইন্টার্স উঠে পড়েন। কিন্তু একটু পরেই ফিরে আসেন একটা টেলিফোন ডাইরেক্টরি নিয়ে। “এখানে তো ছ’জন মার্শেটি আছে দেখছি। তুমি কোন জনের কথা বলছ?”
“প্রথমজন।”
“এ. মার্শেটি।” ভ্রূ কুঁচকে বলেন উইন্টার্স, “এই ‘এ’ মানে কী?”
“এঞ্জেলো।” আমি নির্বিকার মুখে বলি।
“হুঁ।” উইন্টার্স গম্ভীর হন। “এ কি মাফিয়াদের সঙ্গে যুক্ত?”
“অবশ্যই।” জনৈক এঞ্জেলো মার্শেটি আমার কথা শুনলে কী করতেন জানি না, জানতে চাইও না।
“আমি চাই আগামী শুক্রবার রাত আটটা থেকে বারোটার মধ্যে যেন ম্যাককালাম খুন হয়।” একটা সিগার জ্বালিয়ে সুখটান দিয়ে বলেন উইন্টার্স। “বুঝলে?”
“আগামী শুক্রবার?” আমার গলাটা শুকিয়ে যায়। “কিন্তু স্যার, যা জেনেছি তাতে তাড়াহুড়ো করে কাজ করাটা এঞ্জেলোর দস্তুর নয়। ও শিকারের সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে তারপর প্ল্যান করে, তারপর এগোয়। ধরুন দু’-তিন সপ্তাহ তো লাগবেই।”
“অসম্ভব!” রেগে ওঠে উইন্টার্স। “টাকা যখন আমি দিচ্ছি, তখন খুনটা কখন হবে সেটাও আমি ঠিক করব। আগামী শুক্রবার টমসনের বিবাহবার্ষিকী, তাতে আমন্ত্রিত হিসেবে আমি ওই সময় হাজির থাকব। একগাদা লোক সাক্ষী দেবে, ম্যাককালামকে আমি খুন করিনি।
ভালো কথা, একে কত দিতে হবে?”
আমি মরিয়া হয়ে সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলাম। অসম্ভব একটা দর হাঁকলে হয়তো উইন্টার্স পিছিয়ে যাবেন।
“এক লাখ ডলার স্যার।”
“এক... লাখ!” উইন্টার্স যে রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছেন, বেশ বুঝলাম। “তুমি এর চেয়ে সস্তায় কাউকে জোগাড় করতে পারলে না?”
“অত সময় আপনি আমাকে দেননি, স্যার।” ব্যাপারটাকে একটু খুঁচিয়েই দিই আমি। “আর এই পর্যায়ে এসে দরাদরি করলে ব্যাপারটা আপনার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে, স্যার। বোঝেনই তো, এরা কেমন লোক হয়।”
“অবশ্য সবকিছুরই যা দাম আজকাল।” সিগারটা চিবোতে চিবোতে বললেন উইন্টার্স। “ঠিক আছে, ক্ল্যারেন্স। আমি রাজী।”

সন্ধেবেলা আমার ডাক পড়ল। আশেপাশে কেউ নেই নিশ্চিত করে উইন্টার্স তাঁর ব্রিফকেসটা খুলে আমাকে দেখালেন, “এই যে। ছোটো ছোটো নোটে এক লাখ ডলার। এবার এটা দিয়ে ব্যাপারটা পাকা করো।”
আমি ব্রিফকেসটা নিয়ে নিজের ঘরে গেলাম। টাকাগুলো বের করে গুনলাম। হ্যাঁ, পুরো এক লাখ ডলারই বটে।
আমি কি টাকাটা নিয়ে পালিয়ে যাব?
