বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ পর্যায়সারণীর দেড়শো বছরঃ গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির দেওয়ালে টাঙানো পর্যায়সারণী (periodic table) দেখেছ তো! সেই পর্যায়সারণীর বয়স হল দেড়শো বছর। রুশ বিজ্ঞানী দমিত্রি ইভানোভিচ মেন্দেলিয়েভ মৌলিক পদার্থগুলিকে একটা সারণী বা টেবিলের মতো করে সাজান। এরই নাম পর্যায়সারণী বা পিরিয়ডিক টেবিল। ১৮৬৯ সালের ১৮ মার্চ মেন্দেলিয়েভ রাশিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটির সভায় তাঁর গবেষণার কথা প্রকাশ করেছিলেন। পর্যায়সারণী এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার যে রাষ্ট্রসংঘ ২০১৯ সালকে আন্তর্জাতিক পর্যায়সারণী বর্ষ হিসাবে ঘোষণা করেছে। একদিনে কিন্তু এই আবিষ্কার হয়নি। এবার আমরা এই পর্যায়সারণী ধাপে ধাপে কেমন করে তৈরি হল, সেই গল্প শুনব।
মৌলিক পদার্থ কাকে বলে অনেকেরই জানা। সহজ কথায়, যে পদার্থকে ভাঙতে ভাঙতে একইরকম পরমাণু পাওয়া যায় তাকে বলে মৌলিক পদার্থ বা মৌল। যেমন লোহার মধ্যে লোহা ছাড়া অন্য কোনও পরমাণু পাওয়া যাবে না। কিন্তু জল ভেঙে দুইরকম মৌল—হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পাওয়া যায়। তাই জল মৌল নয়, যৌগ। এই কথাটা এখন যতটা সহজ মনে হচ্ছে, প্রাচীনকালে কিন্তু বিষয়টা বোঝা মোটেই সহজ ছিল না। যৌগিক পদার্থ ভেঙে মৌল বার করার মতো বিজ্ঞান রপ্ত করতে মানুষের সময় লেগেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ বিশ্বাস করত যে চারদিকে যে কোটি কোটি নানা বস্তু দেখা যায়, তারা মাত্র কয়েকটা মৌলিক পদার্থ দিয়ে তৈরি। আমাদের দেশে মনে করা হত মৌলিক পদার্থের সংখ্যা পাঁচ – ক্ষিতি অর্থাৎ পৃথিবী বা কঠিন পদার্থ, অপ অর্থাৎ জল বা তরল, মরুৎ অর্থাৎ বায়ু, তেজ অর্থাৎ আগুন বা শক্তি এবং ব্যোম অর্থাৎ শূন্য। এদের বলা হত পঞ্চভূত। সব প্রাচীন সভ্যতাই এইরকম কয়েকটা মৌলের কল্পনা করেছিল। প্রাচীন গ্রিকরাও প্রথমে চারটে, পরে পাঁচটা মৌলিক পদার্থের কথা বলেছিল। চিনদেশের কল্পনায় পাঁচটা মৌলিক পদার্থ ছিল মাটি, ধাতু, কাঠ, জল ও আগুন। সবাই পাঁচটা মৌলের কথাই বলেছিল, তাই মনে করা হয় যে প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

পঞ্চভূতঃ প্রাচীন ভারতবর্ষ, গ্রিস ও চিনে

এগুলো যে সত্যি সত্যি মৌলিক পদার্থ নয়, কোনও কোনওটা আদৌ পদার্থই নয়, তা বুঝতে সময় লেগেছিল। সোনা, রুপো, তামা, টিন, কার্বন, গন্ধক, পারদ, সিসা, লোহা, অ্যান্টিমনি, দস্তা, আর্সেনিকーএই বারোটা মৌলের আবিষ্কার হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে। এগুলো প্রকৃতিতে মৌলিক পদার্থের রূপে পাওয়া যায়, আবার এদের আকরিক থেকে আলাদা করা বেশ সহজ। যেমন, সোনা প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আকরিক থেকে তামা নিষ্কাশন খুব শক্ত নয়। আবার লোহাকে আকরিক থেকে পৃথক করা বেশ শক্ত। কিন্তু মানুষ প্রথম যে লোহা ব্যবহার করে, তা এসেছিল উল্কাপিণ্ড থেকে। সে-যুগে এদের কোনওটাকেই অবশ্য মৌলিক পদার্থ বলে মনে করা হত না।
প্রথম মৌলগুলো কে বা কারা আবিষ্কার করেছিল জানা সম্ভব নয়। মধ্যযুগে অ্যালকেমিস্টরা সস্তার ধাতুকে সোনাতে পরিবর্তন করার নানা চেষ্টা করত। তার থেকেই রসায়নশাস্ত্র বা কেমিস্ট্রির জন্ম। অ্যালকেমিস্টদের মধ্যেই আমরা মৌলিক পদার্থের প্রথম আবিষ্কারকের নাম খুঁজে পাই। ১৬০৯ সালে হেন্নিগ ব্র্যান্ড ফসফরাস আবিষ্কার করেছিলেন। ১৬৬১ সালে রবার্ট বয়েল প্রথম মৌলিক পদার্থের আধুনিক সংজ্ঞা দিয়েছিলেন। তখন অবশ্য পরমাণুর কথা আসতে পারে না। বয়েল বলেছিলেন যে পদার্থকে কখনওই  ভেঙে অন্য পদার্থ পাওয়া যাবে না, তাই মৌল।
চলে আসি অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে। রসায়নের জনক ফরাসি বিজ্ঞানী আঁতোয়া ল্যাভসিয়ের ১৭৮৯ সালে মৌলিক পদার্থের প্রথম তালিকা তৈরি করেছিলেন। তাতে ছিল তেত্রিশটি নাম। এদের মধ্যে সবাইকে অবশ্য আজ মৌল বা এমনকি পদার্থ বলাও যাবে না। তেইশটি পদার্থ ছিল মৌলিক। তাহলেও বোঝা যাচ্ছে যে ফসফরাস আবিষ্কারের পরের একশো আশি বছরে আরও দশটা নতুন মৌল আবিষ্কার হয়ে গেছে। ফরাসি বিপ্লবের সময় ল্যাভসিয়েরকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
আধুনিক পরমাণুবাদের জনক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন ডালটন ১৮০৩ সালে হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ও গন্ধক - পাঁচটি মৌলিক পদার্থের এক তালিকা তৈরি করেছিলেন। ১৮০৮ সালে তিনি এই তালিকাতে আরও পনেরোটি নাম সংযোজন করেন। ১৮২৭ সালে তাঁর তালিকাতে মৌলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬। সঙ্গের ছবিতে সেই ৩৬টি মৌলিক পদার্থের নাম দেওয়া আছে।  এই তালিকাতে সবগুলোই সত্যিকারের মৌলিক পদার্থ। ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, বেরিয়াম, স্ট্রনসিয়াম ও বোরন–এই সমস্ত মৌলিক পদার্থকে তাদের যৌগ থেকে পৃথক করেছিলেন ব্রিটিশ রসায়নবিদ হামফ্রে ডেভি মাত্র দু’বছরে, ১৮০৭ ও ১৮০৮ সালে। ডালটনের তালিকাতে অবশ্য বোরনের নাম নেই।

ডালটনের ৩৬টি মৌলিক পদার্থ ও তাদের চিহ্ন

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ডালটন মৌলিক পদার্থদের জন্য আলাদা আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করতেন। সেই চিহ্নগুলো জনপ্রিয় হয়নি, কারণ সেগুলোকে মনে রাখাটা মোটেই সহজ ছিল না। এখন আমরা যে এক বা দুই অক্ষর ব্যবহার করে মৌলিক পদার্থ এবং তাদের পাশাপাশি লিখে যৌগিক পদার্থ বোঝাই, তা শুরু করেছিলেন সুইডিশ বিজ্ঞানী জোয়ানস জ্যাকব বার্জেলিয়াস। যেমন, অক্সিজেন আর ক্যালসিয়ামের চিহ্ন হল যথাক্রমে O ও Ca। তাহলে পোড়া চুন বা ক্যালসিয়াম অক্সাইডের সঙ্কেত হল CaO। ঠিক তেমনি হাইড্রোজেনের চিহ্ন H বলে জলের সঙ্কেত হল H2O। H-এর পরে 2 দিয়ে বোঝানো হয়েছে জলের অণুতে হাইড্রোজেনের দুটো পরমাণু আছে। O-এর পরে কোনও সংখ্যা না লেখার অর্থ জলের অণুতে অক্সিজেনের পরমাণু আছে একটা। সিলিকন, সেলেনিয়াম, সেরিয়াম–এই তিনটি নতুন মৌল আবিষ্কারের সঙ্গেও বার্জেলিয়াসের নাম যুক্ত আছে।

জন ডালটন ও জ্যাকব বার্জেলিয়াস

১৮৩০ সাল নাগাদ মৌলের সংখ্যা পঞ্চাশ পেরিয়ে গেল। এবার চেষ্টা শুরু হল তাদের শ্রেণিবিন্যাসের। ধরো বাঘ, সিংহ, চিতা, বিড়াল, তাদের মধ্যে অনেক মিল আছে, তাই তাদের জীববিজ্ঞানে একই গোত্রে ফেলা হয়।  সেইরকম একই ধরনের মৌলদের নিয়ে পরিবার তৈরির চেষ্টা শুরু হল।
এ ব্যাপারে মৌলদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ধর্মের কথা বলতে হয় তা হল পারমাণবিক ভর। হাইড্রোজেন পরমাণুর থেকে কোনও মৌলের পরমাণু যত গুণ ভারী, তাকে বলে ঐ মৌলের পারমাণবিক ভর। যেমন একটা অক্সিজেনের পরমাণু একটা হাইড্রোজেন পরমাণুর থেকে মোটামুটি ষোলো গুণ ভারী। তাই অক্সিজেনের পারমাণবিক ভর ১৬। ১৮০৩ সাল থেকেই মৌলদের পারমাণবিক গুরুত্ব নির্ণয় করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ কাজেও ডালটন ও বার্জেলিয়াসের বিশেষ ভূমিকা ছিল।
মৌলের শ্রেণিবিন্যাসের প্রথম উদাহরণ হল ১৮২৯ সালে প্রকাশিত জার্মান বিজ্ঞানী জোহান ডোবারেইনারের ট্রায়াড বা ত্রয়ীর সূত্র । একটা উদাহরণ দেখা যাক। তিনটি মৌল লিথিয়াম, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামーএদের পারমাণবিক গুরুত্ব যথাক্রমে ৬.৯, ২৩ ও ৩৯.১। ডোবারেইনার দেখলেন যে সোডিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব লিথিয়াম ও পটাশিয়ামের গুরুত্বের গড়ের সমান। আবার তিনটে মৌলই ক্ষার (alkaline) ধাতু, অর্থাৎ তারা জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন তৈরি করে। পটাশিয়ামের বিক্রিয়ার হার সবচেয়ে বেশি, সোডিয়ামের তার থেকে কম, আর লিথিয়ামের সবচেয়ে কম। এই তিনটি মৌলকে তিনি বললেন ট্রায়াড বা ত্রয়ী। এইরকম আরও ট্রায়াড খুঁজে পাওয়া গেল। যেমন গন্ধক-সেলেনিয়াম-টেলুরিয়াম, হ্যালোজেন গ্যাসত্রয়ী ক্লোরিন-ব্রোমিন-আয়োডিন; মৃৎক্ষার (alkaline-earth) ধাতুত্রয়ী ক্যালসিয়াম-স্ট্রনশিয়াম-বেরিয়াম। সবার ক্ষেত্রে যে মাঝের মৌলের পারমাণবিক ভর  বাকি দুটোর ভরের গড়ের একদম সমান সমান তা কিন্তু নয়, তার কাছাকাছি।
ট্রায়াডের সূত্র নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করলেন। দেখলেন যে একই ধরনের ধর্ম অনেক সময় তিনটের বেশি মৌলিক পদার্থের মধ্যেও পাওয়া যায়। হ্যালোজেন গ্যাসের দলে সবচেয়ে হালকা মৌল ফ্লুরিনের সন্ধান পাওয়া গেল। গন্ধকের আগে নাম ঢুকল অক্সিজেনের। নাইট্রোজেন, ফসফরাস, আর্সেনিক, অ্যান্টিমনি, বিসমাথ নিয়ে নতুন পরিবার তৈরি হল। কিন্তু সে-যুগে অনেক মৌলের পারমাণবিক ভর নির্ণয়ে ভুল ছিল। তাই এ বিষয়ে গবেষণা খুব একটা এগোল না।

জোহান ডোবারেইনার ও জন নিউল্যান্ডস

১৮৬৩ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন নিউল্যান্ডস তখনকার জানা ৫৬টি মৌলকে এগারটা শ্রেণিতে ভাগ করেন। তিনি এটাও দেখান যে পারমাণবিক ভর অনুযায়ী সাজালে প্রতি অষ্টম মৌলের ধর্ম একই রকম। যেমন ক্ষার ধাতু লিথিয়াম দুই নম্বর, সোডিয়াম নয় নম্বর, পটাশিয়াম ষোল নম্বর। আবার হ্যালোজেনদের মধ্যে ফ্লুরিন সাত নম্বর, ক্লোরিন চৌদ্দ নম্বর। কিন্তু  এই নিয়মটা ক্যালসিয়ামের পরে আর খাটে না। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন অক্টেভ বা অষ্টকের সূত্র। কিন্তু বিজ্ঞানী মহলে তাঁর এই আবিষ্কারকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
অনেকেই এই সময়ে মৌলিক পদার্থদের শ্রেণিবিন্যাসের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সফল হলেন মেন্দেলিয়েভ। ১৮৬৯ সালে মেন্দেলিয়েভ তখনও পর্যন্ত জানা ষাটটি মৌলকে পারমাণবিক ভর এবং রাসয়ানিক ধর্ম অনুসারে একটা সারণী বা টেবিলের আকারে সাজান। নিচের টেবিলটা হুবহু মেন্দেলিয়েভের ১৮৬৯ সালের সারণীর সঙ্গে মিলবে না, কিন্তু আমাদের সুবিধার জন্য এটা নিয়েই আলোচনা করা যাক।

মেন্দেলিয়েভের পর্যায়সারণী

উপরে RH, RH2 এই সমস্ত দিয়ে বোঝানো হয়েছে মৌলটি (R) হাইড্রোজেনের সঙ্গে মিলে হাইড্রাইড যৌগ গঠন করলে তার সংকেত কী হবে। তেমনি RO, RO2 এ সমস্ত দেখাচ্ছে মৌলের অক্সাইডের সংকেত কী। যেমন লিথিয়াম (Li) হাইড্রোজেনের সঙ্গে মিলে যে যৌগ বানাবে, তার সংকেত LiH। আবার লিথিয়াম অক্সাইডের সংকেত হল LiO2। একটি কলাম বা স্তম্ভের সমস্ত মৌল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সঙ্গে একইরকমভাবে যৌগ গঠন করবে। যেমন ক্ষারধাতুরা সবাই আছে IA স্তম্ভে, তাদের হাইড্রাইড অণুতে আছে একটা ধাতুর পরমাণু, আর একটা হাইড্রোজেন পরমাণু। আবার তাদের অক্সাইডে একটা অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে দুটো ধাতুর পরমাণু যুক্ত হয়। আমাদের চেনা মৃৎক্ষার ধাতুরা আছে IIA স্তম্ভে, হ্যালোজেন গ্যাসেরা VIIA স্তম্ভে। পর্যায় শব্দের একটা মানে হল পালা করে ঘুরে আসা। এইভাবে রাসয়ানিক ধর্ম ঘুরে ঘুরে আসে বলে এর নাম পিরিয়ডিক টেবিল বা পর্যায়সারণী। শুধু এই কাজ করলেই মেন্দেলিয়েভের নাম বিখ্যাত হয়ে থাকত। কিন্তু পর্যায়সারণী তৈরিতে তিনি আরও অনেক প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। তার কয়েকটা উদাহরণ দেখা যাক।
বিজ্ঞানীরা তখন ভেবেছিলেন বেরিলিয়াম (Be) ধাতুর অক্সাইডের সংকেত হল Be2O3। সেই অনুযায়ী তার পারমাণবিক ভর হয় ১৪। মেন্দেলিয়েভ দেখলেন যে বেরিলিয়ামের অন্যান্য রাসয়ানিক ধর্মের সঙ্গে বরঞ্চ মৃৎক্ষার ধাতুদের মিল আছে। মৃৎক্ষার ধাতুর অক্সাইডে একটা ধাতুর পরমাণু আর একটা অক্সিজেনের পরমাণু থাকে, যেমন CaO। তাই তিনি বেরিলিয়াম অক্সাইডের সংকেত লিখলেন BeO। এর থেকে তার পারমাণবিক গুরুত্ব কমে তা বোরনের (B) আগে গিয়ে ক্ষারধাতু ম্যাগনেসিয়ামের (Mg) ঠিক উপরে বসল। আবার টেলুরিয়ামের (Te) পারমাণবিক গুরুত্ব আয়োডিনের (I) থেকে বেশি হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাসয়ানিক ধর্ম বিচার করে টেলুরিয়ামকে আগে রেখেছিলেন। ঠিক তেমনি কোবাল্ট (Co) ও নিকেলের (Ni) জায়গাও তিনি উলটে দিয়েছিলেন। পরে দেখা গেছে, মেন্দেলিয়েভ সবক’টি ক্ষেত্রেই ঠিক কাজ করেছিলেন। সেই কথায় আমরা এই লেখার শেষে আসব।
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে যে মেন্দেলিয়েভ তাঁর সারণীতে কয়েকটা শূন্যস্থান রেখে বলেছিলেন যে সেখানে এমন মৌলরা বসবে যাদের তখনও আবিষ্কার হয়নি। অ্যালুমিনিয়ামের (Al) নিচের শূন্যস্থানের মৌলের তিনি নাম দেন এক-অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকনের (Si) নিচে বসালেন এক-সিলিকনকে। এই ‘এক’ শব্দটা মেন্দেলিয়েভ নিয়েছিলেন সংস্কৃত ভাষা থেকে। তিনি বলেছিলেন যে এই মৌলগুলো এখনও আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু পর্যায়সারণী থেকে তিনি তাদের ধর্ম সম্পর্কে নানা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এখন আমরা এক-অ্যালুমিনিয়ামকে গ্যালিয়াম (Ga) আর এক-সিলিকনকে জার্মেনিয়াম (Ge) নামে চিনি। কীরকম ধর্ম মেন্দেলিয়েভ বলেছিলেন, আর কী পরে পাওয়া গেল তার কয়েকটা উদাহরণ নিচের সারণীতে দেওয়া হয়েছে। দেখা যাবে মেন্দেলিয়েভের হিসাব আসল মাপের খুব কাছাকাছি।

এক-অ্যালুমিনিয়াম
গ্যালিয়াম
এক-সিলিকন
জার্মেনিয়াম
পারমাণবিক গুরুত্ব
৬৮
৬৯.৭
৭২
৭২.৬
মৌলের ঘনত্ব (গ্রাম/ঘনসেমি)
৬.০
৫.৯
৫.৫
৫.৩
অক্সাইডের ঘনত্ব
(গ্রাম/ঘনসেমি)
৫.৫
৫.৯
৪.৭
৪.৭

অজানা মৌল সম্পর্কে মেন্দেলিয়েভের অনুমান ও তাদের আবিষ্কারের পরের মাপ

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। গ্যালিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী পল এমিল লেকক। মেন্দেলিয়েভ তাঁকে লেখেন যে এই মৌলটিই তাঁর এক-অ্যালুমিনিয়াম। লেকক মনে করেছিলেন যে মেন্দেলিয়েভ তাঁর কৃতিত্বে ভাগ বসাতে চাইছেন। তিনি বলেন, এক-অ্যালুমিনিয়াম আর গ্যালিয়ামের ধর্মে অনেক পার্থক্য আছে। পরে দেখা যায় মেন্দেলিয়েভই ঠিক। এই বিতর্কের ফলে পর্যায়সারণীর কথা বিজ্ঞানী মহলে ছড়িয়ে পড়ে।
মেন্দেলিয়েভ অবশ্য সমস্ত কথা ঠিক বলেননি। যেমন, মেন্দেলিয়েভ বিভিন্ন সময়ে মোট আঠারোটা নতুন মৌলের কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে ন’টার অস্তিত্ব আছে। তবে সে আলোচনায় আর যাচ্ছি না। একই সময়ে জার্মান বিজ্ঞানী জুলিয়াস লোথার মেয়ার প্রায় একইরকম এক পর্যায়সারণী তৈরি করেছিলেন। তিনি অবশ্য কোনও নতুন মৌলের কথা বলেননি। মেয়ার কাজটা করেছিলেন ১৮৬৮ সালে। কিন্তু তাঁর প্রকাশক পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলায় বই ছাপতে দেরি হয়ে যায় দু’বছর। মেন্দেলিয়েভও অবশ্য ১৮৬৮ সাল থেকেই পর্যায়সারণী বানানো শুরু করেছিলেন। কে আগে কাজটা করেছিলেন তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেশ বিতর্ক হয়েছিল।

দমিত্রি মেন্দেলিয়েভ ও জুলিয়াস লোথার মেয়ার

মেন্দেলিয়েভের জীবৎকালেই পর্যায়সারণীর একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছিল। সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের মৌল খুঁজে পাওয়ার পরে পর্যায়সারণীতে তাদের জন্য একটা নতুন স্তম্ভ তৈরি করতে হয়। তারা হল নিষ্ক্রিয় গ্যাস। প্রথম যে নিষ্ক্রিয় গ্যাস খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তা হল হিলিয়াম। পৃথিবীতে নয়, তার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল সূর্যে। সেই আবিষ্কারের সঙ্গে আমাদের দেশের একটা সম্পর্ক আছে, সেই গল্প তোমরা এখানে পড়তে পার। হিলিয়াম পৃথিবীতে আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম র‍্যামজে। শুধু হিলিয়াম নয়, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপটন, জেনন ও রেডন - সবক’টি নিষ্ক্রিয় গ্যাসের আবিষ্কারের সঙ্গেই র‍্যামজের নাম যুক্ত। ১৯০৪ সালে র‍্যামজেকে এই জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। বর্তমান আরও অনেক মৌল কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়েছে। এখন আমাদের জানা মৌলের সংখ্যা ১১৮। এইসব নতুন মৌলরা তেজস্ক্রিয়, এদের আয়ু খুব কম। এইসব মৌলদের নিয়ে বড়োদের জন্য একটা লেখা লিখেছিলাম, ইচ্ছা করলে এখানে পড়ে দেখতে পার। একেবারে আধুনিক পর্যায়সারণীর একটা ছবি নিচে দেওয়া হল। দেখতে পাচ্ছ মেন্দেলিয়েভের পর্যায়সারণীর থেকে এ অনেকটাই আলাদা। আলাদা হলেও সাজানোর মূল নীতিটা একই আছে। তবে আধুনিক সারণীর বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে এই লেখাটা অনেক বড়ো হয় যাবে।

আধুনিক পর্যায়সারণী

পর্যায়সারণী নিয়ে একটা সমালোচনা অনেকদিন ছিল। ধরা যাক ক্যালসিয়াম আর ঠিক তার পরের মৌল স্ক্যান্ডিয়ামের (Sc) কথা। প্রথমটার পারমাণবিক ভর হল প্রায় ৪০, আর দ্বিতীয়টার প্রায় ৪৫। যদি ৪২ বা ৪৩ গুরুত্বের কোনও মৌল আবিষ্কার হয়, তাহলে পর্যায়সারণীতে তাকে জায়গা দেব কেমন করে? মেন্দেলিয়েভের পক্ষে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেওয়া সম্ভব ছিল না।
আধুনিক পর্যায়সারণীটাকে দেখো, প্রতিটি মৌলের পাশে একটা সংখ্যা আছে যা হাইড্রোজেনকে ১ ধরে শুরু করে পর্যায়সারণীতে সেটি কত নম্বর মৌল তা বোঝাচ্ছে। এই সংখ্যাকে বলে পরমাণু ক্রমাঙ্ক।
১৯০৭ সালে মেন্দেলিয়েভ মারা গিয়েছিলেন। তার দু’বছর পরে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড পরমাণুর নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেন। ১৯১৩ সালে তরুণ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হেনরি মোসলে মৌলিক পদার্থের এক্স-রশ্মি বর্ণালী থেকে দেখান যে কোনও মৌলে থেকে বেরোনো একটা নির্দিষ্ট ধরনের এক্স রশ্মির কম্পাঙ্ক ঐ মৌলের পরমাণু ক্রমাঙ্কের বর্গের সমানুপাতী। দু’বছর পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মাত্র আঠাশ বছর বয়সে নিহত হয়েছিলেন মোসলে।

উইলিয়াম র‍্যামজে ও হেনরি মোসলে

খুব তাড়াতাড়ি বোঝা গেল যে পরমাণু ক্রমাঙ্ক আসলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যার সমান। তাহলে আধুনিক পর্যায়সারণী থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রোটনের সংখ্যা ক্যালসিয়ামের নিউক্লিয়াসে হল ২০ আর স্ক্যান্ডিয়ামের ক্ষেত্রে ২১। প্রোটনকে টুকরো করা যায় না, তাই এই দুই মৌলের মধ্যে অন্য কোনও মৌল থাকতে পারে না। শুধু তাই নয়, আগেই বলেছি মেন্দেলিয়েভ কোবাল্ট-নিকেল এবং টেলুরিয়াম-আয়োডিনের এই মৌলদের নিজেদের মধ্যে জায়গা পালটে ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে হয়তো ওদের পারমাণবিক গুরুত্ব ভুল মাপা হয়েছে। আসলে নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা ধরে হিসাব করলে মেন্দেলিয়েভের সাজানোটাই পাওয়া যায়। যেমন টেলুরিয়ামের পারমাণবিক গুরুত্ব আয়োডিনের থেকে বেশি হলেও পরমাণু ক্রমাঙ্কের বিচারে সে আগে বসবে।
পারমাণবিক গুরুত্ব তাহলে কী? পরমাণুর নিউক্লিয়াসে মোট কতগুলো প্রোটন আর নিউট্রন আছে, তা হল তার ভর সংখ্যা। কোনও মৌলের নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা পালটায় না, কিন্তু নিউট্রনের সংখ্যা এদিক ওদিক হতে পারে। কাজেই তাদের ভর সংখ্যা আলাদা আলাদা। এইধরনের পরমাণুদের বলে মৌলের আইসোটোপ। কোনও মৌলের পারমাণবিক ভর মাপলে আমরা পাই তার আইসোটোপদের ভর সংখ্যার গড়।
মেন্দেলিয়েভের পর্যায়সারণীর গুরুত্ব সব রসায়নবিদ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু কেন মৌলগুলো পর্যায়সারণীতে এইভাবেই সাজানো থাকে, তা বুঝতে সময় লেগেছে আরও অনেকদিন। শেষপর্যন্ত কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এর সমাধানের পথ দেখিয়েছে। কিন্তু সে আলোচনা অনেক জটিল ও দীর্ঘ। ১৮৮২ সালে মেন্দেলিয়েভ ও লোথার মেয়ার একসঙ্গে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির হামফ্রে ডেভি পদক পেয়েছিলেন। চাঁদের বুকে একটি গহ্বরের নাম দেয়া হয়েছে মেন্দেলিয়েভ। র‍্যামজে নোবেল পেলেন, কিন্তু মেন্দেলিয়েভের নাম দু’বার নোবেল পুরস্কারের জন্য ওঠা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত দেওয়া হল না কেন সে পৃথক আলোচনার বিষয়। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের থেকেও বড়ো সম্মান মেন্দেলিয়েভ পেয়েছেন। আধুনিক সারণীতে দেখ ১০১ নম্বর মৌলের চিহ্ন হল Md। ওই মৌলের নাম মেন্দেলেভিয়াম।

_____

No comments:

Post a Comment