অণুগল্পঃ কররেখাঃ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী


কররেখা

অরুণাচল দত্ত চৌধুরী


নরু বুঝল ভুল করে ফেলেছে। এ লাইনে কাজ হাতে নিয়ে নেবার পর পিছিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই। এটা তার এই লাইনে প্রথম কাজ। না করতে পারলে প্রাণসংশয়। তবুও কাজটা না করেই এলাকা ছেড়ে উধাও হয়ে যাবে নরু।
ক্লাস ফাইভে নতুন ইশকুলে গিয়ে নরোত্তমের সবচেয়ে বন্ধু হয়েছিল সূর্যনারায়ণ, মানে সুজু। সে আবার লেখাপড়ায় বেদম ভালো। তাতে বন্ধুত্ব আটকায়নি। এইটে উঠে সে বন্ধুত্বে ছেদ পড়ে। সুজুর বাবার ছিল বদলির চাকরি। আর নরু নিজে নাইনে উঠে লেখাপড়ার পাট ত্যাগ করে ছিল। সাতঘাটের জল খেতে খেতে এই শহরে এসে ঠেকেছে। সেই কৈশোর থেকে কুসঙ্গে মেলামেশা।
এক প্রফেসরকে খুন করার বরাত নিয়েছে মোটা টাকার লোভে। দূর থেকে চিনিয়ে দিয়ে গেছে পার্টি। নরু তবুও অচেনা মক্কেলকে একটু কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিল। ওকে তো আর চেনে না! ভয় কী? যাওয়া আসার রাস্তাটা আবডালে এঁচে নিতে হবে। তারপরই কোপ। নির্জনে গলার নলি ফাঁক।
এই কলেজ ক্যান্টিনে সেই কাছ থেকে দেখেই ব্যোমকে গেল নরু। প্রফেসর এস. এন. ব্যানার্জির ডান হাতে ছ’টা আঙুল। মুখটা চেনা চেনা। বাঁ গালে আঁচিল।
সাহস করে জিজ্ঞেসই করে ফেলল, “আপনি কি সুজু?”
সূর্যনারায়ণের আজ আর ক্লাস নেই। তারপর দুই বন্ধু অনেকক্ষণ পুরনো দিনের কথা বলল। সূর্যই মনে করাল গামছা ঘষে ঘষে নরুর কপালে সে রাজটিকা বানিয়ে দিয়েছিল। কপালের সেই ঘা সারতে পাক্বা দু’মাস। অবিশ্যি নরুও সুজুকে সেদিনই…
“মাঝে মাঝে আসিস।”
শুনে মাথা নাড়ল নরোত্তম। “না রে, আমাকে তোদের এই শহর ছেড়ে পালাতে হবে, আজই।”
আস্তে আস্তে গুছিয়ে সূর্যনারায়ণকে কেন পুলিশে যেতে হবে, এর পর থেকে কেনই বা খুব সাবধানে থাকতে হবে শোনাল নরু। শুধু মুখ ফুটে বলতেই পারল না সে কেন পালাবে। সেই কবে ক্লাস সিক্সে এই সুজুর ছ’আঙুলওলা ওই ডান হাতের চেটোয় চাকু দিয়ে কেটে আয়ুরেখা বাড়িয়ে দিয়েছিল সে নিজে। সেই ঘা সারতেও লেগেছিল দু’মাস।
নিজে রাজা হতে পারেনি। সুজুর আয়ুরেখা বেড়েছিল সত্যিই।

_____

No comments:

Post a Comment