বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ দ্য ভিঞ্চির নোটবইঃ তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়


তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়


দ্য ভিঞ্চির নাম বললেই আমাদের প্রথমেই মনে পড়বে ‘মোনালিসা’ বা ‘দ্য লাস্ট সাপারের’ মতো বিশ্ববিখ্যাত ছবিগুলোর কথা। এই ছবিগুলোর শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি৷ তিনি শিল্পী হিসেবেই জগৎবিখ্যাত, কোনও বিখ্যাত বিজ্ঞানী নন; তবুও বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার আঁচ পেতে আজ তাঁর লেখা ‘নোটবই’ নিয়ে কিছু আলোচনা করতে বসলাম। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সারাজীবন ধরে একটা ‘নোটবই’ লিখে গেছেন। শিল্পী লিওনার্দোর লেখা ‘দ্য ভিঞ্চির নোটবই’ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিস্ময়৷
নোট আমরা সকলেই লিখি স্কুলে বা কলেজে মাস্টারমশাইরা যা পড়ান সেটা মনে রাখার জন্যে৷ বিশেষ কোনও কিছু পড়াশুনো করার সময়েও আমাদের পাতলা বা মোটা খাতা বা পুরনো ডায়েরির পাতায় যখন আমরা কিছু বা অনেক কিছু লিখে রাখি, তখন সেটা আস্তে আস্তে নোটবই হয়ে ওঠে৷ তোমরা নিশ্চয়ই সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ‘নোটবই’ ছড়াটা পড়েছ যেখানে ‘পাগলা ষাঁড়ে করলে তাড়া কেমন করে ঠেকাব তায়’ ছাড়া আর সবকিছুই লেখা ছিল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও ১৫০৮ সাল থেকে প্রায় সারাজীবন এই নোটবইটা লিখে গেছেন।


দ্য ভিঞ্চির নোটবই


আলোচনা করতে বসে অবাক হতে হয়, কী নেই সে খাতায়? খাতায় আছে ট্যাঁকশালে মুদ্রার ওপর কীভাবে ছাপ দিতে হয়, দ্বিমাত্রিক পাতায় ছবি আঁকার সময় ছবিতে কীভাবে গভীরতা আনতে হয়, মানবদেহে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কার্যকারিতা, গর্ভে মানুষের ক্রমবিকাশ, গাছের কাণ্ডের বলয়রেখা গুনে গাছের বয়েস কীভাবে মাপা যেতে পারে, লেদ মেশিন, জীবাশ্ম, রিভার্বেটারি ফার্নেস, লেন্স ঘষার সহজ পদ্ধতি, স্থিতিবদ্যা-গতিবিদ্যা (খুব সম্ভবত গতিবিদ্যার জনক তিনিই), পাখিদের ওড়ার বিজ্ঞান, তিনমাত্রিক বস্তুর ভরকেন্দ্র কীভাবে বার করতে হয় ইত্যাদি, ইত্যাদি।
প্রায় সারাটা জীবন ধরে পাঁচ হাজার পাতার এই নোটবুক তিনি লিখে গেছেন ইতালিয় ভাষায়, উলটো করে, যাতে একমাত্র আয়নার সামনে ধরলেই পড়া যাবে এই খাতা৷ এই ‘আয়না লেখা’ ব্যাপরাটা বোঝার জন্যে সঙ্গে একটু বাংলায় এরকম একটা ছোটো লেখা দিলাম৷ আয়নার সামনে ধরে একটু পড়তে চেষ্টা করলেই (পড়তে চেষ্টা করবে, সঙ্গে নিজে লেখারও চেষ্টা করতে পার, মজা পাবে) দেখবে বেশ গড়গড় করে পড়া যচ্ছে৷ কিন্তু আগে থেকে জানা না থাকলে যে কেউ ধাঁধায় পড়ে যাবে।

