ধারাবাহিকঃ কুরুপাণ্ডব কথাঃ (৫ম পর্ব) মৈত্রেয় মিত্র

আগের পর্ব

পঞ্চম পর্ব

জনসমক্ষে কৃত্রিম যুদ্ধ

এই ঘটনার কিছুদিন পর আচার্য দ্রোণ একদিন রাজসভায় উপস্থিত হলেন। সেই সভাতে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে মহামতি ভীষ্ম, মহর্ষি বেদব্যাস, বিদুর, বাহ্লীক, সোমদত্ত, আচার্য কৃপও উপস্থিত ছিলেন। সকলের সামনে আচার্য দ্রোণ বললেন, “হে মহারাজ, রাজকুমারেরা সকলেই ধনুর্বেদশাস্ত্র আয়ত্ত করেছে। আপনার অনুমতি হলে তারা নিজ নিজ অস্ত্রবিদ্যা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে।”
আচার্য দ্রোণের কথায় মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পরম সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “হে ভরদ্বাজপুত্র দ্রোণ, আপনি আমাদের জন্যে মহৎ এক কাজ সম্পন্ন করলেন। এখন যে স্থানে সকলের অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শন করা যাবে এমন একটি রঙ্গভূমি আপনি যেভাবে উপদেশ করবেন সেভাবেই বানিয়ে দেওয়া হবে। আপনার আদেশের বিন্দুমাত্র অন্যথা হবে না। আমার গভীর অনুতাপের বিষয়, আমি দৃষ্টিহীন। কিন্তু আমি অন্ধ হলেও রাজকুমারেরা যে সকল দৃষ্টিবান ব্যক্তিদের সামনে নিজ নিজ অস্ত্রশিক্ষার পরিচয় দেখাবে, আমি তাঁদের পাশেই উপস্থিত থাকতে চাই।”
এরপর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বললেন, “হে ধর্মরাজ বিদুর, আচার্য দ্রোণ আমাদের মহা উপকার করেছেন। এখন তিনি যা যা আদেশ করবেন, তুমি তাড়াতাড়ি সেইসব কাজ সম্পন্ন করবে।”
আচার্য দ্রোণ বিস্তীর্ণ এক সমতল ক্ষেত্রে রঙ্গভূমির উপযুক্ত একটি জমির সীমা পরিমাণ করলেন। ওই স্থান গাছপালা ও লতাগুল্মহীন পরিচ্ছন্ন, কিন্তু কোথাও কোথাও প্রস্রবণ এবং জলাশয় দিয়ে সুন্দর সাজানো। শুভ নক্ষত্র ও তিথি অনুযায়ী অনুষ্ঠানের মঙ্গল মূহুর্ত ঠিক করে আচার্য দ্রোণ মঙ্গলপূজা সম্পন্ন করলেন। রাজশিল্পীরা সেই রঙ্গভূমির মধ্যে অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শনের জন্য অতি প্রশস্ত সুন্দর গৃহ নির্মাণ করলেন। রাজা, রাজ-অতিথি এবং স্ত্রীলোকদের বসার জন্যে অনেকগুলি সুরম্য দর্শক আসন নির্মাণ করা হল। রঙ্গভূমির আশেপাশে নগরবাসীরা উৎসাহের সঙ্গে ছোটো ছোটো মঞ্চ এবং সুন্দর সাজানো শিবিকা স্থাপন করতে লাগল।
নির্দিষ্ট দিনে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র মহাত্মা ভীষ্ম ও আচার্য কৃপকে সঙ্গে নিয়ে রাজ-আসনে এসে বসলেন। বৈদূর্যমণি খচিত মুক্তার মালিকা এবং নানান সোনালি আলপনায় সেই আসন স্থল অতীব রমণীয়। মহাভাগ্যবতী গান্ধারী, কুন্তী এবং অন্যান্য রাজমহিষীরাও মূল্যবান বস্ত্র পরে, দাসীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁদের নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। নগরের জনগণ রাজকুমারদের অস্ত্র কুশলতা দেখার জন্যে দলে দলে এসে উপস্থিত হতে লাগল। উপস্থিত লোকের কোলাহল সেই রঙ্গভূমিতে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। এমন সময় বাদ্যকরেরা যখন মৃদু সুরে ও ছন্দে বাদ্য যন্ত্র বাজাতে শুরু করল, কোলাহল স্তব্ধ হল। তখন রঙ্গভূমির কেন্দ্রে উপস্থিত হলেন আচার্য দ্রোণ, সঙ্গে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা।
আচার্য দ্রোণের পরনে সেদিন শুভ্র বসন, গলায় শুভ্র ফুলের মালা, শুভ্র উপবীত। তাঁর শুভ্র কেশ, শুভ্র শ্মশ্রু, শ্বেতচন্দনের প্রলেপ তাঁর শরীরে। সেদিন তাঁকে মেঘহীন সুনীল আকাশে পূর্ণ চন্দ্রমার মতো মনে হচ্ছিল। নির্দিষ্ট মূহুর্তে বিজ্ঞ ও মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দিয়ে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করলেন। এরপর রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করলেন আচার্য দ্রোণের অনুচরেরা।
এরপর মহাবীর রাজকুমারেরা সকলের জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে সামনে রেখে রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করলেন। তাঁদের সঙ্গে বদ্ধ তূণ, ধনু, তির। তাঁদের আঙুলে অঙ্গুলিত্র। আচার্য দ্রোণের নির্দেশে তাঁরা নিজ নিজ কুশলতা দেখাতে লাগলেন। রাজকুমারদের ছোড়া তিরের ভয়ে কোনও কোনও দর্শক মাথা নিচু করল। কিন্তু সকলেই অর্জুনের ক্ষিপ্রতা এবং বিচিত্র কুশলতা দেখে অবাক হয়ে গেল। রাজকুমারেরা দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠ থেকে তির ছুড়ে স্থির-লক্ষ্য ভেদ করলেন। কেউ কেউ হাতির পিঠ থেকে চলন্ত-লক্ষ্য ভেদ করলেন। কেউ রথে চড়ে রঙ্গভূমির মধ্যে বারবার ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। দর্শকেরা রাজকুমারদের এই আশ্চর্য কৌশল দেখে বারবার কোলাহলে উদ্বেল হতে লাগল। তাদের উচ্ছ্বসিত সাধুবাদে রঙ্গস্থল পূর্ণ হয়ে উঠল।
এইসময় মহাবীর ভীম ও দুর্যোধন গদা হাতে দুই পাহাড়ের মতো রঙ্গভূমির কেন্দ্রে নেমে এলেন। দুই বীর নিজেদের পৌরুষ দেখানোর জন্যে বারবার সিংহের মতো গর্জন করতে লাগলেন। তারপর তাঁরা একে অন্যকে আঘাত করার জন্য গদা হাতে গোল হয়ে ঘুরতে লাগলেন। রঙ্গভূমির এই সকল দৃশ্যের কথা বিদুর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে এবং মাতা কুন্তী ও রাজমহিষী গান্ধারীকে সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগলেন।
মহাবীর ভীম ও দুর্যোধনকে লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে দেখেই উপস্থিত দর্শকেরা যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক দল দুর্যোধনের সমর্থনে, অন্য দল ভীমের সমর্থনে চিৎকার করতে লাগল। দর্শকদের এই উত্তেজনা দেখে ধীমান আচার্য দ্রোণ পুত্র অশ্বত্থামাকে ডেকে বললেন, “পুত্র, দু’জনকেই সংযত হতে বলো। তারা যেন গদা যুদ্ধ শুরু না করে।  দু’জনেই মহাবীর, ওরা যেন ক্রোধে উত্তেজিত না হয়ে ওঠে।”
অশ্বত্থামা পিতার আদেশে তখনই দুর্যোধন ও ভীমের কাছে গিয়ে তাঁদের গদাযুদ্ধ থেকে নিরস্ত করলেন।
এরপর আচার্য দ্রোণ রঙ্গভূমির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন, “আমার শিষ্য রাজকুমার অর্জুন আমার পুত্রের থেকেও প্রিয়। অর্জুন সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত এবং দেবরাজ ইন্দ্রের তুল্য মহাবীর। হে দর্শকগণ, আপনারা এঁকে দেখুন, এঁর রণকুশলতা দেখুন।”
অর্জুন আচার্যের আদেশে রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে গোধিকা চর্মের অঙ্গুলি ত্রাণ। বক্ষে কাঞ্চনময় কবচ। হাতে ধনুর্বাণ। রঙ্গভূমির চারদিক থেকে শাঁখ বেজে উঠল, বেজে উঠল রণবাদ্য। তাঁর রাজসিক উপস্থিতিতে দর্শকেরা সকলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। তাদের কেউ বলল, “ইনিই শ্রীমান কুন্তীপুত্র।” কেউ বলল, “ইনিই তৃতীয় পাণ্ডব।” কেউ বলল, “ইনিই ইন্দ্রের পুত্র, কৌরবদের রক্ষক।” “ইনি অস্ত্রচালনায় সকলের শ্রেষ্ঠ।” “ইনি পরম ধার্মিক।” “ইনি মহাবীর, কিন্তু অত্যন্ত সংযত।”
দর্শকদের এই প্রশংসা-বাক্যে আকাশ যেন ফেটে পড়ল। পুত্রের প্রশংসা শুনে মাতা কুন্তীর বুক আনন্দে ভরে উঠল, তাঁর দুই চোখে বইতে লাগল আনন্দের অশ্রু।
রঙ্গভূমির এই প্রবল কোলাহল শুনে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে জিজ্ঞেস করলেন, “বিদুর, কীসের জন্যে রঙ্গভূমির দর্শকেরা এত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল?”
বিদুর বললেন, “মহারাজ, পাণ্ডুপুত্র শ্রীমান অর্জুন যোদ্ধা বেশে রঙ্গস্থলে উপস্থিত হওয়ায় দর্শকেরা অর্জুনের প্রশংসা করছে। এই কোলাহল সেই ভূয়সী প্রশংসার।”
মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বললেন, “হে বিদুর, কুন্তীপুত্র তিন পাণ্ডবের জন্যে আমি ধন্য, গর্বিত - আমি সুরক্ষিত হলাম।”
অর্জুনের আশ্চর্য অস্ত্র কুশলতা দেখে মুগ্ধ হওয়ার জন্যে দর্শকরাও উদ্গ্রীব আগ্রহে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে।
আচার্য দ্রোণের অনুমতি পেয়ে অর্জুন অস্ত্রচালনার দক্ষতা দেখাতে শুরু করলেন। প্রথমেই তিনি অগ্নিবাণে অগ্নি সৃষ্টি করলেন। পরক্ষণেই বরুণ বাণ প্রয়োগ করে জল সৃষ্টি করে সেই আগুন নিভিয়ে ফেললেন। তারপর বায়ু বাণে প্রচণ্ড ঝড় এবং জলদ বাণে আকাশে মেঘ সৃষ্টি করলেন। ভৌম বাণে মাটির মধ্যে প্রবেশ করলেন, পার্বত বাণে পাহাড় তৈরি করলেন। তারপর অন্তর্ধান বাণে নিজে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এরপর অদ্ভুত কৌশলে তিনি কখনও দীর্ঘদেহী, কখনও বামনের মতো ছোটো হয়ে গেলেন। ক্ষিপ্রগতিতে কখনও তিনি রথের সামনে, কখনও রথের উপরে চড়ে বসলেন। আবার পরক্ষণেই রথ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে নেমে পড়লেন। তারপর নানান তির নিক্ষেপ করে বড়ো, ছোটো, সূক্ষ্মーনানান লক্ষ্য অনায়াসে ভেদ করতে লাগলেন। একসঙ্গে পাঁচটি তির ছুড়ে বিদ্ধ করলেন চলন্ত এক লোহার বরাহের মুখ। দড়িতে ঝোলানো, বাতাসে দুলতে থাকা গরুর শিংয়ের একটি তূণকে তিনি একই সঙ্গে একুশটি বাণে বিদ্ধ করলেন। এইভাবে তিনি অসিবিদ্যা, তির-ধনু এবং গদা চালনার নানান কৌশল দেখাতে লাগলেন।
মহাবীর অর্জুনের এই আশ্চর্য রণকৌশল দেখে উপস্থিত জনগণ নির্বাক হয়ে রইল। উপস্থিত সমস্ত দর্শক যখন মুগ্ধ এবং নিস্তব্ধ, সেই সময় রঙ্গভূমির দরজায় ভয়ংকর হুঙ্কার এবং বাহু আস্ফালনের শব্দ পাওয়া গেল। উপস্থিত দর্শকেরা চমকে উঠল, এ ভীষণ শব্দ কীসের? কোনও পাহাড়ে ফাটল ধরল, নাকি প্রবল মেঘের গর্জন? দর্শকেরা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, মহাবীর দুর্যোধন গদা হাতে একশো ভাইদের সঙ্গে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে আচার্য দ্রোণকে তখন পাঁচটি নক্ষত্রে ঘেরা চাঁদের মতোই উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় দেখাচ্ছিল। তিনি নিজপুত্র অশ্বত্থামা ও উত্তেজিত দুর্যোধনকে নিরস্ত করলেন।
এই সময় সেই রঙ্গভূমিতে এসে উপস্থিত হলেন কর্ণ। তাঁর দুই কানে সোনার কুণ্ডল। তাঁর সহজাত বলিষ্ঠ শরীর, কোমরে খড়্গ। রঙ্গভূমিতে তিনি বিশাল এক পাহাড়ের মতো পায়চারি করতে লাগলেন। তিনি একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই আচার্য দ্রোণ ও কৃপকে প্রণাম করলেন। তারপর উপস্থিত সমস্ত লোককে সম্বোধন করে বললেন, “এই মহাবীর অর্জুন যা যা করে দেখালেন, আমিও তাই তাই করে দেখাব। আপনারা অবাক হবেন না।”
এই কথা বলে আচার্য দ্রোণের অনুমতি নিয়ে অর্জুন যে যে কৌশল দেখিয়ে উপস্থিত জনতাকে মুগ্ধ করেছিলেন, কর্ণও সেইসব কৌশল এক এক করে দেখালেন। উপস্থিত জনতা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল কর্ণের প্রশংসায়। তারা অবাক হয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠল, কে এই মহাবীর?
কর্ণের এই কুশলতা দেখে অর্জুন খুশি হলেন না। কিন্তু দুর্যোধন কর্ণকে আলিঙ্গন করে বললেন, “হে মহাবীর, আমাদের সৌভাগ্য যে তুমি আজ এখানে উপস্থিত হয়েছ। তুমি নিজের ইচ্ছেমতো কুরুরাজ্য উপভোগ করো।”
দুর্যোধনের এই উচ্ছ্বাস দেখে কর্ণ বললেন, “হে প্রভো, আশা করি আমি আমার কর্তব্য ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছি। এখন আমি আপনার বন্ধু এবং অর্জুনের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে চাই।”
দুর্যোধন বললেন, “উত্তম কথা। এখন আমার বন্ধুত্ব গ্রহণ করে তুমি বিষয়-সম্পদ ভোগ করো, পরে বিপক্ষের মাথায় পদাঘাত করে সুখে কাল কাটিও।”
দুর্যোধনের এই উদ্ধত কথায় অর্জুন আহত সাপের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “ওহে কর্ণ, যারা বিনা আহ্বানে এসে অন্যকে উপদেশ দেয়, যারা গায়ে পড়ে বড়ো বড়ো কথা বলে, তাদের যে স্থানে যাওয়া দরকার, তোর প্রাণ সংহার করে সেই উপযুক্ত স্থানেই পাঠাব।”
কর্ণ উত্তর দিলেন, “হে অর্জুন, এই রঙ্গভূমি সাধারণের জায়গা। এখানে তোমার বিশেষ কোনও অধিকার নেই। এখানে উপস্থিত রাজাদের সকলেই মহাবীর এবং ধর্মপরায়ণ। সেই সকল গুরুজনদের সামনে তির মেরে তোমার মুণ্ডপাত যদি না করতে পারি, তা হলে আর ব্যর্থ তির ছোড়ায় কী লাভ?”
এরপর মহাবীর অর্জুন আচার্য দ্রোণের আদেশে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে যুদ্ধের জন্যে কর্ণের সামনে উপস্থিত হলেন। কর্ণও দুর্যোধন ও তাঁর ভাইদের শুভেচ্ছা নিয়ে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হলেন। পুত্রবৎসল দেবরাজ ইন্দ্র রঙ্গভূমির আকাশ বলাকা শোভিত ঘনমেঘে আচ্ছন্ন করে দিলেন। তাই দেখে কর্ণপিতা সূর্যদেবও নিজের উজ্জ্বল জ্যোতিতে মেঘ সরিয়ে দিলেন। যেদিকে অর্জুন সেদিকে মেঘের শীতল ছায়া, যেদিকে কর্ণ সেদিকে প্রখর রৌদ্র! অর্জুনের পক্ষে আচার্য দ্রোণ, কৃপ ও মহামতি ভীষ্ম রইলেন। আর কর্ণের পক্ষে রইলেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা। উপস্থিত দর্শক ও মহিলারাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজ নিজ পক্ষকে সমর্থন করতে লাগলেন। কিন্তু পাণ্ডবমাতা কুন্তী অর্জুন ও কর্ণকে মুখোমুখি যুদ্ধে উদ্যত দেখে জ্ঞান হারালেন। পরিচারিকাদের সেবায় মাতা কুন্তী সুস্থ হলেন, কিন্তু তিনি বিষণ্ণ মুখে রঙ্গভূমির দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারণ বিবাহের আগেই সূর্যের আশীর্বাদে কুন্তীর যে পুত্র লাভ হয়েছিল, সেই পুত্রই এই কর্ণ!
দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রস্তুত দুই যোদ্ধাকে দেখে আচার্য কৃপ বললেন, “কুন্তীপুত্র ও মহারাজ পাণ্ডুর তৃতীয় পুত্র অর্জুন তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবেন। এখন হে মহাবীর, তোমার মাতা-পিতার পরিচয় দাও। কোন রাজবংশে তোমার জন্ম সেকথা জানার পরই এই দ্বন্দ্বযুদ্ধ সম্ভব। রাজপুত্রেরা কখনও অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন না।”
এই কথা শুনে কর্ণ লজ্জায় মাথা নত করলেন। তাঁর মুখ এখন অতি বর্ষণে পদ্মের মতো ম্লান।

