অণুগল্পঃ গুরুদেবের পটলপ্রাপ্তিঃ সুস্মিতা কুণ্ডু


গুরুদেবের পটলপ্রাপ্তি

সুস্মিতা কুণ্ডু

“এই রোজ রোজ বাজার যাওয়ার কী দরকার বুঝিনে বাপু!”
ব্যাজার মুখে আপনমনে গজগজ করতে করতে বাজারের পথ ধরেন কানাইবাবু। হাতের ঢাউস নাইলনের ব্যাগটার দিকে তাকালেও গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই, গিন্নির হুকুম।
বাজারে পৌঁছে আরেকপ্রস্থ মাথা গরম। সবজি তো নয় যেন সোনা! এমন সব দাম হাঁকছে!
“পটল কত করে?”
“আড়াই’শ দশ টাকা।”
শুনে তো কানাইবাবুর চোখ কপালে।
“অ্যাঁ! চল্লিশ টাকা কিলো! এই পটল খাওয়ার থেকে পটল তোলাই ভালো!”
“আমার মাথা না খেয়ে তবে পটলই তুলবেন যান বরং।” সবজিওয়ালা দেখতে গোবেচারা হলে কী হবে, জিভখানা আঁশবঁটির মতোই ধারালো।
আরেকজন সবজিওয়ালা ‘আড়াই’শ পনেরো’ হাঁকছে। এই লোকটাই সবচেয়ে সস্তায় দিচ্ছে। অবশ্য পটলগুলো একটু রোগাপাতলা গড়নের, কানাইবাবুরই মতো। সেইজন্যই কম দামে জুটছে।
আজ পটলের দোলমা বানাবেন গিন্নি গুরুদেবের জন্য। পটল না নিয়ে ফিরলে গিন্নির বেলনপেটা খেয়ে সত্যিই পটল তুলতে হবে।
অগত্যা পটল এবং গিন্নির মুক্তাক্ষরে লেখা ট্রেন লাইনের মত লম্বা ফর্দ মিলিয়ে আরও চাট্টি পিণ্ডি ব্যাগে ভরে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন কানাইবাবু।
ঘরে ঢোকার আগেই বৈঠকখানার জানালার বাইরে থেকে শুনতে পেলেন গুরুদেব গিন্নিকে বলছেন, “একটা হিরের আংটি, একটা পান্না আর একটা চুনি ধারণ করতে হবে। ওই লাখ দুয়েক। আর একটা যজ্ঞ, ধর গিয়ে হাজার পঞ্চাশেক। আর হেঁ হেঁ, আমার দক্ষিণে তো তুই জানিসই মা।”
ব্রহ্মতালু অবধি রাগে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল কানাইবাবুর। জানালা দিয়ে গলাটা বকের মতো লম্বা করে উঁকি দিলেন। দেখলেন, কানাইগিন্নি গলবস্ত্র হয়ে গুরুদেবের পায়ে লুটিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, “গুরুদেব, এগুলো করলে আমার স্বামীর কিপটেমি দূর হবে তো?”
গুরুদেব হাত তুলে তথাস্তু ভঙ্গীতে আশীর্বাদ করলেন।
জানালার বাইরে কানাইবাবু দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে মুঠো পাকিয়ে বললেন, “দুধ-কলা-পটল দিয়ে কাল সাপ পুষছি! আমার কিপটেমি দূর করা হচ্চে! মজা দেখাচ্ছি! দেখি কে কাকে দূর করে!”
মধ্যহ্নভোজনের আগে গিন্নি গুরুদেবের জন্য আসন পাততে যেই রান্নাঘরের বাইরে গেছেন, অমনি কানাইবাবু সেঁধিয়ে গেলেন হেঁশেলে। গিন্নি কাঁসার থালাবাটিতে সব সেজে গেছেন। বাঁশকাঠি চালের ভাত, ঘি দেওয়া সোনামুগের ডাল, পটলের দোলমা, হ্যাঁকো-ঢ্যাঁকো আরও কত কী! টাকার ছাদ্দ! পয়সার পিণ্ডি!

গিন্নি ভক্তিভরে পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে সিলিং ফ্যানের তলায় হাতপাখা নাড়াচ্ছেন বসে। গুরুদেব ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে হাত আর মুখের সদ্ব্যবহার করে চলেছেন। “আহা! পটলের দোলমাটা খাসা বানিয়েছিস তো!”
ভোজন এক্সপ্রেস প্রায় মধ্যপথ অতিক্রান্ত, ঠিক তখনই গুরুদেব বিকৃতমুখে পেট চেপে ধরলেন। এমন জোরে ‘গড়রর গুবগুব’ আওয়াজ হল পেট থেকে যে দরজার বাইরে লুকিয়ে কানাইবাবুও শুনতে পেলেন। গিন্নির কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল আর কানাইবাবুর মুখে ফিচেল হাসির।
গুরুদেব থালা ফেলে ছুটলেন বাথরুমের দিকে। পেছনে কানাইগিন্নিও ‘কী হল গুরুদেব’ বলতে বলতে ছুটলেন।
কানাইবাবু দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে হো হো হো করে হেসে বলে উঠলেন, “লাখ টাকার পাথর আর যজ্ঞ পরে হবে গুরুদেব, আগে দশ টাকার পটলের পেটে দু’টাকার জোলাপ দেওয়া দোলমার ধাক্কা তো সামলান!”

_____

No comments:

Post a Comment