গল্পঃ খতরনাক খেলঃ অরিজিৎ ভট্টাচার্য



এক

গ্রামের নাম বকুলপুর। পুরুলিয়া শহর থেকে দশ মাইল দূরে অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। এত অপরূপা এখানকার প্রকৃতি যে, যেন মনে হয় কোনও সুনিপুণ চিত্রশিল্পীর সুদক্ষ হস্তে অঙ্কিত সুদৃশ্য ল্যান্ডস্কেপ। এক ঝলক দেখলেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। আর বিকালে তো প্রকৃতিরানি আরও অনুপমা হয়ে ওঠেন। বয়ে যায় মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেওয়া ফুরফুরে হাওয়া। অস্তমিত সূর্যের রক্তিমায় মনে হয় কেউ যেন পশ্চিম দিগন্তে একমুঠো আবির ঢেলে দিয়েছে। পাহাড়ের কোলে শাল-পিয়ালের জঙ্গল অনন্ত শ্যামলিমা নিয়ে যেন কোনও এক স্বর্গীয় সঙ্গীত শোনায়। আর আছে পলাশ। বসন্তকালে লাল ফুলে ভরে যায়। যেন মনে হয়, প্রকৃতির বুকে কামনার আগুন জ্বলে উঠেছে।
অরণ্যের শ্যামলিমা, পলাশের রক্তিমা ছাড়াও যেটা রয়েছে সেটা হল এক অদ্ভুত পাথুরে পরিবেশ যেটা বাংলার সবুজ শ্যামল পরিবেশের সাথে খুব একটা মিল খায় না। যেমনি রূপে অনন্যা এখানকার প্রকৃতি, তেমনি সুন্দর এখানকার সহজ সরল আদিবাসী মানুষদের মন। না আছে তাদের মধ্যে কোনওরূপ যান্ত্রিকতা, না আছে কোনওরূপ কৃত্রিমতা। তারা সকলেই যে প্রকৃতি মায়ের সন্তান। দিনে হাড়ভাঙা খাটুনি করা, আর রাতে রুটি আর বাজরা দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, এভাবেই চলে তাদের জীবন। তারা পাথরকে পূজা করে, পাথরকেই দেবতা বলে মানে। কিন্তু কিছুদিন হল এই অঞ্চলের সরল মানুষদের সরল মনে জন্ম নিয়েছে এক বিভীষিকা।
আগে ছিল বিহারের মানভূম, এখন হয়েছে আমাদের পশ্চিমবাংলার পুরুলিয়া। রাজ্য বদল হলেও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি এখানে। তবে বর্তমানে ইলেকট্রিসিটি এসেছে। আদিবাসী ছোটো ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে পিঠে বইভরা ব্যাগ ঝুলিয়ে একঝাঁক আলোকশিখার মতো স্কুলে যেতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় তৈরি হয়েছে গ্রামের পাশে ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে। সেই হাইওয়ের একদিকে পুরুলিয়া শহর, আরেকদিকে ঝাড়খণ্ড। মোটামুটি বলতে গেলে, পাথরের রাজ্যে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু এইসব সুন্দর সুন্দর জায়গাতেই অনেক কুৎসিত ঘটনাবলি ঘটতে থাকে। একমাস হল এলাকার বাসিন্দাদের মনে শান্তি নেই। এক অজানা আতঙ্কে কাঁপছে গোটা গ্রাম।
আতঙ্ক শুরু হয় আগের মাসের কুড়ি তারিখ, শনিবার দুপুরে। স্কুল থেকে দল বেঁধে পাহাড়-জঙ্গলের গা বেয়ে ফিরছিল পড়ুয়ারা। গ্রামের কাছে এসেই তাদের চোখে পড়ল পরিবর্তনটা। আগে সোজা রাস্তা তাদেরকে গাঁয়ে পৌঁছে দিত। কিন্তু এখন রাস্তা হয়ে গেছে দু’ভাগ। একভাগ গিয়েছে ডানদিকে, মানে যেখানে অযোধ্যা পাহাড়ের মাঠাবুরু, আরেকটা পথ গিয়েছে বামদিকে যেখানে বাবলা আর ফণীমনসার জঙ্গল আর নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। আর তাদের গ্রামের দিকে যাবার তো কোনও রাস্তাই নেই। চমকে গেল বাচ্চারা। আগের দিনও তো রাস্তাটা সোজা তাদের বকুলপুর গ্রামে পৌঁছে দিয়েছে। তাহলে মাত্র একদিনে এতটা পরিবর্তন! এ কি বাস্তব, নাকি পাহাড়ের ইন্দ্রজাল? বড়োদের কাছে তারা গল্প শুনেছে যে, এইসব শাল-সেগুনের গভীর অরণ্যে দেবতারা থাকেন। সেই দেবতা মানুষের ওপর ক্ষিপ্ত যখন হন, তখন তিনি তাদের এইভাবে বিভ্রান্ত করেন। গভীর অরণ্যে এইভাবে পথ হারাতে হয় তাদের।
তার থেকেও বড়ো আশ্চর্যের ব্যাপার, এই বুড়ো লোকটা কোথা থেকে এল! ষাট-পঁয়ষট্টি বছর বয়স, গাল তোবড়ানো, চোখ কোটরে ঢুকে গিয়েছে, রোগা শরীর, মাথায় পাগড়ি। পরনে নোংরা একটা ফতুয়া আর ব্রিটিশ আমলের ঢলঢলে হাফ প্যান্ট। ছেলেরা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বুড়ো লোকটা তার হলদেটে দাঁতগুলো বের করে অদ্ভুত এক ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বলল, “আরে, এটাই তো পাহাড়ের মায়া। আর এই মায়াকে ছিন্ন করলে তবেই তোমরা বাড়ি পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু যাই হয়ে যাক না কেন, পিছনে তাকালে একদম চলবে না। আর পাথরের রাজ্যে নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে।”
বলেই সাইকেল নিয়ে চলে গেল বুড়ো লোকটা। বলতে গেলে ফণীমনসার ঝোপের আড়ালে অদৃশ্যই হয়ে গেল। আর নিজের মনে বাবলা-ফণীমনসার ঝোপের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগল ছেলেমেয়ের দল। মনে মনে জপতে লাগল বোঙাদেবের নাম।
কিন্তু এ কি আলাদা এক জগত! আশেপাশের চারদিক কেউ যেন নেগেটিভ ফিল্টার দিয়ে এডিট করে দিয়েছে। সবুজ বনানী আর পাহাড়কে কালচে দেখাচ্ছে। দুপুরবেলা, আকাশে মেঘও নেই, কিন্তু দিনের আলো এমনিভাবে ফিকে হয়ে এসেছে কেন! মনে হচ্ছে যেন গোধূলি। অপার্থিব ফিকে নীলচে আলোয় ভরে গেছে চারপাশ। বইছে ঠাণ্ডা হাওয়া। সেই হাওয়া যেন ইহজগতের নয়, উঠে আসছে নরকের কোন অতল থেকে। চারপাশ ছেয়ে গেছে এক অপার্থিব হাসনুহানার গন্ধে, কিন্তু আশেপাশে তো কোনও হাসনুহানা গাছও নেই। আর সহ্য করতে পারল না নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো। বাবা-মায়ের নাম ধরে চেঁচাতে শুরু করল। কান্নায় ভেঙে পড়ল তারা। কিন্তু অরণ্যে রোদন। কেউ সাড়া দিল না তাদের এই ক্রন্দনে। এ যেন আলাদা এক জগত। আকাশ কেমন যেন অদ্ভুত এক গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। উড়ে বেড়াচ্ছে অনেকটা শকুনের মতো দেখতে কিছু পাখি। শকুন তো এত বড়ো হয় না! লম্বা ঠোঁট, পায়ে ধারালো নখর। আশেপাশে শুধু কবর আর কবর। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা, যেন পৌঁছে দেবে তাদের অনন্ত নরকে।
না, সেইদিন আর গ্রামে ফেরেনি পড়ুয়া ছেলেমেয়ের দল। তাদের বাবা-মায়েরা কত কেঁদেছে, কত খুঁজেছে পাহাড়-জঙ্গলে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায়নি তাদের। কেউ যেন তাদের স্রেফ মুছে দিয়েছে বকুলপুরের চিত্রপট থেকে। কান্নায় ভেঙে পড়ল গোটা গ্রাম।

