আমার স্কুলঃ আমার পাঠশালা জীবন (২য় পর্ব) সুস্মিতা কুণ্ডু


দ্বিতীয় পর্ব

আগেরবার গল্প বলেছিলাম এক পাঠশালার, যেখানে আমি ছোটোবেলায় পড়েছিলাম। আজ বলব এমন বেশ কয়েকটা পাঠশালার গল্প যেখানে আমি পড়িনি। ভাবছ তো এ আবার কেমন? আমি যে ইস্কুলে পড়িইনি সেই ইস্কুলের গল্প আবার কী করে বলব! আসলে আমাদের ছোটোবেলাটা একটু অন্যরকম ছিল। সেই বিশ-তিরিশ বছর আগে ইস্কুল-কলেজের অনেক কম নিয়মকানুন ছিল। এত কড়াকড়ি ছিল না। তাই যখন দেশের বাড়ি, মানে আমার বাবার আরামবাগের গ্রামের বাড়িতে যেতাম তখন প্রায়ই জেঠতুতো দাদাদিদির হাত ধরে চলে যেতাম ওদের স্কুলে। অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই সেই সুযোগ হত না কারণ, আমি যখন স্কুলের ছুটিতে যেতাম দেশের বাড়ি তখন ওদেরও স্কুল ছুটি থাকত। তবে মাঝেমধ্যে এক-দু’দিনের এদিক-ওদিকের জন্য সুযোগটা এসেই যেত। শুধু দাদাদিদির স্কুলই নয়, অনেক সময় চলে যেতাম জেঠু বা পিসির স্কুলেও। এক এক করে সব গপ্পো শোনাই তাহলে।
আমার ঠাকুরদার সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার জন্মের আগেই তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পরে আমার পিসিও ওই স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন। আমাদের গ্রামের বাড়িটি থেকে ঠাকুরদা এবং পিসিমণির সেই স্কুল ছিল প্রায় কিলোমিটার দুয়েক দূরের পথ। পিসিমণিকে দেখতাম সাদা অথবা খুব হালকা রঙের খোলের সরু পাড় শাড়ি পরে রওয়ানা দিত সক্কাল সক্কাল। গরমকালে ছিল মর্নিং স্কুল আর বছরের বাকি দিনগুলো দশটায় স্কুল। অতটা পথ পিসিমণির হাত ধরে, সবুজ ধানক্ষেতের মাঝের হলদে মাটির আল ধরে হেঁটে হেঁটে ঠিক পৌঁছে যেতাম। দিদিমণির ভাইঝি বলে বেশ ভাবসাব হয়ে যেত সকলের সঙ্গে।
আর বেশি কিছু মনে না থাকলেও মনে আছে, পিসিমণিরই শিক্ষিকা সহকর্মী এবং প্রিয় বন্ধু শিউলিপিসির কথা। শিউলিপিসিদের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল একবার পিসিমণি। সেখানেই প্রথম খেয়েছিলাম ঘরের গরুর দুধ থেকে বানানো খাঁটি ঘি দিয়ে মাখা ফুলকো ফুলকো সাদা মুড়ি। তার ওপর মোটা দানার চিনি আর নারকেল-কোরা ছড়ানো। সে কী অপূর্ব স্বাদ!
এ তো গেল ঠাকুরদার আর পিসিমণির ইস্কুলের কথা।
এবার আসি জেঠুর ইস্কুলের গল্পে। জেঠুও ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তবে জেঠুর স্কুল দু’কিলোমিটার নয়, অনেকটাই দূরে ছিল। সাইকেলে চেপে যেতে হত জেঠুকে। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পরা মানুষটা দিব্যি গড়গড়িয়ে সাইকেল চালিয়ে ইস্কুলে যেত। জেঠুকে না জানি কেন একটু ভয়ই পেতাম। আসলে জেঠু শুধু স্কুলেই নয়, বাড়িতেও টিউশন পড়াত। রোজ সকালে ছাদে মাদুর পেতে পাড়ার জনা দশেক ছেলেমেয়ে বসত জেঠুর কাছে পড়তে। আমি ভুলেও ধারে পাশে ঘেঁষতাম না। তার কারণ জেঠুর হাতের তালপাতার পাখাটি। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সবসময়ই লাল শালুর ঝালর দেওয়া পাখাটি হাতে থাকত। বাতাস করার কাজে মোটেই লাগত না সেটি। অঙ্ক ভুল হলেই ঠাই করে নেমে আসত পড়ুয়ার মাথায়। এরপরেও আর কেউ জেঠুর ছায়া মাড়ায়? তবে জেঠুর সাইকেলে চেপে পা দোলাতে দোলাতে জেঠুর ইস্কুলেও ঘুরে এসেছিলাম একবার। তখন জেঠুর হাতে তালপাতার পাখাটি ছিল না কিনা!
অন্য নানা স্কুলে বেড়িয়ে এলেও সবচেয়ে মজা পেতাম দিদির স্কুলে যেতে। দিদি তখন হাই স্কুলে পড়ে। শাড়ি পরে স্কুলে যেত। ক্লাস নাইন হবে বোধ করি। আমি তখন সিক্স। শাড়ি পরা বড়ো দিদির স্কুলে যাওয়ার মজাই আলাদা। ছয় ক্লাসের ছাত্রী হয়েও দিব্যি নয় ক্লাসের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়তুম, নয়ছয় ব্যাপার যাকে বলে। দিদির বন্ধু অন্য দিদিরাও খুব ভালোবাসত। দিদির বেস্ট ফ্রেণ্ড ছিল আমিনাদিদি। নানারকম খাবার এনে খাওয়াত আমাকে। আলাদাই খাতির সবার কাছে। আজও পুরনো অ্যালবামের কোনও এক খোপে দিদির বন্ধুদের সাথে একসাথে তোলা একটা ছবি আছে মনে হয়। অবাক লাগে ভাবতে, এই মানুষগুলোকে হয়তো কোনওদিন আর দেখতে পাব না বা দেখতে পেলেও চিনতে পারব না হয়তো। ওরাও বুঝতে পারবে না যে এটাই সেই টুটুলের বোন মিতুল।
আর একটা ইস্কুলের কথা বলে আজ গল্প শেষ করব। আমাদের দেশের বাড়ির গ্রামের ভেতরেই ছিল একটা পাঠশালা। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর অবধি। বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যেত চণ্ডীমণ্ডপের লাগোয়া পাঠশালা। ওই চণ্ডীমণ্ডপেই গ্রামের সবেধন নীলমণি দুর্গাপুজোটিও হত। স্কুল বলতে একটাই টানা হলঘর। এই ক্লাসের পড়া ওই ক্লাসে শোনা যেত। কখনও বা মাস্টারশাইরা একসাথে দুটো ক্লাসে হেঁটে বেড়িয়ে পড়া ধরতেন। এক ক্লাসের ছেলেমেয়ে চেঁচিয়ে নামতা পড়তে শুরু করলে অন্য ক্লাসের ছেলেমেয়েরা পদ্যের লাইন গুলিয়ে ফেলত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, ক্লাসে কোনও বসার বা বইখাতা রাখার বেঞ্চ ছিল না। মাটিতেই বসতে হত। পড়ুয়ারা নিজের নিজের বাড়ি থেকে পাটের বস্তা সঙ্গে নিয়ে পাঠশালায় যেত। সেই পেতে বসে পড়াশোনা সেরে আবার ভাঁজ করে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসত।
তখন বেশ অনেকটাই ছোটো আমি। দাদাদিদির সাথে চটের বস্তা নিয়ে গুড়গুড় করে হাজির হয়েছি পাঠশালায়। মাস্টারমশাইয়ের কাছে দাদাদিদি আমায় নিয়ে গেল। সগর্বে বলল, “এই আমাদের বোন। ও-ও আজ আমাদের ইস্কুলে পড়বে।”
মাস্টারমশাই অবাক হয়ে বললেন, “তোরা তো দুই ভাইবোন বলেই জানতাম।”
জেঠতুতো দাদা আর দিদি জোরদার মাথা নেড়ে বলেছিল, “না না, আমরা তিন ভাইবোন তো! ও আসলে এখানে থাকে না, অনেক দূরে থাকে। ছুটি পড়লে তবেই আসে।”
তারপর?
তারপর আর কী? আমিও দিব্যি সারাদিন পাঠশালায় চট পেতে বসে পড়াশোনা করে বাড়ি চলে এলাম দাদাদিদির হাত ধরে। 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment