গল্পঃ মহীপতিঃ অরিন্দম দেবনাথ


অরিন্দম দেবনাথ


প্রাচীন বটগাছের ঘন ছায়ার নিচের রাজাসনে চোখ বুজে বসে আছেন পক্ষীকুলের মহীপতি। এই গাছের কোটরেই তাঁর বাস। এই গাছই তাঁর রাজপ্রাসাদ। তরুতলে মাথা তুলে থাকা একটি কালো পাথর তাঁর রাজাসন।
মহাধিপতি পেচক গম্ভীর প্রকৃতির নভশ্চর। দিনের আলো চোখে সহ্য হয় না বলে চোখ বুজে থাকেন প্রায় সবসময়। কীই বা করবেন? বিচারের জন্য কিম্বা অভিযোগ জানাতে পক্ষীকুল তাঁর কাছে হাজির হয় দিনের আলোতেই।
কিছুদিন হল রাজাসনে বসার সময় তিনি একটি মোতির মালা গলায় পরে নেন। এই মোতির মালাটা তাঁকে দিয়েছেন তাঁর মন্ত্রীーরাজপ্রাসাদের কাছে ওকগাছের মন্ত্রীপুরে থাকা ন্যাড়া ঈগল। তিনি এই মালাটা পেয়েছেন হেতমগরের রাজবাড়ির ছাদে। একদিন এই মোতির মালা পরে হেতমগরের রাজা একা ছাদে পায়চারি করছিলেন। সেই সময় ন্যাড়া ঈগল বসে ছিলেন রাজপ্রাসাদেরই চুড়োর গম্বুজের মাথায়। হঠাৎ মহামন্ত্রী এসে রাজার কানে কিছু বলতে রাজামশাই, “দুত্তোর! রইল তোর রাজপাট, এই ঝকমারি আর পোষায় না। আমি রাজাসন ছেড়ে কাজের কাজ করতে চললাম।” বলে মোতির মালা গলা থেকে ছুড়ে ফেলে দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিচে চলে গেছিলেন। সেই মালাটাই ন্যাড়া ঈগল ঠোঁটে করে এনে পেচকরাজাকে গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “নিদেন একটা মোতির মালা না হলে আমাদের রাজামশাইকে মানাচ্ছে না। আমরা পাখি বলে কি ওই দো-পেয়েদের থেকে কিছু কম?”
এর কিছুদিন পর একদিন হেতমগরের মন্ত্রীও তাঁর বাসভবনের ছাদে ভরদুপুরে কপাল চুলকাতে চুলকাতে একা হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। সেই সময় কানের কাছে সেনাপতি এসে ফিসফিস করে কিছু বলতেই মন্ত্রীমশাই গলার সোনার হার ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, “দুত্তোর! রইল তোর মন্ত্রীত্ব। আমিও মন্ত্রিপদ ছেড়ে চললাম রাজামশাইয়ের সাথে কাজের কাজ করতে।”
সেই মালাটা ন্যাড়া ঈগল গলায় পরে পেচকরাজার কাছে এসে বলেছিলেন, “পেন্নাম রাজামশাই, আমিও মানুষ মন্ত্রীর মতো গলায় একটা সোনার হার পরে নিয়েছি। না হলে আপনার মান থাকছিল না।”
পেচকরাজা বলে উঠলেন, “যাই বলো না মন্ত্রীপ্রধান, রাজা হওয়া কিন্তু খুব সুখের নয়। দু’দণ্ড যে ঘুমোব তার উপায় নেই। সবসময় কোনও না কোনও সমস্যা লেগেই আছে।”
“কিন্তু রাজামশাই, আপনার তো রাজকর্মের নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময়ের বাইরে কোনও কিছু না করলেই হল।” ন্যাড়া ঈগল বললেন।
“তা কি হয়, মন্ত্রীপ্রধান! এই তো পরশু রাতে আমি সবে ব্যাঙের পা দিয়ে রাতের খাবার শেষ করতে চলেছি, তুমি এসে হাজির হলে তোমার বাসার সমস্যা নিয়ে। তোমার বাসা নাকি আর আরামদায়ক নয়। ব্যাপারটা এতই তুচ্ছ যে আমার কাছে তোমার অত রাতে এই বিষয় নিয়ে আসার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। তোমাকে কি আমি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলাম?”
রাজার এই কথা শুনে ন্যাড়া ঈগল চুপ করে রইলেন। সত্যিই তো, এই সামান্য ব্যাপারে রাজামশাইয়ের কাছে যাওয়া তাঁর উচিত হয়নি। তিনি নিজেই গৃহমন্ত্রকের মন্ত্রী বাবুইকে বলে বাসা ঠিক করিয়ে নিতে পারতেন। ইদানিং কী যে হয়েছে তাঁর!
মন্ত্রীপ্রধানকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে পেচকরাজা প্রসঙ্গ ঘোরালেন। “তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে মন্ত্রীপ্রধান, যে পশ্চিমের জঙ্গল কেটে হেতমগরের মানুষেরা বাসস্থান বানান শুরু করেছে? ফলে পক্ষীকুল বসত হারাচ্ছে!”
দু’পাশে ডানা ঝাপটিয়ে উশখুশ করে উঠলেন ন্যাড়া ঈগল। এই রে, হেতমগরের মন্ত্রীর সোনার হার পেয়ে বেমালুম ভুলে গেছেন রাজামশাইয়ের সাথে বিষয়টা আলোচনা করতে!
“রাজামশাই, আমি খানিক ভেবেছি বটে। আমাদের মানুষের বসতির আনাচে-কানাচে থাকতে হবে আর কী।”
“সে কী বলছ, মন্ত্রীপ্রধান? হাজার হাজার পাখি বসতির আনাচে-কানাচে থাকবে? কিছু কাক-শালিক-চড়াই-ঘুঘু না হয় ওখানে ঠাঁই পাবে, বাকিরা?”
তীক্ষ্ণ নখওয়ালা পা বেঁকিয়ে খানিক মাথা চুলকিয়ে মন্ত্রীপ্রধান বললেন, “মানুষরা তো তাদের বসত বানাবেই রাজামশাই, ওখানেই যেন বেশি সংখ্যক পক্ষীকুল একটু মানিয়ে থেকে যায় তার জন্য বোঝাতে হবে...”
“সে কি! মন্ত্রীপ্রধান, তোমার হল কী? মানুষের বাসায় পাখি থাকবে? খাবে কী?”
“কাক-শালিকের কি আর খাবারের অভাব হয়, রাজামশাই!”
“না না ন্যড়া ঈগল, এটা মন্ত্রীপ্রধানের মতো কথা হচ্ছে না। ভেবে দেখো বাবুইয়ের কী হবে, তোতা, মুনিয়া কোথায় থাকবে। মাছরাঙা, ডাহুক, শ্যামা, হাঁড়িচাচা... তার থেকেও বড়ো কথা, ধরো আজ হেতমগরের লোকেরা যদি ওকগাছটা কেটে দেয় তাহলে তুমি কোথায় যাবে? তুমি কি মানুষের ইট-পাথরের বাড়ির মাথায় থাকতে পারবে? খাবে কী?”
রাজামশাইয়ের কথা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলেন মন্ত্রীপ্রধান। সত্যি তো, ওকগাছ চলে গেলে সে যাবে কোথায়?
“তাহলে উপায়, রাজামশাই? মানুষের জঙ্গল কেটে বাড়ি বানানো কি আর আমরা আটকাতে পারব?”
“তুমি কি কিছু উপায় ঠাউরেছ, মন্ত্রীপ্রধান?”
ন্যাড়া ঈগল উপায় আর কী বলবেন। হেতমগরের মন্ত্রীর ছুড়ে ফেলা সোনার হার পরে সে সব ভুলেই গেছিলেন। জঙ্গল যে কাটা হচ্ছে তা তো নিজের চোখেও দেখেছিলেন তিনি। তাঁর বা অন্যান্য পাখিদের যে বিপদ আসছে একথা তাঁর একবারও মনে আসেনি। তাঁর নিজের বাসা ওকগাছ কাটা পড়লে যে কী হবে! ভাবতেই আতঙ্কে কেঁপে উঠল তাঁর ডানা।