এর পরের ঘটনাটা ঘটল গাঁয়ের ঝিন্দারাম মুণ্ডার সাথে। ঝিন্দারাম শনিবারের দুপুরে ছুটি নিয়ে পুরুলিয়া শহর থেকে গাঁয়ে ফিরছিল। সামনের দৃশ্য দেখে চমকে উঠল ঝিন্দারাম। রাস্তা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু এই রাস্তায় তো সে আগের দিনই পুরুলিয়া এসেছে! তখন তো রাস্তা একটাই ছিল। একদিনে এত পরিবর্তন! আচ্ছা, সে রাস্তা ভুল করেনি তো? এই তো একটা বুড়ো লোক, যেন হাওয়া থেকে উঠে এসেছে। আচ্ছা, একে জিজ্ঞাসা করলে কেমন হয়?
ঝিন্দারামকে অবাক করে বুড়ো লোকটা বলে উঠল যে ও রাস্তা ভুল করেনি, দুটো রাস্তাই ওকে গ্রামে পৌঁছে দেবে। সেজন্য ওকে প্রথমে চক্রব্যূহ নামক এই মরণখেলায় জয়ী হতে হবে। থাকবে অনেক ফাঁদ, অনেক প্রলোভন। কিন্তু এতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে চলবে না। এই খেলায় সফল হলেই সে পৌঁছে যাবে তার গাঁয়ে, কিন্তু বিফল হলেই সে হারিয়ে যাবে নিজের সময় থেকেই।
তখনই ঝিন্দারামের কৌতূহলী নজর খুঁজে নিল সেই দৃশ্য, যা দেখতে অক্ষম হয়েছিল গাঁয়ের নিরীহ ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা। বুড়োর গোড়ালি উলটো, আর সেখানে বড়ো বড়ো লোমের গোছা। ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হল না ঝিন্দারামের। সে বুঝতে পারল স্বয়ং শয়তান তাকে মরণখেলায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দু’সপ্তাহ আগে স্কুলের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের সাথে কী হয়েছে, পরিষ্কার মনে আছে ঝিন্দারামের। সেদিন তো এরকমই এক শনিবারের বারবেলা ছিল। ছেলেমেয়েদের এই দলে তার ভাইপোও ছিল। স্কুল থেকে বেরিয়ে তারা বাড়িতে ফেরেনি। নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। তাহলে এটাই কি সেই অলৌকিক ফাঁদ!
বুড়োকে অবাক করে দিয়ে পুরুলিয়ার দিকে ছুটতে শুরু করল ঝিন্দারাম। পেছন থেকে ভেসে এল বুড়োর অপার্থিব হাসির খিলখিল শব্দ।