না, সেটা নিরাপদ নয়। ওই টাকায় আমি হয়তো বছর দুয়েক কাটাতে পারব, কিন্তু আমার প্রতিনিয়ত ভয় হবে। চোরের ভয়। চোর বলে ধরা পড়ার ভয়। সঙ্গে এই আরামের চাকরিটাও যাবে।
তাহলে আমি কী করব? আমি কি টাকাটা উইন্টার্সকে ফেরত দিয়ে সত্যি কথাটা বলব, যে অ্যাঞ্জেলো মার্শেটি বলে কোনও খুনির সঙ্গে আমি যোগাযোগ করিনি? তারপর কী হবে? আমার চাকরিটা যাবেই। তাতে আমার সর্বনাশ হবে না ঠিকই, কিন্তু অসুবিধা হবে।
তাহলে?
আচ্ছা, আমিই কি এক লাখ ডলার নিয়ে খুনটা করে আসব?
তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি কি এক লাখ ডলার পেলে মানুষ খুন করতে পারি?
মিনিট পাঁচেক লাগল উত্তরটা খুঁজে পেতে।
এক লাখ ডলার পেলে আমি অতি অবশ্যই মানুষ খুন করতে পারি।

বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায় উইন্টার্স ক্লাবে একটা মিটিং সারতে বেরিয়ে গেলেন। আমি একা একা মদ্যপানের বিরোধী, কিন্তু সেদিন দু’পাত্তর চড়িয়েই ফেললাম। আর তখনই আমার মাথায় আইডিয়াটা এল।
খুনটা যদি কালকের বদলে আজকেই হয়?
আমি যখন মনস্থির করেই ফেলেছি, তখন শুভ কাজে বিলম্ব কেন?
উইন্টার্স আজ মাঝরাতের আগে ফিরবেন না। তাঁর অ্যালিবাই থাকবে একেবারে পোক্ত। এদিকে আমার হাতেও আর কোনও কাজ নেই।
উইন্টার্সের অস্ত্রশস্ত্রের সংগ্রহের পরিচর্যা আমাকেই করতে হয়। একটা রিভলভার নিলাম, গুলি ভরলাম, ডাইরেক্টরি ঘেঁটে ম্যাককালামের ঠিকানা জোগাড় করলাম। তারপর রওনা দিলাম।

শহরের ও-মাথায় একটা দশতলা বাড়িতে থাকে ম্যাককালাম। ফ্ল্যাট নম্বর ৭০৬। আমি চুপচাপ উঠে ঘরের বেল বাজালাম। ম্যাককালাম নিজেই দরজা খুলল।
মিস্টার উইন্টার্সের ভ্যালে হিসেবে আমাকে এর আগে ক্লাবের কিছু কিছু অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছিল। ম্যাককালাম তখন আমায় দেখেছিল। তবে নিজেকে অদৃশ্য করে রাখাটা আমাদের কাজের অঙ্গ, তাই ম্যাককালাম আমাকে চিনে ফেলবে বলে মনে হয়নি। তাই হল। দরজা খুলে ম্যাককালাম চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাকে চাই?”
কোটের পকেটে হাত দিয়ে গুলিভরা রিভলভারটাই নাড়াচাড়া করছিলাম এতক্ষণ। কিন্তু ম্যাককালামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম, গুলি চালানো তো দূরের কথা, রিভলভারটাই আমি পকেট থেকে বের করতে পারছি না।
একটা মানুষ খুন করা... না, আমার দ্বারা ওটি হবে না।
“এটা কি মিস্টার গ্যারিবল্ডির ফ্ল্যাট?” নার্ভাস হলেই আমি যে কেন ইটালিয়ান নাম ভাবি, কে জানে! আমার স্বর্গত মা এটা জানতে পারলে…
“না।” বিরক্ত গলায় বলে দরজা বন্ধ করে দিল ম্যাককালাম।