কর্ণের অঙ্গরাজ্যে অভিষেক

মহাবীর কর্ণের এই অসম্মান দেখে দুর্যোধন আচার্য দ্রোণকে বললেন, “হে আচার্য, শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যিনি সৎ-বংশে জন্মেছেন, বীর এবং সমরকুশল, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করাই যায়। তবুও অর্জুন রাজা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যদি যুদ্ধ না করতে চায়, আমি এই মুহূর্তেই কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করছি।”
দুর্যোধন মহাবীর কর্ণকে তৎক্ষণাৎ সসম্মানে সোনার আসনে বসালেন। মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে ডেকে খই, পুষ্প এবং সোনা দিয়ে কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। মহারাজ কর্ণের মাথায় রাজছত্র ধরা হল। তাঁর দু’পাশে চামর বীজন করে বন্দিরা বন্দনা গান শুরু করলেন।
অঙ্গরাজ কর্ণ কৃতজ্ঞ চিত্তে দুর্যোধনকে বললেন, “হে মিত্রবর, রাজ্যদানের যোগ্য তোমার কী উপকার আমি করতে পারি বলো।”
দুর্যোধন বললেন, “হে অঙ্গরাজ কর্ণ, এখন আমি তোমার বন্ধুত্ব ছাড়া আর কোনও উপকারই চাই না।”
কর্ণ, “তাই হোক” বলে দুর্যোধনকে আলিঙ্গন করলেন। দু’জনেই খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।
এই সময় কর্ণের পালক পিতা সূত অধিরথ ঘর্মাক্ত শরীরে, উত্তরীয়হীন খালি গায়ে রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে অঙ্গরাজ কর্ণ অভিষেক স্নানে সিক্ত মাথা নত করে পিতাকে প্রণাম করলেন। সারথি অধিরথ কর্ণকে ‘প্রিয় পুত্র’ বলে সম্বোধন করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর খুশির অশ্রুতে কর্ণের স্নানে ভেজা মাথা আবার অভিষিক্ত হয়ে উঠল। এই দৃশ্য দেখে ভীমসেন কর্ণকে সূতপুত্র বুঝতে পেরে বললেন, “রে সূতনন্দন, অর্জুনের হাতে রণক্ষেত্রে মৃত্যু তোর পক্ষে মোটেই উচিত কাজ নয়। বরং বংশের ধারা অনুসারে অশ্বের বল্গা ধর। অগ্নিতে উৎসর্গ করা যজ্ঞের ঘি যেমন কুকুরের ভোজ্য হতে পারে না, তেমনি তুইও অঙ্গরাজ্যের রাজা হবার উপযুক্ত লোক নোস।”
ভীমসেনের এই উদ্ধত কথা শুনে ক্রোধে কর্ণের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। তিনি কিছু বললেন না। বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু দুর্যোধন ভীমসেনের কথায় মত্ত হাতির মতো ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “ওহে ভীম, কর্ণকে এমন কটু কথা বলা তোমার উচিত হল না। ক্ষত্রিয়দের শক্তিই আসল কথা এবং তাঁরা ক্ষত্রিয়ের সঙ্গেই যুদ্ধ করবেন। মহর্ষি দধীচির অস্থি থেকে অসুরকুল বিনাশী বজ্র উৎপন্ন হয়েছিল। অগ্নি, রুদ্র, গঙ্গা ও কৃত্তিকার পুত্র কার্তিকেয় অসাধারণ পরাক্রমশালী। অনেকে ক্ষত্রিয় বংশে জন্মেও পরে ব্রাহ্মণ হয়েছেন। বিশ্বামিত্র প্রমুখ ক্ষত্রিয় হয়েও অক্ষয় ব্রহ্মত্ব লাভ করেছেন। আচার্য দ্রোণ ঋষিপুত্র হয়েও অতুলনীয় শস্ত্রবিদ হয়েছেন। তোমাদের জন্ম কীভাবে হয়েছে সেকথাও আমরা সকলেই জানি। হরিণীর গর্ভে যেমন বাঘের জন্ম সম্ভব হয় নয়, তেমনি কবচ ও কুণ্ডলধারী, সকল সুলক্ষণযুক্ত, সূর্যের মতো উজ্জ্বল মহাবীর কর্ণও সামান্য বংশে জন্মেছেন, এ হতেই পারে না। কর্ণ যে অঙ্গরাজ্যের রাজা হয়েছেন, এটা কোনও বড়ো ব্যাপারই নয়। তিনি ইচ্ছা করলে নিজের বাহুবলে এবং আমাদের সাহায্যে সমস্ত পৃথিবী জয় করতে পারেন। যিনি কর্ণের এই রাজ্য বিজয়ের বিরোধ করবেন, তিনিই এসে যুদ্ধ করতে পারেন।”
এই সময় আকাশের সূর্য অস্তে গেল। দুর্যোধন অঙ্গরাজ কর্ণের হাত ধরে রঙ্গভূমি থেকে বেরিয়ে গেলেন। আচার্য দ্রোণ, কৃপ ও ভীষ্মের সঙ্গে পাণ্ডবেরাও নিজ নিজ ভবনে ফিরে গেলেন। দর্শকেরাও কেউ অর্জুনের, কেউ কর্ণের, কেউ বা দুর্যোধনের পক্ষ নিয়ে তর্ক করতে করতে নিজ নিজ গৃহে  ফিরে গেল। এদিকে কর্ণকে নিজের পুত্র বলে চিনতে পেরে পাণ্ডবমাতা কুন্তীর মনে তাঁর প্রতি স্নেহের উদ্রেক হল। কর্ণের বন্ধুত্ব লাভ করে দুর্যোধনের মন থেকে ভীম ও অর্জুনের ভয় দূর হয়ে গেল। আর যুধিষ্ঠির কর্ণকেও অদ্বিতীয় ধনুর্ধর বলে চিনতে পারলেন।

আচার্য দ্রোণের গুরুদক্ষিণা

আচার্য দ্রোণ পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের অসামান্য ধনুর্ধর দেখে গুরুদক্ষিণা নিতে মনস্থ করলেন। তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, “হে শিষ্যগণ, তোমরা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাস্ত করে আমার সামনে উপস্থিত করো। সেটাই হবে আমার গুরুদক্ষিণা।”
শিষ্যেরা, “তাই হোক” বলে আচার্য দ্রোণের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নিয়ে রাজধানী ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন।
শিষ্যেরা পাঞ্চালদেশ আক্রমণ করে দ্রুপদরাজের রাজধানীতে যুদ্ধ আরম্ভ করলেন। দুর্যোধন, কর্ণ, মহাবল যুযুৎসু, দুঃশাসন, বিকর্ণ, জলসন্ধ, সুলোচন প্রমুখ বীর রাজকুমারেরা ‘দ্রুপদরাজকে আমিই যুদ্ধে হারাব’ - এই স্থির করে আস্ফালন করতে লাগলেন। কৌরব রাজকুমারদের দেখে দ্রুপদরাজ যজ্ঞসেনও বর্ম পরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের জন্যে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি সাদা রথে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে কৌরব রাজকুমারদের লক্ষ্য করে সাংঘাতিক ক্ষিপ্রতায় তির নিক্ষেপ করতে লাগলেন।
কৌরব রাজকুমারদের অহংকার দেখে মহাবীর অর্জুন আচার্য দ্রোণকে বললেন, “হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, কৌরবকুমারেরা আগে নিজেদের শক্তি দেখাক, আমরা পরে যুদ্ধে নামব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এরা দ্রুপদরাজ যজ্ঞসেনকে পরাজিত করতে পারবে না।”
এই কথা বলে অর্জুন ও অন্যান্য পাণ্ডব-ভাইয়েরা নগরের সীমানা থেকে অর্ধ ক্রোশ দূরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এদিকে দ্রুপদরাজের ক্ষিপ্র শর চালনায় কৌরবকুমারেরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। যুদ্ধের শঙ্খধ্বনি এবং মৃদঙ্গের শব্দে নগরের শিবির থেকে অজস্র দ্রুপদ সেনাও গদা এবং মুষল হাতে কৌরবকুমারদের প্রহার করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে কৌরবকুমারেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।
এই সময় আচার্য দ্রোণকে প্রণাম করে পাণ্ডবগণ রথে চড়লেন। অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধ করতে মানা করে নকুল ও সহদেবকে চক্রব্যূহ রক্ষায় নিয়োগ করলেন। অর্জুন ও ভীমসেনের রথ দ্রুপদের সৈন্যদলের মধ্যে উন্মত্ত হাতির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। অর্জুন ও ভীমসেন দু’জনেই গদার প্রচণ্ড আঘাতে দ্রুপদরাজের হাতির দলকে সংহার করতে শুরু করলেন। ভীমসেনের গদার আঘাতে অজস্র হাতি, অশ্ব, রথ ও পদাতিক ভূমিসাৎ হল। দ্রুপদরাজের সৈন্যবল দুর্বল হয়ে গেল।
তখন মহাবীর অর্জুন শর-জালে দ্রুপদরাজ যজ্ঞসেনকে এবং তাঁর সৈন্যদেরও আচ্ছন্ন করে ফেললেন। অর্জুনের তিরে অজস্র পদাতিক, অশ্ব মারা গেল। অর্জুন পাঁচ তিরে রাজা যজ্ঞসেনের রথের ঘোড়া ও সারথিকে আহত করলেন। দুই তিরে দ্রুপদরাজের ধনু এবং রথের ধ্বজা ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। তারপর ধনুর্বাণ ছেড়ে হাতে উদ্যত তরবারি নিয়ে নিজের রথ থেকে নেমে দ্রুপদরাজের রথে চড়ে বসলেন। কিছুক্ষণ যুদ্ধের পর তিনি দ্রুপদরাজকে বন্দী করে ফেললেন। দ্রুপদরাজকে বন্দী করে অর্জুন দাদা ভীমসেনকে বললেন, “দাদা, দ্রুপদরাজ কুরুবীরদের আত্মীয়, তাঁর সৈন্যদের অকারণ সংহার করবেন না। আমাদের উদ্দেশ্য গুরুদক্ষিণা প্রদান। চলুন আমরা যুদ্ধ সংবরণ করি।”
অর্জুনের কথায় ভীম যুদ্ধে ক্ষান্ত হলেন। যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে দ্রুপদরাজ এবং তাঁর সচিবকে নিয়ে তাঁরা আচার্য দ্রোণের সামনে উপস্থিত হলেন।

দ্রোণাচার্যের প্রতিজ্ঞা রক্ষা

পরাজিত, বিধ্বস্ত এবং সর্বস্বান্ত দ্রুপদরাজকে দেখে আচার্য দ্রোণ বললেন, “হে দ্রুপদরাজ, আমার আদেশে তোমার রাজ্য ও নগরী, এমনকি তোমার জীবনও এখন বিপক্ষের হাতে। দেখো, এখনও তুমি আমার বন্ধুরূপে যা চাইবে আমি তোমাকে তাই দেব। হে বীর, তুমি তোমার জীবননাশের চিন্তা করো না, কারণ আমরা ক্ষমাশীল ব্রাহ্মণ। তাছাড়াও শৈশবে আমরা একই আশ্রমে খেলা করেছি। সেই কারণে, যতই ক্রোধ হোক না কেন, তোমার প্রতি প্রীতি ও স্নেহ থেকেই গেছে। হে মহারাজ, আমি তোমার সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব স্থাপনের আশা রাখি। হে যজ্ঞসেন, এই জন্যে আমি তোমার রাজ্যের অর্ধেক তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।  তুমি আগে বলেছিলে, যে ব্যক্তি রাজা নয়, সে রাজার মিত্র হতে পারে না। অতএব, এখন থেকে তুমি ভাগীরথীর দক্ষিণ তীরের রাজা হবে, আর আমি হব উত্তর তীরের। যদি তুমি সম্মত হও, তাহলে আমার বন্ধুত্ব স্বীকার করো।”
আচার্য দ্রোণের কথা শুনে রাজা যজ্ঞসেন বললেন, “হে ব্রহ্মন, পরাক্রমশালী মহাত্মা ব্যক্তিদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, আজ জানলাম। আমি তোমার বাক্যে অত্যন্ত প্রীত হলাম এবং সারাজীবন তোমার প্রসন্ন বন্ধুত্ব আশা করব।”
আচার্য দ্রোণ দ্রুপদরাজের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সসম্মানে অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন। দ্রুপদরাজ বিষণ্ণ মনে গঙ্গার উপকূলে মাকন্দী নগরী ও কাম্পিল্যপুরী শাসন করতে লাগলেন। পরাস্ত হয়ে তিনি আগের থেকে অনেক হীনবল হয়ে পড়লেন এবং নিজের ক্ষমতায় আচার্য দ্রোণকে পরাস্ত করতে পারবেন না বুঝে ব্রহ্ম-বলে পুত্রলাভের আশায় পৃথিবী পর্যটনে বের হলেন। এদিকে আচার্য দ্রোণ চর্মণ্বতী নদী পর্যন্ত দক্ষিণ পাঞ্চালদেশ নিজের অধিকারে রেখে সেখানকার অহিচ্ছত্রা নগরীর রাজা হয়ে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন।

যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যে অভিষেক ও পাণ্ডবদের রাজ্য জয়

একবছর পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। যুধিষ্ঠির রাজ্যলাভ করে কিছুদিনের মধ্যেই নিজের অসাধারণ ধৈর্য, স্থৈর্য, সহিষ্ণুতা, সরল সত্যতা এবং অহিংস আচরণে নিজ পিতার মহিয়সী কীর্তিকেও অতিক্রম করলেন। মহাবলী ভীম এবং মহাবীর অর্জুন অত্যন্ত অনুগত ভাই হিসেবে রাজা যুধিষ্ঠিরের প্রধান সহায় হয়ে উঠলেন।
একবার আচার্য দ্রোণ রাজসভায় অর্জুনকে সম্বোধন করে বললেন, “বৎস, আমার গুরু অগ্নিবেশ মুনি অগস্ত্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেছিলেন। একসময় তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘বৎস, তপোবলে ব্রহ্মশিরাঃ নামে একটি অমোঘ অস্ত্র লাভ করেছি, আমি শিষ্য পরম্পরায় সেই অস্ত্র তোমার হাতে দিয়ে যেতে চাই। এই অস্ত্র কখনও মানুষ কিংবা দুর্বল প্রাণীর উপর প্রয়োগ করো না। উপযুক্ত প্রতিপক্ষে ব্যবহার না করলে পৃথিবীও দগ্ধ হয়ে যেতে পারে।’ বৎস অর্জুন, এখন তোমার মতো যোগ্য আর কাউকে দেখছি না। অতএব এই অস্ত্র তোমাকেই প্রদান করছি। কিন্তু বৎস, মুনি যে নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছেন, দেখো, তার যেন অন্যথা না হয়। তবে তোমার ভ্রাতা ও পরিজনদের সামনে তোমাকে আরও কিছু গুরুদক্ষিণা দিতে হবে।”
অর্জুন বিনা প্রশ্নে আচার্য দ্রোণের আদেশ স্বীকার করে নিলেন। তখন আচার্য দ্রোণ বললেন, “হে অর্জুন, যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি আমার প্রতিযোদ্ধা হবে, এই প্রতিজ্ঞা করো।” 
“আপনার আদেশ শিরোধার্য, গুরুদেব। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম।”
এর কিছুদিন পরেই অর্জুন উত্তরদিকে বেরিয়ে পড়লেন। হিমালয়ের কাছে গন্ধর্বরাজ্যে যবনরাজ সৌবীর প্রায়ই উপদ্রব করতেন। সেখানে এক রণস্থলে মহাবীর অর্জুন সৌবীরকে সংহার করে গন্ধর্বরাজ্যকে যবন মুক্ত করলেন। এই সৌবীর তিন বৎসর ধরে এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছিলেন। তিনি সর্বদাই কুরুদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করতেন। রাজা বিচিত্রবীর্য এবং পরে মহারাজ পাণ্ডু যে সৌবীরকে পরাস্ত করতে পারেননি, মহাবীর অর্জুন সেই অতুলনীয় বীর সৌবীরকে বিনাশ করলেন।
সৌবীর জয়ের পর অর্জুন ও ভীমসেন এক রথেই পশ্চিমদেশবাসীদেরও পরাজিত করেন। সেখান থেকে তাঁরা দক্ষিণদেশে গিয়ে সেইসব দেশও জয় করলেন। তারপর পরাজিত রাজাদের থেকে প্রচুর অর্থ সম্পদ সংগ্রহ করে কুরুরাজ্যে নিয়ে এলেন। মহাবীর পাণ্ডবেরা এইভাবেই অনেক রাজাদের রাজ্যচ্যুত করে নিজেদের রাজ্যের সীমা বিস্তার করলেন।
কিন্তু পাণ্ডবদের অলৌকিক বাহুবল বিবেচনা করে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত ঈর্ষা অনুভব করতে লাগলেন। এই চিন্তায় তাঁর রাত্রের সুখের ঘুমও দূর হয়ে গেল।

[কৃতজ্ঞতাঃ মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল মহাভারতের বঙ্গানুবাদ। প্রকাশকঃ বসুমতী সাহিত্য মন্দির]
(ক্রমশ)

অঙ্কনশিল্পীঃ দীপিকা মজুমদার

No comments:

Post a Comment