প্রতিটি আলোচনা ছবি এঁকে বোঝানো (জাত শিল্পী লিওনার্দো কথার চেয়ে ছবি দিয়ে বোঝাতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক), অথচ বিষয়বস্তুগুলো একেবারেই গোছানো নয়, নিতান্ত এলোমেলোভাবে লেখা৷
নোটবুক নিয়ে আলোচনা করার আগে একটু আলোচনা করি, এমন উদ্ভটভাবে লেখার রহস্যটা কী?
১) কেন তিনি শুধু আয়নার সামনে ধরলেই পড়া যাবে, এভাবে পাঁচ হাজার পাতা লিখলেন?
২) কেন এরকম এলোমেলো করে লিখে গেছেন?
৩) কেন ছাপাননি?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানছি যে তিনি স্বভাব ‘ন্যাটা’ ( যাঁদের বাঁহাত বেশি ভালো চলে)৷ তার জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি এভাবে উলটো লিখতে শুরু করেছিলেন একুশ বছর বয়স থেকে ৷ তবে বাঁহাতে তো অনেকেই লেখেন, কিন্তু এরকম উলটো করে, শুধু আয়নার সামনে ধরলেই পড়া যাবে কেন? উত্তরটা নিশ্চই গোপনীয়তা। তাঁর আশঙ্কা ছিল যে এই সমস্ত অধার্মিক চিন্তাধারা চার্চ সহ্য করবে না। সেসময় চার্চের প্রচুর ক্ষমতা ছিল। তারা অবাধ্য হলে মানুষকে পুড়িয়ে মারার শাস্তিও দিতে পারত, দিয়েও ছিল৷ মানুষের শরীরের ভেতরে কী আছে জানতে তিনি তিরিশটা মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন সে-যুগে (সে আমলে চার্চের চোখে সেটা বে-আইনি ছিল)। ধরা পড়লে তাঁকে ব্রুনোর মতো জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হত। ব্রুনো সে সময় পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, এটা প্রচার করার জন্যে চার্চের রোষের মুখে পড়েছিলেন। বিষয়গুলো আরও দুর্বোধ্য করার জন্যে তিনি তাঁর নোটবুকে কখনও ধাঁধাঁ লিখেছেন, কখনও অঙ্ক লিখতে গিয়ে বেশ কয়েক ধাপ লাফিয়ে গেছেন (যাকে আমরা স্টেপ জাম্প বলে থাকি), কখনও শুধু শুধু বক্তব্যকে টেনে লম্বা করেছেন৷ সেকালের অনেক বৈজ্ঞানিকের নিগ্রহের কথা তিনি জানতেন। বৈজ্ঞানিক হিসেবে খাতায় নিজের নাম লেখাতে তিনি চাননি৷
এই নোটবইতে বিমান বা এরোপ্লেন আবিষ্কার নিয়ে প্রচুর কাজের কথা লেখা আছে৷ জড়বস্তুকে আকাশে ভাসাতে গেলে তার গড়ন কেমন হবে, কীভাবে তার গতিজাড্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে–আলোচনা আছে তারও৷ ছবিসমেত বিস্তৃত আলোচনা আছে মানুষের শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে, যেগুলো তিনি নিজে হাতে মড়া কেটে তথ্যসংগ্রহ করেছিলেন৷
দ্য ভিঞ্চি সাহেব তখন রাজার জন্যে যুদ্ধের বিভিন্ন অস্ত্র তৈরি করার পরিকল্পনা করছিলেন৷ তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন বিশাল আকারের ধনুক, বড়ো ট্যাঙ্ক, সাবমেরিন আর যুদ্ধবিমান। বিমান বা এরোপ্লেন নিয়ে কাজ করাটা তাঁর প্রায় নেশা হয়ে গিয়েছিল। নোটবইতে তিনি পাখির শরীরের ভরকেন্দ্রের (centre of gravity) সঙ্গে ডানার চাপের কমবেশি হবার সম্পর্ক বার করতে চেষ্টা করেছেন। হাওয়া কেটে পাখির আকাশে উড়ে যাবার আচরণ ব্যখ্যা করেছেন। বিশ্লেষণ করেছেন বাঁকানো ডানার সঙ্গে ওড়ার গতিপথের সম্পর্ক। সেই ১৫০৫ সালে তিনি হাওয়াকে একধরনের তরল (fluid) হিসেবে ধরেছিলেন, যেটা ‘উড়ান-বিজ্ঞানের (aerodynamics) একেবারে গোড়ার কথা। তিনি ছবি এঁকে বুঝতে চেয়েছেন পাখিরা হাওয়াতে ঝাঁপ মারার সময় (glide) কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে। লিওনার্দো সাহেবের প্রায় চারশো বছর পর রাইট-ভাইরা এই পথেই প্রথম বিমানের নক্সা করেছিলেন। মজার কথা, অবাক হওয়ারও, এই ১৫০৫ সালেই তিনি আঁকছেন মোনালিসা।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বিমান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে কোনও বস্তুকে ওড়াতে হলে পাখি কীভাবে ওড়ে সেটা বোঝা দরকার, কারণ পাখির শরীরটা একটা জড়বস্তু। তিনি নিয়মিত বাজারে গিয়ে পাখি কিনতেন, সেটাকে উড়িয়ে দিতেন। ওড়ার সময়ে পাখিদের শরীরের অবস্থানগুলো কেমন হয়, তারা কীভাবে কোনদিকে বেঁকে ডানা নাড়ে, কীভাবে সেই অবস্থানগুলো বদলে যায় ওড়বার সময়, তা ভালোভাবে দেখে নোটবইতে একের পর এক ছবি এঁকে বুঝতে চেষ্টা করতেন। এই কাজ করতে করতে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ওড়ার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখিরা তাদের শরীরের ভরকেন্দ্র দরকারমতো বদলে নিতে পারে। সেটা তারা করে শরীরের ভেতরের বায়ুকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে। দ্য ভিঞ্চির ৪৫০ বছর পর জানা গেছে, পাখিরা ওড়ার সময় শ্বাসনালীর সব বাতাস কীভাবে ফুসফুসে নিয়ে যায় উড়ন্ত অবস্থা থেকে বসে পড়ার সময় পর্যন্ত। মানুষ যন্ত্রের সাহায্যে কীভাবে উড়তে পারবে বুঝতে তিনি এই নোটবইতে ৩৫০০০ শব্দের সঙ্গে ৫০০ ছবি এঁকে গেছেন। এই কাজের বেশিরভাগটাই তিনি করেছিলেন ১৫০৫ থেকে ১৫০৬ সালের মধ্যে। মানুষ আকাশে ওড়া নিয়ে ভাবনাচিন্তা, পরীক্ষা শুরু করেছিল তার অন্তত ২৫০ বছর পর থেকে, তাও বেলুনের সাহায্যে। আকাশে ওড়বার যন্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু হল তারও ১০০ বছর পর৷
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর পরিকল্পনা করা ডুবোজাহজের নাম দিয়েছিলেন ‘অন্য জাহাজকে ডোবানোর জন্যে একটা জাহাজ’। তিনি বেশ কিছু স্কেচ বা রেখাচিত্রও এঁকেছিলেন। তবে বিজ্ঞানীরা তাঁর স্কেচ আর মন্তব্যগুলো পড়ে বুঝেছেন যে দ্য ভিঞ্চির সাবমেরিনে যথেষ্ট যন্ত্রপাতি ছিল না ডুবোজাহাজ তৈরি করার জন্যে।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি প্রচুর সময় দিয়েছেন মানুষের শরীরের ভেতরের কলকব্জাগুলো বুঝতে। এ বিষয়েও এঁকেছেন প্রচুর ছবি৷ তিনি মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করে এঁকে গেছেন মানুষের খাদ্যনালি, পাচনতন্ত্র, ফুসফুস, গর্ভাবস্থার বিভিন্ন সময়ের ভ্রূণের ছবি৷ তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের ছবি, পরিষ্কার করে এঁকে।

লিওনার্দো মারা যাবার প্রায় আড়াইশো বছর পর আরেক গবেষক জে.বি.ভেঞ্চুরি ওই নোটবইয়ের পাঠোদ্ধার করে ছাপার উপযুক্ত করে আবার লেখেন। পৃষ্ঠা সংখ্যা আর রচনার তারিখ মিলিয়ে ওই পাঁচ হাজার পাতার খাতাটা চৌদ্দটা খণ্ডে ভাগ করেন ভেঞ্চুরি সাহেব। খণ্ডগুলোর নাম রাখেন A থেকে N। দুর্ভাগ্য, সে-লেখা ছাপা হয়েছিল এই সেদিন, ১৮৮৩ সালে৷ এই বই নিয়ে গবেষণা হয়েছে গত বিংশ শতাব্দীতে, গবেষণা এখনও চলছে। মধ্যে বিজ্ঞানের ইতিহাসে খালি রইল সাড়ে চারশোটা বছর! তার মধ্যে গতিবিদ্যা বিজ্ঞানে তার নিজস্ব জায়গা পেয়ে গেছে, কাজ শুরু হয়ে গেছে বিমান বা এরোপ্লেন আবিষ্কারের।
এখানে একটা আলোচনা এসেই যায়, আমরা কি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে বিজ্ঞানী বলতে পারি? এটা সত্যি, তাঁর বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু কোনও চিন্তাকেই তিনি পরিণত প্রযুক্তিতে উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর সময়কার বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীদের আমরা দেখি, যেমন কোপারনিকাস, টাইকো ব্রাহে, উইলিয়াম গিলবার্ট কাজ করেছিলেন বিজ্ঞানের ছোটো ছোটো গণ্ডীর মধ্যে। বিজ্ঞানীরা সাধারণত একেকটা বিষয় নিয়ে তার শেষ নিয়মটা পর্যন্ত কাটা ছেঁড়া করে সত্যিটা বুঝতে চেষ্টা করেন। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এই একাগ্রতাটা ছিল না। তাঁর মনে যেটা ধরেছে, জাত শিল্পীর মতো, তিনি তাই নিয়ে কাজ করেছেন ৷
_____

(‘আয়না লেখা’ লিখে দিয়েছেন হৈমন্তী চ্যাটার্জি দত্ত)

No comments:

Post a Comment