বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ রহস্যময় লেকঃ কালীপদ চক্রবর্ত্তী



স্থানীয় লোকেরা বলেন ভূতেদের লেক (হ্রদ) বা ভূতুড়ে লেক। এই লেক নিয়ে অসংখ্য কাহিনি ছড়িয়ে আছে। এই লেকটি দেখতে এত সুন্দর যে একে ভূতুড়ে বা বিদঘুটে বলতে মন চায় না। গাছপালায় ঢাকা এক পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় রয়েছে টলটলে জলে ভরা এই হ্রদ। যেসব বিদেশি এই হ্রদ দেখেছেন তারা বলেন, এই হ্রদের জল নাকি কাচের থেকেও স্বচ্ছ। তবুও এই লেকটা নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের ভয়ের শেষ নেই। তাদের ধারণা, আশপাশের যত লোক মারা যায়, তাদের সব প্রেতাত্মা এই বিদঘুটে হ্রদে বাস করে। তারা বলেন, ঠিক দুপুরবেলা যখন চারদিক নিস্তব্ধ থাকে, তখন গেলে নাকি লেকটিকে দেখা যায় না। লেকের জায়গায় একটা কুঁড়েঘর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তখন নাকি এলাকার প্রেতাত্মারা বিশ্রাম নেয় সেখানে। কিন্তু যদি একটু শব্দ করা হয়, তবে সে কুঁড়েঘরটা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তার জায়গায় লেকটা আবার ফিরে আসে। স্থানীয় লোকেদের এও বিশ্বাস, যদি কেউ লেকের পাশ দিয়ে একা একা হেঁটে যায়, তবে অনেক সময় লেকের মাছ জল থেকে লাফিয়ে ডাঙায় উঠে যায়। তখন বুঝে নিতে হবে, লোকটির কোনও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের প্রেতাত্মা সেই মাছটা উপহার দিয়েছে সেই লোকটিকে। তাদের মতে, সব প্রেতাত্মা মানুষের ক্ষতি করে না। আত্মীয়দের প্রেতাত্মারা তাদের ভালোই চায়। কিন্তু এ ব্যাপারে সকলে অবশ্য একমত ছিল না। হোক আত্মীয়স্বজনের প্রেতাত্মা, তবুও প্রেতাত্মা তো বটে। তাই ভয় কাটে না লোকজনদের। কেউ একা একা ঐ লেকের ধারে কাছে যেতে সাহস জোটাতে পারত না। বিশেষ করে সন্ধের পরে তো নয়ই। এমনকি দুপুরবেলায়ও একা একা কেউ সেখানে যায় না। ঐ লেকের জলও নাকি রহস্যময়। একটু হাওয়া দিলেই নাকি লেকের জল এমনভাবে ফুঁসে উঠতে থাকে, যা না দেখলে নাকি বিশ্বাস করা যায় না। সবথেকে অদ্ভুত হল, হ্রদের আশেপাশে নাকি মাছ বৃষ্টি হয়। অর্থাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো মাছ পড়ার ঘটনাও নাকি হামেশাই ঘটে। স্থানীয় লোকজনেরা লেকের অশরীরী বাসিন্দাদের শান্ত করতে ওঝা-বদ্যি ডেকে, মুরগি, ছাগল কেটে উৎসর্গ করে লেকের জলে। ওঝারা মন্ত্র পড়ে, পশুপাখির রক্ত ছেটায় হ্রদের জলে।
আফ্রিকা মহাদেশে ক্যামেরুন নামে যে দেশ আছে, সেই দেশের উত্তর-পশ্চিমে নাইজেরিয়া সীমান্তে এই নিয়স হ্রদটি (Lake Nyos) অবস্থিত। এই লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ কিমি., প্রস্থ প্রায় ১.২ কিমি. এবং গভীরতা ৬৮০ ফুট।
এই লেক বা হ্রদটি সম্পর্কে আগে কেউই তেমন খোঁজখবর রাখত না। কিন্তু ১৯৮৬ সালের একটি ঘটনায় সারা বিশ্বের মানুষ চমকে ওঠে। তারিখটা ছিল ২১শে আগস্ট। ক্যামেরুনে প্রায় সারাবছর ধরেই বৃষ্টি হয়। তবে জুলাই-আগস্ট মাসে খুব বেশি বৃষ্টি হয়। সেদিনও ঝড়ো হাওয়ার সাথে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল ক্যামেরুনের এই এলাকায়। এই বৃষ্টির সময় ঘরের বাইরে বেরোনো খুবই কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, হাট বসার দিন। হাটে না গেলে সারা সপ্তাহের খাবার জিনিস আনা যাবে না। আর অন্য কোথাও পাওয়াও যাবে না। লেক নিয়স থেকে মাইল খানেক দূরে পাহারের ঢালে ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম ‘ঢালু নিয়স’। এই গ্রামের লোকেরা সবাই খুব গরিব। গরু, ভেড়া, ছাগল–এসব পালন করেই বেশিরভাগ লোকের দিন চলে। গ্রামে জেলে, চাষিও কিছু কিছু আছে।
হাট থেকে লোকজন ঘরে ফেরার পর সব গুছিয়ে খাওয়াদাওয়া শেষ করতে একটু রাতই হয়ে গিয়েছিল সেদিন। খাওয়াদাওয়া শেষ করে কেউ কেউ শুয়েও পড়েছিল। আবার কারও কারও তখনও খাওয়া শেষ হয়নি। হঠাৎ একটা বিকট বিদঘুটে আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল গ্রামের বাসিন্দা মেষপালক হাদারির। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ঝড়বৃষ্টির এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে লেক নিয়স থেকে নীল রঙের আলো ঠিকরে বের হতে দেখে অবাক হয়ে গেল সে। ঘুম-ঘুম চোখটা রগড়ে নিয়ে ব্যাপারটা ভালো করে দেখার জন্য সে দুয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল। যা দেখল, তাতে সে খানিকটা হতবাক হয়ে গেল। সে যা দেখছে তা সত্যি কি না বিশ্বাস করতে পারছে না।
প্রায় পঞ্চাশ গজ উঁচু এক বিশাল অজগরের মতো কী যেন একটা নিয়স লেক থেকে এগিয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে। ভয়ে, আতঙ্কে তার হাত-পা হিম হতে লাগল। হাদরি দেরি না করে ঘরের সবাইকে জাগিয়ে তুলে একছুটে উঠে গেল পাশের একটা উঁচু টিলার ওপর। সেখানে একটা ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে সে দেখার চেষ্টা করতে লাগল কী ঘটছে ব্যাপারটা। অত অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না। তবে সাপের মতো কিছু একটা তাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে, এটা দেখতে পেল সে। সবাই ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল। নড়াচড়া না করে সারারাত চুপ করে রইল তারা। ভোর হলে হাদরি নেমে এল টিলা থেকে। গ্রামে ফিরে যে দৃশ্য সে দেখল তার থেকে ভয়ানক আর কিছু হতে পারে না। গ্রামের একটি লোকও আর বেঁচে নেই। তাদের কেউ মরে পড়ে আছে বিছানার ওপর, কেউ দরজার পাশে, কেউ বারান্দায়, কেউ পড়ে আছে তার খাবারের থালার ওপর। গ্রামের ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধ–সবাই মারা গেছে। মারা গেছে গ্রামের যত গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি। অনেকে তাদের শেষ খাওয়াটাও শেষ করে যেতে পারেনি।
এই ঘটনার তিনদিন বাদে সাংবাদিকেরা যখন সেখানে পৌঁছোয় তখনও হাদরি পাগলের মতো বুক চাপড়ে কেঁদে চলেছে আর বলেছে, “গ্রামের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোও বেঁচে নেই। এমন দৃশ্য দেখার চেয়ে আমার মরে যাওয়াই ভালো ছিল।”
শুধুমাত্র ঐ একদিনেই ঢালু নিয়স গ্রামে বারোশো লোক মারা গিয়েছিল। শুধু এই গ্রামই নয়, নিয়সের সেই রহস্যময় অজগরটা মৃত্যু ছড়াতে ছড়াতে চলে গিয়েছিল আরও বহুদূরে। আশেপাশের গ্রামে আরও পাঁচশো লোক সেদিন মারা যায়। এই এলাকাটা এতই দুর্গম যে সতেরোশো মানুষের এই নির্মম পরিণতির খবর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারে ঘটনার দিন তিনেক পরে।
সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে দেখেন, গ্রামের গাছপালা, ঘরবাড়ি সবই ঠিক আছে, ঠিক নেই শুধু একটা প্রাণীও। পোকামাকড়গুলো পর্যন্ত মারা গেছে। অথচ ভূমিকম্প হয়নি, বড়োরকমের ঝড় হয়নি, কোনও অসুখবিসুখও হয়নি। তাহলে কী কারণে মারা গেল এতগুলো লোক? তাহলে কী এমন রহস্যময় ঘটনা ঘটল যাতে একরাতে এতগুলো মানুষ মারা গেল? এলাকার লোকেরা নিয়সকে ভূতুড়ে লেক বলে। তাহলে কি তার পেছনে সত্যিই কোনও কারণ আছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিজ্ঞানীরা উড়ে এলেন। দিনরাত নানা পরিক্ষানিরীক্ষা চালাতে লাগলেন এই লেক আর তার জল নিয়ে। তারা দেখলেন, লেকটা আসলে একটা মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। জ্বালামুখের নিচের দিকটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে জল জমে সৃষ্টি হয়েছে অত্যন্ত গভীর এই লেক। আগ্নেয়গিরির ভেতর থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস চুইয়ে চুইয়ে মিশছে হ্রদের জলে। কিন্তু হ্রদ অত্যন্ত গভীর হওয়ায় জলের চাপে সেই গ্যাস ওপরে উঠতে না পেরে হ্রদের জলেই দ্রবীভূত হচ্ছে অর্থাৎ মিশে যাচ্ছে। দেখা গেছে, লেক নিয়সের জলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের দ্রবণের মাত্রা শতকরা ৯৮ থেকে ৯৯ ভাগ। এই জল বোতলে নিয়ে নাড়া দিলে তা থেকে কোল্ড ড্রিঙ্কের মতো বুদবুদ ওঠে। কোনও কারণে লেকের জল ওলটপালট হলে বা এতে কোনও কিছু আছড়ে পড়লে এই দ্রবীভূত কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে আসতে শুরু করে। আর কোনও স্থান থেকে একবার এ গ্যাস বেরোতে শুরু করলে তার চতুর্দ্দিক থেকেও বিপুল পরিমাণ গ্যাস একসাথে প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসতে থাকে।
বিজ্ঞানীরা বললেন, ২১শে আগস্ট তারিখে জোরালো হাওয়ার কারণে অথবা বড়ো কোনও পাথরখণ্ড লেকে পড়ায় বিপুল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে এসেছিল এবং সঙ্গে ছিল জলীয় বাষ্প। কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাতাসের থেকে ভারী হওয়ায় তা পাহাড়ের গা বেয়ে নিচের দিকে নেমে গিয়েছিল। কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসে মানুষ শ্বাস নিতে পারে না। আর এ কারণেই সেদিন মারা যায় প্রায় এক হাজার সাতশো নিরীহ মানুষ।
২০০১ সালে বিজ্ঞানীরা এই গ্যাসকে জলের তলা থেকে সাইফন প্রণালীতে বাইরে বের করা শুরু করেছেন যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তবে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের ফলে এই লেক নাইজিরিয়ায় আবার বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।


_____

4 comments:

  1. দারুন লাগলো। সমৃদ্ধ হলাম।

    ReplyDelete
  2. Very authentic and informative writing. The readers will not stop to read to the end.

    ReplyDelete
  3. Informative writing, thanks a lot

    ReplyDelete
  4. খুব সমৃদ্ধ হলাম। আমরা কলেজ জীবনে এই রকম এক বাড়ির খবর ছিল যেখানে যদি রাত্রে লক সেখানে থাকে তবে পরদিন হয়ব তার গভীর অচৈতন্য দেহ অথবা মৃতদেহ দেখা যেত। পরীক্ষা করে দেখা গেল অই বাড়িতে এক গভীর আন্ডারগ্রাউন্ড গর্ত আছে যাতে রাত্রে কারবন ডাই এবং মনো অক্সাইড এই দুটি গ্যাস নির্গত হয়। গর্ত টি বুজিয়ে ফেলার পর আর আগেরমত লোকের মারা যাবার ঘটনা ঘটে নি।

    ReplyDelete