অণুগল্পঃ রক্ষকঃ অরিন্দম দেবনাথ



মচ, মচ... “এক যে ছিল রাজা...”
পায়ের চাপে পাতা ভাঙার শব্দকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে আসছিল ওরা। তন্ময়, নুরজামান, নীলাভ, সপ্তর্ষি, ঈশিতা... পাহাড়-জঙ্গলের নিজস্বতা ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল এক ঝাঁক তারুণ্যের গানের তোড়ে।
ওদের পাহাড়ে আসা এই প্রথম নয়। কিন্তু জঙ্গলের কাঁটার খোঁচা খেতে খেতে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। এই পাহাড়ের উচ্চতা বেশি নয়। তাতে কী? গাড়িতে চেপে পাহাড়ের মাথায় ওঠা আর ঝরা-পাতার কার্পেটে ঢাকা মাটি-পাথরের ওপর খাড়াই পথ না থাকা পথ বেয়ে ওঠার রোমাঞ্চকে রোখার সাধ্যি কার? হোক না সে পথ কাঁটাময়। না হয় একটু গায়ের চামড়া ছড়বে! পিছিয়ে নেই দলের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য চৌষট্টি বছরের শিবুদাও। ওরা পারলে আমি পারব না? আমিও পিছু ছাড়ছি না। না হয় শরীরে শর্করার মাত্রা বেশি। দিনে অন্যান্য ওষুধ ছাড়াও দু’বার ইনসুলিন নিতে হয়। দলের সর্বকনিষ্ঠ ছ’বছরের গুবলুও পিছু ছাড়বে না দলের। কান্নাকাটি জুড়ে একসা।
একের পর এক লাইন করে উঠে আসছে দলটা। এই জঙ্গলে সেরকম কোনও বন্যজন্তু নেই। আছে কিছু শেয়াল, সজারু আর খরগোশ। কিন্তু তাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। জঙ্গলের ইতিউতি খরগোশ আর শেয়ালের গর্ত। সবার বাক্যবাণে জঙ্গলের পাখিরা কথা হারিয়ে ফেলেছে। পোকার দল চুপ মেরে গেছে। যদিও বহুবছর আগে এখানে গণ্ডার ঘুরে বেড়াত।
এই জঙ্গলে পর্যটক খুবই কম আসে। আশেপাশের গ্রামের লোকেরা জঙ্গলে শুকনো গাছের ডাল-পাতা কুড়িয়ে বেড়ায় জ্বালানি করবে বলে। একসময় এই জঙ্গলটাই প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে গেছিল। আবার পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দারাই একে সবুজ করে তুলেছে। তবে জঙ্গলের এই অংশে সচরাচর কেউ আসে না। কথিত, এখানে নাকি এ জঙ্গলের রক্ষকের বাস।
দলনেতা অনেকবার বলেছে, “ওরে তোরা কথা বলিসনি! তাহলে জঙ্গলের কথা শুনতে পারবি না। পাতা পড়ার শব্দ, বাতাসের ফিসফাস, ঘুঘু কিম্বা হাঁড়িচাচার গান।”
কে শোনে কার কথা?
আচমকা জঙ্গলে যেন ঝড় উঠল। কেঁপে উঠল শালের ঝোপ। গুম মেরে থাকা পাখির দল ঝটপটিয়ে উঠল। গাছের ডালপালা এড়িয়ে বিশাল দুই ডানা ছিটকে ভেসে উঠল বাতাসে। থমকে গেল তারুণ্যের কোলাহল। ডানা ঝাপটিয়ে আসছে সে…
জঙ্গলের রক্ষক?

_____

No comments:

Post a Comment