গল্পঃ মোগলি ভূতঃ তরুণকুমার সরখেল



ঠাকুরদা ছিলেন যেমন রাশভারী, তেমনি পরোপকারী। তাঁর চিকিৎসায় কত লোক যে উপকৃত হয়েছিলেন বলে শেষ করা যাবে না।
সেবার ঘোর বর্ষায় ঠাকুরদা রোগী দেখে ফিরছিলেন পাশের গ্রাম ধনুকতোড় থেকে। তখন আবছা আঁধার নেমে এসেছে। মাঝে ধানক্ষেতের পাশে একটা পুকুর রয়েছে। পুকুরপাড়ে অনেকদিনের পুরনো পাকুড়গাছ। সেই গাছটার নাম অনুসারে পুকুরটাকে সকলে পাকুড়বাঁধ বলে। ঠাকুরদা পাকুড়বাঁধের কাছাকাছি আসতেই সন্ধেবেলার আবছা আলোয় দেখতে পেলেন, গ্রামের একজন বউ ঝুঁকে পড়ে জল থেকে গেঁড়ি-গুগলি তুলছে। গ্রামের অনেকেই এসময় পুকুর থেকে গেঁড়ি-গুগলি তুলে নিয়ে যায়।
ঠাকুরদা বউটাকে দেখে একটু গলা খাঁকারি দিলেন। কিন্তু তাতে তার কোনও ভ্রূক্ষেপ দেখা গেল না। ঠাকুরদা ডাক্তার মানুষ। গ্রামের সকলেই তাঁকে মান্যি-গন্যি করে। গ্রামের বউরা ডাক্তারবাবুর গলার আওয়াজ পেলেই মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গেঁড়ি-গুগলি তুলতে বউটা এতটাই মগ্ন যে ডাক্তারবাবুর উপস্থিতি বোধহয় টেরই পায়নি সে।
তিনি সাইকেলটা পাশে রেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর বউটির দিকে তাকাতেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। এক ফাঁকে সে একেবারে মাঝপুকুরে চলে গেছে। সেখানে অন্তত এক তালগাছ জল। বউটি অতদূরে গেলই বা কখন, আর কীভাবেই বা গেল? তাছাড়া গভীর জলে ওভাবে কোমর ঝুঁকিয়ে গুগলি তোলা তো সম্ভব নয়। তিনি কি ভুল দেখছেন ? না, ভুল হবার নয়। ঐ তো বউটির নড়াচড়া এতদূর থেকেও বেশ বোঝা যাচ্ছে। তিনি আর সেখানে দাঁড়ালেন না।
গ্রামে ফিরে তারাপদ মাইতির সঙ্গে দেখা। তারাপদকে ডেকে ঘটনাটা বলতেই সে বলল, “এ আর নতুন কথা কী, ডাক্তারবাবু? মোগলি ভূতকে তো অনেকেই পুকুরপাড়ে গেঁড়ি-গুগলি তুলতে দেখেছে। মোগলিকে আপনার মনে নেই বুঝি? ঐ তো সেবার গেঁড়ি-গুগলি তুলতে গিয়ে জলে ডুবে মরল। বেচারা মোগলি সাঁতারটাও জানত না যে। গুগলির নেশায় এতটাই মশগুল ছিল যে কোন সময় জলের গভীরে চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। তখন সন্ধে হয়ে এসেছিল বলে সেখানে কোনও লোকজনও ছিল না। বেচারা বেঘোরে প্রাণটা হারাল। সেই থেকে তার গুগলি তোলার নেশাটা এখনও যায়নি। তবে ও কারও কোনওদিন ক্ষতি করেনি।”
ঠাকুরদা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, “এবার বুঝলাম। মোগলির বাড়িতেও আমি গিয়েছিলাম একবার। ও-বেচারি তখন ম্যালেরিয়ায় মরতে বসেছিল। আমার চিকিৎসাতেই সেবার বেঁচে যায়।”
মজাটা হল এর কয়েকদিন পর। ঠাকুরদা একদিন সেই পাকুড়বাঁধের পথ দিয়েই ফিরছিলেন। পথঘাট শুনশান। সরু রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালানোর সময় হঠা‌ৎ পায়ের কাছে কিছু একটা পড়ল। জিনিসটা বেশ ভারী মনে হল। পিছনের ক্যারিয়ারে আটকানো ঔষুধের ব্যাগটা পড়ল কি? না। তিনি পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে জিনিসটার উপর আলো ফেললেন। সেটা আর কিছু নয়, জ্যান্ত একটা রুই মাছ। মাছটা এখানে এসে পড়ল কীভাবে? ঠাকুরদা এদিক ওদিক তাকালেন। না, কেউ নেই। হঠা‌ৎ তাঁর মোগলি ভূতের কথা মনে পড়ল। এ নির্ঘাত তারই কাজ। ডাক্তারবাবু রুই মাছ পছন্দ করেন, এটা মোগলি এখনও ভোলেনি। বেঁচে থাকতে ডাক্তারবাবুকে সে অনেকবার রুই মাছ দিয়ে এসেছে।
ঠাকুরদা আর দেরি না করে চটপট মাছটা তুলে বড়ি নিয়ে এলেন। অবশ্য বাড়িতে এই ভূতুড়ে কাণ্ডের কথা একবারও বললেন না। কী জানি ভূতের দেওয়া মাছ তারা যদি না খায় তাহলে তাঁর সাধের রুই মাছ খাওয়াই হবে না। তার চেয়ে না বলাই ভালো।
এরপর প্রায়ই ঠাকুরদাকে জ্যান্ত রুই মাছ সাইকেলে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। তবে সে-মাছ তিনি কোথায় পেয়েছেন তা কখনওই প্রকাশ করেননি। মোগলি মরে গিয়েও তাঁকে নিয়মিত মাছ সাপ্লাই করে গেছে। এরকম উপকারী ভূত ক’টা হয়?
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

2 comments:

  1. আহা। ভারি মজার ভূত, মিষ্টি ভূত।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লাগলো

    ReplyDelete