অণুগল্পঃ গপ্পারদার গপ্পঃ হীরক সেন


আমাদের এইদিকটায় এখনও মফস্বলি ছাপ লেগে আছে। যদিও পিন কোডে এখন কলকাতা, তবুও কিছু পুরনো বাড়ি, সদ্য গজিয়ে ওঠা ফ্ল্যাট, নতুন-পুরনো বাসিন্দাদের নিয়ে পুরো কলকাতা হয়ে ওঠেনি। আর একটু পিছিয়ে বোড়ালের দিকে গেলে কোনও কোনও দোকানের সাইনবোর্ডে আজও লেখা দেখা যায় - ‘এখানে কলকাতার দরে মাল পাওয়া যায়।’
অদূরেই নতুন হাট। সেখান থেকে সকালবেলা বেশ কিছু লোক ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে আসে এলাকায়। এদেরই একজন গপ্পারদা। সবচেয়ে পুরনো। বয়েস সত্তর টপকানো। ছোটোখাটো চেহারা, কিন্তু গলা বাজখাঁই। ‘সবজিইইইইইই’ বলে যে টানটা দেয়, তাতেই পাড়া গরম।
পুরনো লোক বলে গপ্পারদার কাস্টমার সবচেয়ে বেশি ছিল। ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। তার কারণ, গপ্পারদা এখন আর কিছুই মনে রাখতে পারে না। পাঁচশো পটল দিয়ে কুমড়োর দাম হিসেব করে। যদি বলে দেওয়া হয় ‘কাল বেশি করে কড়াইশুঁটি এনো গপ্পার, কচুরি হবে’, তো আপনার কপালে মুলো শাক নাচছে। কেউ কেউ মেনে নিয়েছে। বেশিরভাগই বিরক্ত হয়ে চলে গেছে অন্য সবজিওয়ালার কাছে।
এইরকম এক শীতের দিনে হঠাৎ খেয়াল করা গেল, গপ্পারদা উধাও। উধাও মানে, প্রায় এক সপ্তাহ আসেনি। ওর টিকে থাকা কাস্টমাররা অন্যদের থেকে মাল নিচ্ছে। তবে সবাই চিন্তিত। তারপর খবর ভেসে এল, গপ্পারদা আর নেই। সপ্তাহের রোগে-ভোগে চলে গেছে। কে যে খবরটা আনল তা মনে নেই, তবে কমবেশি শোকগ্রস্ত হল সব্বাই।
চলে যাচ্ছিল দিন। হঠাৎ এক সকালে একটা চেনা সুর কানে এল। গলাটা পাতলা, কিন্তু টানটা এক। সেই ‘সবজিইইইইইই’। ভ্যানটাও চেনা। বছর সতেরো বয়স। চেহারায় মিল না থাকলেও বোঝা গেল গপ্পারদার ছেলে। ব্যস। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। কী খবর? বাবার কী হয়েছিল? ছেলে দেখা গেল বোকাসোকা। কম কথার মানুষ। শত প্রশ্নেও খালি হাসে। সহানুভূতির বন্যায় প্রথমদিনেই ভ্যান প্রায় খালি। এরপর পুরনো প্রায় সব কাস্টমার ফিরে গেল ছেলের কাছে। দুয়েকজন নুতনও জুটে গেল। ফের ব্যাবসা জমজমাট।
প্রায় মাস খানেক পর এক বন্ধুর সাথে জমির ব্যাপারে গেছি নতুন হাটের ভিতরে। ফেরার পথে হঠাৎ এক মাটির বাড়ির বারান্দায় দেখি এক চেনা চেহারা, সবজি গোছাচ্ছে। চমকে উঠে ডাকতেই সে আরও চমকাল। তারপর একগাল হেসে বলল, “বাবু ভিতরে আসেন।”
বললাম, “এটা কী হল, গপ্পারদা?”
“বাবু, বসেন বলছি।”
খাটিয়া পেতে দিল। তারপর বলল, “বাবু, শরীর খারাপ চলল প্রায় দুই সপ্তা। তারপর ছেলেকে বললাম, আমার তো সময় লাগবে, তুই যা মাল নিয়ে। ছেলে এসে বলল, বাবা সবাই বলে তুমি মারা গেছ। আমি বললাম, তুই কী বললি? সে বলল, কিছুই না, খালি হাসলাম। তবে মাল সব বিক্কিরি হয়ে গেল। আমি ভাবলাম, তাহলে এই চলুক। এমনিতেই আমি তো আর পারছিলাম না। মরলে যদি ব্যাবসা জমে, মরেই যাই। আপনি কাউকে বলবেন না বাবু।”
ফেরার সময় দুটো তাজা ফুলকপি নিয়ে এলাম। গপ্পারদা সেই ভুল হিসেবই করেছিল, ছেলে এসে ঠিক দাম নিল।

_____

No comments:

Post a Comment