গল্পঃ জয় জগন্নাথঃ দেবলীনা দাস



“ধ্যাত্তেরি, রিমোটটা কোথায় গেল আবার!”
মহা বিরক্ত হয়ে ঘরের জিনিসপত্র হাটকে রিমোট খুঁজতে বসলেন জগন্নাথবাবু। একেই বলে কপাল। গিন্নি বাড়ি নেই, পাড়ার দোকানের রুটি-মাংস দিয়ে জম্পেশ ডিনার সেরে সবে গুছিয়ে বসবেন সাড়ে ন’টার সিরিয়াল দেখতে, এমন সময়ে অবিবেচক রিমোটখানা হাওয়া। সিরিয়ালের আগে একটু নিউজে চোখ বুলিয়ে নেওয়ার ছিল। পাঁচুর চায়ের দোকানে সকালবেলা লেটেস্ট সব খবর নিয়ে আলোচনা হয়। টু-পাইস তিনিও কন্ট্রিবিউট না করতে পারলে চলে কী করে! পেপার দেওয়ার ছেলেটাও আসে লেটে। আহাম্মক সব ব্যাটা।
রাগের মাথায় গিন্নির সাধের জয়পুরী কাজের জামা পরানো একখানা কুশন তুলে ‘দুত্তোর’ বলে ছুড়ে মারেন জগন্নাথ। গিন্নি থাকলে এটা করা যেত না। অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঠিকঠাক করতে পারলে একটা ফুরফুরে ভাব আসে। এল না। এল একটা ‘আঁউ’ করে শব্দ। কেন আসবে? বাড়িতে তো দ্বিতীয় জনমনিষ্যি নেই।
ফিরে তাকাতেই জগন্নাথবাবু তাল ঢ্যাঙা একটা লোককে দেখতে পেলেন। মাথায় কালো জাঙ্গিয়া গোছের কী একটা পরা, চোখ দুটো আর মুখখানা দেখা যাচ্ছে খালি। লোকটার পায়ের কাছে কুশনটা পড়ে আছে। মুখে কুশনের বাড়ি খেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিল মনে হয়, তড়িঘড়ি ডান হাতটা তুলে জগন্নাথের দিকে তাক করে দাঁড়াল সে। জগন্নাথ দেখলেন, লোকটার হাতে একটা বন্দুক ধরা।
ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় লোকটা বলল, “হ্যান্ডস আপ। মানে চিঁড়েটা কোথায় রেখেছেন চুপচাপ বের করে দিন।”
জগন্নাথবাবুর এইসা রাগ হল, যে বলার নয়। ঝগড়া করে ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে বসে আছেন গিন্নি, তাতেও তাঁর মন ভরেনি। শেষে ভাড়াটে গুণ্ডা পাঠিয়ে গেরস্থালির জিনিসপত্তরের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে! নিজের স্বামীকে এত অবিশ্বাস! চাট্টি চিঁড়ের জন্য! রেগেমেগে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিলেন জগন্নাথ। মাঝপথে হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা, তাকে একরকম গুঁতো দিয়েই সরিয়ে দিলেন রাস্তা থেকে। তাক থেকে চিঁড়ের কৌটোটা নামিয়ে ছুড়ে দিলেন তার দিকে। বললেন, “নাও ধরো, বিদেয় হও এইবার। তাকে বলবে আমি ডিভোর্স পেপার পাঠাব।”
লোকটা ঠক করে হাত থেকে বন্দুক ফেলে চিঁড়ের কৌটোর মধ্যে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কীসব খুঁজতে লাগল। এহ্‌, নোংরা হাতে খাওয়ার জিনিসটা ঘাঁটছে দেখো! কিন্তু খুঁজছেটা কী? ভালো করে বুঝতে না বুঝতে কৌটোটা রেগেমেগে ছুড়ে ফেলে লোকটা জগন্নাথবাবুকে বলল, “ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সাথে?”
“ওহো! এইবার বুঝেছি।” জগন্নাথ একটু লজ্জা লজ্জা একটা হাসি দিয়ে আরেকটা ছোটো কৌটো ধরিয়ে দেন লোকটির হাতে। বলেন, “চিঁড়ে চেয়েছ ভাবলাম। তুমি জিরে বলেছ সেটা বুঝতে পারিনি বাবা। আসলে হিয়ারিং এডটা খুঁজে পাচ্ছি না, কান শুনতে ধান শুনেছি আর কী। হেঁ হেঁ হেঁ। গিন্নিকে বোলো না, সবকথা বলার দরকার নেই। যাও, এবার যাও। আচ্ছা এক মিনিট, আমার রিমোটটা একটু খুঁজে পাও কি না দেখবে?”
লোকটার চোখ কেমন বিস্ফারিত হয়ে উঠল। হাতের কৌটোখানা নাড়িয়ে সে বেশ জোরে জোরে কেটে কেটে বলল, “জিরে নয়। চিঁড়েও নয়। হিরে। হি-রে।”
“হিরে?” জগন্নাথের চোখও লোকটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গোল পাকিয়ে উঠল। “গিন্নি আমায় না বলে হিরে কিনেছেন? এত বড়ো আস্পদ্দা!”
লোকটা কপাল চাপড়াল। আবার জোর গলায় বলল, “আপনার গিন্নির হিরে নয়। দুর্গানারায়ণবাবুর হিরেটা। আপনি জগমোহন সমাদ্দার নন?”
জগন্নাথ আত্মপরিচয় দিতে তৎপর হলেন না, কারণ তাঁর চোখদুটো চকচক করে উঠেছে। টেনে ঠেলে লোকটাকে সোফায় নিয়ে গিয়ে ফেললেন তিনি কোনওমতে। বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও, ব্যাপারটা শুনতে হচ্ছে! বলো দেখি কী বিত্তান্তখানা! আরে আসলে সোনার বাংলা চ্যানেলে আঁধার রাতের আলো বলে যে সিরিয়ালটা হয়, সেখানে ভিলেন ভদ্রলোকের নাম দুর্গানারায়ণ। বলো বলো শুনি। আহা, তাড়াহুড়ো কোরো না, তাড়া করার দরকার নেই, আমার সিরিয়াল শুরু হতে দেরি আছে।”
লোকটার চোখের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠছে। জগন্নাথের মায়া লাগল। বললেন, “মাথা থেকে জাঙ্গিয়া টুপিটা খুলে ফেলো না বাবা। জল খাবে?”
লোকটা প্রাণপণ মাথা নেড়ে কাকুতির স্বরে বললে, “আমি বাথরুম যাব। শরীর খারাপ লাগছে।”
জগন্নাথবাবু বাধ্য হয়েই একটা দাবড়ানি দিলেন লোকটাকে। বললেন, “আগে কথাখানা ভালো করে বলে নাও না। পরে বাথরুম যাবে। ডায়াবেটিক বুড়ো মানুষ তো নও, একটুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবে এখন।”
লোকটা নাছোড়বান্দা। পিন আটকে যাওয়া গ্রামোফোনের মতো এক সুরে বেজে চলল, “বাথরুম যাব, বাথরুম যাব।”
দাবড়ানির সুর চড়ালেন জগন্নাথও। বললেন, “দেখো, বাথরুমে যাব বললেই তো যাওয়া যায় না। এ তোমার নব্য ফ্ল্যাটবাড়ি নয়, আমার পিতাঠাকুরের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তৈরি করানো বাড়ি। বাথরুম পেছনের উঠোনে। সে এখন আমায় উঠে খিড়কি দরজার তিনখানা তালা-ছিটকিনি-হুড়কো খুলতে হবে। অনেক হ্যাপা।”
লোকটি মিনমিন করে বলল, “আজ্ঞে খুলতে হবে না।”
উদগ্রীব হয়ে উঠলেন জগন্নাথ। বললেন, “কেন কেন, খুলতে হবে না কেন? তুমি ম্যাজিক জানো?”
লোকটি কাঁদোকাঁদো গলায় বললে, “আপনি একখানাও তালা বা ছিটকিনি বা কিছুই লাগাননি আজ্ঞে। দরজা খোলাই ছিল। না হলে আমি ঢুকলাম কী করে!”
ইয়া লম্বা জিভ কেটে দোষ স্বীকার করেন জগন্নাথ। বলেন, “এহে, ভুলে গেছিলাম আবার দরজা লাগাতে। শোনো, গিন্নিকে বোলো না, বুঝলে। সবকথা অত বলে ফেলতে নেই।”
লোকটা বিড়বিড় করে স্বগতোক্তির মতো, “আর গিন্নি! এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারলে আমি আর এ-মুখো হব ভেবেছেন!”
এখন নিন্দুকে জগন্নাথ ভটচাযকে কালা বললে হবে কী, শুনতে তিনি মোটের ওপর ভালোই পান। অতএব মিটিমিটি হেসে জগন্নাথ উত্তর করেন, “এ-মুখো হবে না মানে! সরস্বতীপুজো-কালীপুজোর চাঁদার সিংহভাগ কার বাড়ি থেকে যায় সে আমি জানি না ভেবেছ! গৃহযুদ্ধ চাই না বলে কিছু বলি না, হুঁ হুঁ!”
লোকটি আবার খাবি খায়। অস্পষ্ট তোতলায়, “চাঁ-চাঁ-চাঁদা!”
জগন্নাথ একটা শার্লক হোমস গোছের মুখভঙ্গি করেন। বলেন, “সত্যি করে বলো তো খোকা, তুমি ও-পাড়ার বিশু নও? তোমার দলবল নিয়ে তুমি এ-বাড়িতে প্রায়ই নারকোল নাড়ু আর চিঁড়েভাজা খাওয়ার জন্য হানা দাও না? আমার অনুপস্থিতিতে তোমার জেঠিমাকে নিঃসন্তান বিধবা, সরি, তোমার জেঠিমা তো সধবাই, আমি তো মরিনি এখনও, মাই মিসটেক, হ্যাঁ কী বলছিলাম? হ্যাঁ, নিঃসন্তান মহিলার অপত্যস্নেহের সুযোগ নিয়ে তোমরা চাঁদার নাম করে শ’য়ে শ’য়ে টাকা নিয়ে যাও না এই বাড়ি থেকে?”
লোকটা এবার কেঁদে ফেলে। বলে, “আমি বিশু নই। আমি বাথরুম যাব।”
জগন্নাথ রেগে যান আবার। বলেন, “বুড়োধাড়ি ছেলে হয়ে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদতে লজ্জা করে না! শোনো, মাথায় জাঙ্গিয়া পরো আর যাই পরো, ওই ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলা চিনতে আমি ভুল করব ভেবেছ? নো, নেভার! কভি নেহি! বাপের পকেট থেকে চুরি করে বিড়ি খেলে ওইরকমই গলা হবে। ছোটোবেলায় একবার এক থাবড়া দিয়েছিলুম কানের গোড়ায়, মনে পড়ে?”
লোকটা হাপুস নয়নে কাঁদে।
আহা, বুঝি চড় খাওয়ার কথাটা মনে করানো উচিত হয়নি। আচ্ছা এক মিনিট, এটা বিশুই তো? দিনকাল ভালো নয়, ভালো করে জেনে বুঝে নেওয়া দরকার। অতএব জগন্নাথ জোরদার ধমক দেন লোকটাকে। “এইয়ো, চোওওওপ! কান্না বন্ধ করো। বলছি তুমি সত্যি বিশু তো? দেখো ঠিক করে বলো বাবা, নাহলে আবার হ্যাপা আছে। পুলিশ-টুলিশকে ফোন করতে হবে। এদিকে ল্যান্ডলাইন ডেড, আর মোবাইলটা কোথায় রেখেছি খুঁজে পাচ্ছি না।”
লোকটা কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে বলে, “না না, পুলিশ ডাকবেন না। আমি বিশু। আমার ঠাকমা আমায় ছোটোবেলায় আদর করে বিশু বলে ডাকতেন। জ্যাঠামশাই, বাথরুম যাব?”
জগন্নাথ বিজয়ীর হাসি হাসেন। বলেন, “গলা শুনেই বুঝেছিলাম। লোকে ভাবে আমি পুরো কালা। আর শোনো, তোমার ঠাকুমার কথা তুলো না। উনি সুবিধের লোক ছিলেন না। গাছের আম-জাম পাকলে কোনও দিন পাড়ার ছেলেদের একটি হাতে করে দিয়েছেন? উলটে একবার বাবার কাছে আমার নামে যা নয় তাই… আরে খেলে যা! বাথরুম বাথরুম করে কেঁদে মরছে দেখো! যাও যাও। আর শোনো, ফিরে এসে আমাকে হিরের গল্পটা শুনিয়ে তবে যাবে। হিয়ারিং এডটা খুঁজে রাখছি, রিমোটটা তুমি খুঁজে দিয়ে যাবে, পারলে মোবাইলটাও।”
বিশু ছুটে বেরিয়ে যায় খিড়কি দরজা দিয়ে। জগন্নাথবাবু ঘর আঁতিপাঁতি করে হিয়ারিং এড খুঁজতে থাকেন। পাঁচ, দশ, পনেরো মিনিট করে আধঘণ্টা চলে যায়, বিশু ফেরে না। হিয়ারিং এডের খোঁজে বিরতি দিয়ে জগন্নাথ এবার তার খোঁজে যান। এহ্‌, এ কী কাণ্ড, বাথরুম তো ফাঁকা! উঠোনও ফাঁকা। পালিয়েছে তার মানে। নাকি, নাকি উবে গেছে? লোকটা বিশুই ছিল তো? নাকি ভূতপ্রেত ছিল? ভ্যানিশ করে গেছে?
আপাদমস্তক শিহরিত হন জগন্নাথ, রোমাঞ্চিত হন। শিগগিরি ঘরে ঢুকে পড়েন। মোবাইলটা খুঁজতে হবে। ফোন করে গিন্নিকে গল্পটা না বলতে পারলে পেট ফেঁপে যাবে, শরীর আইঢাই করবে। হিয়ারিং এডটা পাওয়া গেল না, থাক গে। গল্প বলতে গেলে তো শোনার দরকার পড়বে না তাঁর। আর ভগবানের দয়ায় গিন্নির গলাখানি সরেস, শুনতে হিয়ারিংয়ের কোনও এড লাগে না। ঘর এলোমেলো করে মোবাইল খুঁজতে লাগলেন জগন্নাথ। পেছনের দরজা নিয়মমাফিক তালা-হুড়কোর বন্ধনমুক্ত রয়ে গেল।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

1 comment: