গল্পঃ বই নিয়ে বৈরিতাঃ কিশোর ঘোষাল



এক

সন্ধের অন্ধকারে রুকু-সুকুর সঙ্গে ঝাপসা পানা তালঢ্যাঙা লোকটাকে দেখে সরুদার ভুরু কুঁচকে উঠল। কিছু বলল না, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
রুকু-সুকু দুই যমজ ভাই, দু’জনেই অশরীরী। সরুদার দুই মাসতুতো যমজ বোন রুন্টি আর ঝুন্টির খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভূতেদের সঙ্গে মানুষের ভাব-ভালোবাসা নিয়ে যারা সন্দেহ করছ, তারা করতে থাকো। কিন্তু ওদের দেখলে অবাক হতেও ভুলে যাবে, একথাটা মনে রেখ। সর্বজিৎ, মানে সরুদা ফি-বছরে দু-তিনবার প্রফুল্লনগরের মাসিমার বাড়ি আসে মাসিমা আর চার বোনের আদর আর ভালোবাসার টানে। বড়োবোনের অবিশ্যি বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আছে মেজো টুম্পি আর ছোটো দুই যমজ বোন, যাদের কথা আগেই বলেছি। সরুদা কলকাতায় থাকে, আর হস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে, আই.আই.টি, কানপুরে। ছুটিতে বাড়ি যাবার আগে ক’দিনের জন্যে এখান থেকে ঘুরে যায়। গতকাল সকালেই সরুদা প্রফুল্লনগরে পৌঁছেছে। আজ রবিবার, সন্ধেবেলা সকলের সঙ্গে বারান্দায় বসে আড্ডা চলছিল। সরুদা রুকু-সুকু আর তাদের সঙ্গের ঝাপসা লোকটাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কী রে রুকু-সুকু, কাল এলি না যে? খুব ব্যস্ত ছিলি নাকি? সঙ্গের ভদ্রলোকটি কে? চিনতে পারলাম না তো!”
ঝাপসা ঢ্যাঙা লোকটা রুকু-সুকুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে নিচু হয়ে নমস্কার করল। বলল, “আজ্ঞে, আপনি নিশ্চয়ই সরুদা, আপনাকে নমস্কার। মাসিমা-মেসোমশাইকে প্রণাম আর বোনেদের সকলকে অনেক নমস্কার। আজ্ঞে আগে ছিলাম মটরলাল মণ্ডল, এখন অশরীরী।”
সরুদার সাহস আছে বটে। রুকু-সুকু না হয় বাচ্চা ছেলে, ভয় লাগে না। কিন্তু এই মটরলাল বেশ বয়স্ক পাকা ভূত। তাকে সরুদা জিজ্ঞেস করে বসল, “এ মটর কোন মটর? হরিমটর না, গাড়ি মটর?”
মটরলাল একটু যেন ঘাবড়েই গেল। বলল, “আজ্ঞে, ঠিক বুঝতে পারলাম না কথাটা।”
সরুদা বলল, “মটর দু’রকমের। একটা দিয়ে ঘুগনি রান্না হয়, দারুণ খেতে। মাসিমার হাতের নারকেল কুচি দেওয়া নিরিমিষ ঘুগনি খেয়েছেন? খাননি। একবার খেলে আর ভুলতে পারবেন না। আরেকটা আছে মটরগাড়ি, রাস্তায় হর্ন দিয়ে চলে। আপনি কোন মটর?”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মটরলাল বলল, “ও বাবা, মটরের আবার এতরকম হয় জানতাম না তো! তবে আপনার কথায় মনে পড়ছে। ছোটোবেলায় আমার বাবা যে বাবুর বাড়ি কাজ করতেন, সেই বাবুর একটা লাল রঙের মটরগাড়ি ছিল বটে। বাবা রোজ দু’বেলা ধোয়ামোছা করে ঝকঝকে করে রাখতেন গাড়িটা। আপনার কথায় এখন মনে হচ্ছে, আমার নামেও একটা গল্প আছে। আর সে গল্পে সবটাই জুড়ে আছেন, আমার বাবা। বাব্বা, আপনি তো সাংঘাতিক, সরুদা! রুকু-সুকুর মুখে আপনাদের কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু এখন দেখছি যে অনেক বেশি!”
সরুদা এসব কথায় তেমন গুরুত্ব দিল না। বলল, “তা, হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, আপনি রুকু-সুকুর সঙ্গে হুট করে উদয় হলেন–এটা আমার তেমন পছন্দ হল না। আপনি জানেন, আমার ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা বোনেরা রয়েছে, মাসিমা আছেন, ভয়-টয় পেয়ে আঁতকে উঠলে?”
মটরলাল সড়াৎ করে এত্ত লম্বা জিভ বের করে দুই হাতে নিজের কান ধরল। বলল, “আজ্ঞে, ইয়ে মানে, এদিকটা আমি ভাবিনি। খুব ভুল হয়ে গেছে।”
মটরলালের জিভ সটকানো দেখে টুম্পিরা তো বটেই, সরুদাও চমকে উঠেছিল। ওরে ব্বাবা, করে কী মটরলাল! সরুদা চট করে সামলে নিল। গম্ভীর হয়ে বলল, “ঠিক আছে ঠিক আছে, অত লম্বা করে লজ্জা পাওয়ারও কোনও দরকার ছিল না। কীসের জন্যে এসেছেন, সেটা বলুন।”
“আজ্ঞে, আমাদের খুব বিপদ। আপনি ছাড়া আমাদের কোনও গতি নেই।” ব্যাকুল হয়ে কাঁচুমাচু মুখে মটরলাল বলল।
“বিপদে-আপদে রুকু-সুকু আমাদের বিস্তর সাহায্য করে। কিন্তু আপনাদের বিপদে আমি কী কাজে আসব?”
রুকু এতক্ষণে কথা বলল, “সরুদা, আমি বলছি। মটরকাকু মুর্শিদাবাদের ভাবতায় থাকেন। সেখানকার একটা পোড়ো বাড়িতে ওঁদের প্রায় চোদ্দ পুরুষ ধরে হাজার আষ্টেক ভূতের বাস। ইদানীং সেই পোড়ো বাড়িতে কিছু মানুষ ডেরা গেড়েছে। মটরকাকু যা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে মানুষগুলো তেমন সুবিধের নয়। তাদের মধ্যে দু’জন দিনের বেলায় ওই বাড়িতেই পড়ে পড়ে ঘুমোয়, কিন্তু বাকিরা কেউ থাকে না। কিন্তু রাত আটটা সাড়ে আটটা বাজলেই অনেক লোক চলে আসে, প্রায় জনা পনের-কুড়ি! তারা সারারাত কীসব কাজকম্মো করে, আবার ভোর না হতেই সবাই হাওয়া হয়ে যায়।”
সরুদা গুরুত্ব না দিয়ে হালকা চালে বলল, “ধুর, যারা আসে তারাও তোদেরই মতো ভূত। সারাদিন ঝোপে ঝাড়ে, ফাঁকফোকরে লুকিয়ে থাকে, রাতের বেলা নিজেদের মধ্যে হুটোপুটি করে, হাডুডু খেলে।”
মটরলাল হৈ হৈ করে উঠল। বলল, “না সরুদা, না। ওরা মানুষ তো বটেই এবং জ্যান্ত! ওই বাড়ির বড়ো একটা হলঘর ওরা সাফসুতরো করে নিয়েছে। সেখানে ছোটো একটা জেনারেটার চালায়, আলো জ্বালে, কিছু মেশিনপত্রও চালায়। যে দু’জন দিনের বেলা ঘুমোয়, তারা আসলে ওই ঘরটা পাহারা দেয়।”
সরুদা ভুরু কুঁচকে মটরলালের দিকে তাকাল। বলল, ‘রাতের অন্ধকারে আলো জ্বলছে, জেনারেটার চলছে, মেশিনপত্র চলছে, আশেপাশের লোকেরা কেউ দেখতে বা আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না?”
মটরলাল বলল, “আজ্ঞে, আশেপাশে কেউ থাকলে তো? পশ্চিমদিক জুড়ে পোড়ো জমি আর হুগলি নদীর পাড়। বাকি তিনদিকে ঝোপঝাড়ে জঙ্গল হয়ে যাওয়া অনাবাদি জমি। বহুযুগ আগে মস্ত বাগানওলা জমিদার বাড়ি ছিল, এখন গোটা এলাকাটাই জঙ্গুলে হয়ে উঠেছে। আর আমাদের জন্যে চিরকালই এলাকাটার একটু বদনাম তো আছেই। কাজেই চট করে কেউ কাছ ঘেঁষে না।”
সরু চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, “হুম। কিন্তু লোকগুলো লুকিয়ে রাত জেগে কী করছে কী? সেটা জানা গেছে?”
“আজ্ঞে, বই ছাপে। অনেক বই।”
“বই ছাপে? কী বই? বই আবার রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে ছাপতে হয় কেন?” সরুদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আজ্ঞে, আমি আবার লিখতে পড়তে কিছুই জানি না। বই ছাপে এটুকু বলতে পারি। কী বই বলতে পারব না।”
সরুদা খ্যাঁক করে ধমকে উঠল। “বেঁচে থাকতে লেখাপড়া শেখেননি কিংবা শিখতে পারেননি, সে না হয় অন্য কথা। তাই বলে, ভূত হয়েও একটু আধটু লেখাপড়া শিখতে পারেননি? যত্তসব! ভূত হয়ে সারাটা দিন কী করেন কী, লোককে শুধু ভয় দেখিয়ে বেড়ান নাকি?”
মটরলাল একথার কোনও উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে ঘাস দেখতে লাগল আর হালকা হাওয়ায় নড়তে থাকা পর্দার মতো দুলতে লাগল। মাসিমা সরুদার পাশেই বসে ছিলেন। তিনি সরুদার কনুই ধরে আতঙ্কভরা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “কী করছিস কী, সরু? ভূতদের এমন রাগাতে আছে? এখনই কিছু একটা করে বসলে?”
সরুদা মাসিমার হাতে হাত রেখে শান্ত হতে ইশারা করল। তারপর বলল, “রুকু-সুকু, তোরা লিখতে পড়তে জানিস তো? তোরা ক্লাশ সেভেন অবধি পড়েছিলি না?”
রুকু বলল, “হ্যাঁ, সরুদা। ক্লাশ সেভেনের রেজাল্ট বেরোনোর আগেই তো এপারে চলে এলাম। তবে তার পরে এপারে এসেও কিছু কিছু লেখাপড়া করেছি।”
মাসিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ও মা, ক্লাশ সেভেনের পর লেখাপড়া ছেড়ে কোথায় চলে গেলি?”
সরুদা মাসিমার পিঠে হাত রেখে বলল, “মাসিমা, তুমি শুনলে দুঃখ পাবে, তাই এতদিন তোমায় বলিনি। ক্লাশ সেভেনের পরীক্ষা দিয়ে ওরা দু’ভাই মামাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে পুকুরে চান করতে গিয়ে দু’ভাই মারা গিয়েছিল।”
‘ইস। ওদের মায়ের অবস্থাটা চিন্তা কর, সরু! হতভাগা ছোঁড়া, তোদের কী মায়ের কথা একটুও শুনতে নেই? মায়ের কথা একটুও মনে করতে নেই?” শেষ কথাগুলো মাসিমা রুকুসুকুকে বললেন। বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। শাড়ির আঁচলে চোখ ঢাকলেন।
সরু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মাসিমা, শান্ত হও। যা হবার তা তো হয়েই গেছে, বহুবছর আগে। আর এখন দুঃখ করে কী হবে?” তারপর মটরলাল আর রুকু-সুকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “রুকু-সুকু, তোরা দু’জনে মটরলালবাবুর সঙ্গে ওঁদের বাড়ি থেকে ঘুরে আয় না। দেখে আয় তো কী বই ছাপছে। ওই সঙ্গে গোটা বাড়িটাও ঘুরে-টুরে দেখে আসবি। কদ্দিন লাগবে ঘুরে আসতে?”
মটরলাল বলল, “যেতে ঘণ্টা খানেক, ফিরতে ঘণ্টা খানেক। দেখতে শুনতে কতক্ষণ আর লাগবে?”
“ভেরি গুড। রুকু-সুকু, তাহলে কাল সকালে আমার কাছে রিপোর্ট করবি, কেমন? মটরলালবাবু আপনাকে আর কষ্ট করে ফিরতে হবে না। যা করার আমি রুকু-সুকুকে নিয়েই করে ফেলব। তোরা এখন বেরিয়ে পড়, এতক্ষণে লোকগুলো হয়তো বই ছাপা শুরু করে দিয়েছে।”
মাসিমা রুকু-সুকুকে বললেন, “এই রাত্তিরে পুকুরে চান করতে গিয়ে আবার যেন কোনও অঘটন ঘটাস না, বাবা। সাবধানে যাস, দুগ্‌গা, দুগ্‌গা।”
রুকু-সুকুও কাঁদছিল। ওরা আর মটরলাল মাসিমা-মেসোমশাইকে প্রণাম করে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
ওরা চলে যেতে টুম্পি জিজ্ঞেস করল, “লুকিয়ে বই ছেপে কার কী লাভ, সরুদা?”
“কী করে বলি বল তো? কাল রুকু-সুকু কী খবর আনে দেখা যাক, তারপর ভাবব। এদিকে রুকু-সুকুর জন্যে মাসিমার যা মনখারাপ, রাত্রে কী খাবার জুটবে কে জানে।”
একথার উত্তরে টুম্পি সরুদাকে খোঁচা দিয়ে বলল, “তোমার মতো হিরের টুকরো বোনপোকে মা না খেতে দিয়ে উপোসে রাখবে? তুমি ভাবলে কী করে, সরুদা?”
সরুদা টুম্পির কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “টুম্পি দিন দিন কীরকম হিংসুটি হচ্ছে দেখছ, মাসিমা?”
চোখের জল মুছতে মুছতেও মাসিমা হেসে ফেললেন। সরুদাকে বললেন, “ওদের কথা ছাড় না। সারাবছর কত কী করি, তাও ওদের মন পাই না। কিছু না কিছু খুঁত বের করবেই। তুই হস্টেলে থাকিস, ছাইপাঁশ কী খাস কে জানে। তাও তো যা দিই তুই সোনামুখ করে খেয়ে নিস।”
‘মা, তোমার বোনপোর সোনামুখ, আর আমাদের বুঝি জং ধরা লোহার মুখ?”
টুম্পির এই রাগ রাগ কথায় সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। মাসিমা হাসতে হাসতে উঠে পড়লেন। বললেন, “টুম্পি ভেতরে আয়। পরোটাগুলো বেলে দিচ্ছি, তুই ভাজতে শুরু কর। অনেক রাত হয়ে যাবে। কাল সোমবার। তোদের স্কুল, তোদের বাবারও অফিস আছে।”
শুনে সরুদা বলল, “টুম্পির জন্যে শুকনো রুটি করবে, না দুধ-সাবু?”
মাসিমা সরুদার কথায় অবাক হলেন খুব। বললেন, “কেন? টুম্পির কী হয়েছে? পেটখারাপ? কই, আমাকে বলিসনি তো, টুম্পি!”
“আমার কিচ্ছু হয়নি, মা। আমি পরোটা খাব, সরুদা ইয়ার্কি করছে।”
টুম্পির এই কথায় সকলে হাসতে লাগল, মাসিমা-মেসোমশাই সবাই। মাসিমার সঙ্গে ঘরের ভেতরে যেতে যেতে টুম্পি লম্বা জিভ বের করে ভ্যাঙাল সরুদাকে। সরুদা হাসতে হাসতে বলল, “হা হা, জিভটা আরেকটু লম্বা করলেই মটরলালকে হারিয়ে দিবি।”

দুই

বোনেরা সবাই স্কুলে, মেসোমশাই অফিসে। মাসিমা সকাল থেকে ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন, এখন একটু ফাঁকা। সরুর কিছু করার নেই, চুপ করে বসে ছিল বারান্দায়। মাসিমা বললেন, “অনেক বেলা হয়ে গেল সরু, দাঁড়া, ক’টা লুচি ভেজে আনি, বসে বসে খা। সকাল থেকে আমার যা যায় না, দম ফেলারও ফুরসত পাই না।”
সরুদা ব্যাপারটা বোঝে। শান্তভাবে বলল, “ব্যস্ত হয়ো না, মাসিমা। আমার তো আর কোনও তাড়া নেই। ধীরেসুস্থে করো।”
মাসিমা ভেতরে যেতেই ঝাপসা দুই ভাই রুকু আর সুকু এসে সরুদার সামনে দাঁড়াল। সরুদা ওদের দেখেই বলে উঠল, “কী রে? কখন ফিরলি? কী কী দেখলি বল।”
বারান্দার ছায়া ঘেঁষটে দাঁড়িয়ে রুকু বলল, “আমরা ফিরেছি যখন তখন প্রায় ভোর। যা যা বলেছিলে সরুদা, সবই দেখে এসেছি। বড়ো একটা হলঘরে ছোট্ট একটা জেনারেটার চালায়, শব্দ প্রায় হয়ই না। তাছাড়া কাজ করার সময় ওরা দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখে। বাইরে থেকে শব্দ শোনা যায় না, বা আলোও দেখা যায় না। ওরা বই ছাপায় না, বইয়ের কপি করে। দুটো বড়ো বড়ো ফটোস্ট্যাট মেশিন আছে, তাতে ঝপাঝপ কপি বের করে ফেলছে। সেই কপির গোছা নিয়ে চার-পাঁচজন সেট করে বই বাঁধাচ্ছে। শেষরাত্রে ট্র্যাক্টরের মধ্যে সাজিয়ে খড় চাপা দিয়ে বই চালান হয়ে যাচ্ছে শহরে।”
“বোঝো কাণ্ড। নকল বই বাজারে পাওয়া যায় শুনেছি, সেসব বই এইভাবে বানায়? কী সর্বনাশ!”
এই সময় বড়ো থালায় গোটা ছয়েক ফুলকো লুচি আর দুটো বেগুনভাজা নিয়ে মাসিমা বারান্দায় এলেন। বললেন, “শুরু কর, সরু। আমি আরও আনছি। অনেক দেরি হয়ে গেল বাবা। ও মা, তোরাও এসে গেছিস? ভালোই হয়েছে, তোদের জন্যেও আনছি।”
শেষের কথাটা মাসিমা রুকু-সুকুকে লক্ষ করে বললেন। একটা লুচি ভাঁজ করে বেগুনভাজা পুরে মুখে তুলল সরুদা। বলল, “আমি শুরু করছি। তোদেরও আসছে, লোভ দিস না যেন।”
রুকু-সুকু দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, “কী যে বলো না সরুদা, তোমার খাওয়ায় লোভ দেব?”
সরুদা সেকথায় কান দিল না। বলল, “কী বই কিছু বুঝলি?”
“বেশিরভাগ স্কুলে পড়ার নোট বইーবাংলা, ইংরিজি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল। কয়েকটা গল্পের বইও রয়েছে দেখলাম।”
“গল্পের বইও? কী বই?”
এই সময় মাসিমা দুটো প্লেটে লুচি-বেগুনভাজা এনে রুকু-সুকুকে দিলেন। সরুদার থালাতেও দুটো দিলেন। সরুদা বলল, আর নেবে না। লুচি খেতে খেতে রুকু বলল, “একটা দেখলাম ‘তিন এক্কে তিন হেমকান্ত মীন’, আরেকটা দেখলাম ‘পাঁচকথা’। আরেকটা বেশ মোটা বই, ‘আলোকতরু’।
“কী বলছিস! তিনটে বইই দারুণ বই। আমার খুব প্রিয়। বুঝেছি, বদমাইশ লোকগুলো এই বইগুলোর সস্তায় কপি করে, কম দামে বিক্রি করছে। আর ঠকছে যারা বইটা কষ্ট করে যত্ন নিয়ে ছেপেছে, সেই প্রকাশকরা আর লেখকরা। নাহ্‌, কিছু একটা করতেই হবে। এ-জিনিস চলতে দিলে বাংলা বইয়ের জগতটাই শেষ হয়ে যাবে।”
সরুদা আর কিছু বলল না, খেতে খেতে চিন্তা করতে লাগল। সবার খাওয়া হয়ে গেলে সরুদা রুকু-সুকুর খুব কাছে গিয়ে বসল। তারপর খুব নিচু গলায় অনেক কিছু বলতে লাগল। রুকু-সুকু চুপ করে শুনতে লাগল আর ঘাড় নাড়তে লাগল বারবার।

তিন

বোনেরা স্কুলের পর কোচিং সেরে, মেসোমশাইও অফিস থেকে ফিরে চা-জলখাবার খেয়ে সাড়ে আটটা নাগাদ বারান্দায় বসে গল্প করছিল। মাসিমাও হাতের কাজ সেরে এসে বসলেন বারান্দায়। জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ রে সরু, ছেলেদুটোকে কোথাও পাঠিয়েছিস নাকি? এখনও এল না তো!”
সরুদা চিন্তিত মুখে বলল, “রুকু-সুকুর কথা বলছ তো? এসে যাওয়ার তো কথা। এত দেরি হচ্ছে কেন কে জানে!”
“কোথায় গেছে ওরা?” টুম্পি জিজ্ঞেস করল।
“অপারেশন ভাবতা, কিন্তু এখন হচ্ছে ভাবনা। সব ঠিকঠাক হল কি না কে জানে।”
ঠিক সেই সময়েই পেয়ারাগাছের নিচে উদয় হল দুই মূর্তিমান ভাই রুকু-সুকু। সরুদা উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, “ওফ, এসে গেছিস? খুব চিন্তায় ফেলেছিলি। কোনও বিপদ-আপদ হয়নি তো? সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে?”
“সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে, সরুদা। পুলিশ এসে এক এক করে সবক’টাকে ধরেছে। সেসব দেখেই আমরা রওনা হলাম।”
“যাক, ভালোই হয়েছে। মটরলালবাবুরা কিছুদিন মনে হয় আবার শান্তিতেই থাকবেন।”
টুম্পি বলে উঠল, “অ্যাই রুকু-সুকু, কী হয়েছে পুরো বল তো! সরুদাকে জিজ্ঞেস করলে খুব ভাও খাবে।”
রুকুসুকু হেসে উঠল। বলল, “তেমন কিছু নয়। যেখানে সেখানে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া যে ঠিক নয়, লোকগুলো হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।”
টুম্পি বলল, “যাচ্চলে, বই ছাপার সঙ্গে বিড়ি-সিগারেটের কী সম্পর্ক?”
“একটা লোকের ফেলে দেওয়া সিগারেট থেকেই তো সব ঘটে গেল!” রুকু হাসতে হাসতে বলল।
টুম্পি রেগে উঠল। বলল, “তুইও সরুদার মতো ভাও খেতে শিখে গেছিস? কী হয়েছে, পুরোটা বলবি?”
সরুদা বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমিই বলছি। সকালে তোরা স্কুলে যাওয়ার পর রুকু-সুকু এসেছিল। ওদের থেকে জানলাম, ওই লোকগুলো ভালো ভালো বইয়ের জেরক্স কপি বানিয়ে বাজারে সস্তায় বিক্রি করছে। ওই লোকগুলোর মধ্যে জনা তিনেক সিগারেট-বিড়ি খায়। বই মানেই কাগজ, আর কাগজে চট করে আগুন ধরে যায়। রুকু-সুকুকে বলেছিলাম, সিগারেটের জ্বলন্ত দুয়েকটা টুকরো নিয়ে কাগজের বাণ্ডিলে রাখতে। ব্যস, তারপরের কাজটা আগুনই করে দেবে। তাই তো রুকু-সুকু?”
“ঠিক তাই, সরুদা। হলঘরের এককোণে প্রচুর কাগজ জমিয়ে রাখা ছিল। আমরা জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো নিয়ে সেগুলো ধরিয়ে দিতেই দাউ দাউ জ্বলে উঠল সমস্ত হল ঘরটা। তারপর আর কী? লোকগুলো আগুনের ভয়ে দৌড়োদৌড়ি শুরু করল। আগুন নেভানোর জন্যে পুকুরে ছুটল বালতি নিয়ে। পোড়ো বাড়িতে অমন আগুন দেখে গ্রামের বহু লোকজনও চলে এল। তারা ঘিরে ধরল ওই বদমাইশ লোকগুলোকে। জিজ্ঞেস করতে লাগল, ওরা কারা? পোড়ো বাড়িতে কী করছিল? কী ছিল ঘরের মধ্যে? আগুন লাগল কী করে? কেউ একজন পুলিশে খবর দিল। পুলিশ আসার আগে গাঁয়ের লোকেরা লোকগুলোকে ধরে এই মারতে যায় কি সেই মারতে যায়! তারপর পুলিশ এসে সবাইকে ধরে নিয়ে গেল। পোড়া ফটোস্ট্যাট মেশিন, জেনারেটার বাজেয়াপ্ত করে নিল। তারপর ওই বাড়ির দরজাগুলো বন্ধ করে দিয়ে গেল, সাধারণ লোক যেন কেউ আর না ঢোকে।”
মাসিমা চুপ করে শুনছিলেন। এখন জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ রে, কেউ পুড়ে-টুড়ে যায়নি তো?”
রুকু-সুকু খুব জোরের সঙ্গে বলল, “না মাসিমা, কোনও লোকের কোনও ক্ষতি হয়নি। সরুদা বলেই দিয়েছিল, কোনও লোকের গায়ে যেন আগুনের আঁচ না লাগে।”
মাসিমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “যাক বাবা, ঠাকুর বাঁচিয়েছেন। তা হ্যাঁ রে, পুলিশ এসে পোড়ো বাড়ির সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেল, তাহলে তোদের মটরলালরা ও-বাড়িতে ঢুকবে কী করে, থাকবে কোথায়?”
সুকু লজ্জা লজ্জা মুখে বলল, “মাসিমা, বাড়ি ঢুকতে আমাদের দরজা লাগে নাকি? তাহলে আর আমরা অশরীরী কীসের?”
সরুদা হাসল। বলল, “তোরা আজ যা, বিশ্রাম নে। কাল রাত থেকে তোদের খুব ধকল গেল। কাল সন্ধেবেলা আসিস, জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”
ওরা চলে যেতে টুম্পি বলল, “সস্তায় ভালো ভালো বই যদি পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের তো ভালোই। সেটা খারাপ কাজ কেন হবে, সরুদা?”
“বাহ্‌ রে, ধর অনেক সময় নিয়ে, অনেক চিন্তাভাবনা করে, তুই একটা বই লিখলি। তোর সময়ের দাম নেই? তোর ভাবনাচিন্তার একটা দাম নেই? অবিশ্যি সত্যি বলতে, তেমন কিছুই দাম নেই, তোর মাথার মধ্যে গোবর শুকিয়ে ঘুঁটে, তার আবার দাম কী? কিছুদিন আগে তাও ঘুঁটের কিছু দাম ছিল, এখন ঘরে ঘরে গ্যাস হয়ে গিয়ে, সেও আর নেই।”
টুম্পি রেগে গেল খুব। বলল, “একদম বাজে কথা বলবে না, সরুদা। যা বলছিলে বলো।”
মাসিমা আর মেসোমশাই হাসছিলেন। মেসোমশাই বললেন, “সরুটা ফচকে হলেও মাঝে মাঝে সত্যি কথাও বলে।”
টুম্পি আরও রেগে উঠল। বলল, “বাবা, ভালো হবে না কিন্তু!”
সরুদা হাসতে হাসতে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা। রাগ করছিস কেন, শোন না। এবার ধর, তোর লেখা বইটা কেউ খুব সুন্দর করে ছাপল। একটা বই ছাপতেও তো বেশ খরচ হয়, নাকি? তার ওপর ধর সেই বইটা কলকাতা, বাঁকুড়া, বর্ধমান, শিলিগুড়ি কিংবা জলপাইগুড়ির দোকানে দোকানে পাঠাতে হবে। তার খরচ নেই? বইয়ের যে দোকানদার বইটা বিক্রি করবে, সেও তো কিছু পয়সা আশা করবে? তা না হলে তার দোকানটা চলবে কী করে? এইসব খরচ ধরে একটা বইয়ের দাম ধরা হয়।”
মেসোমশাই বললেন, “ঠিক কথা।”
সরুদা আবার বলল, “এবার কিছু বদমাইশ লোক এই বইয়ের জেরক্স করে বাজারে ছেড়ে দিল। তার আর খরচ কী? কিছু সস্তা কাগজ, একটা জেরক্স মেশিন আর বই বাঁধানো, ব্যস। নকল বইয়ের ধাক্কায় আসল বই আর বিক্রিই হবে না। আর এরকম ক্ষতি হলে কেউ আর বই ছাপবে, না কেউ বই লিখবে? এভাবে চললে বই ব্যাপারটাই উঠে যাবে কিছুদিন পরে।”
টুম্পি বলল, “ইস, কতরকমের বদমাইশ লোক হয়!”
টুম্পির কথায় মুচকি হেসে সরুদা বলল, “এরা হচ্ছে সমাজের বৈরী। বই নিয়ে বৈরিতা সহ্য করা মুশকিল, কারণ বই আমাদের সেরা বন্ধু বৈকি!”

_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

1 comment: