বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ অস্ত্রের ঝংকার (১ম পর্ব) কিশোর ঘোষাল


প্রথম পর্ব


এক

আদিম মানুষের সঙ্গে অমানুষের, অর্থাৎ অন্য প্রাণীর বুদ্ধির তফাতটা প্রথম চোখে পড়েছিল যে কারণে, সেটা হল অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার। আদিম মানুষেরা প্রধানত বন্য জীবজন্তু শিকার করে প্রাণধারণ করত। তাদের মধ্যে আদিম যে মানুষেরা অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছিল, বিজ্ঞানীরা তাদের হোমো হ্যাবিলিস বলেন। সেই অস্ত্রশস্ত্র তারা বানিয়েছিল পাথরের টুকরো, গাছের ডালপালা এবং মরা জন্তুর শক্তপোক্ত হাড় দিয়ে। কয়েকটা নমুনা দেখালে বুঝতে পারা যায় সেই সময়কার অস্ত্রশস্ত্রের রকমসকম।
হোমো হ্যাবিলিস
ছোটো বড়ো নানান আকারের পাথরের টুকরো, সেগুলো একটু ছুঁচোলো হলে কিংবা করে নিতে পারলে মারাত্মক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। আদিম মানুষেরা তাই করেছিল। তারা দল বেঁধে ঘুরত আর শিকারের জন্যে অপেক্ষা করার সময় হাতের কাছে জড়ো করে রাখত এরকম অজস্র পাথর। জীবজন্তু দেখলেই তাদের দিকে সকলে মিলে সজোরে ছুড়ে মারত সেই পাথর। তাতে ছোটোখাটো কিংবা মাঝারি সাইজের জন্তু ঘায়েল হত নির্ঘাত। তারপর ঘায়েল হওয়া জন্তুর কাছাকাছি গিয়ে আঘাত করা হত গাছের শক্ত ডালের আগায় বাঁধা তীক্ষ্ণ আর ধারালো ফলা দিয়ে। অথবা মোটা গাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা ভারী পাথরের মুগুর দিয়ে। তারপর জন্তুর হাড় দিয়ে বানানো অস্ত্র ব্যবহার করে কেটে ফেলা হত জন্তুর পুরু চামড়া এবং মাংস।

পণ্ডিতেরা আজ থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগেকার এই সময়টার নাম দিয়েছেন প্রস্তরযুগ বা Stone Age। প্রথমদিকে পাওয়া পাথরের অস্ত্রগুলি ছিল বেশ ভোঁতা আর মোটাসোটা। কিন্তু পরের দিকে এই অস্ত্রগুলিই অনেক সূক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ এবং কাজের উপযোগী হয়ে উঠল। আদিম মানুষেরা যে তীক্ষ্ণ এবং উপযোগী পাথরের অস্ত্র বানাতে শিখল তাই নয়, তারা যে পাথর দিয়ে সবথেকে ভালো অস্ত্র বানানো যায়, সেই বিশেষ ধরনের পাথরের ব্যবহারও শিখে ফেলল। সেই বিশেষ পাথরের নাম ফ্লিন্ট (flint)। এই পাথরটি খনিজ কোয়ার্জের (quartz) রূপান্তরিত কেলাসিত পাললিক শিলা (cryptocrystalline sedimentary rock)। এই ফ্লিন্ট পাথরের বাংলা নাম চকমকি পাথর। এই পাথরের সঙ্গে লোহা মিশ্রিত পাইরাইট পাথরের (pyrites) টুকরো ঘষাঘষি কিংবা ঠোকাঠুকি করলে আগুনের ফুলকি ওঠে। ঘটনাচক্রে এই পাথর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র বানানোর সময়েই সেই মানুষেরা হয়তো আগুন জ্বালতে শিখে ফেলেছিল এবং বুঝে ফেলেছিল লোহার গুরুত্ব। পরবর্তীকালে তামা, ব্রোঞ্জ ও লোহার নিষ্কাশন পদ্ধতি শিখে ফেলে তারা সূচনা করে ফেলল নতুন যুগের।
ফ্লিন্ট পাথরের তৈরি বর্শা ফলক

পাইরাইট পাথর


পাথরের পরিবর্তে ধাতু এসে যাওয়াতে অস্ত্রশস্ত্র এবং তার সঙ্গে যাবতীয় যন্ত্রপাতি যেমন, কোদাল, কুড়ুল, কাস্তে, হাতুড়ির আমূল পরিবর্তন হতে বেশি দেরি হল না। প্রস্তরযুগ (stone age) থেকে তাম্রযুগে (copper age) আসতে আদিম মানুষের লেগেছিল লক্ষ বছর। পণ্ডিতেরা বলেন, তাম্রযুগের শুরু হয়েছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মের মোটামুটি ৯০০০ বছর আগে (9000 B.C.) অর্থাৎ আজ থেকে মাত্র এগারো হাজার বছর আগে!
তামা তেমন কিছু শক্ত ধাতু নয়, খুব সহজেই বেঁকে যেত এবং তামা দিয়ে বানানো ধারালো পাত কিংবা ফলার সূক্ষ্ম মুখটি চট করে ভোঁতা হয়ে যেত। তামার এই অসুবিধে দূর করতে তামার সঙ্গে আরও কিছু ধাতু মিশিয়ে বানিয়ে তোলা হল ব্রোঞ্জ (Bronze), যাকে আমাদের সংস্কৃতে বলা হয় কাংস্য, চলতি ভাষায় কাঁসা।
ব্রোঞ্জযুগে তামার সঙ্গে ১২% থেকে ৬% টিন মিশিয়ে নানান ধরনের ব্রোঞ্জ ব্যবহার হত। ১০% - ১২% টিনমিশ্রিত কঠিন ব্রোঞ্জ থেকে সাধারণত অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি বানানো হত এবং ৬% - ৮% টিনমিশ্রিত ব্রোঞ্জ থেকে শিরস্ত্রাণ (helmet), গায়ের বর্ম বা কবচ (armor) বানানো হত।
তবে অস্ত্রশস্ত্র বানানোর ব্যাপারে ব্রোঞ্জের ব্যবহার খুব বেশি হলে হাজার খানেক বছরের বেশি চলেনি। তার কারণ ততদিনে মানুষ লোহার আবিষ্কার ও ব্যবহার শিখে ফেলেছিল। লোহার ব্যবহার শিখে ফেলার পর মানব সভ্যতার অতিদ্রুত উন্নতি ঘটতে লাগল।
আমাদের দেশের প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে হরপ্পা-মহেঞ্জোদরো সভ্যতায় তামার অস্ত্রশস্ত্র ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে, কিন্তু ব্রোঞ্জের ব্যবহার তেমন পাওয়া যায়নি। পণ্ডিতেরা বলেন, ভারতীয় সভ্যতায় তাম্রযুগের পরেই লৌহযুগের শুরু হয়েছিল। প্রাচীন ভারতবাসী ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানলেও ব্রোঞ্জের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত ছিল। গয়নাগাটি, পূজা এবং গৃহস্থালীতে প্রয়োজনীয় নানান পাত্র ও উপকরণ এবং দেবদেবীর নানান মূর্তি নির্মাণে ব্রোঞ্জ ব্যবহারের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে।

দুই

অস্ত্রশস্ত্র বলতে আমরা সাধারণভাবে ইংরিজিতে weapon বুঝি। কিন্তু আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে অস্ত্র আর শস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য ছিল বিস্তর। অস্ত্র মানে যা ছুড়ে শত্রুকে বা বিপক্ষকে আঘাত এবং আক্রমণ করা হয়। অন্যদিকে শস্ত্র মানে যা হাতে ধরে রেখে শত্রু বা বিপক্ষকে আঘাত করা হয়। নানান প্রকারের অস্ত্রশস্ত্রের বিভাগ নিচে দেওয়া হল চট করে মনে রাখার সুবিধের জন্য।
  
বিভিন্ন অস্ত্রের নাম
অস্ত্রের বিবরণ
উদাহরণ
অস্ত্র তিন প্রকার 


পাণিমুক্ত অস্ত্র
পাণি অর্থাৎ হাত থেকে ছোড়া অস্ত্র
শক্তি -  একধরনের বর্শা।
যন্ত্রমুক্ত অস্ত্র 
যন্ত্রে বসিয়ে ছোড়া অস্ত্র 
শর, তির, বাণ।
মুক্তামুক্ত 
হাতে রেখে, আবার কখনও কখনও হাত থেকে ছুড়ে যে অস্ত্রে আঘাত করা হয়। 
দণ্ড (ধাতু বা কাঠের লাঠি), গদা ইত্যাদি।
শস্ত্র
অমুক্ত অস্ত্র - হাতে ধরে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। 
তরবারি, খড়্গ ইত্যাদি।

এবারে মহাভারতে উল্লেখ থাকা কয়েকটি ভয়ংকর (নাকি মজার?) অস্ত্রের ক্ষমতার কথা বলছি শোনো।

অস্ত্রের নাম 
অস্ত্রের বিশেষ ক্ষমতা
কাকুদীক
যে অস্ত্রে বিদ্ধ হলে সৈন্যরা রথ, অশ্ব, গজের উপর ঘুমিয়ে পড়ে। (তিরের ফলায় ঘুমের ওষুধ মেশানো থাকত?)
শুক
যে অস্ত্রের ভয়ে সৈন্যরা রথের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। (ভীতু সৈন্যরা যেকোনও অস্ত্রের ভয়েই লুকিয়ে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্য কী?)
নাক
যে অস্ত্রে বিদ্ধ হলে সৈন্যরা উন্মত্তের মতো স্বর্গদর্শনের ভুল করত। (তিরের ফলায় তীব্র নেশার ওষুধ মেশানো থাকত?)
অক্ষিসন্তর্জন 
যে অস্ত্রের প্রভাবে সৈন্যরা প্রস্রাব ও বাহ্য করে ফেলত।
নর্তক 
যার আঘাতে সৈন্যরা পিশাচের মতো নৃত্য করে।
ঘোর
যে অস্ত্র নির্দয়ভাবে বিনাশ করে।
আস্যমোদক 
যে অস্ত্রে সৈন্যদের অবশ্য মৃত্যু হয়। মৃত্যুর দেবতা যমের আনন্দবর্ধক।

প্রস্তরযুগের প্রথমদিকে যে ধরনের অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার হত, সেগুলি প্রধানত পাণিমুক্ত অস্ত্র। যেমন পাথরের ধারালো টুকরো; মুক্তামুক্ত অস্ত্র, যেমন গাছের ডালে বাঁধা বর্শা, মুগুর বা গদার মতো ভারী কাঠের ডাণ্ডা যা ছুড়েও মারা যেত আবার হাতে ধরে খোঁচা মারা যেত অথবা পেটানো চলত। আর ছিল শস্ত্র, ছুরির মতো তীক্ষ্ণ পাথরের ফলা, যা হাতে ধরে খুঁচিয়ে আঘাত করা যেত। পরবর্তীকালে মানুষ যখন ধনুক এবং তির আবিষ্কার করে ফেলতে পারল যার নাম যন্ত্রমুক্ত অস্ত্র, তখন শিকার ও যুদ্ধের সংজ্ঞাটাই বদলে গেল।
মানব সভ্যতায় প্রথম যে যন্ত্রমুক্ত অস্ত্র আবিষ্কার হয়েছিল সেটার নাম না জেনে গেলেও সেটা অনেকটা আমাদের গুলতির (slingshot) মতো। বুনো লতার শক্ত তন্তু দিয়ে দড়ি বুনে তার মধ্যে ধারালো পাথরের টুকরো বেঁধে বার কতক ঘুরিয়ে ছুড়ে দেওয়া হত শিকারের দিকে। কিন্তু তাতে লক্ষ্য স্থির রাখা প্রায় অসম্ভব। তারপর যে গুলতি আবিষ্কার হল সেটা অনেক কাজের জিনিস। দুই হাতওয়ালা গাছের ডালে পশুর নাড়িভুঁড়ির ফিতে আর চামড়ার পট্টি লাগিয়ে জোরদার গুলতি তৈরি করে ফেলেছিল সে-যুগের মানুষেরা। নিচের ছবিতে যে গুলতিগুলির ছবি আছে, সে দুটোই এযুগের গুলতি। সেই আমলের গুলতি আমাদের বর্তমান সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি, কিন্তু তাদের হদিশ পাওয়া গেছে গুহার দেওয়ালে আঁকা ছবিতে এবং পরবর্তীকালের নানান নিদর্শন থেকে।

গুলতির পরবর্তী ধাপ হল ধনুক ও তির। মানুষের প্রথম কারিগরিবিদ্যার সার্থক ও অত্যন্ত উপযোগী ব্যবহার বললে এতটুকুও অত্যুক্তি হয় না। হয়তো সেই প্রস্তরযুগ থেকে শুরু হয়ে খ্রিস্টাব্দ পনেরো শতাব্দী পর্যন্ত তির-ধনুক ব্যবহারের কোনও বিকল্প ছিল না। পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক যত বীরের কাহিনি ও গল্প আমরা শুনি, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ তিরন্দাজ। তির-ধনুকের এই বিদ্যাকে আমাদের শাস্ত্রে ধনুর্বেদও বলা হত। মহাভারতে বর্ণিত আছে, আচার্য দ্রোণ ছিলেন এই ধনুর্বেদ বিদ্যায় সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। তাঁর বিখ্যাত শিষ্যদের মধ্যে হলেন অর্জুন, কর্ণ এবং একলব্য।

ধনুক ও তিরের বিজ্ঞান

ধনুকের চাপটি (arc) বানানো হত খুবই শক্ত অথচ স্থিতিস্থাপক কাঠ দিয়ে। আর জ্যা, গুণ বা ছিলা (chord) বানানো হত সাধারণত মরা জন্তুর নাড়িভুঁড়ি রোদ্দুরে শুকিয়ে তোলা তন্তু দিয়ে। চাপের একপ্রান্তে এই জ্যা লতা থেকে বানানো শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত। আর চাপের অন্যপ্রান্তটা হত হুকের মতো, সেই হুকে গুণের ফাঁস টেনে পরিয়ে দেওয়া হত। ধনুকের গুণ সর্বদাই প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্যের থেকে একটু কম রাখা হত, কারণ গুণ টেনে না পরালে চাপ ও গুণ সমেত ধনুকটি টান টান হতে পারত না। অতএব ধনুকের এই গুণ পরানোতেও যথেষ্ট শক্তি ও দক্ষতার দরকার হত। যে ঘটনার কথা পড়া যায়, রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের হরধনু ভাঙার কাহিনিতে অথবা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় অর্জুনের লক্ষ্যভেদের সময়।
প্রথমদিকের তির ও ধনুক দুটোই কাঠ অথবা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো হত। তিরের মুখগুলি ছেঁটে তীক্ষ্ণ বানানো হত এবং তিরের পিছনের দিকে কিছুটা চিরে গাছের শুকনো পাতা কিংবা পাখির লেজের পালক লাগানো হত। তাতে তির ছোড়ার পর বাতাস কেটে ভেসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করার সুবিধে হত।
নিচের প্রথম ছবিতে সাধারণ অবস্থায় ধনুক ও তিরের অবস্থান বোঝাতে চেয়েছি। দ্বিতীয় ছবিতে তির ছোড়ার সময় ছিলার টানে ধনুকের চাপ যত বেশি বেঁকে আসবে, সামনের দিকে তত দ্রুত ছুটবে তির। বলা বাহুল্য, ছিলার টানে ধনুকের চাপ যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য সেটি ভীষণ শক্ত অথচ নমনীয় হওয়া জরুরি ছিল।

তিন

পদার্থবিদ্যা (physics)-য় অনেক ধরনের শক্তির মধ্যে একটি হল স্থিতিশক্তি (potential energy) ও গতিশক্তি (kinetic energy)। ধরা যাক একটা পাথরের টুকরো নিয়ে তুমি পাহাড়ের মাথায় উঠলে, তারপর সেটিকে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে দিলে। উঁচু জায়গায় পাথরটার অবস্থানের জন্যে ওই পাথরের মধ্যে স্থিতিশক্তি সঞ্চিত হয়েছিল, এবার সেই পাথর গড়িয়ে দেওয়াতে প্রাকৃতিক কারণেই সেই স্থিতিশক্তি গতিশক্তিতে পরিবর্তিত হয়ে গড়গড়িয়ে নিচে নেমে আসতে থাকবে এবং তার আঘাতে পাহাড়ের নিচেয় থাকা পশু বা শত্রুদের বেশ জোরে আঘাত করতে পারবে। ক্রিকেট খেলায় একই বল একেক ফাস্ট বোলারের হাতে পড়ে যে প্রচণ্ড গতি পায়, তার পিছনেও এই স্থিতিশক্তি ও গতিশক্তি কাজ করে। বোলার যতদূর থেকে দৌড়ে এসে যত প্রবল বেগে হাত ঘোরাবেন, বলের মধ্যে ততই স্থিতিশক্তি সঞ্চিত হবে এবং হাত থেকে বল ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে বল দ্রুত দৌড়ে যাবে ব্যাটসম্যানের দিকে।

তির-ধনুকের ক্ষেত্রেও একই তত্ত্ব কাজ করে। ছিলার টানে ধনুকের জ্যা যত বেঁকে আসবে, তিরের মধ্যে তত স্থিতিশক্তি সঞ্চিত হবে। তারপর ওই অবস্থা থেকে তির ছেড়ে দিলেই তির তীব্র গতিতে লক্ষ্যের দিকে ছুটবে। তির ছাড়লেই ধনুকের জ্যা আর ছিলা আগের অবস্থায় ফিরে যায়, আর সেই সময় প্রচণ্ড টানে থাকা ছিলা টান মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আসার সময় তিরন্দাজের বাহুতে আঘাত করত। এই আঘাতে তিরন্দাজের বাহু ক্ষতবিক্ষত হতে থাকত এবং বছরের পর বছর এই আঘাতের ফলে তিরন্দাজ বীরের বাহু কড়া পড়ে শক্ত হয়ে উঠত। সেকালে কে কত বড়ো তিরন্দাজ মহাবীর তার পরিচয় মিলত তাঁদের বাহুর দিকে তাকালেই। অর্জুনের মতো সব্যসাচী বীর, যাঁর দু’হাতই তির নিক্ষেপে সমান দক্ষ ছিল, তাঁর দু’হাতেই যে ওই রকম কড়া পড়েছিল সেকথা বলাই বাহুল্য। যদিও বড়োসড়ো যুদ্ধের সময় তাঁরা বাহুতে ধাতু অথবা গণ্ডারের চামড়ার বর্ম পরতেন।
অতএব টিভি সিরিয়ালে বা সিনেমায় যখন রামায়ণ বা মহাভারতের গল্প দেখো, সেখানে শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণ, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন, কর্ণ প্রমুখ মহাবীরদের যে পেশিবহুল বলিষ্ঠ মসৃণ হাত দেখ, সেসব একান্তই অবাস্তব। কারণ, প্রকৃত বীর-যোদ্ধাদের হাত পেশিবহুল বলিষ্ঠ তো হবেই, কিন্তু সে হাতে বহু যুদ্ধে তির নিক্ষেপের ক্ষত এবং কড়ার লক্ষণ থাকতেই হবে।
তির নিক্ষেপের সময় পদার্থবিদ্যার আরেকটি শাখা গতিবিদ্যা (dynamics)-র একটি তত্ত্ব সেকালের বীর তিরন্দাজরা না জেনেই ব্যবহার করতেন, সেটি হল প্রজেক্টাইলস (projectiles)। যেকোনও বস্তু যত জোরেই ছোড়া হোক না কেন, কিছুদূর সমান্তরালে গিয়ে মাধ্যাকর্ষণের ফলে মাটির দিকে নেমে আসবেই। সেক্ষেত্রে তিরটাকে নির্দিষ্ট এক কৌণিক অবস্থানে (angular position) রেখে নিক্ষেপ করলে সেই তির অনেকটা দূরে গিয়েও লক্ষ্যকে আঘাত করতে পারে। ওই কৌণিক অবস্থান তিরের গতি এবং লক্ষ্যবস্তুর দূরত্বের উপর নির্ভর করে।


লক্ষ্য একটু দূরে হলে ধনুক থেকে সোজাসুজি তির ছুড়লে চিত্রঃ১ এ দেখানো পথে তির মাটিতে পড়ে যায়, কিন্তু চিত্রঃ২ এ দেখানো কোণে তির ছুড়লে তির লক্ষ্যভেদ করে ফেলে।
কাজেই সারা বিশ্বের ইতিহাস, পুরাণ অথবা কাব্যগাথায় যত বিখ্যাত বীর-তিরন্দাজের কথা পড়া যায় বা শোনা যায়, তাঁদের দক্ষতা অলৌকিক বললেও কম বলা হয়, আর সেই কারণেই তাঁরা সাধারণ মানুষের চোখে বীর নায়ক হিসেবে শ্রদ্ধা ও পূজা পেয়ে এসেছেন।

(চলবে)

2 comments:

  1. হিমাদ্রি শেখর দত্তJuly 1, 2019 at 11:49 PM

    অস্ত্রের প্রকারভেদ এবং নামগুলি খুবই পছন্দ হল। প্রকারভেদ জানা থাকলেও সংজ্ঞা জানা ছিল না। খুবই উপাদেয় লেখা। তবে চারিদিকে এত হানাহানি আর মারণযজ্ঞ চলছে, তার মধ্যে অস্ত্র আর শস্ত্র আলোচনা কতটা বিধেয় জানি না। আজকাল অল্পেতেই আশংকিত হয়ে পড়ি। দ্বিতীয় পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম। তীরন্দাজের বাহু বিপর্যয়ও জানা ছিল না। নিজে তো মিছিমিছিও খেলার সুযোগ পাইনি, চোখে আঘাত লাগার পর।

    ReplyDelete
  2. আমার এই লেখা পড়ে যদি কেউ মারণ যজ্ঞে মেতে ওঠে, তবে সেটা তার কৃতিত্ব বলে স্বীকার করতেই হবে। পড়েছো এবং পড়ে মন্তব্য দিয়েছ, সেজন্য কৃতজ্ঞ।

    ReplyDelete