বিজ্ঞ পেচকরাজা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আরও কিছুদিন আগে যদি বিষয়টা জানতাম!”
লজ্জায় ডানার আড়ালে মুখ লুকোলেন মন্ত্রীপ্রধান। ছিঃ ছিঃ, সোনার হারের দর্পে মন্ত্রীপ্রধানের ধর্ম পালন করেননি উনি! জঙ্গল উচ্ছেদের কথা রাজামশাইকে জানানো উচিত ছিল। গাছ কাটার পরিণতি যে কী হতে পারে ভেবে দেখেননি উনি। এখুনি পক্ষীপ্রজা ও মন্ত্রীসভার বাকি সদস্যরা এসে পড়বে। পক্ষীকুল যদি মন্ত্রীপ্রধানের কর্মে অমনোযোগের কথা জানতে পারে তবে কি আর তাঁকে মন্ত্রীপদে থাকতে দেবে? 
ডানা নাড়িয়ে, ঠোঁট দিয়ে দু’বার পা ঠুকরে ন্যাড়া ঈগল বলে উঠলেন, “তাহলে আমাদের কী করা উচিত রাজামশাই, যুদ্ধ?”
“আহ্‌ মন্ত্রীপ্রধান!” গর্জে উঠলেন পেচকরাজ। “মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ? আর যুদ্ধ করে কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে শুনি?”
“তাহলে উপায়! বাসস্থান হারিয়ে খাদ্যের অভাবে কি আমরা মারা যাব?”
“মন্ত্রীপ্রধান, তুমি দিন দিন তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়ছ। আগে তো হতাশ হতে না! পক্ষীকুলের কেউ বিপদে পড়লে আগে উড়ে যেতে তুমি। ঝড়ে কারও বাসা ভাঙলে ঠোঁটে করে ডালপালার টুকরো নিয়ে বাসা বানিয়ে দিতে। পক্ষীকুল কিছুই ভোলেনি মন্ত্রীপ্রধান, চলো, মৃত্যুচিন্তা না করে কিছু করা যাক।”
রাজামশাইকে লুকিয়ে গলা থেকে সোনার হারটা খুলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মন্ত্রীপ্রধান। এই ধন প্রদর্শন করতে গিয়েই নিজের কাজে অমনোযোগী হয়ে পড়ছিলেন তিনি।
“হুকুম করুন, প্রাজ্ঞ পেচক। আমি নিরাশাবাদী নই। সোনার প্রভাবে খানিক দিকভ্রষ্ট হয়েছিলাম মাত্র।”
“শোনো মন্ত্রীপ্রধান, মানুষ অরণ্য ধ্বংস করবে এতে আর আশ্চর্য কী? আমরা আছিই তো নতুন অরণ্য সৃষ্টিতে। প্রকৃতি আমাদের তৈরি করেছেন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে। সমস্ত পক্ষীকুলকে বলো হেতমগরের সব গাছ কেটে ফেলার আগে গাছের ফল ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে রুক্ষ প্রান্তরে ছড়িয়ে দিতে। বর্ষা আসছে। ওই ফলের বীজ থেকে জন্ম হবে নতুন গাছের। সেই গাছে গাছে আমরা গড়ে তুলব আমাদের নব-আলয়। আর দেরি নয়, মন্ত্রী প্রধান।”
তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলে সাথীদের ডাকতে হাওয়ায় ডানার ঝাপটা মেরে উড়ে যাওয়ার আগে মন্ত্রীপ্রধান বললেন, “প্রণাম রাজামশাই, আজ বুঝলাম মহীপতি সবাই হতে পারে না।”
_____

অলঙ্করণঃ রাখি পুরকায়স্থ

1 comment:

  1. আহা, এমন কেন সত্যি সত্যি হয় না! খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete