গল্পঃ দুটি গল্পঃ সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

দুটি গল্প

সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী


আত্মবিশ্বাস

ছোট্টো একটা স্টিম ইঞ্জিন–অনেকগুলো রেলের কামরা টেনে টেনে চলেছে। যেতে যেতে পথে পড়ল একটা পাহাড়ের চড়াই যার ওপর দিয়ে চলে গেছে রেলের লাইন। তার মতন ছোটো একটা ইঞ্জিনের পক্ষে এতগুলো কামরা নিয়ে চড়াই পেরনো অসম্ভব। তবুও সে চেষ্টার ত্রুটি করল না। পিছিয়ে গিয়ে গতি বাড়িয়ে... কিন্তু না, কিছুতেই সে একটা পাও এগোতে পারল না। শুধু তার কয়লাই পুড়ল আর একগাদা স্টিম বেরোল হুস হুস করে। এখন সে কী করে? ইঞ্জিনটা ছোট্টো হলে কী হবে, হাল ছাড়বার পাত্র সে নয়। এতগুলো কামরার দায়িত্ব যে তার কাঁধে। সে কামরাগুলো ছেড়ে রেখে একা এগিয়ে চলল সাহায্যের সন্ধানে।
চড়াই পেরিয়ে কিছুদূর আসার পর দেখা পেল পেল্লাই এক বড়ো স্টিম ইঞ্জিনের–পাশের এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটো ইঞ্জিন বড়ো ইঞ্জিনকে বলল, “দাদা, আমাকে একটু সাহায্য করবে? এতগুলো কামরা আমি একা চড়াই টপকে আনতে পারছি না।”
বড়ো ইঞ্জিন তাকে ধমক দিয়ে বলল, “আহ্‌! দেখছ না আমি এখন বিশ্রাম নিচ্ছি? রাত্রে আমাকে মালগাড়ি নিয়ে যেতে হবে। যাও এখান থেকে।”
ছোটো ইঞ্জিন কী আর করে। হুস হুস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আবার এগিয়ে চলল। কিছুদুর এসে আরেকটা বড়ো ইঞ্জিনের সাথে দেখা, কিন্তু সেও তাকে সাহায্য করতে রাজী হল না। ছোটো ইঞ্জিন দুঃখিত হল বটে, কিন্তু হতাশ হল না। আর তার এগিয়ে চলাও থামল না।
এবার তার দেখা তারই মতন একটা ছোটো ইঞ্জিনের সাথে। সে কিন্তু তাকে সাহায্য করতে রাজী হল। তখন দু’জনে হাত ধরাধরি করে ফিরে এল রেলের কামরাগুলোর কাছে। এবার দুটো ইঞ্জিনে মিলে কামরাগুলোকে টানতে টানতে পাহাড়ের গা দিয়ে উঠতে লাগল, আর দুটো ইঞ্জিনই প্রত্যেকে গান গাইতে লাগল–
WoooooooooooWoooooo “I-think-I-can! I-think-I-can! I-think-I-can! I-think-I-can! I-think-I-can! I-think-I-can! I think I can - I think I can - I think I can I think I can…”
চড়াই টপকে তারা কামরাগুলোকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে সমতল জায়গায় নিয়ে এল। এবার আর ছোটো ইঞ্জিনের একা টানতে কষ্ট হবে না। তাই সে দ্বিতীয় সাহায্যকারী বন্ধু ইঞ্জিনটিকে অনেক ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় দিল।
ছোটো ইঞ্জিনটি এবার কামরাগুলো নিয়ে মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে চলল– 
“I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could! WoooooooooooWoooooo I-thought-I-could!  I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could! I-thought-I-could!”
(গল্পটি The Little Engine That Could নামে নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন পত্রিকায় এপ্রিল ৮, ১৯০৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।)
_____


ঈশ্বরের করুণা

সমুদ্রের ডুবন্ত পাহাড়ে ধাক্কা লেগে একটি জাহাজ ডুবে যায়। আকস্মিক দুর্ঘটনায় জাহাজের সকলেরই সমুদ্রে তলিয়ে গেল। কেবল একজন নাবিক ভাগ্যক্রমে ভাঙা জাহাজের একটি তক্তা ধরে ভাসতে ভাসতে এক জনমানবহীন দ্বীপের বেলাভূমিতে সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় আছড়ে পড়ল। ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে মড়ার মতন পড়ে রইল প্রায় একদিন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দ্বীপে লোকজনের খোঁজে বেরোল। ছোট্ট দ্বীপ–নানারকম গাছ, নাম না জানা কত পাখি, খরগোশ, কচ্ছপ আরও কত প্রাণী, কিন্তু কোথাও কোনও মানুষ বা তার বসতি চোখে পড়ল না। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচল বটে, কিন্তু এই জনমানবহীন দ্বীপে নিঃসঙ্গ সে বাঁচবে কী করে? হতাশায়, মৃত্যুভয়ে সে একেবারে ভেঙে পড়ল। আকুলভাবে সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল যেন এখান থেকে উদ্ধার পেয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে পারে। একটি টিলার ওপর উঠে সে ব্যাকুল হয়ে সমুদ্রের চারদিকে খুঁজতে লাগল যদি কোনও জাহাজ বা স্টিমার দেখা যায়।
এভাবে তার একটি একটি করে দিন কাটতে লাগল। রোজই সে সকাল থেকে সারাদিন টিলার ওপর থেকে সমুদ্রের দিকে নজর রাখে। গাছের বুনো ফল, কচ্ছপের ডিম খেয়ে তার দিন কাটে। জাহাজে থাকতেই তার কাছে সব সময় দুটো জিনিস থাকত। কোমরে গোঁজা থাকত একটা বড়ো ছুরি, আর চোখে একটু কম দেখত বলে পকেটে রাখত একটা আতস কাচ। এ দুটোই এখন তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। শুকনো খড়কুটো, গাছের ডালপালা জড়ো করে আতস কাচ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ফেলে আগুন জ্বালাতে সক্ষম হল সে। আর সেই আগুনে সমুদ্রের ঢেউয়ে তীরে ভেসে আসা মাছ আর খরগোশের মাংস ঝলসে প্রথম যেদিন খেল সেদিন তার খুব আনন্দ হল।
ধীরে ধীরে নাবিকটি তার নতুন জীবনে অভ্যস্ত হতে লাগল। একদিন সমুদ্র-তীরে মাছের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা তার ভাঙা জাহাজের থেকে ভেসে আসা কয়েকটা কাঠের তক্তা আর ছেঁড়া একটা বড়ো পালের কাপড় পেয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি সেগুলোকে জড়ো করে নিয়ে এল টিলার ঠিক নিচে একটা উঁচু সমতল জায়গায়। গাছের সোজা লম্বা ডাল কেটে খুঁটি করে কাঠের তক্তাগুলো শুকনো লতাপাতা দিয়ে বেঁধে আর পালের কাপড় আচ্ছা্দন দিয়ে মোটামুটি চলনসই গোছের একটা আস্তানা বানিয়ে ফেলল। ঝড়, বৃষ্টি আর চড়া রোদের হাত থেকে তো সে রক্ষা পেল। কাদামাটির তাল করে তার থেকে মাটির থালা, একটা বড়ো বাটি আর জল খাবার গ্লাস বানিয়ে আগুনে পুড়িয়ে নিল। বন্য জন্তুর মতন বেঁচে থাকার চেয়ে এটুকু ভদ্রস্থ জীবনযাপনের মতো ব্যবস্থা করতে পেরেছে দেখে সে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাল।
একদিন সকালে নাবিকটি টিলার ওপর থেকে দূর সমুদ্রে একটা জাহাজ দেখতে পেল। উল্লসিত হয়ে সে দু’হাত শূন্যে তুলে চিৎকার করতে লাগল। লম্বা একটা গাছের পাতাসহ ডাল মাথার ওপর সজোরে দোলাল, যদি জাহাজের কেউ দেখতে পায়। জাহাজটা আবার ধীরে ধীরে দিগন্তরেখার আড়ালে চলে গেল। এই নির্জন দ্বীপ থেকে মুক্তির যে সুযোগটুকু এসেছিল সেটুকুও মিলিয়ে গেল। তবুও আশায় বুক বেঁধে সারাদিন ওখানে বসে থাকল যদি জাহাজটা আবার দেখা যায়। জাহাজটা কিন্তু আর দেখা গেল না। বিফল মনোরথে সে তার নিজের আস্তানার দিকে ফিরে চলল। সারাদিন তার কিছু খাওয়াও হয়নি। ক্লান্ত পা দু’খানি সে টেনে টেনে চলতে লাগল। হঠাৎ তার নজরে এল, খানিক দূরে কালচে ধূসর ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে আকাশে উঠছে। সে সচকিত হয়ে উঠল। তবে হয়তো ঐ জাহাজ দ্বীপের অন্য কোনও দিকে নোঙর ফেলেছে, আর তার নাবিকেরা আগুন জ্বালিয়ে থাকবে। আকাশে তারই ধোঁয়া উঠছে। উত্তেজনায় সে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে লাগল। এ কী! ধোঁয়ার উৎস তো তারই আস্তানা। যে ঘরটি সে একা কয়েকদিন ধরে অমানুষিক পরিশ্রমে বানিয়েছিল তা আগুন লেগে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত। নির্বাক দৃষ্টিতে সে তার পোড়া ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল। মন তার একদম শূন্য–কোনও চিন্তার তরঙ্গও উঠছে না।
অনেক্ষণ বাদে তার সম্বিৎ ফিরল। ক্ষোভে, দুঃখে, হতাশায় সে মাটিতে পড়ে কাঁদতে লাগল, “হা ঈশ্বর, কী আমার অপরাধ? এত করে তোমাকে ডাকলাম এখান থেকে আমাকে উদ্ধার করার জন্য, তুমি শুনলে না। এতদিন বাদে যাও একটা জাহাজ দেখা গেল, তাও এ-দ্বীপে এল না। যেটুকু মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছিলাম তাও পুড়ে গেল। এই নির্জন দ্বীপে তিলে তিলে মৃত্যু বরণ করার প্রার্থনা কি আমি তোমার কাছে করেছিলাম? আমি এতকাল জানতাম তুমি দয়াময়, করুণাময়, বিপদে যে তোমার সাহায্য চায় তাকে তুমি রক্ষা করো। কিন্তু আজ দেখছি তুমি তা নও। তুমি অত্যন্ত নির্দয়, নিষ্ঠুর।”
কাঁদতে কাঁদতে খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর শুয়ে সে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
কতক্ষণ সে ঘুমিয়েছে জানে না। কীসের একটা বিকট শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। সকাল হয়ে গেছে। কীসের শব্দ, কোথা থেকে আসছে? নাকি সে স্বপ্ন দেখছিল? না, আবার সেই শব্দ। কিন্তু এ-শব্দ তার অতি পরিচিত। এ তো জাহাজের হুটারের শব্দ! পাগলের মতন দৌড়ে সে টিলার ওপর উঠে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই তো! একটা ছোটো জাহাজ তীরের থেকে একটু দূরে নোঙর ফেলেছে, আর একটা নৌকো করে জনা তিনেক লোক পাড়ের দিকে আসছে। আনন্দে উত্তেজনায় সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে ছুটতে বেলাভূমিতে এসে মূর্ছা গেল।
জ্ঞান ফিরলে পর নাবিক দেখল সে তার উদ্ধারকারী জাহাজে মাঝ সমুদ্র দিয়ে চলেছে। জাহাজের অন্যান্য নাবিকেরা তার সেবা শুশ্রূষা করে তাকে সুস্থ করে তুলল। সে তাদের তার জাহাজডুবি হয়ে এই নির্জন দ্বীপে আসার কাহিনি শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কারা? তোমরা কি এই দ্বীপেই আসছিলে?”
তারা বলল, “না, আমরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে বেড়াই। এই দ্বীপের পাশ দিয়ে অনেক সময়ে যাই বটে, তবে এই দ্বীপে আসি না। কাল তোমাকে উদ্ধারের জন্যই আমরা এসেছিলাম।”
নাবিকটি অবাক বিস্ময়ে বলল, “তোমরা জানলে কী করে আমি এই দ্বীপে রয়েছি?”
একজন উত্তর দিল, “তুমি যে আগুন জ্বালিয়েছিলে, তার ধোঁয়া দেখে।”
নাবিকটি স্তম্ভিত হয়ে ভাবল, ঈশ্বর মঙ্গল কোন পথে করেন তা কে বলতে পারে।
(English Story: The Shipwreck)

_____

No comments:

Post a Comment