দুষ্টুমিষ্টিঃ মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী, অদিতি ভট্টাচার্য, অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শেলী ভট্টাচার্য, প্রতীক কুমার মুখার্জি



রাণু খ্যাপানি গান

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

আমার ডাক নাম হল রাণু। অনেক ছোটোতে আমি বেশ শান্তশিষ্ট থাকলেও আমার দু’জন দুষ্টু দাদা ছিলেন। বিশেষ করে বড়োজন। ছ’বছরের বড়ো দাদার মাথায় সর্বক্ষণ আমায় জ্বালাতনের বুদ্ধি ঘুরত। তিনি বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন গানের প্যারোডি বানাতে পারতেন ওই অল্প বয়স থেকেই। ছোটো বয়সে রস না পেলেও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতে অভ্যস্ত ছিলাম আমরা। দাদা সেই গান শুনে তারও প্যারোডি বানালেন, ‘দ্যায় দুম তানা না না, উন্নত নাসিকা’ (মানে খোঁজার চেষ্টা বৃথা) এবং সে গানের নাম হলো ‘রাণু খ্যাপানি গান’। আজও আমার কাছে রহস্য, দাদারা এই গান গাইলে কেন আমি নাকি সুরে চিৎকার জুড়ে মাকে ডাকতাম, “ও মাঁ, দ্যাঁখো নাঁ! ও মাঁ, দেঁখেছ?”
যেই আমি চেঁচাতাম, অমনি গান বদলে যেত মন্ত্র পাঠে ‘ওঁ মা দেইখ্যেছো, ওঁ মা দেইখ্যো না’।
বাড়িতে আসা রাশিয়ান পত্রিকাগুলি দেখে কেন জানি না আমার ধারণা হয়েছিল, চাঁদ আর সোভিয়েত রাশিয়া একই। এই সুসংবাদটি যখনই আমার দাদার কানে পৌঁছাল, তিনি পেলেন রাণু খ্যাপানোর নতুন অস্ত্রー‘সোভিয়েত রাশিয়া চাঁদে, তাই পৃথিবী কাঁদে।’
_____



মুনিয়ার কাণ্ড

অদিতি ভট্টাচার্য

মা-বাবার সঙ্গে মুনিয়া গেছে এক আত্মীয়র বাড়ি বেড়াতে। ছোট্ট মুনিয়ার লুচি-প্রীতির কথা আত্মীয়পরিজন মহলে কারুরই অজানা নেই। গৃহকর্ত্রী তাই তাড়াতাড়ি আটা মেখে লুচি ভেজে দিলেন।
খেতে বসে মুনিয়া বলল, “তোমরা এরকম লাল লাল লুচি খাও বুঝি? ফস্সা লুচি খাও না? আমার মা তো আমায় কী সুন্দর ফস্সা ফস্সা লুচি ভেজে দেয়।”
_____



পিটুনি প্রাইমারি স্কুল

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ইস্কুলে গরমের ছুটি পড়ে যেতেই দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াবার সাধ্য আর চলন দুটোই তখন অনুপস্থিত ছিল। সেসময়ে সবে প্রাইমারি থেকে মিডলে উঠেছি। ছুটির এক সকালে পিতৃদেবের শোবার ঘরে খুলে বসলাম নিজস্ব পাঠশালা। দুটি কোল-বালিশ, একটি মাথার বালিশ এবং পিতৃদেবের আরাম কেদারার কুশন হল আমার ছাত্রদল।
​পড়া ধরা দিয়ে ক্লাস শুরু। ছাত্ররা মূক, তাই প্রত্যুত্তর পাওয়া যাবে না জেনেও বারংবার প্রশ্নের ঝড় বইয়ে দিলাম। তারপর ভূগোল পড়াতে শুরু করলাম, ঠিক যেমনভাবে ক্লাসে মাস্টারমশাই পড়াতেন। আবার প্রশ্নের পালা। ছাত্ররা নীরব দেখে শুরু করলাম বেত্রাঘাত। ওই বেতটি আমার পিতৃদেব ঘরের কোনায় রেখে দিয়েছিলেন কেবল ভয় দেখাবার জন্য, কোনোদিন ব্যবহার করেননি। মারের চোটে এক ছাত্রের গা ফেটে তুলো বেরিয়ে এল। তাতেও রাগ কমে না। ছাত্র পড়া না পারলে রাগ হয় না?
​আমার সহোদরাটি কোন ফাঁকে জানালার গরাদ দিয়ে আমার নাজেহাল ছাত্রদের দশা দেখে কাপ-ডিশ ভাঙা হাসিতে ফেটে পড়তে ক্লাস গেল ভেঙে। লিকলিকে বেতটি মাতৃদেবীর কৃপায় আমারই পিঠে দেহত্যাগ করেছিল সেদিন।
_____



ম্যাজিক 

শেলী ভট্টাচার্য

“জানো মা, আজ স্কুলে একটা সাদা রঙের কাপড়কে ‘গিলি-গিলি-গে’ বলে ম্যাজিক করে বিভিন্ন রঙের রুমালের মালা করে দেখাল।” স্কুলফেরতা হিয়ার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। ও বলছিল, “আমি যদি এরকম ‘গিলি-গিলি-গে’ বলি, তো যেকোনও সাদা কাপড় রঙিন হয়ে যাবে?”
আমি ওর অবুঝ প্রশ্নকে সামলে বললাম, “না রে, ম্যাজিক এত সহজ নয়।”
ওকে দেখে আমার মনে পড়তে লাগল ছেলেবেলার কথা। মহাজাতি সদনে পি. সি. সরকারের ম্যাজিক শোয়ে আমি বাবা-মায়ের সাথে গিয়েছিলাম। সেখানে বিখ্যাত শো ‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’ ম্যাজিকে দেখাচ্ছিলেন। যখনই ‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া’ বলছেন, অমনি খালি গ্লাস ভরে উঠছে। আমার খুব মনে ধরেছিল ম্যাজিকটা। সেসময় জলের কষ্ট ছিল বলে আমি ঘরে ফিরতে ফিরতে মাকে বলেছিলাম, “আমি ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার ম্যাজিকটা করে জল আনব।”
শিশুমন এমনই হয়। সামনে দেখা সবকিছুকে সরল দৃষ্টিতে দেখে প্রয়োগ করে।
এমন সময় একজনকে দেখলাম পথের ধারের কিছু গরিব মানুষকে খাবার বিতরণ করছেন। হিয়ার জিজ্ঞাসা, “উনি কী করছেন, মা?”
আমি উত্তরে বললাম, “এটা পৃথিবীর কঠিন ম্যাজিক। হাসি ছড়ানোর ম্যাজিক।”
 _____



কে রে লাইট?

প্রতীক কুমার মুখার্জি

প্রায় তিরিশবার পাড়ায় চক্কর দেওয়াতেও আশানুরূপ চাঁদা না ওঠায় মেজাজ চড়েছিল। মানসচক্ষে দেখছি ক্রচেট সুতোর টুনি বালব-সজ্জিত প্যান্ডেল, একহাতি সরস্বতী। ক্লাস এইট-নাইনের বিপ্লবী মন ভারাক্রান্ত। দু-দশ টাকার বিনিময়ে যা শুনতে হয়েছে কহতব্য নয়, বিশেষ করে মূর্তি পরিবার। বলে, “হামলোগ কেরেলাইট, বাঙ্গালি সেরিমনি নো চান্দা, ভাগো!”
ভাগো!
অপমানের শোধ নিলাম পুজোর আগের রাতে। অন্যান্য বাড়ির ফুলের টবের সাথে মূর্তিদের তিনতলার ব্যালকনি থেকে নামালাম চারটে নধর, কচি দু-ফুটিয়া কলাগাছ। ভোরের আগেই টবে রং-টং করে সেই গাছ প্যান্ডেলের সামনে বসে পড়ল।
মূর্তিদের হাহাকারে মোরগ ডাকল সেদিন। আধঘন্টার ভিতর মূর্তিমানেরা প্যান্ডেলের সামনে। গোরিলার মতো বুকে দমাদ্দম ঘুষি, “কলাগাছ হামারা হ্যায়!”
আমরা মানব কেন? মূর্তিপুত্র ছোটো মূর্তির সাথে হাতাহাতি লেগে গেল। ভদ্র, শান্তিপ্রিয় বাপী মারপিট থামাতে গিয়ে একচড় খেতেই ঘূর্ণিঝড়! ছোটো মূর্তিকে ধোবিপাটে আছড়ে ফেলে বুকের উপর বসে শান্তভাবে অহিংসার বাণী শোনাতে লাগল।
আর ঠিক থাকা যায়? হাস্যরোল উঠতেই মূর্তি আমতা আমতা করল, “কলাগাছ হামারা, খাস মাদ্রাজী, পাত্তা কাটনেসে লাল জুস নিকলতা!”
আমরা অল আউট!
পুজো ভালোই কেটেছিল। মাদ্রাজী কলাগাছের সগর্ব উপস্থিতিতে পঞ্চাশ টাকা চাঁদাও জুটেছিল। বাপীকে কাঁধে চাপিয়ে ভিক্ট্রি ল্যাপ দিয়েছিলাম আমরা। মজার কথা, তাকে ডানদিক থেকে চাগিয়ে ধরেছিল স্বয়ং কেরেলাইট!
_____

অলঙ্করণঃ সুস্মিতা কুণ্ডু

No comments:

Post a Comment