দুই

হাতিবাগানে নিজের বাড়িতে বসে ব্ল্যাক কফি খাচ্ছিল সুনীপ। বিকেলবেলা। রূপকুণ্ডের রহস্যভেদের পর কলকাতা শহরে এখন অ্যাডভেঞ্চারার হিসাবে সুনীপের খুব নাম হয়েছে। কোরবাতে দুর্জন সিং, আর রূপকুণ্ডে তান্ত্রিক অঘোরীচণ্ডের সাথে ডুয়েলে সুনীপের সাফল্যের কাহিনি সারা পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা দেশে সুনীপ সাহা এখন সাহসিকতার প্রতীক। ডার্ক ওয়ার্ল্ড আর ডার্ক ফ্যান্টাসির রহস্য সমাধানে সুনীপের সত্যিই জুড়ি মেলা ভার। প্রচুর ফলোয়ার তৈরি হয়েছে এখন সুনীপের। অসীম সাহসিকতার জন্য রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছে। এই সুনীপের কাছেই এখন সাহায্য পাবার আসায় পুরুলিয়া থেকে এসেছে সাঁওতাল যুবক ঝিন্দারাম।
ঝিন্দারামের মুখ থেকে ঘটনাবলি শুনে ব্যাপারটা মোটামুটি পরিষ্কার হল সুনীপের কাছে। মনে পড়ল ফিজিক্সের জিরো এনার্জি ইউনিভার্স বা ব্রহ্মাণ্ডের মোট শক্তি শূন্য হবার তত্ত্ব। হ্যাঁ, ডার্ক এনার্জি ওয়ার্ল্ড বা অন্ধকার শক্তির এক জগত। ফিজিক্সের থিয়োরিও স্বীকার করে এর অস্তিত্বের কথা। অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতোই, কিন্তু ডার্ক এনার্জি বা নেগেটিভ এনার্জি দিয়ে পূর্ণ। এর নেগেটিভ এনার্জি যদি আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পজিটিভ এনার্জির সাথে যোগ করা হয়, তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের মোট শক্তির পরিমাণ শূন্য হবে। যেমন ভালো সত্ত্বা আর খারাপ সত্ত্বা মিলে একজন মানুষের মধ্যে বৌদ্ধিক ভারসাম্য তৈরি করে, তেমনই পজিটিভ আর ডার্ক ওয়ার্ল্ড এই সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে। এটা পদার্থবিদ্যারই কথা।
সুনীপের যেটা মনে হল সেটা হল, কোনওভাবে মাঠাবুরুর এই অঞ্চলটাতে আমাদের পরিচিত জগতের সাথে ডার্ক ওয়ার্ল্ডের কোনও একটা লিঙ্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে। আর এই বুড়োটা হতে পারে ডার্ক ওয়ার্ল্ডেরই কোনও প্রাণী। আর এই লিঙ্কটাই হয়তো চক্রব্যূহ। যারা ঐ লিঙ্কে হারিয়ে যায়, তারা আর ইহজগতে ফিরতে পারে না। যেমনটা হয়েছে গ্রামের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে। কিন্তু সুনীপও প্রতিজ্ঞা করেছে যে বাচ্চাদের উদ্ধার সে করবেই। ফিরিয়ে আনবে তাদের গ্রামে। হ্যাঁ, রূপকুণ্ডের পর এটাই তার নেক্সট মিশন।

রাতের হাওড়া আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার চেপে পরের দিন ভোরে ঝিন্দারামের সাথে পুরুলিয়া পৌঁছাল সুনীপ। কোনও বন্ধুকে সাথে নেয়নি এবার। বন্ধুদের জানিয়েছে, কয়েকদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে গ্রামে বেড়াতে যাচ্ছে। এটা তার একার মিশন।
পুরুলিয়া শহরে খাওয়াদাওয়া সেরে সেখান থেকে ট্রেকারে মাঠাবুরু। সেখান থেকে হাঁটাপথে যখন বকুলপুরে পৌঁছাল, তখন সূর্যদেব অস্তাচলে ঢলে পড়ছেন। গোধূলির হালকা গোলাপি রোম্যান্টিক এক আলো। সন্ধ্যা আগত প্রায়। শিয়ালের হুক্কাহুয়া আর ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছে।
গ্রামবাসীদের সাথে আলাপ করল সুনীপ। একটা ব্যাপার দেখে অবাক হয়ে গেল যে, গ্রামবাসীরা বিশ্বাসই করছে না যে তাদের গ্রামের কাছাকাছি এইরকম একটা ইন্দ্রজাল তৈরি হতে পারে। তারা মনে করে যে, হয় ছেলেমেয়েদের হুড়ালে (এক ধরনের নেকড়ে) নিয়ে গেছে, আর না হলে তারা মুণ্ডেশ্বরী নদীর বানে ভেসে গেছে।
ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস হল না সুনীপের। কারণ, হুড়ালে নিয়ে গেলে তাদের ক্ষতবিক্ষত আধখাওয়া মৃতদেহ আর ছিন্নভিন্ন রক্তমাখা পোশাক এই পাহাড়-জঙ্গলে ঠিক খুঁজে পাওয়া যেত। আর নদীতে ভেসে গেলেও তাই। ঝিন্দারামেরই কথা অনুসারে, খোঁজাখুঁজি তো এরা কম করেনি।
গ্রামের মোড়লের বাড়িতে রাত কাটানোর প্রস্তাব মনঃপূত হল সুনীপের। গভীর রাতে কানে ভেসে এল বহুদূরে কোথাও এক অস্পষ্ট ক্রন্দনধ্বনি। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের কান্নার আওয়াজ।

সকাল হতেই ফ্রেশ হয়ে নড়েচড়ে বসল সুনীপ। আজ শনিবার, আজ বারবেলাতে আবার গ্রামে ঢোকার মুখে আবির্ভাব ঘটবে চক্রব্যূহের ইন্দ্রজালের। হ্যাঁ, সুনীপ ঝিন্দারামের কাছে শুনেছে, একমাত্র শনিবারের বারবেলাতেই চক্রব্যূহের আবির্ভাব ঘটে। কারণ, ঐ অভিশপ্ত বিকালের পরের দিন সকালে ঝিন্দারাম আবার ঐ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। কোথায় আর রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে? রাস্তা তো সোজা গ্রামের দিকেই যাচ্ছে! তাহলে আগেরদিন কি সে ভুল দেখেছিল? কিন্তু আগেরদিন সে তো মহুয়া খায়নি। সম্পূর্ণ হুঁশেই ছিল। কিন্তু বুড়োটার বলা কথাগুলি এখনও ঝিন্দারামের কানে বাজছে। “যে একবার ঐ চক্রব্যূহে পথ হারায়, সে না নিজের সময়ে ফিরতে পারে, না নিজের জগতে ফিরতে পারে।” এই বলে অট্টহাস্য করে উঠেছিল বুড়োটা।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় ঝিন্দারাম গ্রামে ফিরে মোড়লকে সব জানায়। মোড়ল চিন্তিত হয়ে যোগাযোগ করেন গ্রামের ওঝার সাথে, যিনি থাকেন মাঠাবুরুতে। ওঝা বলেন, “দেবতা ক্ষুধার্ত হয়েছেন। এই চক্রব্যূহ হল দেবতার অভিশাপ। গ্রামের মানুষেরই কোনও অন্যায়ের ফলে দেবতা রুষ্ট হয়েছেন।”
ওঝা এও বলেন, খুব তাড়াতাড়ি দূর থেকে এমন কারোর আবির্ভাব হবে যে গ্রামবাসীকে এই ইন্দ্রজালের হাত থেকে মুক্তি দেবে।

তিন

সোনালি রোদ ঝলমলে এক সকাল। আদিবাসীদের লোকনৃত্য দেখে মন ভরে গেল সুনীপের। এইসব উপজাতিদের সংস্কৃতি, জনজীবন, লোকনৃত্য তাকে বরাবরই টানে। এখানে আসার আগে সাঁওতালদের সম্পর্কে পড়াশুনা করে এসেছে সুনীপ।
ভারতের প্রাচীনতম উপজাতিদের মধ্যে অন্যতম হল সাঁওতালরা। মুণ্ডা জাতির অন্তর্ভুক্ত। আর্যরা ভারতে আসার আগে এরা থাকত ভারতের বৃহত্তম অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চল, যেটা পূর্ব ও মধ্য ভারতে বিস্তৃত, সেই দণ্ডকারণ্যে। এরা বরাবরই সরল, সৎ, পরিশ্রমী, সাহসী। আর্যরা এদেরকেই বলত অসভ্য, রাক্ষস। এদের উপাস্য দেবতা মারাঙ্গ বুরু, যিনি বোঙা নামেই অধিক পরিচিত। এখনও ভারত ছাড়া নেপাল ও বাংলাদেশে সাঁওতালদের দেখা মেলে। এরা অরণ্যের সন্তান। উৎসব বলতে সোহরাই, বাহা আর করম।

বেলা তিনটের সময় সুনীপ রওনা হল নিজের লক্ষ্যস্থলের দিকে। গ্রামের পাশেই সড়ক। চলে গেছে শাল-সেগুনের অরণ্য ভেদ করে সোজা পুরুলিয়ার দিকে। তাহলে কি ঝিন্দারাম মিথ্যা কথা বলছে?
এইসময় নিজের চোখে যা দেখল, তা বিশ্বাসই হল না সুনীপের।
এক নিমেষে রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে গেল। নিমেষে বদলে গেল আশেপাশের প্রকৃতি। আর যেন শূন্য থেকে আবির্ভূত হল অদ্ভুত পোশাক পরা এক বৃদ্ধ।
বুড়ো লোকটা বলেছিল, “তুমি যদি সাইকেলে করে এই রাস্তার শেষপ্রান্তে পৌঁছাতে পার, তাহলেই এই খেলায় তুমি বিজয়ী। কিন্তু একটা কথা মনে রেখ, আশেপাশে অনেক ফাঁদ পাতা রয়েছে। যাতে পা দিলেই অনন্তকালের জন্য নিজের সময় থেকে হারিয়ে যাবে তুমি। এটা এতটাই দুরূহ, যে আগে কেউ সফল হতে পারেনি। জিতলে তুমিই হবে সেই প্রথম ব্যক্তি, যে সফলভাবে চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।”
অবাক হয়ে গেল সুনীপ। রাস্তা আর শেষই হচ্ছে না। আকাশটা কেমন যেন লাল বর্ণ ধারণ করেছে। অদ্ভুত সুন্দর হাসনুহানার গন্ধে ঢেকে যাচ্ছে বিশ্বচরাচর, যদিও আশেপাশে কোনও ফুলের নামগন্ধ নেই। ধূ ধূ মাঠ। এক অপার্থিব মৃদু নীল আলোয় ঢেকে যাচ্ছে বিশ্বচরাচর। বইছে হিমেল হাওয়া। এই হাওয়া কি উঠে আসছে নরকের কোন অতল গভীর থেকে?
সুনীপ বুঝতে পারল, সে ডার্ক ওয়ার্ল্ডের লিঙ্কের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ডার্ক ম্যাটার এখানেও নিজের মায়া দেখাতে শুরু করেছে। বাচ্চারা ভগবান না করুন যদি ডার্ক ওয়ার্ল্ডে চলে যায় তাহলে ওদের ফেরত আনা যাবে না। কিন্তু এখানে থাকলে সে মরণপণ চেষ্টা করবে। আর এই লিঙ্কটাকে ভেঙে দেবে। না, এই খেলায় সে জয়ী হয়ে ফিরবেই। এটাই তার অদম্য প্রতিজ্ঞা।
আশেপাশে কোথাও ডাকছে একপাল নেকড়ে। সুনীপ জানে এখানে কোনও নেকড়ে নেই, এ শুধু ডার্ক ওয়ার্ল্ডের মায়া। এরপর শুনতে পেল পেঁচার ডাক। না, পেছন ফেরা যাবে না, জানে সুনীপ। পেছন ফিরলেই সে হারিয়ে যাবে এই ধাঁধার মধ্যে।
আকাশটা কেমন যেন লাল হয়ে এসেছে। আকাশে ওগুলো কী উড়ছে? ওগুলোও কি মায়া, নাকি ডার্ক ওয়ার্ল্ডের জীব? পাখিগুলোকে দূর থেকে দেখে শকুন বলে মনে হয়। কিন্তু আকারে শকুনের থেকে অনেক বড়ো। চোখগুলো কেমন যেন ক্ষুধা আর হিংস্রতায় জ্বলছে। মুখ থেকে ধোঁয়াও বেরোচ্ছে। তাহলে এগুলোই কি উপকথার ড্রাগন!
না, তাকে খুব শিগগিরি এই ফাঁদ থেকে বেরোতে হবে। নাহলে আজকে এই ড্রাগনের পাতের আইটেম সে হতে চলেছে। কিন্তু আর কতদূর? রাস্তা চলছে তো চলছেই। সে সাইকেল ভালোই জোরে চালাচ্ছে, কিন্তু এই মায়াবী পথ শেষ হবার নামই নিচ্ছে না।
‘এই পথ যদি না শেষ হয়’
নিজের মনেই হেসে উঠল সুনীপ। তখনই মনে আরেক ভয় দেখা দিল। আচ্ছা, বুড়োটা মিথ্যে কথা বলেনি তো? কিন্তু এই ধাঁধা থেকে বেরোতে তাকে হবেই। কিন্তু সামনে পথ তো আর নেই। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল সুনীপ। ঘড়ি যে কখন থেমে গেছে তা সে খেয়ালই করেনি। তখনও তিনটে দশ। অথচ ব্যাটারি তো গত পরশু সকালেই ভরেছে।
সুনীপ বুঝতে পারল, এখানে সময়ও থেমে যায়। কিন্তু সামনে আর কোথায় যাবে? আর পথের চিহ্নমাত্র নেই। সামনে মাটি যেন কোনও এক অজানা মন্ত্রবলে সরে গেছে। আর সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে নক্ষত্র, উল্কা আর গ্যালাক্সি সমন্বিত কালো মহাকাশ। এবার কী করবে সুনীপ?
কিন্তু সুনীপ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে, এভাবে এগিয়ে গেলে ডার্ক ওয়ার্ল্ডের মধ্যে প্রবেশ করতে হবেই তাকে। ড্রাগনগুলো হয়তো লক্ষ করেছে তাকে। ধেয়ে আসছে তার দিকেই। শূন্য খাদের ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে দিল সুনীপ।

চার

মায়া মায়াই থাকে, মায়া কখনও বাস্তব হয় না। অতল গহ্বরের ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে দিল সুনীপ। ধেয়ে এল হিংস্র ড্রাগনগুলো। চোখের নিমেষে কোথায় মিলিয়ে গেল সেই অতল গহ্বর, সামনে ঝাঁ তকতকে রাস্তা। শূন্যে মিলিয়ে গেল মহাকাশ আর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রহেলিকা। চিহ্ন রইল না কিছুর। তার দিকে গতিতে ধেয়ে আসা ড্রাগনগুলোও মিলিয়ে গেছে। সুনীপ বুঝতে পারছে যে, পরীক্ষার প্রথম রাউন্ডে সে পাশ করেছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সে।
সামনে আবার রাস্তা। চলছে তো চলছেই।
হঠাৎই গরম এক হলকা হাওয়া লাগল সুনীপের গায়ে। সামনে অদ্ভুত এক প্রাণী। না মানুষ, না জানোয়ার। মানুষ আর সরীসৃপের মাঝামাঝি এক জীব। লম্বা জিভ বের করে সুনীপকে গ্রাস করতে চাইছে। এবারও ভয় পেল না সুনীপ। গতি বাড়াল সাইকেলের। বেশ জানে সে, এইসব তাকে ভয় দেখানো ছাড়া তার আর কোনও ক্ষতি করতে পারে না। জন্তুটার শরীর ভেদ করে এগিয়ে গেল সাইকেল।
বেশ বুঝল সুনীপ। সেকেণ্ড রাউন্ডের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে।
পরিবেশের উত্তাপ আস্তে আস্তে বাড়ছে। কাছাকাছি কোথাও নেকড়ে ডাকছে। এ যেন পুরুলিয়ার ছোটনাগপুরের চিরাচরিত প্রকৃতি নয়। এই প্রকৃতির সাথে হুবহু মিল আছে পূর্ব ইউরোপের কার্পেথিয়ান পর্বতসঙ্কুল অঞ্চলের প্রকৃতি। কিন্তু কী মুশকিল, রাস্তা তো সামনে আবার দু’ভাগ হয়ে গেছে। অবাক হয়ে গেল সুনীপ।
এইবারে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হুবহু একইরকম দুইজন লোক। তার চেয়েও বড়ো আশ্চর্যের, এই দুইজনই হুবহু আগের বুড়ো লোকটার মতো। সামান্য একটু তফাত ছাড়া। একজনের চোখ ঘোলাটে, আরেকজনের চোখ নীলাভ, প্রখর দৃষ্টি।
নীলাভ চোখওয়ালা লোক বলল, “তোমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম তুমি সাহসী। কিন্তু এখন জানলাম তুমি বুদ্ধিমানও বটে। তুমি সত্যিই এই খেলা জেতার দাবিদার। সাবাস জানাই তোমায়।”
স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সুনীপ। নীরবতায় কাটল কিছু মুহূর্ত। তারপর সে কোমল অথচ দৃঢ় গলায় জিজ্ঞাসা করল, “কে তোমরা?”
উত্তর এল, “আমরা তোমায় চক্রব্যূহ ভেদ করার রাস্তা বলে দিতে পারি। এই দুটো রাস্তার মধ্যে একটা তোমাকে অভীষ্টের দিকে পৌঁছে দেবে, আরেকটা রাস্তা তোমাকে পৌঁছে দেবে সোজা নরকে।”
চমৎকৃত হল সুনীপ। তাহলে এই তাপ আর কিছুই নয়, নরকের আগুনের আঁচ! এই রাস্তা দুটোর মধ্যে একটা তাকে নিয়ে যাবে নরকে! খেলা তো কঠিন হতে শুরু করেছে ক্রমশ।
এবার সুনীপ বুঝতে পেরেছে এরা কে। এরা যক্ষ। এবার ঘোলাটে চোখওলা লোকটা বলল, “তুমি আমাদের কাছে সঠিক রাস্তা জানার জন্য একটাই প্রশ্ন করতে পার। একবারই যেকোনও একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করবে। এখানে ব্যঞ্জনা হল, আমাদের মধ্যে এর উত্তরে একজন সঠিক বলবে, আরেকজন মিথ্যা বলবে। কিন্তু তুমি একজনের কাছে একবারই জিজ্ঞাসা করতে পারবে। দ্বিতীয়বার করলে বাচ্চাদের মতো তুমিও এই অন্ধকার জগতে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। এবার ঠিক করো তুমি আমাদের মধ্যে কার কাছ থেকে জানবে।”
চোয়াল দৃঢ় করে স্থিরভাবে চিন্তা করতে লাগল সুনীপ। প্রশ্ন বেশ জটিল এবার। নীল চোখওয়ালা লোক বলে উঠল, “কী হল! সময় তো পেরিয়ে যাচ্ছে। ভাবার জন্য আর কতক্ষণ নেবে?”
প্রশ্নকর্তাকে চমকে দিয়ে সুনীপ ঘোলাটে লোকওয়ালা লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল এক অদ্ভুত প্রশ্ন, “আপনার সঙ্গীকে আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, কোন রাস্তাটা ধরলে আমি সোজা নরকে গিয়ে পৌঁছাব, কারণ আমি নরকে যেতে চাই।”
দু’জন লোক পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তাহলে কি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এই প্রশ্নও ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে? তারা ডানদিকের রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করল। তাদের হতবাক করে সুনীপ সাইকেলে উঠে গতি নিয়ে ডানদিকের রাস্তা নিল।
প্রতিপক্ষের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে দু’জনেই হতবাক। আর সুনীপের মনে একরাশ আনন্দ। সে এখন খেলার দ্বিতীয় রাউন্ডে সফল হয়ে তৃতীয় রাউন্ডে প্রবেশ করেছে। কিন্তু নেকড়ের ডাক এত কাছ থেকে ভেসে আসছে কেন?
একপাল নেকড়ের ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পাচ্ছে সুনীপ। আর কতদূর! পথ তো শেষ হবার নামই নিচ্ছে না। আচ্ছা, সে পথ ভুল করেনি তো? উত্তাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নরকের দিকে চলছে না তো সে! ঐ তো সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে লেলিহান বহ্নিশিখা। যদি তার অন্তিম পরিণতি নরক হয়ে থাকে তাহলে হোক না। কিন্তু কে বলতে পারে যে, এই আগুনও মায়া নয়? সে জানে, অশুভ যতই শক্তিশালী হোক না কেন সবসময় শুভ শক্তিই জয়ী হয়। যাই হোক, সেই লেলিহান বহ্নিশিখার ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে দিল সুনীপ। না, পুড়ল না সে। বরং একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস জুড়িয়ে দিল তার প্রাণ। চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল আগুন। সামনে ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে চলেছে রাস্তা।
এ কী! রাস্তাটা মনে হচ্ছে শেষ হতে চলেছে। কিন্তু সামনে শুধুই কুয়াশা। এই শরৎকালে এত ঘন কুয়াশা কী করে এল? অবাক হয়ে গেল সুনীপ। আর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বুড়ো লোকটা। কোথা থেকে ভেসে আসছে কোন ক্রুদ্ধ ক্ষুধার্ত জানোয়ারের এক অপার্থিব গর্জন। আর ধীরে ধীরে সেই ধ্বনি কাছে এগিয়ে আসছে। ভয় পেল সুনীপ এই প্রথমবারের জন্য। কিন্তু সে জানে যে, সে এখন খেলার শেষ রাউন্ডে প্রবেশ করেছে। এখন খেলা খুব কঠিন হবে, তার অশরীরী অপার্থিব প্রতিপক্ষ নিজের সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাবে।
সুনীপের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বৃদ্ধ লোকটি। খেলায় প্রতিপক্ষকে অসম্মান বা ঘৃণা করা স্বাভাবিক। কিন্তু এ কেমন প্রতিপক্ষ যাকে সম্মান বা শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে? সুনীপ শরীরী, সে অশরীরী। কিন্তু শরীরী হয়েও সে বেশি শক্তিশালী, বেশি সুনিপুণ। আগে কোনও মানুষই এই খেলায় এতদূর আসতে পারেনি। হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে, ভয়ে দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে, আর নয়তো বুদ্ধিবিভ্রমের ফলে যক্ষের হাতে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু সবক’টা স্তরেই তার প্রতিপক্ষ জয়ী হয়েছে। এ কি সাধারণ কোনও মানুষ? না এর মধ্যে আছে অলৌকিক কোনও শক্তি, মাথার ওপর আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ?

পাঁচ

চোখ বুজে মা-বাবার কথা মনে করল সুনীপ। অনুভব করতে চাইল তাদের, অন্তর থেকে চাইল তাদের আশীর্বাদ। ছোটোবেলা থেকেই তার মা-বাবাকে সে ঈশ্বর বলে মেনেছে।
ওদিকে তার প্রতিপক্ষও সতর্ক। এখনি তাকে করতে হবে চরম আঘাত। সে কাঁপা গলায় বলল, “শেষ ধাঁধা। আমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেই তুমি রাস্তার শেষপ্রান্তে পৌঁছাতে পারবে। তারপর তুমি মুক্ত। কিন্তু তোমাকে আমার প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিতে হবে।”
চমকে উঠল সুনীপ। সে জানে তার জন্য চরম কঠিন কোনও প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। কিন্তু সে এখন পাবে না গুগলের সাহায্য। এই লড়াই তাকে একাই লড়তে হবে। পারবে কি সে এই শয়তানি চক্রব্যূহ ভেদ করতে? উত্তেজনায় ঘামছে সে, শুকিয়ে আসছে তার গলা প্রবল উৎকন্ঠায়।
কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে বৃদ্ধ লোকটি বলল, “না, কোনও কঠিন প্রশ্ন করব না। তোমাকে শুধু বলতে হবে, আমি কে।”
যা বাবা, এটা আবার কেমন প্রশ্ন! চমকে গেল সুনীপ। বুড়ো লোকটা কে, তা সে জানবে কী করে! কিন্তু লোকটা যেন অন্তর্যামী। মৃদু হেসে বলল, “আমার মনে হয় তুমিই এই খেলার বিজয়ী হবার দাবি রাখো। তাই আমি তোমাকে খুঁজছিলাম। কিছু ইঙ্গিত দিতে পারি আমি। এই পথের, এই অন্ধকার দুনিয়ার শেষ পরিণতি আমিই। তাই আমি এই খেলার সবশেষে এসেছি।”
সুনীপ বাকরুদ্ধ। বুড়ো বলল, “শুধু তাই নয়, তোমার, তোমাদের এই দুনিয়ার শেষ পরিণতি আমিই। বলো, আমি কে।”
বিদ্যুতের মতো উত্তর খেলে গেল সুনীপের মনে। আরে, এই বুড়োটাকেই তো সে খেলার শুরুতে দেখেছিল! এই বুড়ো থেকেই শুরু হয়েছিল এই খেলা, আর এই বুড়োতেই শেষ হল। খেলার মাঝেও বুড়োটা এসে হাজির হয়েছিল, আবার সেটা দুটো প্রতিরূপ নিয়ে, একজন ভালো, আরেকজন খারাপ। মানে একজন ধনাত্মক বা পজিটিভ, আরেকজন ঋণাত্মক বা নেগেটিভ। দু’জনেই একরকম আর এই বুড়োটা তাদের যোগফল। ভাবতে থাকল সুনীপ, তাদের দুনিয়া আর ডার্ক ওয়ার্ল্ড এই বুড়োটা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। আর ধ্বংসের পর এর মধ্যেই লীন হয়ে যাবে।
সুনীপ জেনে গেল যে উত্তর কী হবে। ওদিকে বুড়োটার ঠোঁটের কোণে হাসি। সে বুঝতে পেরেছে, তার প্রতিপক্ষ হারতে চলেছে। না, এবারও কেউ ভেদ করতে পারল না চক্রব্যূহ, উপরন্তু এর বলি হল এক অসাধারণ মানুষ।
কিন্তু বুড়োটাকে স্তম্ভিত করে আচম্বিতে বলে উঠল সুনীপ। “শূন্য। তোমার নাম শূন্য। ইউ আর জিরো।”
নিমেষে মিলিয়ে গেল কুয়াশা। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একঝাঁক পাখির মতো স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা। তাদের দেখে মনে হচ্ছে, এইমাত্র তারা স্কুল থেকে ফিরছে। চোখেমুখে কিছুটা ভয়, কিছুটা ক্লান্তি আর কিছুটা বিস্ময়। সুনীপকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “বাড়ি যাব।”
নিমেষে ব্যাপারটা বুঝতে পারল সুনীপ। সময় এখানে স্থির। তাই দু’সপ্তাহ কেটে গেলেও এদের মনে হচ্ছে যে এরা চক্রব্যূহের মধ্যে আজই বন্দি হয়েছে।
সুনীপকে অবাক করে বুড়োটা বলে উঠল, “সাবাস! ভেঙে দিয়েছ তুমি আমার চক্রব্যূহ। আমি এতদিন তোমাকেই খুঁজছিলাম। আজ আমি নিশ্চিত হলাম যে, এই গ্রহের সর্বোৎকৃষ্ট জীব মানুষ এখনও পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর হয়ে যায়নি। আজও তাদের মধ্যে বেঁচে রয়েছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অপরের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার প্রবণতা, বুকভরা সাহস আর উপস্থিত স্থিরবুদ্ধি। তুমি অনেক দূর যাবে। সামনে এই গ্রহের প্রয়োজন পড়তে পারে তোমাকে। তৈরি থেকো সেদিনের জন্য।”
যেমন শূন্য থেকে উপস্থিত হয়েছিল, তেমন করে শূন্যেই মিলিয়ে গেল বুড়োটা। আর নিমেষে বদলে গেল চারদিকের প্রকৃতি। মাঠাবুরুর ছোটনাগপুরের পরিবেশ ফিরল তার স্বাভাবিক রূপে। মাথার ওপর জ্বলন্ত দিবাকর। ঘড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। হাতঘড়ি দেখল সুনীপ, সাড়ে তিনটে বাজে। মানে তার চক্রব্যূহ ভেদ করতে মাত্র কয়েক সেকেণ্ড লেগেছে! নিজের মনেই হাসল সুনীপ।

বাচ্চাদের ফিরে পাওয়ায় গ্রামে অকাল উৎসব। মোড়ল চেয়েছিলেন সুনীপ কিছুদিন থেকে যাক। কিন্তু সুনীপ খুব ব্যস্ত, তাকে ফিরতে হবে কলকাতায়। বিদায় নেবার সময় মোড়ল অশ্রুপূর্ণ চোখে কান্নাভেজা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “আর কি দেখা হবে না আমাদের?”
সুনীপ একরাশ হেসে বলল, “অবশ্যই হবে। নতুন কোনও সময়ে। আবার আমরা দেখা করব নতুন কোনও গল্প সাথে নিয়ে।”

_____



No comments:

Post a Comment