পরদিন সকালে নিজের চাকরি খোয়ানোর এবং নতুন করে কাজ খোঁজার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই নিজের ঘর থেকে নামলাম। মিস্টার উইন্টার্স ব্রেকফাস্ট করছিলেন। আমি ব্রিফকেসটা হাতে নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম।
“তাহলে ক্ল্যারেন্স,” কফির কাপটা নামিয়ে বললেন উইন্টার্স, “মার্শেটির সঙ্গে দেখা করতে বেরোচ্ছ বুঝি? তার আর দরকার হবে না। আমি ঠিক করেছি, খুনটা আর করাব না।”
আমি অতিকষ্টে ব্রিফকেসটা নিজের আলগা হাত থেকে পড়ে যাওয়া ঠেকালাম।
“হ্যাঁ।” গলা খাঁকরে বলেন উইন্টার্স। “ম্যাককালাম আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে এই বলে যে আমি জোচ্চুরি করছিলাম। আমি বলেছি, আমি ওসব কিচ্ছু করিনি। আর কোনও সাক্ষী নেই, কোনও প্রমাণ নেই। তাই ক্লাব কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছে, আমার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমিও ভাবলাম, ম্যাককালামকে মেরে ফেলার আর কোনও দরকার নেই।”
“ভাবলেন?” আমার গলাটা বোধহয় অনিচ্ছাসত্বেও একটু অন্যরকম হয়ে গেছিল, কারণ উইন্টার্সকে বেশ চমকে উঠতে দেখলাম। “আপনার কি মনে হয়, অ্যাঞ্জেলো ব্যাপারটা ভালোভাবে নেবে? তাছাড়া আছে মাফিয়ার প্রশ্ন। এসব পেমেন্টের অর্ধেকটাই মাফিয়া নিয়ে নেয়। সেই টাকাটা এভাবে মার গেলে ওরা কী ভাববে, সেটা ভেবেছেন?”
“তা অবশ্য ঠিক।” উইন্টার্সের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে। বুঝি, মোক্ষম জায়গায় চেপে ধরেছি লোকটাকে। “ঠিকই তো। শেষমুহূর্তে এভাবে ব্যাপারটা বাতিল করলে যেকোনও পেশাদারেরই খারাপ লাগবে, আর এরা তো... আচ্ছা বেশ। তুমি ওদের টাকাটা দিয়ে দাও, আর বলে দাও যে খুনটা আর করার দরকার নেই। তাহলে নিশ্চয় ওরা কিছু মনে করবে না?”
“পেনাল্টির কী হবে?”
“পেনাল্টি? কীসের পেনাল্টি?”
“অ্যাঞ্জেলো এরকম একটা কেসের কথা আমাকে বলেছিল, স্যার। এরকম হলে মাফিয়া ব্যাপারটাকে খুব বাজেভাবে নেয়। ওরা মনে করে, আপনি খুনের ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন না। আপনার কাছে এটা একটা খেলা ছিল। তার চেয়েও বড়ো কথা, ওরা ভাবতেই পারে, আপনি এসবের মাধ্যমে আসলে ওদের নিয়ে খোঁজখবর করছেন, হয়তো একটা বই লেখার জন্য!”
“হুঁ।” ঢোঁক গিললেন উইন্টার্স। “পেনাল্টি কত হতে পারে?”
“আরও এক লাখ ডলার, কমপক্ষে।”
“বেশ বেশ!” ঘাম-টাম মুছতে গিয়ে রুমালটা ভিজিয়েই ফেলেন উইন্টার্স। “মোট দু’লাখ ডলারই সই। কিন্তু এর চেয়ে এক পয়সাও বেশি আমি দিতে পারব না। হুঁহ্‌! খুনই হল না, এদিকে এতগুলো টাকা গচ্চা গেল। তুমি ব্যাপারটা মিটিয়ে দিও, বুঝলে ক্ল্যারেন্স!”
বুঝলাম আমি।
দু’’লাখ ডলারের শোক ভুলতে উইন্টার্সের কমপক্ষে একবছর লাগবে। তদ্দিন অপেক্ষা করি। টাকাটাও ব্যাঙ্কে একটু বড়ো হোক। তারপর এই তল্লাট থেকে কেটে পড়া যাবে, কী বলেন?

[মূল কাহিনিঃ দ্য ফেব্রিকেটর, লেখকঃ জ্যাক রিচি,
মে ২০০৯-এর ‘আলফ্রেড হিচকক’স মিস্ট্রি ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত]

_____

গল্পঃ মহীপতিঃ অরিন্দম দেবনাথ


অরিন্দম দেবনাথ


প্রাচীন বটগাছের ঘন ছায়ার নিচের রাজাসনে চোখ বুজে বসে আছেন পক্ষীকুলের মহীপতি। এই গাছের কোটরেই তাঁর বাস। এই গাছই তাঁর রাজপ্রাসাদ। তরুতলে মাথা তুলে থাকা একটি কালো পাথর তাঁর রাজাসন।
মহাধিপতি পেচক গম্ভীর প্রকৃতির নভশ্চর। দিনের আলো চোখে সহ্য হয় না বলে চোখ বুজে থাকেন প্রায় সবসময়। কীই বা করবেন? বিচারের জন্য কিম্বা অভিযোগ জানাতে পক্ষীকুল তাঁর কাছে হাজির হয় দিনের আলোতেই।
কিছুদিন হল রাজাসনে বসার সময় তিনি একটি মোতির মালা গলায় পরে নেন। এই মোতির মালাটা তাঁকে দিয়েছেন তাঁর মন্ত্রীーরাজপ্রাসাদের কাছে ওকগাছের মন্ত্রীপুরে থাকা ন্যাড়া ঈগল। তিনি এই মালাটা পেয়েছেন হেতমগরের রাজবাড়ির ছাদে। একদিন এই মোতির মালা পরে হেতমগরের রাজা একা ছাদে পায়চারি করছিলেন। সেই সময় ন্যাড়া ঈগল বসে ছিলেন রাজপ্রাসাদেরই চুড়োর গম্বুজের মাথায়। হঠাৎ মহামন্ত্রী এসে রাজার কানে কিছু বলতে রাজামশাই, “দুত্তোর! রইল তোর রাজপাট, এই ঝকমারি আর পোষায় না। আমি রাজাসন ছেড়ে কাজের কাজ করতে চললাম।” বলে মোতির মালা গলা থেকে ছুড়ে ফেলে দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে চলে গেছিলেন। সেই মালাটাই ন্যাড়া ঈগল ঠোঁটে করে এনে পেচকরাজাকে গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “নিদেন একটা মোতির মালা না হলে আমাদের রাজামশাইকে মানাচ্ছে না। আমরা পাখি বলে কি ওই দো-পেয়েদের থেকে কিছু কম?”
এর কিছুদিন পর একদিন হেতমগরের মন্ত্রীও তাঁর বাসভবনের ছাদে ভরদুপুরে কপাল চুলকাতে চুলকাতে একা হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় কানের কাছে সেনাপতি এসে ফিসফিস করে কিছু বলতেই মন্ত্রীমশাই গলার সোনার হার ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, “দুত্তোর! রইল তোর মন্ত্রীত্ব। আমিও মন্ত্রিপদ ছেড়ে চললাম রাজামশাইয়ের সাথে কাজের কাজ করতে।”
সেই মালাটা ন্যাড়া ঈগল গলায় পরে পেচকরাজার কাছে এসে বলেছিলেন, “পেন্নাম রাজামশাই, আমিও মানুষ মন্ত্রীর মতো গলায় একটা সোনার হার পরে নিয়েছি। না হলে আপনার মান থাকছিল না।”
পেচকরাজা বলে উঠলেন, “যাই বলো না মন্ত্রীপ্রধান, রাজা হওয়া কিন্তু খুব সুখের নয়। দু’দণ্ড যে ঘুমোব তার উপায় নেই। সবসময় কোনও না কোনও সমস্যা লেগেই আছে।”
“কিন্তু রাজামশাই, আপনার তো রাজকর্মের নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময়ের বাইরে কোনও কিছু না করলেই হল।” ন্যাড়া ঈগল বললেন।
“তা কি হয়, মন্ত্রীপ্রধান! এই তো পরশু রাতে আমি সবে ব্যাঙের পা দিয়ে রাতের খাবার শেষ করতে চলেছি, তুমি এসে হাজির হলে তোমার বাসার সমস্যা নিয়ে। তোমার বাসা নাকি আর আরামদায়ক নয়। ব্যাপারটা এতই তুচ্ছ যে আমার কাছে তোমার অত রাতে এই বিষয় নিয়ে আসার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। তোমাকে কি আমি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলাম?”
রাজার এই কথা শুনে ন্যাড়া ঈগল চুপ করে রইলেন। সত্যিই তো, এই সামান্য ব্যাপারে রাজামশাইয়ের কাছে যাওয়া তাঁর উচিত হয়নি। তিনি নিজেই গৃহমন্ত্রকের মন্ত্রী বাবুইকে বলে বাসা ঠিক করিয়ে নিতে পারতেন। ইদানিং কী যে হয়েছে তাঁর!
মন্ত্রীপ্রধানকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে পেচকরাজা প্রসঙ্গ ঘোরালেন। “তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে মন্ত্রীপ্রধান, যে পশ্চিমের জঙ্গল কেটে হেতমগরের মানুষেরা বাসস্থান বানান শুরু করেছে? ফলে পক্ষীকুল বসত হারাচ্ছে!”
দু’পাশে ডানা ঝাপটিয়ে উশখুশ করে উঠলেন ন্যাড়া ঈগল। এই রে, হেতমগরের মন্ত্রীর সোনার হার পেয়ে বেমালুম ভুলে গেছেন রাজামশাইয়ের সাথে বিষয়টা আলোচনা করতে!
“রাজামশাই, আমি খানিক ভেবেছি বটে। আমাদের মানুষের বসতির আনাচে-কানাচে থাকতে হবে আর কী।”
“সে কী বলছ, মন্ত্রীপ্রধান? হাজার হাজার পাখি বসতির আনাচে-কানাচে থাকবে? কিছু কাক-শালিক-চড়াই-ঘুঘু না হয় ওখানে ঠাঁই পাবে, বাকিরা?”
তীক্ষ্ণ নখওয়ালা পা বেঁকিয়ে খানিক মাথা চুলকিয়ে মন্ত্রীপ্রধান বললেন, “মানুষরা তো তাদের বসত বানাবেই রাজামশাই, ওখানেই যেন বেশি সংখ্যক পক্ষীকুল একটু মানিয়ে থেকে যায় তার জন্য বোঝাতে হবে...”
“সে কি! মন্ত্রীপ্রধান, তোমার হল কী? মানুষের বাসায় পাখি থাকবে? খাবে কী?”
“কাক-শালিকের কি আর খাবারের অভাব হয়, রাজামশাই!”
“না না ন্যড়া ঈগল, এটা মন্ত্রীপ্রধানের মতো কথা হচ্ছে না। ভেবে দেখো বাবুইয়ের কী হবে, তোতা, মুনিয়া কোথায় থাকবে। মাছরাঙা, ডাহুক, শ্যামা, হাঁড়িচাচা... তার থেকেও বড়ো কথা, ধরো আজ হেতমগরের লোকেরা যদি ওকগাছটা কেটে দেয় তাহলে তুমি কোথায় যাবে? তুমি কি মানুষের ইট-পাথরের বাড়ির মাথায় থাকতে পারবে? খাবে কী?”
রাজামশাইয়ের কথা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলেন মন্ত্রীপ্রধান। সত্যি তো, ওকগাছ চলে গেলে সে যাবে কোথায়?
“তাহলে উপায়, রাজামশাই? মানুষের জঙ্গল কেটে বাড়ি বানানো কি আর আমরা আটকাতে পারব?”
“তুমি কি কিছু উপায় ঠাউরেছ, মন্ত্রীপ্রধান?”
ন্যাড়া ঈগল উপায় আর কী বলবেন। হেতমগরের মন্ত্রীর ছুড়ে ফেলা সোনার হার পরে সে সব ভুলেই গেছিলেন। জঙ্গল যে কাটা হচ্ছে তা তো নিজের চোখেও দেখেছিলেন তিনি। তাঁর বা অন্যান্য পাখিদের যে বিপদ আসছে একথা তাঁর একবারও মনে আসেনি। তাঁর নিজের বাসা ওকগাছ কাটা পড়লে যে কী হবে! ভাবতেই আতঙ্কে কেঁপে উঠল তাঁর ডানা।
বিজ্ঞ পেচকরাজা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আরও কিছুদিন আগে যদি বিষয়টা জানতাম!”
লজ্জায় ডানার আড়ালে মুখ লুকোলেন মন্ত্রীপ্রধান। ছিঃ ছিঃ, সোনার হারের দর্পে মন্ত্রীপ্রধানের ধর্ম পালন করেননি উনি! জঙ্গল উচ্ছেদের কথা রাজামশাইকে জানানো উচিত ছিল। গাছ কাটার পরিণতি যে কী হতে পারে ভেবে দেখেননি উনি। এখুনি পক্ষীপ্রজা ও মন্ত্রীসভার বাকি সদস্যরা এসে পড়বে। পক্ষীকুল যদি মন্ত্রীপ্রধানের কর্মে অমনোযোগের কথা জানতে পারে তবে কি আর তাঁকে মন্ত্রীপদে থাকতে দেবে? 
ডানা নাড়িয়ে, ঠোঁট দিয়ে দু’বার পা ঠুকরে ন্যাড়া ঈগল বলে উঠলেন, “তাহলে আমাদের কী করা উচিত রাজামশাই, যুদ্ধ?”
“আহ্‌ মন্ত্রীপ্রধান!” গর্জে উঠলেন পেচকরাজ। “মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ? আর যুদ্ধ করে কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে শুনি?”
“তাহলে উপায়! বাসস্থান হারিয়ে খাদ্যের অভাবে কি আমরা মারা যাব?”
“মন্ত্রীপ্রধান, তুমি দিন দিন তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়ছ। আগে তো হতাশ হতে না! পক্ষীকুলের কেউ বিপদে পড়লে আগে উড়ে যেতে তুমি। ঝড়ে কারও বাসা ভাঙলে ঠোঁটে করে ডালপালার টুকরো নিয়ে বাসা বানিয়ে দিতে। পক্ষীকুল কিছুই ভোলেনি মন্ত্রীপ্রধান, চলো, মৃত্যুচিন্তা না করে কিছু করা যাক।”
রাজামশাইকে লুকিয়ে গলা থেকে সোনার হারটা খুলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মন্ত্রীপ্রধান। এই ধন প্রদর্শন করতে গিয়েই নিজের কাজে অমনোযোগী হয়ে পড়ছিলেন তিনি।
“হুকুম করুন, প্রাজ্ঞ পেচক। আমি নিরাশাবাদী নই। সোনার প্রভাবে খানিক দিকভ্রষ্ট হয়েছিলাম মাত্র।”
“শোনো মন্ত্রীপ্রধান, মানুষ অরণ্য ধ্বংস করবে এতে আর আশ্চর্য কী? আমরা আছিই তো নতুন অরণ্য সৃষ্টিতে। প্রকৃতি আমাদের তৈরি করেছেন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে। সমস্ত পক্ষীকুলকে বলো হেতমগরের সব গাছ কেটে ফেলার আগে গাছের ফল ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে রুক্ষ প্রান্তরে ছড়িয়ে দিতে। বর্ষা আসছে। ওই ফলের বীজ থেকে জন্ম হবে নতুন গাছের। সেই গাছে গাছে আমরা গড়ে তুলব আমাদের নব-আলয়। আর দেরি নয়, মন্ত্রী প্রধান।”
তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলে সাথীদের ডাকতে হাওয়ায় ডানার ঝাপটা মেরে উড়ে যাওয়ার আগে মন্ত্রীপ্রধান বললেন, “প্রণাম রাজামশাই, আজ বুঝলাম মহীপতি সবাই হতে পারে না।”
_____

অলঙ্করণঃ রাখি পুরকায়স্থ